পরিচালক, ঔপন্যাসিক, এবং গল্পকার ‘জহির রায়হান’ এর জীবনী

4
1498

জহির রায়হান (আগস্ট ১৯, ১৯৩৫ – জানুয়ারি ৩০, ১৯৭২) একজন প্রখ্যাত বাংলাদেশী চলচ্চিত্র পরিচালক, ঔপন্যাসিক, এবং গল্পকার। জহির রায়হান ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট বর্তমান ফেনী জেলার অন্তর্গত মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর তিনি তার পরিবারের সাথে কলকাতা হতে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) স্থানান্তরিত হন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে বাংলায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে দু’বার বিয়ে করেন: ১৯৬১ সালে সুমিতা দেবীকে এবং ১৯৬৬ সালে তিনি সুচন্দাকে বিয়ে করেন, দুজনেই ছিলেন সে সময়কার বিখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেত্রী।

কর্মজীবন

জহির রায়হান বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তার সাহিত্যিক ও সাংবাদিক জীবন শুরু হয়। ১৯৫০ সালে তিনি যুগের আলো পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি খাপছাড়া, যান্ত্রিক, সিনেমা ইত্যাদি পত্রিকাতেও কাজ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি সম্পাদক হিসেবে প্রবাহ পত্রিকায় যোগ দেন। ১৯৫৫ সালে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ সূর্যগ্রহণ প্রকাশিত হয়। চলচ্চিত্র জগতে তার পদার্পণ ঘটে ১৯৫৭ সালে, জাগো হুয়া সাবেরা ছবিতে সহকারী হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে। তিনি সালাউদ্দীনের ছবি যে নদী মরুপথেতেও সহকারী হিসেবে কাজ করেন। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশাম তাকে এ দেশ তোমার আমার এ কাজ করার আমন্ত্রণ জানান; জহির এ ছবির নামসঙ্গীত রচনা করেছিলেন। ১৯৬০ সালে তিনি রূপালী জগতে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন কখনো আসেনি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। ১৯৬৪ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র সঙ্গম নির্মাণ করেন (উর্দু ভাষার ছবি) এবং পরের বছর তার প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র বাহানা মুক্তি দেন। জহির রায়হান ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং ২১শে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক আমতলা সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন। ভাষা আন্দোলন তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যার ছাপ দেখতে পাওয়া যায় তার বিখ্যাত চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেওয়াতে। তিনি ১৯৬৯ সালের গণ অভ্যুত্থানে অংশ নেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারাভিযান ও তথ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন। কলকাতায় তার নির্মিত চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেওয়ার বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী হয় এবং চলচ্চিত্রটি দেখে সত্যজিত রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহা এবং ঋত্বিক ঘটক প্রমুখ ভূয়সী প্রশংসা করেন। সে সময়ে তিনি চরম অর্থনৈতিক দৈন্যের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও তার চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হতে প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ তিনি মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করে দেন।

Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting

অন্তর্ধান ও মৃত্যু

জহির রায়হান দেশ স্বাধীন হবার পর তার নিখোঁজ ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে শুরু করেন, যিনি স্বাধীনতার ঠিক আগমুহূর্তে পাকিস্তানী আর্মির এদেশীয় দোসর আল বদর বাহিনী কর্তৃক অপহৃত হয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের ৩০ ডিসেম্বর জহির রায়হান ভাইয়ের সন্ধানে মীরপুরে যান এবং সেখান থেকে আর ফিরে আসেননি। মীরপুর ছিল ঢাকা থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত বিহারী অধ্যুষিত এলাকা এবং এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে যে সেদিন বিহারীরা ও ছদ্মবেশী পাকিস্তানী সৈন্যরা বাংলাদেশীদের ওপর গুলি চালালে তিনি নিহত হন।

পরিবারের উল্লেখযোগ্য সদস্য

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রবাদ পুরুষ জহির রায়হানের দুই স্ত্রী’র একজন সুমিতা দেবী। এই প্রয়াত অভিনেত্রীর দুই ছেলে বিপুল রায়হান ও অনল রায়হান। দুজনেই প্রতিষ্ঠিত নাট্য নির্মাতা। আরেক স্ত্রী সুচন্দা’র ছোট ছেলে তপু রায়হানও অভিনেতা। তিনি ‘সবুজ কোট কাল চশমা’ ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। জাহির রায়হানের ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারের মেয়ে শমী কায়সার

