সাইবার ওয়ার সমাচার নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন

5
312

আইটি সেক্টরের সাথে কম-বেশি জড়িত বা পরিচিতজনদের মধ্যে বিশেষত তরুণদের মাঝে এক টান টান উত্তেজনা ক’দিন ধরেই পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটরিয়া থেকে শুরু করে মাঠ বা আড্ডা- সব জায়গায়ই সর্বাধিক আলোচিত বিষয় ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার ওয়েবসাইট হ্যাকিং ও পাল্টা হ্যাকিংয়ের ঘটনা । নিজ নিজ হ্যাকারদের সপক্ষে সরব হয়ে উঠেছেন বিভিন্ন প্রোগ্রামার, ওয়েব মাস্টার থেকে শুরু করে সোস্যাল নেটওয়ার্ক ব্যবহারকারীরাও। আড্ডা বা অফিসেও এই রেশ টেনে নিয়ে সরগরম করে তুলছে দুই দেশের মধ্যকার রাজনৈতিক ইস্যুগুলোকে, যাকে কাঠামোকরণ করা হচ্ছে সাইবার ওয়ার নামে।

সাইবার বলতে সাধারণত কম্পিউটার নেটওয়ার্ককে বোঝানো হয়। আর নেটওয়ার্কের ওপর যারা অন-রালে থেকে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় তারা হ্যাকার নামে পরিচিত। হ্যাকারদের এই নিয়ন্ত্রণ-পাল্টা-নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাকেই সাইবার ওয়ার বা সাইবার যুদ্ধ বলা হচ্ছে।
সাইবার আধুনিক যুদ্ধের অন্যতম হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে। হাতের আঙুল কম্পিউটার কিবোর্ড চেপে যে তীর নিক্ষেপ করবে তা শত্রুর ঘাঁটিকে তছনছ করে ফেলবে তথ্য বিভ্রাট ঘটিয়ে। এত সহজ আর ভয়ঙ্কর উপায়টির নিয়ন্ত্রণ নিতে তাই পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো মরিয়া। যোদ্ধা হিসেবে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে হ্যাকার নিয়োগ দেয়ার সংবাদও প্রকাশিত হচ্ছে। তবে সব কিছুই চলছে চলমান পুঁজিবাদী- সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতি-রাজনীতির গতি-প্রকৃতিতে অবশ্যম্ভাবী বিশ্বযুদ্ধের প্রস’তি হিসেবে। আর বিশেষজ্ঞরা তাই বলছেন, আগামী বিশ্বযুদ্ধে সাইবার যুদ্ধও একটি অন্যতম হাতিয়ার হবে। কিন’ বর্তমানে ওয়েব জগৎ হ্যাকিং-পাল্টা হ্যাকিংয়ের ঘটনাবলিকে মিডিয়া বা আইটি সেক্টরের লোকজনও প্রচার চালাচ্ছেন সাইবার ওয়ার নামে।
ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে হ্যাকিংয়ের দিকটা সমপ্রতি বিশ্ব আলোচনাতে এলেও অতীতে এ ধরনের বহু ঘটনার সাক্ষী সাইবার জগৎ। আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ অনেক সংস’া যেমন- NASA, US Military, Lockeed Martin (পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান) এ সাইবার হামলা চালিয়েছিল Titan Rain কোড নামের একটি হ্যাকার গোষ্ঠী। হ্যাকিং ইতিহাসে এই হামলাকে এক ভয়ঙ্কর এবং শক্তিশালী হামলা হিসেবে ধরা হয়। কেউ জানে না, কবে থেকে কারা এই আক্রমণ শুরু করেছিল? তবে আক্রমণ দৃষ্টিগোচর হয় ২০০৪ সালে এবং অনেকের ধারণা চীনারা এ আক্রমণ চালায় । ২০০০ সালে বিশ্বের সব থেকে বড় সার্চ ইঞ্জিন yahoo হ্যাক করে Michael Calce নামে mafiaboy কোড নেমের এক হ্যাকার। yahoo প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির স্বীকার হয় এই হ্যাকিং-এ। এ ছাড়া Robert Tappan Morris নামের এক প্রোগ্রামার ইন্টারনেটে ডাটার পরিমাণ হিসাব করার জন্য একটা প্রোগ্রাম তৈরি করতে গিয়ে ভুলক্রমে morris worm নামের ভাইরাস তৈরি করেন। যা কিনা দ্রুত বিশ্বে ছড়িয়ে বিশ্বের প্রায় ৬০০০ কম্পিউটারকে পুরোপুরি নষ্ট করে ফেলে। ২০০৪ সালে mydoom নামে একটি ভাইরাসও ৩৯ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি করে। এই ভাইরাস বহনকারী প্রথম মেইল পাওয়া যায় রাশিয়া থেকে। তবে সব থেকে ভয়ঙ্কর সাইবার হামলা হয়েছিল ১৯৮২ সালে। The original logic bomb নামে এই সাইবার হামলায় কোনো মিসাইল, বিমান হামলা বা বিস্ফোরক ছাড়াই একটি সাইবেরিয়ান গ্যাস পাইপলাইন সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছিল। এ হামলায় CIA এমন কিছু কোড পাঠিয়েছিল, যেটা সেই গ্যাস পাইপলাইনের সিস্টেমকে সম্পূর্ণ ওলট-পালট করে দিয়ে পুরো সিস্টেম বিস্ফোরিত করে। তবে অতীতের এসব সাইবার হামলার চেয়ে সমপ্রতি ভারত-বাংলাদেশের পাল্টাপাল্টি হামলা অনেক রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করে।

Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting

বিভিন্ন মাধ্যমে জানা যায়, এই সাইবার আক্রমণে বাংলাদেশের পক্ষে মূলত তিনটি হ্যাকিং গ্রুপ নেতৃত্ব দেয় । BBHH (bd black hat hacker), BCA (bd cyber army) এবং 3xpr13 নামের তিনটি গ্রুপ। ঘটনার সূত্রপাতে যেটুকু জানা যায়, ব্ল্যাক বার্ন মুনলাইট নামের এক তরুণ প্রথমে বাংলাদেশ সাইবার আর্মির একজন সদস্য ছিলেন। বাংলাদেশের সব থেকে বড় এথিক্যাল হ্যাকারদের গ্রুপ বলে পরিচিত এই সাইবার আর্মি গ্রুপটি । ব্ল্যাক বার্ন মুনলাইট এই গ্রুপের নীতিমালা ভঙ্গ করে সাইবার আর্মি থেকে বহিষকৃত হয়ে বিডি ব্ল্যাক হ্যাকার নামের আনএথিক্যাল হ্যাকার গ্রুপটি গঠন করে বলে জানা যায়। এই গ্রুপ প্রথমে বাংলাদেশের কিছু সরকারি-বেসরকারি সাইট ধ্বংস করে। পরবর্তী সময়ে সাইবার আর্মির হস-ক্ষেপে বাংলাদেশী সাইট হ্যাকিং বন্ধ করে। এরপর ইন্ডিয়ান ওয়েবসাইট ডিফেস করা শুরু করে এবং সেখানে ইন্ডিয়া বর্ডারে বাংলাদেশী হত্যাকে ইস্যু করা হয়। এ ক্ষেত্রে ব্ল্যাক হ্যাট অল্প কিছু ইন্ডিয়ান দুর্বল কিছু ওয়েব সাইট হ্যাকিং করতে সক্ষম হয়। প্রতিক্রিয়ায় ইন্ডিয়ান সাইবার ফোরস (যেটি ইন্দেশেল নামে পরিচিত) বাংলাদেশ সাইবার আর্মির সাথে কথা বলে তারা পাল্টা আক্রমণ করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন’ পরদিনই ইন্ডিয়ান সাইবার ফোর্স বাংলাদেশের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ওয়েবসাইট হ্যাক করে এবং ডাটা ফাঁস করে দেয়। এরই সাথে বাংলাদেশ সাইবার আর্মিকে আক্রমণের আহ্বান জানায়। এরপরই বাংলাদেশ সাইবার আর্মি আক্রমণে নামে এবং এ ক্ষেত্রে তারা বাংলাদেশের অন্য সব হ্যাকার গ্রুপকে একত্র করে পাল্টা আক্রমণ চালায় এবং অপারেশনের নাম দেয় ‘অপারেশন ইন্ডিয়া’।
এ পর্যন- বাংলাদেশী হ্যাকাররা কতগুলো ভারতীয় সাইট হ্যাকিং করেছে তা নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য বলা হলেও, কোনো কোনো তথ্য প্রায় ২৬ হাজার ভারতীয় সাইট হ্যাক করার সংবাদও জানাচ্ছে। ইউটিউবে ভারত সরকারের উদ্দেশে একটি ভিডিও বার্তাও ছেড়েছে বাংলাদেশ সাইবার আর্মি। সেখানে সাতটি দাবি জানানো হয়েছে এবং দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন- হামলার হুমকি দিয়েছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- সীমানে- বাংলাদেশী নাগরিকদের সাথে বিএসএফের অমানবিক আচরণ বন্ধ করা, টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করা, তিস-ার পানি ঠিকভাবে সরবরাহ করা, বাংলাদেশী ওয়েবসাইটগুলোকে হ্যাক না করা। বাংলাদেশী হ্যাকাররা যেসব ওয়েবসাইটে আক্রমণ চালিয়েছে সে সবের মধ্যে ছিল শেয়ারবাজার-সংক্রান- পরামর্শ দেয়ার ওয়েবসাইট, ইন্ডিয়ার ইনকাম ট্যাক্স, ইন্ডিয়া স্টক এক্সচেঞ্জ, মাহিন্দ্র এক্সপ্রেস, বিএসএফ এবং কংগ্রেসের ওয়েবসাইটসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইট। পাল্টা ইন্ডিয়ান হ্যাকাররাও বাংলাদেশের কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটসহ প্রায় হাজারখানেক ওয়েবসাইট হ্যাক করেছে বলে প্রকাশ। ইন্ডিয়ার ক্ষেত্রে ইন্ডিয়ার সাইবার আর্মি ও ইন্ডিশেল বিশেষভাবে সক্রিয় বলে জানা যায়। তারাও ওয়েবসাইট হ্যাকিং করে তাদের দাবির কথা বলেছে। তারা জানাচ্ছে- বিএসএফের নির্যাতনসহ বাংলাদেশের প্রতি ভারতের বিভিন্ন বিষয়ে বৈষম্য আমরাও সমর্থন করি না। আবার এই সাইবার হামলাও সমর্থন করি না।

