DHS: ।। অন্ধকারের বাসিন্দা ।। Mega Post

0
267

কেমন আছেন? সবাইকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি আমাদের স্পেশাল পর্বে। আশা করি সবাই আজকের কাহিনীটি পড়বেন। আজকের কাহিনীটি খুবই বিশাল। কাহিনীটি ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করা। মূল লেখক ইফরান। লেখক সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায় নি।

আসুন শুরু করি:
আজকের গল্পটি খুবই ভয়ানক এবং ভৌতিক। ১৫ বছরের নিচের কাউকে পোষ্টটি না পড়ার জন্য বিশেষ ভাবে অনুরোধ করছি আর যাদের হার্টে সমস্যা আছে তারা পোষ্টটিকে এড়িয়ে চলুন।

Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting

।। অন্ধকারের বাসিন্দা ।।

আজ সকাল থেকেই আকাশের অবস্থা খারাপ। যেকোনো সময় ঝাঁপিয়ে বৃষ্টি নামবে। বছরের এই সময়ে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে বৃষ্টি হবার কথা নয়। হয়তো কয়েক ফোঁটা ঝরে বন্ধ হয়ে যাবে। মিলির মতো হয়তো আকাশেরও আজ মন খারাপ। মানুষের চেয়ে আকাশ এই দিক দিয়ে একটু আলাদা। একটা সাধারন মানুষ ইচ্ছে হলেই কাঁদতে পারে না। কিন্তু আকাশ পারে। সব কষ্টগুলো কান্নার বৃষ্টি আকারে ঝরিয়ে দেয়। এরপর সূর্যের আলোতে ঝলমল করে হাসে।

মিলি বৃষ্টি পছন্দ করে। শুধু পছন্দ করে বললে ভুল হবে। ও বাসায় ছিল, বৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু মিলি ছাদে উঠে বৃষ্টিতে গাঁ ভেজায় নি, এমন কোনোদিন হয়নি।

তবে আজ মিলি মনে প্রানে চাচ্ছে যেনও বৃষ্টিটা না হয়। প্রায় ১০ বছর থাকার পর আজ তারা তাদের পুরনো বাসা ছেড়ে নতুন বাসায় উঠছে। মিলির জীবনের প্রথম বাড়ি বদলের অভিজ্ঞতা। প্রথম প্রথম খুব এক ধরনের উত্তেজনা কাজ করছিলো। সাথে ছিল প্রিয় বাড়িটা ছেড়ে চলে যাওয়ার দুঃখ। দুঃখটাই প্রবল হয়ে গ্রাস করেছিলো তার হৃদয়টাকে। এতদিনের চেনা জানা পরিবেশ ছেড়ে যাওয়া আসলেই কষ্টের। বারবার ঘাড় ঘুড়িয়ে নিজের হাতে করা বাগানটা দেখছে। ভীষণ কান্না পাচ্ছে ওর। কষ্ট হচ্ছে কান্নাটাকে আটকে রাখতে।

মিলিরা তাদের নতুন বাড়িতে যখন পৌঁছায় তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমেছে।

মফঃস্বল অঞ্চলের ২ তলা বাড়ি। অনেকটা বাংলো টাইপের। বাড়ির নামটি ইংলিশে লেখা। বাংলা করলে দাঁড়ায় “এক টুকরো স্বর্গ”। চারপাশে গাছগাছালি পরিবেষ্টিত। দিনের আলো সেই গাছপালা বেধ করে খুব একটা ভেতরে ঢুকতে পারছে না। বাড়িটা প্রথম দেখাতেই অপছন্দ হল মিলির। এটা কোনও বাড়ি হল? আশেপাশে ত্রি সিমানায় কোনও বাড়িঘর দেখা যাচ্ছে না। কারো সাথে যে গল্প করবে এমন মানুষ খুঁজে পাবে কই সে? আর তাছাড়া বাবা সারাদিন অফিসের কাজে ব্যস্ত। মা ব্যস্ত ঘর আর ঘরের কাজ কর্ম নিয়ে। মনটা বিষাদে ভরে উঠলো মিলির। তার সদা চঞ্চল মনটাতে কে যেনও পিচ ঢেলে দিল।

তাদের সাহায্য করার জন্য মিলির মামা এসেছিলেন। এই এলাকায় তিনি গত ৩ বছর ধরে আছেন। উনাকে মিলির খুবই পছন্দ। ভদ্রলোক ভীষণ হাসিখুশি। সব সময় মজা মশকরা করে থাকেন। মিলির বিষাদে ছেয়ে যাওয়া চেহারা দেখে যা বুঝার বুঝে নিলেন। তাকে অভয় দিয়ে বলতে লাগলেন, নতুন পরিবেশ। অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই মানিয়ে নিতে পারবে সে। তখন আর তেমন বিরক্ত লাগবে না। বরং কোলাহল মুক্ত এমন সুন্দর নির্জন বাড়িটা তখন আরও ভালো মনে হবে। মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিয়েছে মিলি। আর কিছু বলেনি।

সেই বাড়িতে প্রথম রাত্রি।

ছোট মামা সব কিছু গুছিয়ে দিয়ে প্রায় ৮ টার দিকে বিদায় নিলেন। বাবা অফিস থেকে ফিরেন রাত ৯ টা ১০ টার পর। বাংলাদেশের সুনামধন্য একটি ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানের নবনিযুক্ত চীফ এক্সিকিউটিব হয়েছেন তিনি গত মাসে। অফিসের অর্ডারে এখন শিফট করেছেন নতুন শহরে। এই শাখার সমস্ত দায়ভার এখন তার উপর। অফিসে কাজের চাপও বেড়ে গেছে কয়েকগুন।

সন্ধ্যা নাগাদ মোটামুটি কাজকর্ম, ঘরদোর গুছিয়ে ফেলা হয়েছিলো। বাসায় খাবার ঘর, বসার ঘর মিলিয়ে রুম সর্বমোট ৬টি। নিচ তলায় বসার ঘর, রান্না ঘর, এবং খাবার ঘর। আর উপর তলায় ৩ টি বেডরুম আর একটি পড়ার রুম। পড়ার রুম মিলি নিজের মতো সাজিয়ে নিলো। বাসায় থাকাকালীন সময়ের বেশীরভাগ সময় সে পড়ালেখা করে কাটায়। পড়ার রুমের সাথে লাগোয়া একটি বারান্দা। বারান্দায় মিলি নিজের ব্যাবহার করা ইজি চেয়ারটা বসালো। পড়ার টেবিলটা বারান্দার দরজার ঠিক পাশে। আর একটু দূরে তার ব্যাবহারের কম্পিউটারটা।

খাওয়ার টেবিলে ওরা ৩ জন। কাজের মেয়েটা খাবার পরিবেশন করছে। মিলির বাবা সুলতান সাহেবের কড়া নির্দেশ রয়েছে যে, আর কোনও বেলা না হোক তবে রাতের খাবার সবার একত্রে বসেই খেতে হবে। কেউ মারাত্মক অসুস্থ থাকলে অবশ্য তার জন্য এই নির্দেশ কিছুতা শিথিল করা হয়।

সুলতান সাহেব কথাবার্তা একটু কম বলেন। এই জিনিসটা উনি উনার বাবার কাছ থেকে পেয়েছেন। উনার বাবা বলতেন, কথা বেশি বলা হল মেয়ে মানুষের স্বভাব। কথা বলতে হবে মেপে। পেট পাতলা এবং বাঁচাল স্বভাবের পুরুষমানুষ জীবনে উন্নতি করতে পারে না। সুলতান সাহেব এই শিক্ষা সেই ছোট বেলা থেকেই পালন করে আসছেন। তিনি এখন একজন সফল পুরুষমানুষ।

আজকে তিনি নিয়ম ভঙ্গ করলেন। বেশ ফুরফুরে গলায় মিলিকে জিজ্ঞেস করলেন, “কেমন লাগছে রে মা?”

মিলি বাবার কাছ থেকে হটাত এই প্রশ্ন আশা করে নি। তবে বুদ্ধিমতী মেয়ে সে। দ্রুত সামলে নিলো। বলল, “ভালোই লাগছে বাবা। তবে এতো বড় বাড়ি, কিন্তু মানুষ মাত্র ৪ জন। তাই কেমন যেনও খালি খালি লাগছে।”

সুলতান সাহেব আশ্বস্ত করে বললেন, “আরে প্রথম দিন দেখে এমন লাগছে। দেখবি অভ্যস্ত হয়ে গেলে খারাপ লাগবে না। কোলাহল থেকে দূরে এমন একটি বাড়ি সবার কপালে জোটে না। আমরা আসলে লাকি!”

এরপর আর তেমন একটা কথা হলো না। চুপচাপ খাওয়া শেষ করলো সবাই।

মিলি বিছানায় গেলো রাত ১১ টার দিকে। বাবা-মা আরও আগেই শুয়ে পড়েছে। সবাই খুব ক্লান্ত। শোওয়ার পর উনাদের রুম থেকে কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। অবশ্য, মিলির রুমের পরে একটা রুম ফাঁকা, তারপরের রুমে উনারা শুয়েছেন। বিশাল আকারের রুমগুলো বেধ করে শব্দ আসার কথাও নয়।

নতুন বাড়িতে প্রথম রাত। স্বাভাবিক ভাবেই মিলির একটু অস্বস্তি লাগছিল। কাজের মেয়েটা নিচে রান্নাঘরের পাশে শুয়েছে। তার সাথে খানিকক্ষণ কথা বলে আসলে হয়তো ভালো হতো। কিন্তু এতরাতে আর নিচে নামতে ইচ্ছে করলো না। তারপর একসময় চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করতে লাগলো সে। এক সময় ঘুমিয়ে পড়লো।

মিলির আচমকা ঘুম ভেঙ্গে যায় রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে। প্রথমে অপরিচিত পরিবেশে মানিয়ে নিতে একটু কষ্ট হয়। আজকেই প্রথম এসেছে বাসাতে। অচেনা চারিধার। মিলির একটা বদ অভ্যাস আছে। ঘরে বাতি না থাকলে ঘুমুতে পারে না সে। তাই বাকি সব প্যাকিং খোলা না হলেও তার ঘরের ডিম লাইটটা ঠিকই লাগানো হয়েছিলো। হটাত ঘুম থেকে উঠায় খেয়াল হল, ঘরে কোনও আলো নেই। হয়তো কারেন্ট চলে গেছে, বলে নিজেকে সান্ত্বনা দিল মিলি। কিন্তু খানিক বাদেই চমকে উঠলো। তাহলে, ফ্যান ঘুরছে কিভাবে? আই পি এস এখনো কানেকশন দেয়া হয় নি! আর আম্মু বা আব্বু যে বাতি বন্ধ করবে তার প্রশ্নই আসে না। কারন উনারা জানেন যে মিলি অন্ধকারে ঘুমুতে পারে না। বাতি না দেখলে অবশ্যই ভয় পাবে।

মিলি আসলেই ভয় পেলো। আস্তে করে বিছানা থেকে নেমে মোবাইলের আলোতে একটু একটু আগায় সে। সুইচ বোর্ডের কাছে গিয়ে টিউব লাইটের বাতিটা চেপে দেয়।

ক্ষণিকের জন্য বোবা হয়ে যায় মিলি। তার বিছানার উপর পা দুটোকে গুটিসুটি মেরে কেউ একজন বসে আছে। একটি মেয়ে। চুল দিয়ে মুখ ঢাকা। শুধু হাত দুটো দেখা যাচ্ছে। ফ্যাঁকাসে রঙ্গের হাত। অনেকদিন রক্তশূন্যতায় ভুগলে যেমন হয়, তেমনই। মিলি তার দিকে ঘুরতেই নিজের একটা হাত মিলির দিকে বাড়িয়ে দিলো মেয়েটি। অনেকটা কারো হাত ধরার জন্য আমন্ত্রন জানিয়ে যেভাবে হাত বাড়িয়ে দেয় কেউ তেমন করে।

আতঙ্কে থরথর করে কেঁপে উঠলো মিলি। কিছু বলার চেষ্টা করলো। কিন্তু মুখ দিয়ে গোঙানির মত আওয়াজ ছাড়া কিছু বের হল না। এক সময় প্রচণ্ড ভয়ে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেলো।

2………..