জীবনপঞ্জি

১৯৩৫: জন্ম ১৯ আগস্ট, মজুপুর গ্রাম, ফেনী।

প্রাথমিক লেখাপড়াঃ মিত্র ইন্সটিটিউট, কলকাতা।
আলিয়া মাদ্রাসা, কলকাতা।

১৯৪৯: নতুন সাহিত্য পত্রিকা (কলকাতা)-য় ওদের জানিয়ে দাও শীর্ষক কবিতা প্রকাশিত।
১৯৫০: আমিরাবাদ হাইস্কুল (ফেনী) থেকে মেট্রিক পরীক্ষা।
১৯৫১-১৯৫৭: কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সরাসরি জড়িত।
১৯৫২: : ছাত্র অবস্থাতেই মহান ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহন।

মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ থেকে জহির রায়হানে পরিণত।
প্রমথেশ বড়ুয়া মেমোরিয়াল ফটোগ্রাফি স্কুল (কলকাতা)-য় ভর্তি।

১৯৫৩: জগন্নাথ কলেজ (ঢাকা) থেকে আই.এস.সি পরীক্ষা।
১৯৫৬-১৯৫৮: কোর্স শেষ না করেই চিকিৎসাশাস্ত্র (মেডিক্যাল কলেজ) ত্যাগ।
১৯৫৬: পাকিস্তানের প্রখ্যাত চিত্র পরিচালক জারদরি-এর সহকারী মনোনীত হয়ে চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ।
১৯৫৮: : বি.এ.অনার্স (বাংলা ভাষা ও সাহিত্য), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পঞ্চাশের দশকে ছাত্র অবস্থায় প্রথম গল্পগ্রন্থ সূর্য গ্রহণ প্রকাশিত।

১৯৬১: : প্রথম চলচ্চিত্র কখনো আসেনির মুক্তি লাভ।

চিত্রনায়িকা হেনা লাহিড়ী সুমিতা দেবীর সাথে পরিণয়।
পাকিস্তানের প্রথম রঙ্গিন ছবি সঙ্গম (উর্দু ভাষায়) তৈরি।

১৯৬৪: হাজার বছর ধরে উপন্যাসের জন্য আদমজী পুরস্কার লাভ।
১৯৬৮: চিত্রনায়িকা কোহিনূর আকতার সুচন্দার সাথে পরিণয়।
১৯৭০: পাকিস্তানের প্রথম রাজনৈতিক-চেতনামন্ডিত চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’ মুক্তিলাভ।
১৯৭১: : মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ।

মুক্তিযুদ্ধের উপর প্রথম চলচ্চিত্র স্টপ জেনোসাইড নির্মাণ।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দ্বিতীয় চলচ্চিত্র এ স্টেট ইজ বর্ন নির্মাণ।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চলচ্চিত্র ইনোসেন্ট মিলিয়ন (পরিচালকঃ বাবুল চৌধুরী) এবং লিবারেশন ফাইটার্স (পরিচালকঃ আলমগীর কবীর)-এর তত্ত্বাবধান।
বুদ্ধিজীবীদের বাংলাদেশ মুক্তি পরিষদ (Bangladesh Liberation council of Intelligentsia)-এর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত।

১৯৭১: সাহিত্যে অবদানের জন্য বাংলা একাডেমী পুরস্কার লাভ (১৯৭২ সালে ঘোষিত)
১৯৭২: বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটি গঠন।
১৯৭২: নিখোঁজ (৩০ জানুয়ারি থেকে আজ পর্যন্ত)।
১৯৭৭: চলচ্চিত্র শিল্পে অবদানের জন্য রাষ্ট্রীয় একুশে পদক লাভ।
১৯৯২: সাহিত্যে কৃতিত্বের জন্য স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার লাভ।

