Horror Tune 40: ।। রহস্যময় মসজিদ ।। (পর্ব – ০১)

1
344

– ‘চল! গজারিবন ইকোপার্কেই যাই।’ প্রস্তাব দিল জাবির।
– ‘আবার ওখানে? কতদিনই তো ওখানে গেলাম। আজ অন্য কোথাও যাই।’
– ‘না, রায়হান। আজও ওখানেই যাব। তবে অন্য দিনের মতো ঐ হাঁটাহাঁটি, আড্ডাবাজি, দীঘিতে ঢিল ছোড়াছুড়ি করবো না। আজকে সম্পূর্ণ অন্যরকম একটা কাজ করব।’
– ‘হেঁয়ালি করিস না! পরিস্কার করে বল। সোহাগ, তুই কি কিছু জানিস?’
– ‘আমি বোধহয় আন্দাজ করতে পারছি। বলল সোহাগ। ‘তুই ঐ জঙ্গলের ভেতরে যেতে চাস, তাই না জাবির?’
– ‘ঠিক ধরেছিস।’
– ‘ওহ! তাহলে তো দারুণ মজা হবে!’ এবার রায়হানই গজারিবন যাওয়ার জন্য লাফ দিয়ে ঊঠল।

জাবির, রায়হান আর সোহাগ, তিন অন্তরঙ্গ বন্ধু। দুদিন হল ওদের ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে। পাশ করলেই উঠে যাবে সেকেন্ড ইয়ারে। অবশ্য পাশ করার চিন্তা জাবিরদের করার কথা না, এসএসসিতে গোল্ডেন এ+ পাওয়া ছাত্র তারা। যাই হোক, পরীক্ষা শেষ, এই করব, সেই করব, পারলে একবার মঙ্গলগ্রহেও যাব এরকমই অবস্থা এখন তাদের। আপাতত গজারিবন ইকো পার্কের জঙ্গলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগে পার্কে গেলেও জঙ্গলের ভেতরে ঢুকেনি। জঙ্গলের আশপাশে উপজাতিদের হালকা বসতি আছে। একদিন কলেজের অন্যান্য বন্ধুদের সাথে এসে হাঁটতে হাঁটতে জঙ্গলে ঢুকতে গেলে এক উপজাতি বয়স্ক রাখাল তাদের বাঁধা দেয়। সে বলে এই জঙ্গলে নাকি সন্ধ্যার পর ভূত দেখা যায়। বন্ধুদের মধ্যে আবার কয়েকটা ছিল ভীতু। এরা ভূতের নাম শুনেই ইউটার্ন নিয়ে নেয়। তাই সেদিন আর এগোনো হয় না।

Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting

-মা! আমরা যাচ্ছি।
-আচ্ছা, যা। সন্ধ্যার আগেই ফিরিস।
-আচ্ছা ঠিক আছে। মাকে বলে বন্ধুদের নিয়ে গজারিবনের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল জাবির।

আজকে তারা ঐ উপজাতি রাখালের কথিত ভূত পরীক্ষা করতেই এসেছে। যদিও মাকে বলে এসেছে সন্ধ্যার আগেই ফিরবে। কিন্তু তারা আজ সন্ধ্যার পরও ঘন্টাখানেক দেরি করবে। প্ল্যান মতো সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই তারা জঙ্গলের ভেতরে ঢুকতে শুরু করল। জঙ্গলটা বেশি বড় না হলেও বেশ ঘন। এখনো বাইরে যথেষ্ট আলো থাকলেও জঙ্গলের ভেতরে প্রায় অন্ধকার হয়ে এসেছে। সাথে নিয়ে আসা টর্চলাইট জ্বালাতে হল। গাছের ফাঁকে ফাঁকে রাখালদের ঘোরাঘোরিতে সৃষ্ট হালকা ট্রেইল ধরে একটু একটু করে এগোতে লাগল তারা। ধারাল ইট দিয়ে গাছের গায়ে তীর চিহ্ন এঁকে যাচ্ছে ওরা। যেন ফেরার সময় পথ ভুল না হয়। নীড়ে ফেরা পাখিদের কলকাকলীর সুর শোনা যায়। ঝরা পাতার মর্মর ধ্বনিও কানে বাজছে। হঠাত সোহাগ থমকে দাঁড়াল।
– ‘এই শুনতে পাচ্ছিস!’
– ‘কী?’ একযোগে প্রশ্ন করল জাবির ও রায়হান।
– ‘আযান!’
– ‘হ্যা! শুনতে পাচ্ছি! হয়তো পার্কের পাশের মসজিদ হতে আসছে। আমরা তো এখনো খুব বেশি ভেতরে ঢুকিনি।’ রায়হান বলল।
– ‘না! এটাতো খালি গলার আযান! মাইকে নয়! পার্কের মসজিদে তো মাইকে আযান হয়। আমরা তো আগের কয়েকবার ওখানে নামাজও পড়লাম!’ বলল সোহাগ।
– ‘আর লোডশেডিং বা অন্য কোন কারণে খালি গলায় আযান দিলে সেটা এই জঙ্গল থেকে কোন ভাবেই শুনতে পাওয়ার কথা না!’ সায় দিল জাবির।
– ‘ঠিক!’
– ‘হুম! তাহলে কে এই আযান দিচ্ছে? ভূত নাকি?’ প্রশ্ন করল রায়হান!
– ‘আরে ভূত কী আযান দিবে?’
– ‘আরে ভূতটা যদি ভাল হয়, তাহলে তো আযান দিতেই পারে!’ বলল সোহাগ।
– ‘আরে তোরা কী শুরু করলি! চল, আযানের শব্দ ধরে এগোই।’ বলল জাবির।
– ‘আচ্ছা চল! আল্লাহর হাওলা!’