সকাল ১০ টা।

সুলতান সাহেব আজকে অফিসে যান নি। সকালে নামাজ পড়তে উঠার পর মিলির ঘরে এসেছিলেন তিনি মিলিকে দেখার জন্য। দেখতে পান মাটিতে পড়ে আছে মিলি। গালে একটা অদ্ভুত নিশানা। অনেকটা গালে ধারালো নখ দিয়ে আঁচড় কাটলে যেমন হয়। অনেক চেষ্টার পর মিলির জ্ঞান ফিরে। কিন্তু জ্ঞান ফেরার সাথে সাথে সুলতান সাহেবকে আঁকড়ে ধরে সে। বলতে থাকে, “ভয় পেয়েছি বাবা। ভীষণ ভয় পেয়েছি।”

সুলতান সাহেব এবং মিলির মা মমতাজ বেগম অনেক চেষ্টা করেও তাকে সাহস দিতে পারেননি। মিলি বারবার বলতে থাকে, এই বাড়িতে সে থাকবে না। সুলতান সাহেব পড়েছেন বিপদে। আজকে তার একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিঙে এটেণ্ড করার কথা। কিন্তু মিলিকে এই অবস্থায় ফেলে যাওয়া সম্ভব না। অগত্যা, মিলির ছোট মামাকে খবর দিয়েছেন তিনি। মিলি উনার সাথে অনেক ফ্রি। যদি কিছু বলে, সেই আশায়।

খবর পেয়েই মিলির ছোট মামা ছুটে আসেন। মিলি ছোট মামাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠে। কেন জানি, ছোট মামাকে তার খুব আপন মনে হয়। অন্যরা যেখানে তাকে ছোট বাচ্চা বলে অবহেলা করে বা তার কথাটা বিশ্বাস করতে চায় না, সেখানে ছোট মামাকে যেকোনো কথা বললেই তিনি তা নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করেন। ছোট মামাকে নিয়ে নিজের রুমে যায় সে। সব খুলে বলে গতরাতে যা যা হয়েছে।

মিলির ছোট মামা, সেলিম তালুকদার পেশায় একজন ডাক্তার। ১০ বছর ধরে ডাক্তারি করছেন। তিনি খুব মনোযোগ দিয়ে মিলির কথাগুলো শুনলেন। বিশ্বাস করলেন কি করলেন না, তা তার মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল না। তিনি তার ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে জানেন, যখন কারো মন কোনও ব্যাপারে বিক্ষিপ্ত থাকে তখন তাকে কথা বলার সুযোগ করে দেয়া উচিত। এতে বিক্ষিপ্ত ভাবটা অনেকটাই কেটে যায়। মিলির দেখানো স্থানটা একটু নিজে দেখবেন বলে মিলির বিছানার দিকে গেলেন তিনি। সকালে সবাই মিলিকে নিয়ে খুব ব্যস্ত ছিল তাই বিছানা গোছানো হয়নি। ছোট মামা মিলির হাত অনুসরণ করে সেখানটায় গেলেন যেখানে গত রাতে মেয়েটিকে বসে থাকতে দেখা গিয়েছিলো। কাঁথার পাশে কি যেনও একটা লেগে আছে। ছোট মামা আর একটু এগিয়ে গিয়ে জিনিসটা হাতে তুলে নিলেন। এক গাছি চুল। খুব সুন্দর চুল। ঘন কালো এবং সিল্কি। মিলির চুল হতেই পারে না। কারন তার ভাগ্নির চুল একটু লালচে আর কোঁকড়া।

বড় মামা নিজের হাতের তালুতে চুলের গাছিটা লুকিয়ে ফেললেন। পাছে মিলি আবার কি না কি ভেবে বসে। মিলিকে নিয়ে বারান্দায় চলে এলেন তিনি। সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন মিলির বাবা এবং মা।

সুলতান সাহেব মিলির ছোট মামাকে নিয়ে আড়ালে গিয়ে কথাবার্তা বলতে লাগলেন। ঘটনা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “তোমার কি মনে হয় সেলিম, ঘটনা কি??”

সেলিম সাহেব সরাসরি কোনও উত্তর দিলেন না। একটু ঘুরিয়ে বললেন, “নতুন বাসা, প্রথম রাত। হয়তো ভুলভাল দেখেছে। আপনি চিন্তা করবেন না দুলাভাই। আমি মাঝে মাঝে কাজ কম থাকলে চলে আসবো এইখানে। মিলির সাথে গল্পগুজব করবো। তাহলে হয়তো মিলি একজন কথা বলার মানুষ খুঁজে পাবে। একজন সঙ্গি পেলেই এইসব ঠিক হয়ে যাবে।”

“তুমি একটু দেখো সেলিম। আমার একমাত্র মেয়েটার জন্য আমার অনেক চিন্তা হয়।” মনে মনে বিড়বিড় করে বললেন সুলতান সাহেব।

সেলিম সাহেব মিলিদের বাসা থেকে বের হবার সাথে সাথে হটাত আকাশটা পুরো অন্ধকার হয়ে গেলো। এমনটা হবার কোনও কারণ ছিল না। কারণ সময় এখন বিকেল ৩ টা। রোদ ঝলমলে একটা দিন এমন করে মিনিটের মধ্যে আধারে ঢেকে যাবে এটা খানিকটা অবিশ্বাস। সেলিম সাহেব কিঞ্চিৎ ভয় পেলেন। বৃষ্টি নামলে এই এলাকার রাস্তাঘাট কাঁদায় সয়লাব হয়ে যায়। জামা কাপড় নষ্ট হয়ে যাবে।

বলা নেই কওয়া নেই, ঝুমঝুম করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো। উপায়ন্তর না দেখে সেলিম সাহেব একটা গাছের নিচে আশ্রয় নিলেন। পুরানো আমলের গাছ। বিশাল মোটা কাণ্ড। শুধু যে বৃষ্টি শুরু হয়েছে তাই না, পাল্লা দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। ব্যাপারটা কিছুতেই বোধগম্য হল না সেলিম সাহেবের কাছে। এই অসময়ে বৃষ্টি, তার উপর এমন ঝড়ো হাওয়া। নাহ, কোথায় কি যেনও একটা গোলমাল আছে।

গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির মধ্যে মিলিদের বাড়ির দিকে তাকালেন সেলিম সাহেব। এই মফঃস্বল শহরে আসার পর থেকেই এই বাড়ি সম্পর্কে অনেক অদ্ভুত ব্যাপার শুনেছেন তিনি। কখনো বিশ্বাস হয় নি ঘটনা। অনেকেই নাকি বাড়িটাতে রাতের বেলা একটা বাচ্চা মেয়েকে ঘুরতে দেখে। মেয়েটার পড়নে থাকে একটা সাদা ময়লা পোশাক, মাথার চুল নাকি অনেক লম্বা। পুরো মুখটাকেই ঢেকে দিয়েছে সেই চুল। মেয়েটাকে যারা দেখেছে তাদের সাথে ১ সপ্তাহের মধ্যেই কোনও না কোনও বড় রকমের দুর্ঘটনা ঘটেছে। তাদের বেশিরভাগই অপঘাতে মারা গেছে নয়ত কাউকে কিছু না বলে হারিয়ে গেছে শহর থেকে। যারা বেঁচে আছে তাদের মধ্যে পাগল হয়ে গেছে কয়েকজন, আর কয়েকজন এই জায়গা ছেড়ে বহু দূরে পালিয়েছে।

পুরনো ইতিহাস থেকে জানা যায়, বাড়িটা ইংরেজদের আমলে একপ্রকার টর্চার হাউজের মতো ছিল। কোনও প্রজা খাজনা দিতে অস্বীকৃতি জানালে বা আইন ভঙ্গ করলে এই বাড়িতে এনে অত্যাচার করা হতো। এই বাড়িতে বেগোড়ে প্রান দিতে হয়েছে হাজার হাজার মানুষকে। শুধু যে প্রজাদের অত্যাচার করা হতো তাই নয়, এমনকি মাঝে মাঝে বাড়ি থেকে মেয়ে মানুষ ধরে এনে তাদের উপর চরাও হতো ঐ পশুগুলো। বেশীরভাগই সহ্য করতে না পেরে মারা যেতো। দাফনকাফনের ঝামেলায় না গিয়ে সেই লাশগুলোকে ফেলে দেয়া হতো বাড়ির পিছনে কুয়োতে। সেই কুয়াকে ঘিরেও লোকমুখে নানান কথা শোনা যায়। যদিও কুয়াটা পরে মাটি ফেলে বন্ধ করে দেয়া হয় তবে প্রবীণ বৃদ্ধ যারা আছেন তাদের মুখে মুখে এককালে নাকি এইসব ঘটনা শোনা যেতো। তবে মানুষ এখন অনেক উন্নত। বিজ্ঞানের জয়যাত্রা চারিদিকে। এখন ঐ পুরনো আমলের কথা ভেবে সময় নষ্ট করার কোনও মানে হয় না। তাই এখন এসব নিয়ে আলোচনা প্রায় হয় না বললেই চলে। একবার তিনি ভেবেছিলেন সুলতান সাহেবকে জানাবেন এই ঘটনাগুলো সম্পর্কে। কিন্তু পরক্ষনেই মনে হয়েছে, কি লাভ জনিয়ে? তিনি নিজেই যেখানে এসব কুসংস্কারে বিশ্বাস করেন না সেখানে আরেকজনকে ভয় দিয়ে লাভটাই বা কি?

