ইন্ট্রোডিউসিং ভার্চুয়াল রিয়েলিটি

0
113

শুক্রবার সকাল ১০টা। সাব্বিরের আজ কলেজ নেই। তাই বাসাতেই টাইম পাস করছে। একটু বাজার করার জন্য তাকে বাসার নিচে যেতে হবে, এটা বলার জন্য রান্নাঘর থেকে সাব্বিরের মা অনেকক্ষণ ধরে ডাকতে ডাকতে হয়রান। তবুও কোন রিপ্লাই নেই। তাই এবার উনি সাব্বিরের ঘরের সামনেই চলে এলেন। দেখলেন যে তার ছেলে বড় একটা বাক্সের মতো গগলস টাইপের কিছু একটা চোখের উপর বেধে রেখেছে। সাথে মাথায় হেডফোন। হয়তো ঘরের কিচ্ছু চোখে দেখতে পাচ্ছে না। অন্ধদের মতো বাতাসের মাঝে কিছু একটা স্পর্শ করার জন্য হাতের ভংগিমা দেখাচ্ছে। হায়হায়! ছেলে কি পাগল হয় গেলো নাকি? না, ব্যাপারটা আসলে একটি ইন্টারেস্টিং । এই জিনিসটাকে বলা হয় VR (ভি-আর), যার পূর্ণরূপ হচ্ছে Virtual Reality (ভার্চুয়াল রিয়েলিটি)।

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি বা VR হচ্ছে এক ধরণের সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রিত সিস্টেম যাতে মডেলিং ও অনুকরণবিদ্যার (Modeling and Simulation) প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষ কৃত্তিম ত্রিমাত্রিক ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য পরিবেশের সাথে সংযোগ স্থাপন বা উপলব্ধি করতে পারে। VR-এ আপনি যা দেখবেন ও অনুভব করবেন, তার পরিবেশ পুরোপুরি বাস্তব পৃথিবীর মতো হতে পারে, যা থেকে বাস্তব অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। আবার, VR-এ সিমুলেট করা পরিবেশ, যা অবাস্তব হলেও আপনাকে এমন অনুভূতিতে নিয়ে যাবে, যাতে মনে হবে যে সত্যিই আপনি সেই পরিবেশেরই একটা অংশ।

Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting

ইন্ট্রোডিউসিং ভার্চুয়াল রিয়েলিটি

VR-এ ব্যবহারকারী সম্পূর্নভাবে একটি কম্পিউটিং সিস্টেম নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে নিমজ্জিত হয়ে যায়। এর জন্য তাকে VR Compatible কিছু স্পেশাল ডিভাইস পরে নিতে হয়। যেমনঃ VR Headset, VR Gloves, VR Suit, Headphone ইত্যাদি। হেডসেটটি কিছুটা হেলমেডের মতো দেখতে, যেখানে একটি দ্বিপার্শীয় ত্রিমাত্রিক (Stereoscopic 3D) ডিসপ্লে দিয়ে ব্যবহারকারীকে একধরণের স্পেশাল ফরম্যাটের ইমেজ উপস্থাপন করা হয়। এই ইমেজ হতে পারে ছবি, ভিডিও বা অন্য যে কোন কিছু। সেই সাথে এই হেডসেটে থাকে একটি শক্তিশালি Gyroscope সেন্সর, যা দিয়ে ব্যবহারকারী যা দেখছে তার Speed ও Rotation স্বয়ংক্রিয়ভাবে কন্ট্রোল করা হয়। এজন্য ব্যবহারকারী তখন VR Image ছাড়া বাস্তব পৃথিবীর কিছুই দেখতে পায় না। সেই সাথে হেডফোনের অডিও তার VR অভিজ্ঞতাকে আরো বাস্তবে রূপ দেয়। এছাড়া Gloves স্পর্শের অনুভুতি প্রদান করে এবং Suit নিয়ন্ত্রন করে সম্পূর্ণ দেহের অনুভূতি ও তাপমাত্রা। তার মানে সব ইন্দ্রিয়কেই নিয়ন্ত্রন করা হচ্ছে VR দিয়ে। যদি বাস্তব পরিবেশ থেকে আপনার সব ইন্দ্রিয় বা অনুভূতিকেই অন্য একটি বাস্তবের মতো অবাস্তব পরিবেশে স্থাপন করা হয়, তখন এটা অনুভব করা কষ্ট হয়ে যাবে যে আপনি বাস্তব পরিবেশে নেই। এই কৃত্তিম অবাস্তব পরিবেশকে বলা হয় Telepresence.