গাছ-গাছালির ঘনত্বে এমন গাঢ় অন্ধকার দেখে প্রায় সবার মনেই এক অজানা আতঙ্ক চেপে বসে। অন্ধকারকে কেন যেন মানুষের ভীষণ ভয়। তার উপর এই ভৌতিক আযান জাবির, রায়হান আর সোহাগের সাহসী মনকেও কী একটু কাঁপিয়ে দিল না? তিনজন পরস্পর হাত ধরে আযানের শব্দ ধরে ধরে এগোতে লাগল।

ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে তারা যতই সামনে এগোতে লাগল ততই আযানের শব্দ বাড়তে লাগল। আযান যখন প্রায় শেষ তখন হঠাত করে একটা খোলা জায়গায় চলে আসল তারা।

– ‘ওয়াও! এ দেখি পুরাই মসজিদ!’ সবাই কোলাহল করে উঠল।
– ‘অনেক পুরনো আমলের। মোঘল আমলের সময়কার মনে হচ্ছে।’
– ‘ঐ দেখ মুয়াজ্জিন! মসজিদের বারান্দার উঁচু জায়গায় মাত্র আযানটা শেষ করলেন।’ মাঝারি উচ্চতার শ্যামবর্ণের এক লম্বা দাড়িওয়ালা লোককে দেখাল জাবির। লোকটা জাবিরদের দিকে একনজর তাকিয়েই মসজিদের ভেতরে ঢুকে গেল।
– ‘ওযুখানাটা কোথায়?’ জিজ্ঞেস করল জাবির।
– ‘তুই এখানে নামাজ পড়বি?’
– ‘কেন নয়?’
– ‘না! আসলে আমার ভয় করছে। এটা কোন স্বাভাবিক মসজিদ নয়! এই জঙ্গলের মধ্যে কে মসজিদ বানাবে? আমি নিশ্চিত এখানে কোন ঘাপলা আছে। হয়তো অতিপ্রাকৃতিক কিছু। চল পালাই!’ বলল রায়হান।
– ‘চুপ কর! আগে তো জঙ্গলের এডভেঞ্চারের লোভে লাফ দিয়ে চলে আসলি। এখন সটকে পড়তে চাচ্ছিস কেন?’
– ‘রায়হান! তুই কিন্তু বেশি করছিস। এখানে এতো ভয় পাওয়া কারণ কী? মসজিদে কেউ আমাদের খেয়ে ফেলবে না। নামাজ শুরু হয়ে যাবে। চল আগে নামাজটা পড়ে নিই। পরে ইমাম মুয়াজ্জিনের সাথে কথা বলে দেখা যাবে।’
– ‘আচ্ছা চল তাহলে। তাড়াতাড়ি আগে অযু পড়ে নিই।’

