কবরস্থানের রহস্য

11
401

ছোটবেলা থেকেই ব্যাখ্যার অতীত বিষয়সমূহ নিয়ে আমার সীমার অতীত আগ্রহ ! এসব বিষয়ে তথ্য সংগ্রহে আমার কোন ক্লান্তি নেই। তাই রহস্যের খোঁজ পেলে আর দেরি করি না, ছুটে যাই ঘটনাস্থলে। আর এধরণের ঘটনা সংগ্রহের জন্য নানা ধরণের লোকের সাথেই কথা বলতে হয়। এবারও তেমনি এক লোকের সাথে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলার সুযোগ এসে গেল। লোকটির নাম করিম মিয়া। তিনি মৃত মানুষের জন্য কবর খোঁড়া এবং দাফন কাজ সমাধা করেন। প্রায় ১০ বছর ধরে তিনি একাজ করে আসছেন। আর আমি যে ধরণের গল্পের জন্য হয়রান সে ধরণের ঘটনা তার জীবনের নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার। গত বছর আমার এক আত্মীয়ের লাশ দাফনের সময় তার সাথে পরিচয়। তখন তার মুখে বেশ কিছু কাহিনী শোনা হয়। যদিও তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ানক কাহিনী সে বলতে চায়নি সেদিন; অনেক জোর করার পরও। আমি আমার মোবাইল নাম্বার তাকে দিয়ে আসি এবং প্রয়োজনে যোগাযোগ করতে বলি। এর মাঝে কেটে গেছে অনেকদিন। তার কথা প্রায় ভুলেই গেছিলাম। হঠাৎ গতকাল অচেনা একটা নাম্বার থেকে ফোন পেলাম । হুম, সেই লোকের ফোন ! তার চেয়ে বড় কথা তিনি তার ঘটনাটি আমাকে বলতে চান। এই ঘটনা কাউকে না বলে নাকি তিনি শান্তি পাচ্ছেন না। তাছাড়া অন্য কেউ এই ঘটনা বিশ্বাসও করবে না। তো পরদিনই দেখা করার সিদ্ধান্ত নিলাম। করিম মিয়া বলল যে কবরস্থানে তিনি এ ঘটনার শিকার সেখানেই তিনি এ কাহিনী বলতে চান। আর সময়টাও রাতে হলে তার জন্য ভালো হয়। আমার কোন আপত্তি ছিল না। সময় ঠিক করলাম রাত ১২ টা। আমি পৌঁছে গেছিলাম সময় মত। কবরস্থানের একটু সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বেশ রাত, আর জায়গাটাও কেমন নির্জন। তাই একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। যদিও সেসবে পাত্তা দিলাম না। একটু পর ধীর পায়ে কারও এগিয়ে আসার শব্দ পেলাম। হ্যাঁ, করিম মিয়াই হবে। ছোটখাটো গড়নের করিম মিয়া ধীর পায়ে এগিয়ে আসছিল। কাছে এসে বলল, “ভাইসাব, একটু দেরি কইরা ফেললাম।” এই বলে আমাকে নিয়ে কবরস্থানের একটু সামনে বসার মত একটা জায়গায় বসে পড়ল। কোন রকম ভূমিকা ছাড়াই সে তার কাহিনী শুরু করল…… (এখানে করিম মিয়ার ভাষায় আঞ্চলিকতা উহ্য রাখা হল) ___সেদিন ছিল পূর্ণিমা। চাঁদের পূর্ণ আলোয় সবকিছু পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। আমি আর আমার নিত্যদিনের সঙ্গী জহির মিলে একটা কবরে বেড়া লাগানোর কাজ শেষ করে বাসার দিকে রওনা হলাম। কবরস্থানের গেটের কাছে এসে দেখলাম দুইজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। তাদের পরনে সাদা পাঞ্জাবী, মুখে শুভ্র দাড়ি। তাদের হাতে একটা লাশ কাফনে মুড়িয়ে রাখা। দেখে বুঝলাম কোন বাচ্চার লাশ হবে। তারা বলল বাচ্চার লাশ দাফন করতে হবে। আমি বললাম লাশ দাফনের আগে স্থানীয় হুজুরের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়। আমি লোক দুজনকে দাঁড়াতে বললাম। হুজুরের বাসা একটু সামনেই। আমি আর জহির হুজুরের বাসার দিকে হাঁটা দিলাম। যাওয়ার সময় দেখেছিলাম লোক দুটি গেটের সামনেই দাঁড়িয়ে। হুজুরের সাথে কথা হল। তিনি আমাদেরকে তিনি আমাদেরকে কবরস্থানে গিয়ে দাঁড়াতে বললেন। তিনি কিছুক্ষণ পর এসে লোকগুলোর সাথে কথা বলবেন। তো আমরা আবার ফিরে চললাম। রাত তখন আরেকটু গভীর। চারপাশ চাঁদের আলোয় ভিন্ন