বৃষ্টির প্রকোপ বেড়েই চলছে। সেলিমক সাহেব নিজের ঘড়িটার দিকে একবার চোখ বুলালেন। বিকেল ৩.৪৫! এই অসময়ে এমন বৃষ্টির কোনও মানে হয় না। উনি এই সময়ে প্রতিদিন চেম্বারে বসেন। চেম্বারে যদি তিনি না থাকেন তবে রুগীরা এসে ঘুরে যাবে। দিনটাই বৃথা যাবে তার।

ঘড়ি থেকে চোখ তুলে আবারো বাড়িটার দিকে তাকালেন তিনি। সাথে সাথে বুকের মধ্যে ধক করে উঠলো। ২ তালা বাড়িটার ছাদে ঠিক রেলিং এর পাশ ঘেঁষে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শরীরের গড়ন দেখে বুঝা যাচ্ছে বয়স ১২-১৪ এর মধ্যে হবে। মেয়েটার সাদা জামাটি বৃষ্টিতে ভিজে গায়ের সাথে লেপটে আছে। মাথার চুল ঘন কালো। সেই চুল মেয়েটির মুখের সামনের দিকে দেয়া। তাই পুরো মুখটাই ঢাকা পরে আছে সেই চুলের আড়ালে। সেলিম সাহেব তাকানো মাত্রই মেয়েটি রেলিং এর উপর উঠে গেলো। সেলিম সাহেব বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে দেখলেন মেয়েটি রেলিং এর উপর দিয়ে হাঁটছে। একে তো শ্যাওলা পড়া পুরনো বাড়ি তার উপর বৃষ্টি। যেকোনো সময় বড় কোনও দুর্ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। সেলিম সাহেবের দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগলো। তিনি বৃষ্টির পরোয়া না করে ছুট লাগালেন বাড়িটির দিকে। যেভাবেই হোক মেয়েটার পতন ঠেকাতে হবে। নিজের চোখের সামনে একটা বাচ্চা মেয়ের মৃত্যু দেখতে পারবেন না তিনি।

গাছের আড়াল থেকে বের হতেই সেলিম সাহেবের গা বৃষ্টির ঝাঁপটায় ভিজে গেলো। ঠাণ্ডা বাতাসের স্পর্শে কেঁপে উঠলো শরীরটা। সেপ্টেম্বর মাসের দিকে এতো ঠাণ্ডা বাতাসসহ বৃষ্টি তিনি জীবনে দেখেন নি। মিলিদের বাড়ি থেকে বেশি দূরে ছিল না গাছটা। ২০-২৫ সেকেন্ডের মধ্যেই মেইন গেটের কাছে চলে আসলেন সেলিম সাহেব। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। উপরের দিকে তাকাতেই দেখলেন পা হড়কাল মেয়েটি। পড়তে শুরু করলো নিচের দিকে। সেলিম সাহেবের চোখের সামনে বাড়ির সামনের লনে আছড়ে পড়লো দেহটি।

সেলিম সাহেব কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। এরপর একটু একটু করে এগুতে লাগলেন মেয়েটির দিকে। কিছুটা দূরে হলেও তিনি স্পষ্ট শুনেছিলেন বেকায়দা মতন পড়ে মেয়েটির ঘাড়ের হাড্ডি ভেঙ্গে যাওয়ার শব্দ। “খট” করে একটা আওয়াজ এসে ধাক্কা মেরেছিল তার কানে। একজন পেশাদার ডাক্তার তিনি। যা বুঝার বুঝে নিয়েছিলেন। ভুল হবার প্রশ্নই আসে না। আর ঘাড়ের হাড্ডি ভেঙ্গে যাওয়া মানে তৎক্ষণাৎ মৃত্যু।

ধীর পায়ে হেঁটে মেয়েটির লাশের পাশে এসে দাঁড়ালেন তিনি। এখনো মুখটা ঢেকে আছে চুল দিয়ে। একটা হাত বুকের উপর, আরেকটা ছড়িয়ে আছে দেহের পাশে। সেলিম সাহেব খানিকটা ঝুঁকে এলেন। ইচ্ছে চুল গুলো সরিয়ে মেয়েটির মুখ শেষবারের মতন দেখা।

সেলিম সাহেব ঝুঁকা মাত্রই মেয়েটি যন্ত্রের মতো সোজা হয়ে বসে গেলো এবং বুকের কাছে রাখা হাতটি দিয়ে সেলিম সাহেবের গলার একপাশটা চেপে ধরল। চমকে উঠলেন সেলিম সাহেব মেয়েটির হাতের স্পর্শ পেয়ে। আগুনের মতো গরম সেটি। মনে হল, আগুনে লাল করা কোনও লোহা যেনও লাগিয়ে দেয়া হল তার গলায়। নিজের অজান্তেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেলো এক গগনবিদারি চিৎকার। ব্যাথা সহ্য করতে পারলেন না তিনি। অচেতন হয়ে লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে।

3………….

রাত ১১ টা। হাসপাতালের আই সি ইউ রুমের বাইরে অস্থিরচিত্তে পায়চারী করছেন সুলতান সাহেব। সেলিমের জ্ঞান ফিরে নি এখনো। বিকেলবেলা উনি আর মিলির মা বসে টুকটাক গল্প করছিলেন এর মাঝে ভয়ঙ্কর চিৎকার শুনে ঘাবড়ে যান দুজনই। তাড়াহুড়া করে বাইরে এসে দেখেন লনে অচেতন হয়ে সেলিম পড়ে আছে। তাড়াতাড়ি কোনোমতে টেনে হেঁচড়ে রুমে ঢুকানো হয় তাকে। প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ায় কোনও লাভ না হওয়ায় নিয়ে আসতে হয় সদর হাসপাতালে। লন থেকে সেলিমের দেহ ধরাধরি করে রুমে ঢুকানোর সময় সুলতান সাহেব অবাক হয়ে যান। দেহটি একদম পানির মতো ঠাণ্ডা। একটানা ৩০-৪০ মিনিট কেউ পানিতে থাকলে যেমন হয়, ঠিক তেমনি। ঘাড়ের কাছে একটা কালো পুড়া দাগ লক্ষ্য করেন তিনি। আগে কখনো সেলিমের ঘাড়ে এই দাগ দেখেছেন বলে মনে পড়ছে না। নতুন বাড়িটায় আসলে আসা উচিত হয় নি। একের পর এক অঘটন ঘটেই চলছে। এদিকে অফিসের অবস্থাও ভালো না। তার চেয়ে জুনিয়র বয়সী এক ছেলে ঝামেলা করা শুরু করেছে। এই শাখার হেড হবার কথা ছিল তার, কিন্তু অফিস থেকে সুলতান সাহেবকে মনোনীত করায় তার ক্ষোভ বেড়েছে। সাঙ্গপাঙ্গ গুছিয়ে একটা ঝামেলা পাকানোর তালে এখন সে।

ভাবনার ব্যাঘাত ঘটিয়ে আই সি ইউ রুম থেকে বের হয়ে এলেন ডিউটি ডক্টর। বয়স খুবই কম। নিজেকে পরিচয় দিয়েছে সেলিম সাহেবের ছাত্র বলে। সম্ভবত নতুন জয়েন করেছে। সুলতান সাহেব এগিয়ে গিয়ে রুগীর অবস্থা জানতে চাইলেন।

“অবস্থা স্বাভাবিক। মাঝে একবার জ্ঞান ফিরেছিল কিছুক্ষণের জন্য। কোনও কথা বলেন নি। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবার ঘুমিয়ে পড়েছেন। সব ঠিকঠাক থাকলে কাল নাগাদ বাসায় নিয়ে যেতে পারবেন স্যারকে।”

সুলতান সাহেবের চিন্তা কিছুটা কমলো। সেলিমের বউয়ের কোনও বাচ্চাকাচ্চা নেই। বেচারি ঘটনার পর থেকে একটানা কাঁদছে। হাসপাতালে চেয়ারে বসে কিছুক্ষণ কেঁদেছে। সুলতান সাহেব কয়েকবার বুঝানোর চেষ্টা করে বাদ দিয়েছেন। এরপর মিলির মার কাছে উনাকে রেখে তিনি একা চলে এসেছেন হাসপাতালে আবার খবর নিতে।

ডিউটি ডক্টরের গ্রাউনে লেখা নাম পড়লেন তিনি। ইমরান চৌধুরী। গলা খাঁকারি দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তা বাবা ইমরান, এখানে কি আমার থাকতে হবে? বয়স হয়ে গেছে তো বাবা, রাত জাগতে কষ্ট হয়। তাই তেমন সিরিয়াস কিছু না হলে বাসায় চলে যাই। আর আমার মোবাইল নাম্বারটা দিয়ে যাই। যখনই লাগে তুমি ফোন দিলেই আমি চলে আসবো।”

“অবশ্যই স্যার। আপনি চলে যান। সেলিম স্যারের সাথে আমি আছি। আজকে সারারাত ডিউটি আমার। আমি কিছুক্ষণ পরপর স্যারের খোঁজ নিবো। আপনি একদম চিন্তা করবেন না।”

সুলতান সাহেব ডক্টরকে ধন্যবাদ দিয়ে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে এলেন। চামড়ার চোখে দেখতে পেলেন না যে উনি বের হবার সাথে সাথে একটা কালো ছায়া সেই হাসপাতালের করিডরে ঢুকল। খুব দ্রুত অগ্রসর হতে লাগলো আই সি ইউ রুমের দিকে। যেখানে সেলিমকে রাখা হয়েছে।

***************************************************

ঠিক রাত ২টার দিকে আচমকা প্রচণ্ড ব্যাথায় ঘুম ভেঙ্গে গেলো সেলিম সাহেবের। ঘাড়ের পাশের পুড়া জায়গাটা ধপধপ করছে। শরীরটা ভীষণ দুর্বল লাগছে। হাসপাতালে আই সি ইউ কক্ষে তাকে রাখা হয়েছে এটা তিনি বুঝতে পারলেন। পাশের বেডে একজন রুগীকে দেখা যাচ্ছে। গভীর ঘুমে অচেতন।

হটাত ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ায় নাকে এসে ধাক্কা দিলো কড়া ডেটলের গন্ধ। একবার ভাবলেন মাথাটা উঠিয়ে দেখবেন আশে পাশে কেউ আছে কিনা। পেইনকিলার দিলে কাজ হতো। মাথাটা উঁচিয়ে সোজা সামনে তাকাতেই এক সাথে কয়েকটা বিট মিস করলেন তিনি।

পায়ের কাছে বসে আছে সেই মেয়েটি! যাকে আজ দুপুরে ছাদ থেকে পড়ে যেতে দেখেছেন। ঘন কালো চুলের ওপাশ থেকে খুব আগ্রহ নিয়ে সেলিম সাহেবের প্রতিটি পদক্ষেপ লক্ষ্য করছে সে। সেলিম সাহেব মেয়েটিকে দেখে বরফের মত জমে গেলেন। কেন যেনও তার ৬ষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাকে বার বার সতর্ক করতে লাগলো অনাহূত বিপদ সম্পর্কে। সেলিম সাহেব নার্ভ ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করলেন।

গলা দিয়ে কোনও কথা বের হচ্ছে না। অনেক চেষ্টা করে প্রায় ফিসফিস করে বললেন, “কে তুমি? আর কি চাও আমার কাছে? কেন এমন করে আমার পিছনে লেগেছ?”

মেয়েটি যেনও কিছু শুনতে পায় নি এমন করে বসে রইলো। তারপর সেলিম সাহেবকে চমকে দিয়ে হেঁচড়ে হেঁচড়ে উনার উপরে চড়ে বসলো।

সেলিম সাহেব আপ্রান চেষ্টা করতে লাগলেন চিৎকার করার। উনার বারবার মনে হচ্ছে তিনি যা দেখছেন তা শুধুই স্বপ্ন। বাস্তবে এটা ঘটা সম্ভব না। হাসপাতালের সব সিকিউরিটির চোখ ফাঁকি দিয়ে একটা মেয়ে কখনোই আই সি ইউ রুম পর্যন্ত আসতে পারবে না। তিনি চোখ বন্ধ করে একটানা সূরা পড়ার চেষ্টা করতে লাগলেন। কিন্তু এই মুহূর্তে কোনও সূরা মনে পড়লো না তার।

বুকের উপর ভারি কিছু চেপে বসার সাথে সাথেই আবারো চোখ খুলতে বাধ্য হলেন তিনি। মেয়েটি তার বুক পর্যন্ত চলে এসেছে। এতো কাছ থেকে দেখে মেয়েটির অনেক কয়টি ব্যাপার পরিষ্কার বুঝতে পারলেন তিনি। মেয়েটির বয়স ১০-১২ বছরের বেশি হবে না। গায়ের চামড়া ফ্যাঁকাসে বর্ণের। দীর্ঘদিন কেউ সূর্যের আলোতে বাইরে বের না হলে চামড়ার রঙ যেমন হয়ে যায়, ঠিক সেই রঙ। আরেকটা জিনিসের সাথে মিলে যায়। মরা মানুষের চামড়ার রঙ হয় এমন! চুলগুলোর সাথে মিলির রুমে পাওয়া চুলগুলো একদম হুবুহু মিলে যায়। চেহারাটা দেখা যাচ্ছে না পরিষ্কার। তবে সব মিলিয়ে উনার আর বুঝতে বাকি রইলো না যে এই সেই মেয়েটি! যাকে সবাই দেখত বলে দাবি করতো। যাকে দেখা যেতো ঐ বাড়ির আশে পাশে।