মসজিদের পাশেই ছোট্ট অযুখানা। এক সাথে মাত্র ৮ জন অযু করতে পারবে। মসজিদে আছে তিনটি কাতার। এক কাতারে ৭-৮ জন করে দাঁড়াতে পারে। তবে মসজিদের কারুকাজ সেই রকম! সোনারঙে ঝিলমিল করছে চারিদিক। মোঘল আমলের না হোক মোঘলীয় ডিজাইন বলে কথা! যিনি আযান দিয়েছেন- তিনিই ইমাম। আলাদা মুয়াজ্জিন নাই। মসজিদের ভেতরে ঢুকে দেখল মাত্র তিনজন মুসল্লী। একজন অশীতিপর বৃদ্ধ। কম করে হলেও ৯০-৯৫ বছর বয়স হবে। আর বাকী দুজন মধ্যবয়সী। তিনজনই ইমামের মতই লম্বা দাঁড়িওয়ালা। সবাই ওদের দিকে একনজর তাকিয়েই জামাতে দাঁড়িয়ে গেল। একজন ইকামত দেওয়া শুরু করলেন। জাবিররাও দাঁড়াল।

নামাজ শেষে সুন্নাত পড়া হল। মুসল্লীদের মধ্যে লোক দুজন সোজা বের হয়ে গেলেন। বৃদ্ধ আর ইমাম তাসবীহ হাতে বসে থাকলেন। জাবির এগিয়ে গেল ইমাম সাহেবের দিকে। বলল-
– ‘এহেম…এহেম! একটু কথা ছিল হুজুর।’
– ‘বলেন।’ চোখ তুলে তাকিয়ে অনুমতি দিলেন ইমাম সাহেব।
– ‘ইয়ে মানে আসলে আমরা জঙ্গলে হাঁটতে হাঁটতে এখানে চলে এসেছি। এখানে মসজিদটা দেখে বেশ অবাক লাগল। এরকম জায়গায় তো কেউ মসজিদ বানায় না! বা এখানে এই বৃদ্ধ চাচাই বা কোত্থেকে আসলেন!’
– ‘কি করবে এসব দিয়ে? নামাজ পড়েছ, এখন বাড়ি যাও। জঙ্গলে সাপ খোপ আছে তাড়াতাড়ি বাড়ি যাও। দরকার হলে আমি এগিয়ে দিব না হয়।’
ইমামের এড়িয়ে যাওয়া দেখে রহস্য আরো ঘনীভূত হল। সোহাগ বলল-
– ‘আচ্ছা বলেন না, কিছু এই মসজিদের ব্যাপারে, আপনার ব্যাপারে, মুসল্লীদের ব্যাপারে।’
– ‘হ্যা বলেন প্লিজ! রায়হান ও চাপ দিল।’
– ‘আচ্ছা, আমাদের দেখেই ফেলেছ যখন আর ভেতরে সন্দেহও ঢুকে গেছে, তাহলে বলছি। আমরা মানুষ না, আমরা জ্বীন।’
– ‘কী! মানে!! আপনারা!!!’
– ‘ভয় পেয়ো না! আমরা খারাপ জ্ব্বীন না আমরা ভাল জ্বীন। দেখছো না? আমরা নামাজ পড়ি। আমরা কারো ক্ষতি করি না।’
– ‘আপনারা যে জীন তার প্রমাণ কী? জিজ্ঞেস করল জাবির।’
– ‘প্রমাণ করার কিছু নাই। আমরা জ্বীন, এটাই সত্য। এখন তোমরা যেতে পার।’ এই কথাটা বলার সময় সুরটা একটু কঠিন হয়ে আসল।
– ইমাম সাহেবের কঠিন হয়ে যাওয়া দেখেও একটু সাহস সঞ্চয় করে জাবির বলে ফেললঃ
– ‘কাল যদি আবার আসি কোন অসুবিধা আছে?’
– ‘না, অসুবিধা থাকবে কেন? বরং কাল আসলেই ভাল করবে, তোমাদের কৌতুহল মিটবে।(একটু ব্যঙ্গাত্মক সুরে বললেন কি?) এখন যাও। আমাকে আসতে হবে?’
– ‘না আসতে হবে না। আমরা যাচ্ছি। আসসালামু আলাইকুম।’

আস্তে আস্তে জঙ্গল থেকে বেরুতে লাগল ওরা। গাছে আঁকা তীর চিহ্ন ধরে ধরে ফিরটি পথে চলল।

(আগামী পর্বে সমাপ্ত)

*** আগামীকাল পাবেন আগামী পর্বটি।।

লিখেছেনঃ নাশিত চৌধুরী (Nashit Chowdhury)

টিউনারপেজের নতুন টিউন আপনাকে ইমেইল করব?
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting

1 মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here

two × 2 =