পুরস্কার

আদমজী সাহিত্য পুরস্কার ১৯৬৪। (হাজার বছর ধরে)
নিগার পুরস্কার (‘কাঁচের দেয়াল’) চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ বাংলা ছবি হিসেবে।
বাংলা একাডেমী পুরস্কার ১৯৭১। (উপন্যাসঃ মরণোত্তর)
একুশে পদক ১৯৭৭। (চলচ্চিত্রঃ মরণোত্তর)
স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার ১৯৯২। (সাহিত্যঃ মরণোত্তর)

উল্লেখযোগ্য কাজ
উপন্যাস

শেষ বিকেলের মেয়ে (১৯৬০)। প্রথম উপন্যাস। প্রকাশকঃ সন্ধানী প্রকাশনী। রোমান্টিক প্রেমের উপাখ্যান।
হাজার বছর ধরে (১৯৬৪)। আবহমান বাংলার গ্রামীণ জীবনের পটভূমিতে রচিত আখ্যান। (চলচ্চিত্ররূপ, ২০০৫)
আরেক ফাল্গুন (১৯৬৯)। বায়ান্নর রক্তস্নাত ভাষা-আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত কথামালা।
বরফ গলা নদী (১৯৬৯)। প্রথম প্রকাশঃ ‘উত্তরণ’ সাময়িকী। অর্থনৈতিক কারণে বিপর্যস্ত ক্ষয়িষ্ণু মধ্যবিত্ত পরিবারের অসহায়ত্ব গাঁথা।
আর কত দিন (১৯৭০)। অবরুদ্ধ ও পদদলিত মানবাত্নার আন্তর্জাতিক রূপ এবং সংগ্রাম ও স্বপ্নের আত্নকথা।

অন্যান্য রচনা

সূর্যগ্রহণ। প্রথম গল্পগ্রন্থ। ১৩৬২ বাংলা।
তৃষ্ণা (১৯৬২)।
একুশে ফেব্রুয়ারি (১৯৭০)।
কয়েকটি মৃত্য।

চলচ্চিত্র

জহির রায়হান পরিচালিত চলচ্চিত্রসমূহ হচ্ছেঃ

কখনো আসেনি (১৯৬১)।
সোনার কাজল (১৯৬২)। (কলিম শরাফীর সঙ্গে যৌথভাবে)
কাঁচের দেয়াল (১৯৬৩)।
সঙ্গম (১৯৬৪)।
বাহানা (১৯৬৫)।
আনোয়ারা (১৯৬৭)।
বেহুলা (১৯৬৬)।
জ্বলতে সূরযকে নীচে।
জীবন থেকে নেয়া (১৯৭০)।
স্টপ জেনোসাইড (চলচ্চিত্র) (১৯৭১)।
এ স্টেট ইজ বর্ন (১৯৭১)।
লেট দেয়ার বি লাইট (অসমাপ্ত) (১৯৭০)।

পত্রিকা সম্পাদনা

এক্সপ্রেস (ইংরেজি সাপ্তাহিক)।
প্রবাহ (বাংলা মাসিক)।

জহির রায়হান
পরিচালক, ঔপন্যাসিক, এবং গল্পকার 'জহির রায়হান' এর জীবনী
জহির রায়হান
জন্ম মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ
আগস্ট ১৯, ১৯৩৫ (বয়স ৭৬)
ফেনী, নোয়াখালী, বাংলাদেশ
মৃত্যু ৩০ জানুয়ারি, ১৯৭২। মীরপুরে তার ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারের মৃতদেহ খুঁজতে গিয়ে নিঁখোজ হন, এবং আর ফিরে আসেননি।
পেশা চলচ্চিত্র নির্মাতা, লেখক

তথ্যসূত্র

http://en.wikipedia.org/wiki/Zahir_Raihan The Daily Prothom Alo,August 17,2006
Akhono Obohelito Zahir Raihan” Hossain, Amzad. The Daily Prothom Alo, August 17, 2006
সেন গুপ্ত, আশিষ (মে ১৫, ২০০৯)। বিনোদন জগতে আত্মীয়তার বন্ধন (বাংলা ভাষায়)। প্রকাশক: glitz.bdnews24.com। সংগৃহীত হয়েছে: ২০০৯-১০-২৭।

টিউনারপেজের নতুন টিউন আপনাকে ইমেইল করব?
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting

4 মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here

eleven + 9 =