মেয়েটি যেনও সেলিম সাহেবের মনের ইচ্ছে বুঝতে পারলো। একটা হাত মুখের সামনে এনে মুখের কাছের চুলগুলো সরিয়ে দিলো। মুখটি দেখে একই সাথে ভয় এবং প্রবল ঘৃণা গ্রাস করলো সেলিম সাহেবকে। মেয়েটির সারা মুখ জুড়ে পুড়া দাগ। কিছু কিছু জায়গা বেশি পুড়েছে, কিছু জায়গা কম পুড়েছে। কম পুড়া জায়গাগুলো রক্ত জমে লালচে হয়ে আছে। সেখান থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে পোঁচ পড়ছে। সেলিম সাহেবের সাদা ড্রেসটি আস্তে আস্তে সেই পোঁচ দিয়ে ভিজে যেতে লাগলো। সাথে সাথে কেমন যেনও একটা পচা বাসি গন্ধ এসে ধাক্কা মারল সেলিম সাহেবের নাকে।

মেয়েটিকে দেখে মনে হল সেলিম সাহবের ভয় পাওয়া সে খুব উপভগ করছে। এবার বুকের উপর বসেই আস্তে করে নিজের মুখটা সেলিম সাহবের দিকে বাড়িয়ে দিলো। যেনও সেলিম সাহেবকে দেখাতে চায় তার মুখ কতটা বীভৎস! সেলিম সাহেব আর সহ্য করতে পারলেন না। চোখ বন্ধ করে ফেললেন।

সাথে সাথে মেয়েটি নিজের এক হাত দিয়ে সেলিম সাহবের গলা চেপে ধরল। প্রবল আক্রোশে সেলিম সাহেবের গলায় সাঁড়াশির মতো চেপে বসতে লাগলো সেই হাত। সেলিম সাহেব নিজের প্রাণপণ শক্তি দিয়ে দুহাতে সেই হাতটি সরানোর চেষ্টা করতে লাগলেন। শক্তি হারাচ্ছেন তিনি আস্তে আস্তে। এখুনি কিছু না করতে পারলে বাঁচার আশা নেই। এলোপাথাড়ি হাত চালাতে লাগলেন তিনি মেয়েটার শরীর লক্ষ্য করে।

মেয়েটি যেনও এই অসম লড়াই খুব উপভোগ করছে। হা করে হাসার চেষ্টা করলো। ঠিক সেই সময়ে মুখ থেকে খসে পড়লো তার ছোটবেলায় কেটে ফেলা জিহ্বাটা। দৃশটা সহ্য হল না সেলিম সাহেবের। শেষ চেষ্টা স্বরূপ মুখ দিয়ে একটা চিৎকার বের করার চেষ্টা করলেন। চিৎকারটা গলা পর্যন্ত এসে আটকে গেলো। মুখ দিয়ে বের করার জন্য আর বেঁচে রইলেন না।

সেই রাতে ভোর ৪টার দিকে সুলতান সাহেবের মোবাইল হাসপাতাল থেকে ফোন করে জানানো হয় সেলিম সাহেব মারা গেছেন। মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে ডাক্তাররা নিশ্চিত নয়!

4…………….

বাবা খুব ভোরে বাসা থেকে বের হয়েছেন। কি নাকি জরুরী কাজ আছে। ঘুম থেকে উঠেই মিলি দেখল মার চোখটা ভেজা ভেজা। কারণ জিজ্ঞেস করলে মমতাজ বেগম কোনও উত্তর দেন নি। ধুঁকরে কেঁদে উঠেন বারবার। মিলি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে মার দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছুই বুঝতে পারে না। কয়েকবার জিজ্ঞেস করার পর তিনি বললেন এমনিতেই মন খারাপ। মিলি বেশী জোরাজুরি করেনি। মার বলার হলে একবার জিজ্ঞেস করলেই বলতো। যেহেতু বলতে চাচ্ছে না তারমানে হাজারবার জিজ্ঞেস করলেও উনি বলবেন না।

মিলিকে তার ছোট মামার মৃত্যুর সংবাদ জানানো হয় নি। সুলতান সাহেব এমনি নির্দেশ দিয়ে গেছেন। ভোরে ফোন পেয়েই তিনি গাড়ি নিয়ে বের হন। হাসপাতালে পৌছার পর জানান একবারে দাফন কাজ সম্পন্ন করে বাসায় ফিরবেন। সুলতান সাহেবের শ্বশুর বাড়ি অর্থাৎ সেলিমের গ্রামের বাড়ি দিনাজপুরে। ভোরে হাসপাতালের গাড়ি নিয়ে বের হলে দাফন কাজ শেষ করে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হবে। বাসায় থাকাকালীন সময়ে এক মুহূর্তের জন্যও যেনও মিলি চোখের আড়ালে যেতে না পারে এ ব্যাপারে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। সেলিমের কথা শুনে হয়তো মেয়েটার মাথা খারাপ হয়ে যাবে তাই বলেছেন উনি এসে বলবেন না বলার।

এ্যাম্বুলেন্সের পিছনে বসে সেলিমের মৃতদেহের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন সুলতান সাহেব। গতকালও তার সাথে এই সময়ে মিলির ব্যাপার নিয়ে কথা হচ্ছিল আর আজকে সে একটা লাশ! যার কথা বলার ক্ষমতা নেই, নেই নড়াচড়ার ক্ষমতা। হাসপাতালে যাবার পর ডাক্তারের সাথে ১০ মিনিটের মতো কথা হয় উনার। তাদের ভাষ্যমতে, রাত আনুমানিক ২টার দিকে ডিউটি ডাক্তার ইমরান শেষবার সেলিম সাহেবকে দেখতে যায়। তখন তিনি নরমাল ছিলেন এবং যাবতীয় সব কার্যকলাপ স্বাভাবিক ছিল। এরপর আবার যখন তাকে দেখার জন্য ডাক্তার ইমরান যান তখন তাকে মৃত দেখতে পান। লক্ষণীয় ব্যাপার হল উনার গায়ের সাদা চাদরটার উপর এক প্রকার থকথকে জেলির মতো পদার্থ লেগে ছিল। হলুদ বর্ণের। তা কোথা থেকে এসেছে সে ব্যাপারে কেউ কিছু বলতে পারছে না। মমতাজ বেগম ভাইকে শেষবারের মতো দেখতে হাসপাতালে এসেছিলেন। কেঁদে কেটে অস্থির অবস্থা। সুলতান সাহেব এক প্রকার জোর করে পাঠিয়ে দেন উনাকে। মিলি বাসায় একা, তার উপর চোখ রাখা দরকার।

দাফন পর্ব শেষ করে সন্ধ্যা ৬ টার দিকে ফিরতি পথ ধরলেন সুলতান সাহেব। মনটা বিষণ্ণ। লাশ পৌঁছানর পর পুরো বাড়ি জুড়ে কান্নার রোল পড়ে যায়। পরিবারের সবচেয়ে ছোট ছেলে ছিলেন সেলিম সাহেব। সুলতান সাহেবের বৃদ্ধ শাশুড়ি বারবার বিলাপ করে বলছিলেন কেন আল্লাহ তার ছেলের জায়গায় তাকে নিয়ে গেলো না। কথাগুলো সহ্য হচ্ছিল না সুলতান সাহেবের। তাই বাড়ির সবাই জোর করলেও তিনি না থেকে রাতের বেলা বাড়ি ফিরবেন বলে চলে এসেছেন।

***********************************************

মা সারাদিনই কিছুক্ষণ পর পর থেকে থেকে কেঁদেছেন। শেষে মাকে না জানিয়ে মিলি উনাকে জোর করে একটা ঘুমের ঔষধ খাইয়ে দিয়েছে। বলেছে ভিটামিনের ট্যাবলেট। নিজের কাছেই খারাপ লাগছিল তবে এছাড়া আর উপায় ছিল না। মার কান্না সহ্য হয় না তার। এছাড়া মা কারণটাও জানাচ্ছে না। বাবা ফিরলে হয়তো জানা যাবে। উনাদের মধ্যে হয়তো কোনও ঝামেলা হয়েছে তাই মা চাচ্ছে না মিলিকে জানাতে।

মাকে রুমে সুন্দর করে চাদর দিয়ে ঢেকে দিয়ে মিলি পড়ার রুমে চলে গেলো। উদ্দেশ্য কম্পিউটারে কিছুক্ষণ গান শোনা। বিকেলে অবসর সময়টা তার কাটে গান শুনে না হয় গল্পের বই পড়ে। আগে যখন পুরনো বাসায় ছিল তখন মাঝে মাঝে বান্ধবীদের সাথে তাদের বাসায় যেতো না হয় ছাদে গিয়ে সময় কাটাত। এখানে আসার পর থেকে তেমন কোনও কাজ নেই।

গুনগুন করতে করতে কম্পিউটারটা অন করলো মিলি। নিজের পছন্দের প্লে লিস্টটা চালিয়ে দিয়ে ইন্টারনেট ওপেন করলো। গতকাল রাতেই অফিসের কেরানী এসে ইন্টারনেট সংযোগ দিয়ে গেছে। এখানে আসার পর থেকে পেপার পড়া হয় নি। নেটে তার প্রিয় পত্রিকার ওয়েবসাইটটি ওপেন করলো সে।

প্রথম পাতা থেকে বিনোদনের পাতা পর্যন্ত সব পাতাতেই হাল্কা করে নজর বুলাতে লাগলো সে। স্পীকারে মৃদু শব্দে রবীন্দ্র সঙ্গীত বাজচ্ছে। হটাত করে পিছনে ধপাস করে কিছু পড়ার শব্দ হল। মিলি মাথা বাকিয়ে পিছনে তাকিয়ে দেখল দেয়ালে আটকানো শেলফ থেকে তার এবং তার বাবার একত্রে তোলা ছবির স্ট্যান্ডটা নিচে পড়ে গেছে। চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে ছবিটা আবার জায়গা মতো রেখে এল সে।

মিনিটখানেক বাদে আবার একই আওয়াজ। আবারো ঘাড় ঘুড়িয়ে তাকাল মিলি। দেখল সেই একই কাণ্ড। ছবির স্ট্যান্ডটা মাটিতে পড়ে আছে। বিরক্ত হয়ে আবারো উঠলো সে। বই দিয়ে ভালো করে চাপা দিয়ে রেখে এলো স্ট্যান্ডটা। মনোযোগের বিঘ্ন ঘটায় মেজাজ কিছুটা খারাপ হল।

চেয়ারে বসে আবারো পত্রিকার পাতায় ডুব দিলো সে। মিনিটখানেক কেটে গেলো। এবার আর কিছু ঘটলো না। মিলি গভীর মনোযোগে একটা সায়েন্সের উপর লেখা আর্টিকেল পড়ছিল। হটাত কম্পিউটারে কার যেনও ছায়া পড়লো। মিলি প্রথমে ধরতে পারলো না। মাথা ঘুড়িয়ে একবার পিছনে দেখে নিলো। কিছু নেই। রুমটা পুরো ফাঁকা। আবারো ঘুরে পড়তে লাগলো সে। কিছুক্ষণ পর আবার একই দৃশ্য। মিলি এবার পিছনে না ঘুরে গাঁট মেরে বসে রইলো। ভালো করে বুঝলে চাইলো সে ঘটনাটা।