বিএসএফের নির্যাতনসহ বাংলাদেশের সাথে বিভিন্নভাবে ভারত বৈষম্য সৃষ্টি করে রেখে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে যেমন ক্ষোভের সঞ্চার করেছে, তেমনি ভারতের জনগণও তাদের স্বৈরাচারী সরকারের শাসন-শোষণে অতিষ্ঠ ও ক্ষুব্ধ। ভারতকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আঞ্চলিক মোড়ল বানিয়ে মার্কিন পরিকল্পনার সাথে সাথে মার্কিন-ভারত সমন্বিত পরিকল্পনাও কার্যকর করতে চায়। তাই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নির্ভরযোগ্য দালাল হিসেবে বাংলাদেশ সরকার জনগণের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে মার্কিন-ভারত সমন্বিত পরিকল্পনায় ভারতের স্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছে। টিপাইমুখ বাঁধ, তিস-ার পানিবণ্টন চুক্তি- এসব সে প্রক্রিয়ারই ফল। আর এর ফলে ক্ষতির শিকার দুই দেশের জনগণই। তাই হ্যাকার তরুণ গোষ্ঠীসহ প্রযুক্তি জানা তরুণ ও মুক্তিকামী জনগণকে ভাবতে হবে, ভারতবিরোধিতা করতে গিয়ে জনগণের সঠিক আন্দোলনকে বিপদগ্রস্ত করবে, নাকি দুই দেশের জনগণের স্বার্থেই দুই দেশ থেকেই সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালালদের উচ্ছেদ করতে পাল্টাপাল্টি সাইবার হামলাকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে বিপ্লবী আন্দোলনের অংশ হিসেবে সাইবার যুদ্ধে পরিণত করবে। এর জন্যই প্রয়োজন বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদীদের মধ্যকার বিশ্বযুদ্ধের বিপরীতে বিশ্ববিপ্লবের লক্ষ্যে, যে বিপ্লবী আন্দোলন দেশপ্রেমিক, হ্যাকারগোষ্ঠীর তাতে সংগঠিত হওয়া। নিজেদের অদম্য সাহস, মেধা আর দেশপ্রেম যদি প্রযুক্তির তালে কাঁপিয়ে দিতে পারে বিশ্বজনগণের দুশমন সাম্রাজ্যবাদ আর দালালদের ভিতকে, তবে বিপ্লবী আন্দোলনে এর চেয়ে চমৎকার ব্যাপার আর কী হতে পারে! সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো জনগণের বিপ্লবী আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের আধুনিক প্রযুক্তির যে দাম্ভিকতার প্রকাশ ঘটাচ্ছে, শ্রমিক-কৃষক-জনগণের পক্ষে দাঁতভাঙা জবাব তো নতুন প্রযুক্তি জানা এসব তরুণই দিতে পারে। সেটা বাংলাদেশ, ভারত বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র- যেকোনো দেশে বসেই হোক। জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যাপারগুলোতে যাদের এত দরদ ও সহানুভূতি প্রকাশ পাচ্ছে, জনগণের চূড়ান- আন্দোলনেও নিশ্চয়ই তারা শোষিত মানুষের আন্দোলনে একেকজন সৈনিক হয়ে প্রযুক্তির লড়াই করবে।
লেখক : সাংবাদিক

মুল পোস্ট এখানে – http://www.dailynayadiganta.com/details/34105

টিউনারপেজের নতুন টিউন আপনাকে ইমেইল করব?
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting

5 মন্তব্য

  1. আরে বাপরে বাপ পড়তে পড়তে হাপাইয়া গেছিগা ।অসাধারন তথ্য বহুল একটা টিউন ।আপনাকে ধন্যবাদ ভাই

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here

1 × 2 =