অবয়ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা কবরস্থানের গেটের সামনে এসে দাঁড়ালাম। কিন্তু সেই দুই লোককে কোথাও দেখতে পেলাম না। একটু অবাক হলাম। জহির গেট খুলে কবরস্থানের ভিতর ঢুকল। আমি বাইরেই খুঁজতে লাগলাম তাদের। তাদের তো ভিতরে ঢুকার কথা নয় ! অনেক খুঁজেও না পেয়ে ধীর পায়ে কবরস্থানের ভিতরে ঢুকলাম। সেই সময় জহিরের বিকট চিৎকার শুনলাম। একটা চিৎকারই কানে আসল। দৌড়ে গেলাম চিৎকার লক্ষ্য করে। কিছুদূর যাওয়ার পর চোখের সামনে যে দৃশ্য দেখতে পেলাম, তাতে সর্বাঙ্গে কাঁপন ধরে গেল। সেই লোকদুটির হালকা অবয়ব চোখে পড়ছিল, তারা পেছন দিকে মুখ করে আছে। তাদের হাতে সেই বাচ্চার কাফনে মোড়ান লাশ। লাশের উপরের দিকে কাপড় ছিঁড়ে নেয়া হয়েছে। মাথাটা আলগে ধরে দুজনে মিলে গভীর আগ্রহে লাশটিকে নখ দিয়ে আঁচড়ে ক্ষত- বিক্ষত করছে। তাদের মুখ থেকে একধরণের জান্তব এবং উল্লাসিত গোঁ গোঁ জাতীয় আওয়াজ ভেসে আসছিল। একটু পাশেই পড়ে আছে জহিরের নিথর দেহ। প্রাণ আছে কিনা ঠিক বোঝা গেল না। এসব দৃশ্য আমার পক্ষে সহ্য করা সম্ভব হচ্ছিল না। অবস্থা এমন, যে অজ্ঞান হতেও ভুলে গেছি !! মনে হচ্ছিল দাঁড়িয়ে থেকেই মৃত্যু ঘটবে আমার ! আমার শ্বাস-প্রশ্বাসের গভীর আওয়াজে হঠাৎ সেই জন্তুগুলো ঘুরে তাকাল আমার দিকে। সে এক অদ্ভুত, ভয়ংকর চেহারা। ঘাড়ের উপর গোলাকার এক মাংসের স্তূপ। সেখানে চোখ, নাক, ঠোঁটের কোন অস্তিত্ব নেই। ঘাড়ের উপরে মাংসের পিণ্ডটি অনেকটা তরল জাতীয়, কেঁপে কেঁপে উঠছে ! তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল; চোখহীন অথচ ভয়ানক প্রখর সে দৃষ্টি, মুখে সূক্ষ্ম হাসির রেখা। আর সহ্য করা সম্ভব হল না। নিঃশব্দে লুটিয়ে পড়লাম মাটিতে। এরপর আর কিছু মনে নেই। জ্ঞান ফিরলে নিজেকে হাসপাতালে দেখতে পাই। আমাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন সেই হুজুর। জহিরকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। তাদেরকে আমি কিছু জানাই নি। শুধু বলেছি ভয়ংকর কিছু ঘটেছিল। হুজুর আর আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করেননি। এই ঘটনা আর কাউকে বলতে পারিনি। আজ আপনাকে বলে স্বস্তি পেলাম…… ঘটনা শুনতে শুনতে নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেছিলাম। বড় একটা নিঃশ্বাস নিয়ে বললাম, বড় অদ্ভুত কাহিনী। ঠিক বিশ্বাস হয় না ! করিম মিয়া হেসে উঠে বলল, না হইলেই ভালো। অনেক রাত হইছে, আপনার ফিরা উচিত। তার এ কথায় সম্বিত ফিরে পেলাম। আসলেই অনেক রাত। উঠে দাঁড়ালাম আমি; ফিরতে হবে। করিম মিয়া, যাই তাহলে। আপনার সাথে পরে একদিন এই বিষয়ে আরও কথা বলব। উঠে দাঁড়াতেই মোবাইল বেজে উঠল। অচেনা একটা নাম্বার থেকে কল। কল ধরতেই পরিচিত এক কণ্ঠ বলে উঠল, ভাইজান ! বড় বিপদে পইরা গেছি। আজকে আর আসতে পারলাম না ! ঘটনা হইছে কি…… ঘটনা কি, তা আর শোনা হল না। মোবাইল মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আমার বিস্ফোরিত চোখ করিম মিয়ার দিকে। করিম মিয়া ধীরে ধীরে মুখ তুলে আমার দিকে তাকাল। তার ঘাড়ের উপর মাংসের দলা কিলবিল করছে। মুখে অপার্থিব এক ব্যাঙ্গের হাসি, চোখহীন অথচ তীব্র এক দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে…!

টিউনারপেজের নতুন টিউন আপনাকে ইমেইল করব?
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting

11 মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here

16 − seven =