বেশীক্ষণ লাগলো না। ১০ সেকেন্ড পরেই মনিটরের স্ক্রিনে একটা পরিষ্কার অভয়ব দেখে চমকে উঠলো মিলি। সেই মেয়েটার প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে পর্দায়। যাকে সে সেদিন রাতে দেখেছিলো। ঘাড় কাত করে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মিলির দিকে। মিলি কি করবে ভেবে পাচ্ছিল না। মা তার নিজের রুমে। নিজ হাতে ঘুমের ঔষধ খাইয়ে ঘুম পারিয়ে দিয়েছে উনাকে। কাজের মেয়েটা অবসর সময়ে ঘুমুচ্ছে। বিশাল বাড়িতে সে একা। মিলি তাড়াহুড়া না করে আস্তে আস্তে করে মাথা ঘুরাল। দিনের আলো কিছুটা শক্তি দিচ্ছে তাকে। কম্পিউটার টেবিলের পাশেই কাগজ চাপা দেয়ার জন্য একটা ভারী পাথর রাখা। এক হাতে শক্ত করে তা চেপে ধরল।

মাথা ঘুড়িয়ে তার থেকে ৫-৬ হাত পেছনেই মেয়েটাকে দেখতে পেল মিলি। দিনের আলোতে তাকে দেখে তেমন ভয়ঙ্কর মনে হচ্ছে না। উল্টা কেমন যেনও অসহায় লাগছে মেয়েটাকে। মিলি কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বুঝার চেষ্টা করলো তার এখন কি করনীয়। মেয়েটি এক জায়গায় ঠায় দাড়িয়ে আছে। নড়ছে না। মিলি চেয়ারে বসে থেকেই জিজ্ঞেস করলো, “কে তুমি? কি চাও আমার কাছে? কেন ভয় দেখাচ্ছ আমায়?”

জবাবে মেয়েটা কিছু না বলে এক পা এগিয়ে এলো। ঘন কালো চুলের পিছন থেকে কালো চোখগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সেখানে একই সাথে বিরাজ করছে প্রচণ্ড ঘৃণা এবং হতাশা। মিলি নিজের উপর কন্ট্রোল রাখার চেষ্টা করলো। মেয়েটা এগিয়ে এলেও সে ভয় না পেয়ে পুনরায় একই কথা জিজ্ঞেস করলো।
“তুমি চাইলে আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারি। আমরা বন্ধু হতে পারি। আমি তোমার সম্পর্কে কিছুই জানি না। তুমি কোথা থেকে আসো কোথায় যাও তার কিছুই আমার জানা নেই, তবে তুমি যদি আমাকে কিছু বলতে চাও তাইলে নির্দ্বিধায় বলতে পারো। আমার আয়ত্তে থাকলে আমি অবশ্যই তোমাকে সাহায্য করবো।”

মেয়েটা এক পা এক পা করে এগিয়ে আসছিলো। কিন্তু মিলির এই কথা শোনার সাথে সাথে আবার থেমে গেলো। খানিকক্ষণ থেমে থেমে মিলিকে পরখ করলো যেনও। এরপর সেদিনের মতো এক হাত বাড়িয়ে দিলো মিলির দিকে।

হাতটার দিকে তাকিয়ে একই সাথে ভয় এবং কৌতূহল কাজ করা শুরু করলো মিলির ভেতরে। সেদিন রাতেও মেয়েটি তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো। সে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিলো দেখে সেই হাত ধরতে পারে নি। তার কি উচিত হবে মেয়েটার হাত ধরা? মেয়েটাকে সে চিনে না। কিন্তু কেনও যেনও তার মনে হচ্ছে মেয়েটা তাকে কিছু বলতে চায়। এখনো পর্যন্ত মেয়েটা তার কিছু ক্ষতি করে নি, কিন্তু নিশ্চিত হবার চান্স নেই যে সে ভবিষ্যতেও কোনও ক্ষতি করবে না। মিলি খুব একটা সাহসী কখনোই ছিল না। কিন্তু নিজের মধ্যে এক অদম্য ইচ্ছা জাগ্রত হল তার। এগিয়ে গিয়ে ধরে ফেলল মেয়েটির বাড়ানো হাতখানা!

5…………………

তীব্র আলোর ঝলকানিতে ক্ষণিকের জন্য অন্ধ হয়ে গেলো মিলি। মিনিটখানেক লাগলো নতুন আলোতে নিজের চোখকে মানিয়ে নিতে। আলো সয়ে আসতেই চোখ মিটমিট করে বুঝার চেষ্টা করলো সে কোথায় আছে। আশে পাশে কিছুই পরিচিত মনে হল না। সে দাঁড়িয়ে আছে একটা মাটির ঘরের বাইরে। ঘরের ভেতর থেকে একটা ছোট বাচ্ছার একটানা কান্নার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। সেই সাথে জোড়ে জোড়ে কাউকে ধমক দিচ্ছে এক মহিলা কণ্ঠ। মিলি আহাম্মকের মতো দাঁড়িয়ে রইলো। শেষ যতটুকু মনে আছে তার, সে নিজের পড়ার রুমে ছিল। একটা মেয়ে এসে তার পেছনে দাঁড়ায়। এরপর সে হাত বাড়িয়ে সেই মেয়েটির বাড়ানো হাত ছোঁয়। এরপরেই মিলি নিজেকে এখানে আবিষ্কার করে।

অবচেতন মনে এক পা এক পা করে এগিয়ে গেলো মিলি ঐ বাড়ির দরজার দিকে। রুমের দরজাটা খোলা। বিছানার উপর শুয়ে আছে একটি মাস ৫-৬ এর বাচ্চা। পাশে একটা কাঠের পুতুল। পুতুলটা হাত থেকে একটু দূরে পড়ে গেছে দেখে তারস্বরে চেঁচাচ্ছে সে। বিছানার নিচে মাটিতে একটা প্লাস্টিকের চাদর বিছিয়ে তরকারি কাটছেন একজন মাঝবয়সী মহিলা। তার পাশে মুখ গোমড়া করে বসে আছে একটি মেয়ে। মেয়েটির উপর মহিলার মেজাজ খারাপ কোনও কারণে। থেকে থেকেই বকা ঝকা করছেন। মিলি মেয়েটিকে দেখে অবাক হল। ড্রেস থেকে শুরু করে বাকি সবটুকুই সেই মেয়েটার সাথে মিলে যায় যার হাত ধরার পর সে এখানে চলে এসেছে। যদিও মেয়েটার মুখ এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সুন্দর কোমলমতি চেহারা। গায়ের রঙ দুধে আলতা না হলেও নেহায়েত খারাপ নয়। চোখগুলো সুন্দর, মায়াভরা। এই মেয়েটিকে দেখেই সে এতো ভয় পেয়েছে। ভাবতেই হাসি পেলো মিলির। দরজায় টোকা দিয়ে জিজ্ঞেছ করলো, “ভেতরে আসতে পারি?”

মিলিকে অবাক করে দিয়ে তার দিকে কেউ ফিরেও তাকাল না। মহিলা সেই একই ভাবে মেয়েটিকে বকা দিয়ে যাচ্ছে। মিলি ভাবল শুনতে পায় নি। আরেকটু গলা চরিয়ে বলল সে। কিন্তু এবারেও কোনও ভাবান্তর নেই। এর মাঝে মহিলাটি মেয়েটির সাথে খুব দ্রুত কিছু কথা বলল। সে সুত্রে মিলি জানতে পারলো, মেয়েটির নাম মরিয়ম। তার বাবা ইংরেজদের জুটমিলে কাজ করে। তাকে খাবার নিয়ে পাঠানোর জন্য তার মা এতখন ধরে বলছে কিন্তু সে কিছুতেই নরবে না। তাই মহিলা, অর্থাৎ মরিয়মের মা ক্ষেপে গিয়ে মেয়েকে উল্টাপাল্টা কথা শুনাচ্ছেন। খাবার নিয়ে না গেলে আজকে তার বাবা আসার পর মার দেয়া হবে, তার দুপুরের খাবার বন্ধ, বাড়ি থেকে বের হতে দিবে না ইত্যাদি।

মিলির কাছে ব্যাপারটা কেমন যেনও গোলমেলে ঠেকল। ইংরেজদের জুটমিলে কাজ করে মানে কি? এখানে ইংরেজ আসলো কোথা থেকে? আর এই এলাকায় জুটমিল তার জানামতে একটা আছে। কিন্তু তা গত ৩০ বছর ধরে বন্ধ। তাহলে মহিলা কিসের কথা বলেছেন?

অবশেষে মায়ের উপর রেগেমেগে মরিয়ম রাজি হল খাবার নিয়ে যাবার জন্য। তার মা আগেই খাবার ঘুছিয়ে রেখেছিলেন। যেমন জানতেন যে মেয়ে শেষতক রাজি হবে। একগাল হেসে বললেন জলদি ফিরে আসার জন্য। ফেরার পথে যেনও গ্রামের বদ মেয়েগুলোর সাথে খেলাধুলা করে সময় নষ্ট না করে।

মিলি এখনো সেই দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। বলতে গেলে ছোট ঘরটার পুরো দরজা আটকে দাঁড়িয়ে আছে সে। তাই মরিয়মের বাইরে বের হতে হলে অবশ্যই তাকে সরিয়ে বের হতে হবে।

মরিয়ম এমনভাবে মিলির দিকে এগিয়ে এলো যেনও সে মিলিকে দেখতেই পেলো না। রাগে গজগজ করছে মেয়েটি। অতঃপর মিলিকে চমকে দিয়ে তার মাঝ দিয়ে অর্থাৎ মিলিকে বেধ করে বাইরে বেরিয়ে গেলো।

মিলি ঘটনার আকস্মিকতায় ক্ষণিকের জন্য হা হয়ে গেলো। কি ঘটেছে তা সে বুঝে উঠতে পারছে না। একটা জলজ্যান্ত মেয়ে তার মতো একটা জলজ্যান্ত মানুষের মধ্য দিয়ে বেধ করে বেরিয়ে গেলো! এটা কিভাবে সম্ভব? সে কি তবে স্বপ্ন দেখছে?

মিলির ভেতর থেকে একটা তাড়া আসলো যে মরিয়মকে কোনোভাবেই হারানো চলবে না। এই মেয়েটির কাছেই রয়েছে সব রহস্যের চাবি। যা হবার হবে। মিলি ঘুরে মরিয়মকে ফলো করতে লাগলো।

মরিয়মের হাতে দূর থেকেই তার বাবার খাবারের বাতিটা দেখা যাচ্ছে। রাস্তা ঘাটের দিকে তাকিয়ে মিলির বিস্ময়ের সীমা রইলো না। তার যদি ভুল না হয়ে থাকে তবে সে এখন শহীদ নুরুদ্দিন সড়ক দিয়ে হাঁটছে। সামনেই পুরনো মসজিদটা দেখা যাচ্ছে। তবে তার অবস্থা পুরোই বেহাল। মসজিদের বাইরে কিছু মসল্লি দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। দূর থেকে শুনতে না পারলেও মিলি বুঝতে পারলো কোনও একটা ব্যাপার নিয়ে তারা সবাই খুব উদ্বিগ্ন। মরিয়ম অনেকটুকু এগিয়ে গিয়েছে। তাকে ধরার জন্য দৌড় লাগাতে হল মিলির।

প্রায় মিনিট বিশেক চলার পর মিলিরা এক বিরাট বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়ালো। বাড়ির উপর বড় করে সাইনবোর্ডে লেখা, “রিচার্ডস জুটমিল”। মিলি এই নামে কোনও জুটমিলের কথা এখানে শুনেনি। ইতিহাসে আগ্রহ থাকায় এখানে আসার পর পরই এ জায়গার অনেক স্থাপনা সম্পর্কে বাবার কাছ থেকে এবং ছোট মামার কাছ থেকে জেনে নিয়েছে সে। তার হিসেব এখন তারা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে তাদের বাড়ি বেশী দূরে নয়। হেঁটে যেতে মিনিট পাঁচেক লাগবে।

মরিয়ম এক ফাঁকে সেই জুটমিলের দারোয়ানের সাথে কথা বলে ভেতরে ঢুকে গেলো। মিলি খানিকটা ইতস্তত করছে। শেষমেশ মরিয়মের পিছু পিছু সে নিজেও ঢুকে পড়লো।

ঢোকার সাথে সাথে যা দেখল তা দেখার জন্য কেউই প্রস্তুত ছিল না। না মিলি, না মরিয়ম। একটা সুগঠিত দেহের অধিকারী পুরুষ দেহকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন সাদা চামড়ার মানুষ। শূলে চড়ানো জিনিসটা সম্পর্কে মিলি তেমন কিছু জানে না। তবে তার মনে হলে লোকটাকে যেভাবে ফাঁস দেয়া হয়েছে একেই বুঝি শূলে চড়ানো বলে। লাশটা একটা কড়িকাঠের উপর ঝুলছে। মনে হয় মৃত্যুর আগে কিছু বলার চেষ্টা করেছিলো, তাই জিহ্বাটা বেরিয়ে গেছে অনেকখানি। দাঁতে আচমকা কামড় লাগায় জিহ্বাটা থেকে টপটপ করে রক্ত ঝরছে। নিঃশ্বাসের অভাবে চোখগুলো কোঠর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে প্রায়। হাতদুটো পিছমোড়া করে বাধা। পড়নে শ্রমিকদের পড়ার জামা। মারা হয়েছে বেশী সময় হয় নি। এখনো বাতাসে কিঞ্চিত দুল খাচ্ছে দেহটা।

লোকটার চেহারার সাথে মরিয়মের চেহারার অদ্ভুত মিল লক্ষ্য করলো সে। ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হল যখন মরিয়ম বাবা বলে ছুটে গেলো। লাশটাকে ঘিরে থাকা মানুষগুলো নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করছিলো। মরিয়মের ছুটে আসার জন্য প্রস্তুত ছিল না মনে হয়। তাকে ধরার জন্য ঝাপিয়ে পড়লো দুজন। একজন মরিয়মকে ধরে উপর হয়ে পড়ে গেলো। মরিয়ম যেখানে পড়েছে তার ঠিক পাশেই কোনও এক শ্রমিক তার পাট কাটার ধারালো ছুরিটা রেখে গেছে মনে হয়। সেটা মরিয়মের হাতে পড়তেই সে উঠে বসে ধাঁই করে ছুরিটা ঢুকিয়ে দিলো সেই ইংরেজের গলা বরাবর!

ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটল। কিছু রক্ত এসে মরিয়মের ছোট মুখটা ভিজিয়ে দিলো। তার সাদা জামাটা দেখতে দেখতে রক্তে লাল হয়ে উঠলো। মাটিতে পড়ে থাকা ইংরেজটা জবাই করা পশুর মতো লাফাচ্ছে। শ্বাস নেয়ার চেষ্টা করছে কিন্তু কণ্ঠনালী কেটে যাওয়ায় সেখান থেকে এক প্রকার ঘড়ঘড় জাতীয় শব্দ তৈরি হচ্ছে। দেখতে দেখতে উঠানটা ভিজে উঠলো তাজা রক্তে।

এর মাঝে দৌড়ে এসে ৩-৪ জন মিলে ধরে ফেলল মরিয়মকে। আরেকজন দ্রুত এসে সেই জবাই হয়ে যাওয়া ইংরেজটাকে বাঁচানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু লাভ হল না কিছুই। মিনিট দুয়েকের মাঝে মারা গেলো সে।

এরপরের ঘটনা খুব দ্রুত ঘটতে লাগলো। কিছু সাদা লোক এসে মাটিতে ফেলে মরিয়মকে বেঁধে ফেলল। আরেকদল ফাঁসির কাঠ থেকে মরিয়মের বাবার লাশ এবং সদ্য মৃত ইংরেজটার লাশ কাপড় দিয়ে ঢেকে ফেলল। বাকিরা মরিয়মকে নিয়ে গাড়িতে উঠালো। মরিয়ম এর মাঝে দস্তাদস্তি করে তাদের অবস্থা খারাপ করে দিচ্ছিল। শুধু তাই নয়, দুইজনের মুখে থুথু ছিটিয়ে দেয় সে।

এই সমস্ত ঘটনা ঘটতে সময় নেয় ১০-১২ মিনিট। এতো দ্রুত সব কিছু ঘটে গেলো যে মিলি কিছু বলতে না পেরে একরকম ঘোরের মধ্যে কাটিয়ে দেয়। তার সামনের গাড়ি দিয়ে তারা মরিয়মকে নিয়ে যায়। মিলি একপ্রকার ঘোরের মধ্যে সেই গাড়ির পিছন পিছন ছুটে। গাড়িটি রাস্তা থেকে নেমে একটি বাড়ির দিকে মোড় নেয়। মিলি অবাক হয়ে দেখে বাড়িটা তার খুবই পরিচিত। এটা তাদেরই বাড়ি। “এক টুকরো স্বর্গ”!

মিলি পৌঁছানর আগেই তারা গাড়ি থেকে মরিয়মকে নামিয়ে ফেলেছে। ইংলিশে কি কি যেনও কথা হয়। একজন সাহেব গোত্রীয় কেউ চিৎকার দিয়ে কিছু নির্দেশ দিলে বাড়ি থেকে বিশাল মোটা এক লোক বের হয়ে আসে। লোকটার হাতে একটা ধারালো ছুরি। সদ্য ধার দেয়া হয়েছে মনে হয়। আলো পড়ে চিকচিক করছে। পাশে দাঁড়ানো সাহেবদের নির্দেশে সে ছুরিটা তুলে ধরে। মরিয়মকে দু পাশ থেকে চেপে ধরে দুজন। আরেকজন মুখ চিপ দিয়ে জিহ্বাটা বের করে ফেলে।

ছুরি চালায় মোটা লোকটি। মরিয়মের জিহ্বাটা কেটে পড়ে যায়। গলগল করে রক্ত বের হতে থাকে। জিহ্বাটা কেটে ফেলার সাথে সাথে মরিয়মের হাত ছেড়ে দেয় লোকগুলো। প্রত্যেকেই হাসি মুখে চেয়ে চেয়ে দেখতে থাকে মেয়েটির অসহায়ত্ব। মরিয়ম হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরে। কাজ হয় না। রক্ত দিয়ে মুখ ভরে তা আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে বের হয়ে মাটিতে পড়তে থাকে। সাদা চামড়ার লোকগুলোর যেনও এখনো আশ মেটে নি। বাড়ির ভেতর থেকে একটা গ্যালনে করে কি যেনও এনে মরিয়মের উপরে ঢালতে থাকে। দূর থেকেও নাকে পেট্রোলের গন্ধ পায় মিলি। তার বড় বড় হয়ে যাওয়া চোখের সামনে মরিয়মের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয় লোকগুলো। তারস্বরে চিৎকার করতে থাকে মরিয়ম। নাকে চামড়া পুড়া গন্ধ পেয়ে মাথা ঘুরে পড়ে যায় মিলি।

6……………………

সুলতান সাহেবের বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত ৯টা বাজলো। এর মাঝেই তাকে ফোন দিয়ে জানানো হয়েছে যে মিলিকে পড়ার রুমে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া গেছে। সুলতান সাহেব তৎক্ষণাৎ ডক্টর ইমরানকে ফোন করে অনুরোধ করেন তার বাসায় গিয়ে মিলিকে একটু দেখে আসতে। ডক্টর ইমরান মিলিকে দেখে নিশ্চিত হয়ে ফোন দিয়ে সুলতান সাহেবকে জানান যে, দুশ্চিন্তার কিছু নেই। মিলি স্বাভাবিক আছে। তবে সে খুব সম্ভবত কোনও ঘোরের মধ্যে আছে। কারণ তার চোখের পাতা খুব দ্রুত কাঁপছে। ডাক্তারি ভাষায় একে বলা হয় REM বা Rapid Eye Movement! এই অবস্থায় মানুষ সচারচর গভীর কোনও স্বপ্নে নিমজ্জিত থাকে। মিলিকে কয়েকবার ডেকেও কোনও সাড়া পাওয়া যায় নি। ঘুম ভাঙানো যায় নি তার। ইমরান ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করে মিলির মাকে পাশে বসিয়ে রেখে চলে এসেছে। বলে গেছে কোনও রকম সাহায্য লাগলে যেনও অবশ্যই জানানো হয়।

সুলতান সাহেব বাড়ি ফিরেই আগে দৌড়ে মেয়ের রুমে গেলেন। এখনো জ্ঞান ফেরেনি। মেয়ের মাথার পাশে বসে কিছুক্ষণ হাত বুলিয়ে দিলেন মাথায়। চোখ দিয়ে টপাটপ জল নেমে এলো। মেয়েটাকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশী ভালোবাসেন তিনি। ওর কিছু হলে নিজেকে সামলাতে পারেন না। মেয়েটার গা বরফের মতো ঠাণ্ডা। শ্বাস প্রশ্বাস খুব স্বাভাবিক। গভীর ঘুমে থাকলে যেমন হয়, ঠিক তেমনি। কিছুক্ষণ পর উথে নিজের হাতমুখ ধুয়ে খাওয়া দাওয়া শেষ করলেন তিনি। মমতাজ বেগম আজ মিলির পাশে ঘুমাবেন। মেয়ের ঘুম কখন ভাঙে বুঝা যাচ্ছে না। ঘুম থেকে উঠে কাউকে পাশে না পেলে আরও ভয় পাবে সে।

খাওয়া দাওয়ার শেষে কিছুক্ষণ পড়ার রুমে লেখা লেখি করা সুলতান সাহেবের অনেক আগের একটা অভ্যাস। নতুন বাড়িতে আসার পর এতো দ্রুত সব ঘটতে লাগলো যে নিজের জন্যই সময় পাচ্ছিলেন না তিনি। আজ অনেক দিন পর পুরনো ডাইরিটা খুলে ডুব মারলেন। মাঝে মাঝে পুরনো লেখা পড়তে ভালো লাগে।

শেষ পৃষ্ঠায় এসে গাড় ঝর্ণা কলমের কালি দিয়ে কয়েকটা লাইন লিখলেন সুলতান সাহেব।

নতুন বাড়িতে আসার পর থেকে কেমন যেনও একটা গুমোট পরিবেশ ছেয়ে আছে পুরো বাড়িটাকে ঘিরে। মিলিকে নিয়ে চিন্তিত সবাই। মেয়েটা তো এমন ছিল না। পড়ালেখায় সর্বদাই ফার্স্ট হওয়া মেয়ে। ভদ্র, লক্ষ্মী, চুপচাপ, শান্তশিষ্ট, সব গুণই রয়েছে মিলির মধ্যে। আল্লাহ এতো নির্দয় কেন? কেন আমার মেয়েটার সাথেই এমন হচ্ছে? কি এর প্রতিকার?
ডায়রিতে এতটুকু লেখে চোখ থেকে চশমাটা খুলে ফেললেন সুলতান সাহেব। স্বচ্ছ এক টুকরো কাপড় দিয়ে ঘষে ঘষে পরিষ্কার করলেন চশমা খানি। পুনরায় চশমাটা পড়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন পুরনো আমলের দেয়াল ঘড়িটার দিকে। টিকটিক করে সময় দিয়ে যাচ্ছে ঘড়িটা। রাত ১.২৬। বাড়িতে উঠার সময় অফিসের দপ্তরী রাম গোপাল জানিয়েছিল ঘড়িটা নাকি অনেক পুরনো। ঠিক এই বাড়িটার মতো। ব্রিটিশ সরকারের কোনও এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ঘড়ি। বাংলাদেশ থেকে যখন বাক্স পেটারা গুঁটিয়ে তাদের তারিয়ে দেয়া হল, তখন এই ঘড়িটা কোনও কারণে নেয় নি সে। রয়ে যায় বাড়িতে। শেষ চিহ্ন হিসেবে।

রান্নাঘরের দিকে হেঁটে চললেন সুলতান সাহেব। রাত জাগলে সাংঘাতিক পানির তৃষ্ণা পায় তার। এই জন্য তার পড়ার টেবিলেই একটি জগে পানি দিয়ে রাখা হয়। বাড়ির এই সংকটপূর্ণ সময়ে হয়তো কেউ খেয়াল রাখে নি যে জগটি ফাঁকা পড়ে আছে। তাই বাধ্য হয়ে উপরতলা সিঁড়ি বেয়ে নেমে নিচের খাবার ঘরে আসতে হয় সুলতান সাহেবকে।

ফ্রিজ থেকে ঠাণ্ডা পানির বোতল বের করে একদমে এক গ্লাস পানি খেয়ে ফেললেন তিনি। গ্লাসটা টেবিলে রেখে একটা বড় করে ঢেঁকুর তুললেন। কানের মধ্যে অতি সূক্ষ্ম একটা আওয়াজ ধরা পড়লো তার। আওয়াজটা রান্নাঘরের পাশের ময়লা ফেলার ডাস্টবিন থেকে আসছে। সুলতান সাহেব কিছুটা অবাক হলেন। এতো রাত্রিতে সেখান থেকে আওয়াজ আসার কথা নয়। বাড়িটা অনেক পুরনো বলে এর চারপাশেই আগের আমলের উঁচু করে প্রাচীর দেয়া। সেই প্রাচীর টপকে বিড়াল বা কুকুর আসতে পারবে এমন সম্ভবনা খুবই ক্ষীণ। তাছাড়া তিনি নিজে কুকুর বিড়াল পছন্দ করেন না। এই দুটোই হল বেহায়া প্রাণী। নিজের খাবারেও মুখ দেয়, আবার পরের খাবারেও মুখ দেয়। তাই বাড়ির সবার উপর কড়া নির্দেশ আছে বাড়িতে এদের উপস্থিতি যেনও দেখা না যায়।

কিছুটা কৌতূহলী হয়ে পা টিপে টিপে রান্নাঘরের জানালাটার দিকে গেলেন সুলতান সাহেব। উঁকি দিয়ে দেখলেন বাইরের সিকিউরিটি লাইটটা এখনো জ্বালানো। বাড়ির পিছন দিক এটা। লাইট জ্বালানো থাকায় বাড়ির সামনে খোলা জায়গা এবং সিঁড়ি দিয়ে নামার পরের হাতে করা বাগানটা পুরোটাই দেখা যাচ্ছে। জানলার কাছে দাঁড়িয়ে তিনি এক অদ্ভুত গন্ধ পেলেন নাকে। তার পরিচিত কোনও ফুলের গন্ধের সাথে এর কোনও মিল খুঁজে পেলেন না তিনি। হটাত ময়লার ডাস্টবিনের পাশ থেকে কারো যেনও নড়াচড়ার শব্দ পাওয়া গেলো। আনমনে মাথা ঘুরিয়ে সেদিকে তাকালেন সুলতান সাহেব!

সুলতান সাহেবের ক্ষণিকের জন্য সন্দেহ হল তিনি হয়তো ঘুমিয়ে আছেন! কারণ তিনি যা দেখছেন তা আপাত দৃষ্টিতে দেখা সম্ভব না। একটা বাচ্চা মেয়ে হাতে একটা ভাঙ্গা কাঠের টুকরো নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভাঙ্গা কাঠের টুকরোটার মাথায় তাজা রক্ত দেখা যাচ্ছে। মেয়েটার মাথা থেকে ঘন কালো চুল নেমে এসেছে পুরো মুখ জুড়ে। এরফলে মুখটা ঠিক দেখা যাচ্ছে না। খুব ভালো করে খেয়াল করে সুলতান সাহেব একজোড়া চোখ দেখতে পেলেন সেই চুলের ফাঁক দিয়ে। একজোড়া নিস্প্রান চোখ! ঠিক যেমনটা মৃত ব্যক্তিদের হয়!

সুলতান সাহেব খানিকটা ভড়কে গেলেন। এতো রাতে একটা মেয়েকে এভাবে বাড়ির বাইরে আশা করেননি তিনি। তাছাড়া বাড়ির ভেতরে প্রবেশের দরজায় একজন গার্ড রাত জেগে ডিউটি দিচ্ছে। তাকে না জানিয়ে একটা মেয়ের ঢোকা আসলেই অসম্ভব।

সুলতান সাহেব তড়িঘড়ি করে রুমের দরজাটা খুললেন। উকি দিয়ে বাইরে দেখলেন যেখানে খানিক আগে মেয়েটিকে দেখা গিয়েছিলো। কাউকে চোখে পড়লো না। ভালো করে উঁকিঝুঁকি মেরে আশে পাশে দেখতেই তিনি দেখলেন মেয়েটি বাড়ির উঠানের বা পাশে একটা গাছের নিচে দাড়িয়ে আছে। ঠিক তেমনিভাবে। হতে এখনো সেই কাঠের টুকরোটা ধরা। সুলতান সাহেব ডাক দিয়ে বললেন, “কে? কে ওখানে?”

মেয়েটি কথা শুনতে পেলো নাকি বুঝা গেলো না। সেই জায়গাতেই দাড়িয়ে রইলো। সুলতান সাহেব ভাবলেন হয়তো শুনতে পায় নি। পায়ে স্যান্ডেল গলিয়ে ঘর থেকে বের হলেন তিনি। আলো এতদূর যাচ্ছে না, তবে মনে হচ্ছে মেয়েটি এখনো এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। হটাত সুলতান সাহেবের খেয়াল হল, মিলি যেই মেয়েটিকে দেখে ভয় পেয়েছিলো, এই মেয়েটি সেই মেয়েটি না তো?

তিনি আর ডাকাডাকি না করে আস্তে করে নেমে গেলেন দরজা ছেড়ে। হাঁটতে লাগলেন মেয়েটির দিকে। মেয়েটি কিছুক্ষণ দেখল, এরপর আস্তে আস্তে পিছু হটতে লাগলো। অবাক হয়ে গেলেন সুলতান সাহেব। মেয়েটির পায়ের কোনও অংশ মাটি স্পর্শ করছে না। অর্থাৎ বলতে গেলে হাওয়ায় ভাসছে মেয়েটি। এটা কিভাবে সম্ভব? একজন মানুষ হাওয়ায় ভাসে কিভাবে? সুলতান সাহেব হাঁটার গতি বাড়ালেন। মেয়েটিও তার সাথে তাল মিলিয়ে আরও দ্রুত পিছাতে লাগলো।

সুলতান সাহেব এখন যেখানে দাড়িয়ে আছেন সেখানে আলো পৌঁছতে পারছে না। তবে তার মনে হল তার সামনে একটা বিশাল গর্তের মতো কিছু রয়েছে। মেয়েটি তার উপর গিয়ে দাড়িয়ে গেলো। এরপর সুলতান সাহবের চোখের সামনে দ্রুত ঢুকে পড়লো সেই গর্তের ভেতর। সুলতান সাহেব আহাম্মকের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। এরপর এক পা দু পা করে সামনে এগিয়ে গিয়ে উকি দিলেন গর্তটার ভেতর। পুরনো আমলের কোনও কুয়ার মতো লাগলো তার কাছে। এই বাড়িতে কোনও কুয়া আছে বলে জানতেন না তিনি। তবে এটা এলো কোত্থেকে?

Last Part:

সুলতান সাহেবের ঘুম ভাঙল সকাল ৭টার দিকে। রাতে ভাল ঘুম হয় নি। বারবার চোখ লেগে আসতেই একের পর এক দুঃস্বপ্ন দেখেছেন তিনি। ফজরের আজানের পর কিছুক্ষণের জন্য শান্তিতে ঘুমুতে পেড়েছেন।

শরীরটা কেমন যেনও আড়ষ্ট হয়ে আছে। সূর্য এতক্ষণে ভালোই তেজ ছড়ানো শুরু করে দিয়েছে। সুলতান সাহেব উঠে গিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন। দিনের আলোতে বাগানটা কেমন নিরীহ গোবেচারা লাগছে। কিন্তু উনি গতকাল রাতে যা দেখেছেন তা তিনি জীবনে আগে কখনো দেখেন নি বা শুনেন নি। ঐ তো সেই গাছটা যার নিচে গতকাল তিনি মেয়েটাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলেন। মেয়েটার কথা মনে পড়তেই সুলতান সাহেবের মাথায় চকিতে একটা ভাবনা খেলে গেলো। দ্রুত রুম থেকে বের হয়ে তিনি এগুতে লাগলেন মিলির রুমের দিকে।

মিলির বিছানাটা খালি। সুন্দর পরিপাটি করে গুছানো। মিলি সকালে ঘুম থেকে উঠে সবার আগে বিছানাটা সুন্দর করে গোছায়। এটা তার একদম ছোটবেলার অভ্যাস। সুলতান সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে গিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগলেন।

নাস্তার টেবিলেই দেখা হল মিলির সাথে। এক রাতেই মেয়েটি অনেকটা শুকিয়ে গেছে। চোখের নিচে কালি। চুলগুলো কেমন এবড়ো থেবড়ো হয়ে আছে। পাশে বসে আছেন মমতাজ বেগম। হাতে জেলি লাগানো পাউরুটি। মিলি একটা মুখে দিয়ে চিবুচ্ছে আর উনি আরেকটা নিয়ে প্রস্তুত। যেনও সকালের নাস্তাতেই মিলি তার গত রাতের হারান স্বাস্থ্য ফিরে পায় তারই একটা চেষ্টা!

সুলতান সাহেবকে দেখে মিলির চোখ দুটো চঞ্চল হয়ে উঠলো। ফিসফিস করে বলে উঠলো, “বাবা!”

সুলতান সাহেব দ্রুত এগিয়ে গেলেন মেয়ের দিকে। মিলি টেবিলে বসা, সেই অবস্থায় উনি তাকে বুকে ঝড়িয়ে ধরলেন। চোখ দিয়ে টপটপ করে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো। সুলতান সাহেব মেয়েকে সুস্থ দেখে অত্যন্ত খুশি হয়েছেন। তার কেন যেনও মনে হচ্ছিল মিলিকে নিয়ে বড় কোনও সমস্যা হবে। তাই সকাল সকাল মেয়েকে দেখে মনটা ভাল লাগছে।

নিজেকে দ্রুত সামলে নিলেন সুলতান সাহেব। মিলিকে বললেন, “মা খাওয়া শেষ করে একটু উপরে পড়ার রুমে আয় তো। তোর সাথে জরুরী কিছু কথা আছে।”

মিলি যেনও এই কথার জন্যই অপেক্ষা করছিলো। বাবার কথা শেষ হতেই সে বলল, “তোমার সাথেও আমার কিছু জরুরী কথা আছে বাবা।”

মমতাজ বেগম এতক্ষণ চুপচাপ সব শুনছিলেন। এবার তাড়া লাগালেন, “কথা পরে। আগে খেয়ে নাও দুজনই।”

সুলতান সাহেব ফ্রেস হতে চলে গেলেন আর মিলি দ্রুত তার খাওয়া শেষ করতে লাগলো।

******************************************

সুলতান সাহেব কম্পিউটার টেবিলের চেয়ারটায় বসে আছেন। তার ঠিক মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসে আছে মিলি। হাতে একটা পুরনো ডাইরি। ডাইরিটা সে তার রুমে গতকাল খুঁজে পায়। অনেকটা নিজের অজান্তে। ঘটনা অনেকটা এরকমঃ

গতরাতে ভোর ৫টার দিকে মিলির জ্ঞান ফেরে। জ্ঞান ফিরে মানে সে তার আসল দুনিয়ায় আবার ফিরে আসে। জ্ঞান ফেরার সাথে সাথে মিলি প্রচণ্ড ব্যাথায় চিৎকার উঠে। তার চিৎকার শুনে ধড়মড় করে জেগে উঠেন মমতাজ বেগম। মিলি বারবার করে পানি খেতে চাইলে তিনি নিজে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে পানি আনতে যান। হটাত মিলি লক্ষ্য করে তার দেয়ালে ঝুলানো একটা ছবি খানিকটা সরে গিয়েছে। ছবির ওপাশে একটা ছোট ফাঁকা চারকোণা বাক্সের মত দেখা যায়। মিলি বিছানা থেকে নেমে গিয়ে ঐ বাক্স ভালো করে দেখে শুনে বের করে। বাক্সটা খুলতেই ভেতর থেকে একটা ডাইরি পায় সে। পুরনো আমলের কোনও ইংরেজের লেখা। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এই ছবিটা যখন ঝুলানো হয় তখন মিলি নিজের হাতেই ছবিটি সেখানে লাগিয়েছিল। তখন কোনও গর্ত তো দূরের কথা, এমনকি প্লাস্টারেও কোনও সমস্যা দেখা যায় নি। মিলি এখন আর ভয় পায় না। মরিয়মের ব্যাপারটি নিজ চোখে দেখার পর থেকেই সে ধরে নিয়েছে এই বাড়িতে কিছু একটা গণ্ডগোল আছে এবং এটি ঠিক করার জন্য তার কিছু অবশ্যই করতে হবে।

মিলি এতক্ষণ তার বাবাকে সব খুলে বলল। গতকাল বিকেলে মেয়েটির হাত ধরা থেকে শুরু করে মরিয়মের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া পর্যন্ত সব।

সুলতান সাহেব গভির মনোযোগে এতক্ষণ শুনছিলেন। এবার চেয়ারটা ছেড়ে উঠে পড়লেন তিনি। এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন ঘরের লাগোয়া বারাণ্ডায়। পিছন পিছন মিলি প্রবেশ করলো।

“কিছু বলছ না যে বাবা? এখন আমাদের করনীয় কি?”

“তুই কি নিশ্চিত যে আমদের বাগানের বাম পাশটায় একটা কুয়া ছিল এবং খুন করে সেটায় লাশ ফেলে দিত ইংরেজরা?” সুলতান সাহেবের প্রশ্ন।

“হ্যাঁ বাবা! ডাইরিতে তাই লেখা আছে। আমি হাতে পাওয়ার পর থেকে একটানা পড়ে শেষ করে ফেলেছি ডাইরিটা। সেখানে স্পষ্ট লেখা আছে এই কথা। এমনকি মরিয়মের কথাও লেখা আছে। ঐ পার্টের নাম দেয়া আছে “The Evil Child”!”

সুলতান সাহেব এতক্ষণ খানিকটা ইতস্তত করছিলেন। এবার বলেই ফেললেন। “মিলি, আমি বোধহয় সেই মেয়েটাকে গতকাল রাতে দেখেছি!”

মিলির চোখ বিস্ফুরিত হলো! “কোথায়?” প্রায় চিৎকার করে জিজ্ঞেশ করলো সে।

সুলতান সাহেব কিছুটা বিভ্রান্ত। আস্তে আস্তে খুলে বললেন পুরো ঘটনা।

মিলি বাবার কথা শুনল চুপচাপ। এরপর বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, “কিন্তু আমাদের বাগানে তো কোনও কুয়া নেই বাবা।”

সুলতান সাহেব বিড়বিড় করে বললেন, “কি জানি! হয়তো বা কোনকালে ছিল।”

মিলি বাবার চোখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলো। বাবার চোখের ভাষা স্পষ্ট পড়তে পারলো সে। অস্ফুস্ট স্বরে বলল, “বাবা তুমি কি তাই ভাবছ যা আমি ভাবছি?”

সুলতান সাহেব মেয়ের চাহনি লক্ষ্য করে বাগানের দিকে তাকিয়ে বললেন, “হমম!”

***************************************************

“এক টুকরো স্বর্গ” এর সামনে শ খানেক মানুষের একটি ভির দাঁড়িয়ে আছে। সবাই উকি ঝুকি মেরে দেখার চেষ্টা করছে ভেতরের দৃশ্য। গেটের ভেতরে একটা হাসপাতালের এ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে আছে। একের পর এক কঙ্কাল এনে তোলা হচ্ছে তার ভেতর। সাজিয়ে রাখা হচ্ছে পাশাপাশি। একটা এ্যাম্বুলেন্স ভরে গেলে তার জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে নতুন একটা। এই পর্যন্ত প্রায় পঞ্চাশের বেশি লাশ তোলা হয়েছে পুরনো কুয়াটা থেকে।

সুলতান সাহেব বাগানের মাঝখানটায় দাঁড়িয়ে আছেন। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে মিলি। দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট শক্ত করে কামড়ে ধরে রেখেছে সে। চোখ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ছে। আইডিয়াটা তার বাবার। অফিসের কাছ থেকে ছুটি এবং অনুমতি নিয়ে পৌরসভার কিছু লোকদের ডেকে এনে বাগানে গর্ত করা শুরু করেন তিনি। অনেকেই জানিয়েছে যে এই বাড়িতে আসলেই একটি কুয়া ছিল এবং দেশ স্বাধীন হবার পর তা মাতি দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়। কুয়াটা ঘিরে অনেক রকমের কথা প্রচলিত, তাই সুলতান সাহেবকে অফিস থেকে কিছু জানানো হয় নি। বাড়িটা তারা সস্তায় পেয়েছিলো, তাই চাচ্ছিল না হাতছাড়া করতে। এজন্যই সুলতান সাহেব জানতেন না কুয়াটা সম্পর্কে।

কুয়াটা খুঁজে পেতে মিলি অনেক সাহায্য করে। ডাইরিটা পড়ে বারবার জানাচ্ছিল সে কোন গাছের পাশে গর্ত করতে হবে বা কোন গাছ থেকে কত দূরে। বেলা ১টার দিকে কুয়াটা খুঁজে পায় মাটিকাটা লোকগুলো। ভেতরে আলো ফেলে কিছুই দেখা যায় নি, তাই পুলিশকে ফোন দিয়ে আনানো হয়, সাথে ডাকা হয় হাসপাতালের এ্যাম্বুলেন্সও।

সুলতান সাহেবের বিশেষ অনুরোধে ডাক্তার ইমরানও এসেছে এ্যাম্বুলেন্সের সাথে। এ্যাম্বুলেন্সের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের মসৃণ গালে হাত বুলাচ্ছে সে। বুঝাই যায় কোনও গভীর ছিন্তায় মগ্ন। সুলতান সাহেব এগিয়ে গেলেন তার কাছে।

“কি ডাক্তার, খুব চিন্তিত নাকি?”

ডাক্তার ইমরান মনে হয় সুলতান সাহবের উপস্থিতি কামনা করে নি। হটাত এমন প্রশ্নে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো। সামলে নিয়ে বলল, “জি স্যার। একটা ব্যাপার খুব ভাবাচ্ছে আমাকে।”

সুলতান সাহেব চশমাটা খুলে পরিষ্কার করতে করতে জিজ্ঞেস করলেন, “কোন ব্যাপারটা?”

“স্যার, যদি বায়োলজির কথা বলি তাহলে এতো এতো বছর পর মানব কঙ্কালগুলোর অস্তিত্ব থাকা সম্ভব না। আমি বলতে চাচ্ছি, মাটির সাথে মিশে যাওয়ার কথা এতদিনে!”

সুলতান সাহেব এ্যাম্বুলেন্সে রাখা কঙ্কালগুলোর দিকে তাকালেন। বললেন, “আমার জানামতে তাই হবার কথা। বাবা, তুমি একটা কাজ করতে পারবে? এইসব কংকালগুলো যেনও জানাজা পড়িয়ে সুন্দর করে দাফনের ব্যবস্থা করা যায় তা কি একটু দেখবে? খরচের কথা চিন্তা করবে না। খরচ যা লাগে আমি দিবো।”

ইমরান এমন অনুরোধের জন্য অবাক হল। তবে নিজের স্যারের দুলাভাই লাগেন তিনি। তাঁকে ফিরিয়ে দেয়া যায় না। বলল, “জি স্যার। আমি অবশ্যই ব্যবস্থা করবো।”

ঠিক এসময় পেছন থেকে মিলির চিৎকার শোনা গেলো। গর্ত থেকে একটা ১০-১২ বছর বয়সী বাচ্চার লাশ উঠানো হয়েছে। মিলির ধারণা এটাই সেই মরিয়মের লাশ!

***************************************************

পরিশেষঃ কংকালগুলো উলতান সাহেবের ইচ্ছের প্রেক্ষিতে জানাজা পড়িয়ে সমাধিস্ত করা হয়। এই ঘটনার পর সুলতান সাহেব সেই বাড়ি ছেড়ে শহরে ফেরত যান। তারা সপরিবারে ঢাকা থাকেন। মিলি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে অনার্স পড়ছে। সে দ্রুতই নিজের পুরনো জীবনে ফিরে আসে। পড়ালেখা আর অবসরে গান শুনে, বই পড়ে সময় কাটে তার।

সেই বাড়িতে ঐ ঘটনার পর থেকে আর কেউ থাকার সাহস পায় নি। যদিও এখন আর আগের মতো কিছু দেখা যায় না, তবে কুসংস্কারে আক্রান্ত মানুষগুলোর জন্য কুয়া থেকে লাশ তোলাটাই অনেক। রাত্রিতে তো দূরের কথা, এমনকি দিনের বেলায়ও ঐ তল্লাটে কেউ যায় না।

বাড়িটা ঘিরে কিছুদিন পরে এক নতুন গল্পের সূচনা হয়। সেই বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে একটা পুরনো শ্যাওড়া গাছ আছে, যার কাণ্ড বিশাল মোটা। গাছটাও অনেক পুরনো। সেই গাছের নিচে নাকি বৃষ্টিস্নাত দিনে কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। যতক্ষণ বৃষ্টি পড়ে ততক্ষণ সেই ছায়াটি দাঁড়িয়ে থাকে। বৃষ্টি শেষে আপনাআপনি মিলিয়ে যায়। অনেকেই হলফ করে একই কথা বলেছে। কে জানে, এ হয়তো সেই সেলিম সাহেবের লাশ! অপঘাতে মারা গিয়েছিলেন যিনি, সময়ের অনেক আগেই!

(সমাপ্ত)

টিউনারপেজের নতুন টিউন আপনাকে ইমেইল করব?
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting

মন্তব্য দিন আপনার