VR প্রযুক্তি নিয়ে ১৯৫০ সালে সর্বপ্রথম ‘মর্টোন হিলিগ’ একজন লেখক তার লেখা “Experience Theatre” ডকুমেন্টরি তে কিছু কল্পনা প্রকাশ করেন। তিনি মোটেও এটা আশা করেননি যে এটা একদিন বাস্তবে সম্ভব হবে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে গবেষনা আর বেটা টেস্টিং এর পরে অবশেষে ২০১০ সালে সর্বপ্রথম একটি পূর্ণাংগ স্ট্যাবল VR সেট তৈরী করতে সক্ষম হয় ইউএসএ’র একটি প্রতিষ্ঠান ‘Oculus’। ২০১০ সাল মানে বোঝাই যাচ্ছে যে VR প্রযুক্তি এখনও অনেক বেশী নতুন। এতোটাই নতুন যে আমাদের দেশের ২.৫% মানুষও এই VR সম্পর্কে অবহিত না। ২০১০ এর পর থেকে আরো বহু কোম্পানি অনেক রকমের VR Set তৈরী করেছে এবং দিন দিন এর প্রযুক্তি আরো বেশী উন্নত হচ্ছে। কিন্তু সবথেকে বড় সমস্যা হলো, মূল্য। এগুলো একেকটি সেটের দাম অনেক বেশী, যা সাধারণ মানুষদের নাগালের বাইরে। একেকটি VR সেটের মূল্য ২ লাখ থেকে ১৬ লাখ এর মতো। আর VR এ ডিসপ্লে করার মতো ইমেজের’ও খুব অভাব রয়েছে। ইমেজ গুলোর দামও অনেক বেশী তাই কোন প্রোডাকশনও সেগুলো বানানোর প্রয়োজন মনে করে না। কিন্তু থেমে থাকে নি VR। দিন দিন এটা নিয়ে গবেষণা চলেই যাচ্ছে।

অতঃপর ২৫ জুন, ২০১৪ সালে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কোম্পানি Google উদ্ভাবন করলো এক অভাবনীয় ডিভাইস, যা VR প্রযুক্তিতে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। তারা এত দামী আর বড় VR সেট কে একদম বহনযোগ্য (Portable) করে তৈরি করেছে, যাতে এটি রাতারাতি সাধারণ মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে যায় আর সবাই VR এর অভিজ্ঞতা নিতে পারে। এই উদ্ভাবিত জিনিসটির নাম হচ্ছে Google Cardboard। মাত্র ৩৫০গ্রাম ওজনের এই জিনিসটিতে প্লাস্টিক পর্যন্তও ব্যবহার করা হয় নি। এটি শক্ত কাগজের তৈরি একটি গগলসের মতো যেখানে ২টি শক্তিশালি লেন্স লাগানো থাকে। পুরো কাঠামো আর লেন্স এমন ভাবে বসানো থাকে, যাতে ব্যবাহারকারী খুব সহজেই কোন ঝামেলা ছাড়াই এটা ব্যবহার করতে পারে। কার্ডবোর্ডে ফোন হোল্ডার নামের একটি বিশেষ জায়গা থাকে, যেখানে একটি অ্যান্ড্রয়েড বা অ্যাপল স্মার্টফোন রাখলে ‘Cardboard’ অ্যাপ্সের মাধ্যমে খুব সহজেই VR উপভোগ করা যায়। এখানে স্মার্টফোনের Gyroscope, Accelerometer ও Motion সেন্সর ৩টির কম্বিনেশনকে খুব দারুন ভাবে VR এর গতি নিয়ন্ত্রনের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। আর ফোনের ডিসপ্লে তে বিশেষ এক ফরম্যাটের ভিডিও বা ছবির মাধ্যমে VR Image উপস্থাপন করানো হয়। এই বিষেশ ফরম্যাটের ইমেজ কে 360VR বলা হয়। ইউটিউবে এখন 360VR ফরম্যাটের হাজার হাজার ভিডিও পাওয়া যায়, যা খুব সহজেই VR এর মাধ্যমে উপভোগ করা যায়। এখন এই Cardboard প্রযুক্তিকে অনুসরণ করে আরো অনেক VR সেট বের হয়েছে, যেমনঃ Google Cardboard V2, Samsung VR, Xiaomi VR, VR Box ইত্যাদি। এমনকি আমাদের দেশেও Walton VR তৈরি হচ্ছে। এই VR Set গুলোর দাম আমাদের দেশে ৩৫০ থেকে ১০০০ টাকার মধ্যেই পাওয়া যায়, যেখানে Google Cardboard এর দাম হচ্ছে সবথেকে কম।

ইন্ট্রোডিউসিং ভার্চুয়াল রিয়েলিটিইন্ট্রোডিউসিং ভার্চুয়াল রিয়েলিটি

VR এখনও নতুন একটি প্রযুক্তি। যুগের সাথে তাল মেলাতে আমাদের সবারই উচিত এই প্রযুক্তির সাথে পরিচিত হওয়া, VR কে চেনা। বর্তমান সময়ে ভার্চুয়াল রিয়ালিটি সবেমাত্র কুঁড়ি মেলতে শুরু করেছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে যে, আগামীতে প্রাত্যহিক জীবনে এর প্রচণ্ড প্রভাব পড়বে। আমি ভবিষ্যত জীবনে VR এর ৩টি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার তুলে ধরছি।

১. চিকিৎসাক্ষেত্রে ভার্চুয়াল রিয়ালিটি প্রয়োগ করে বিভিন্ন ধরনের ভুল ও ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। যেমন- সিম্যুলেটেড সার্জারির মাধ্যমে নতুন ডাক্তার ও মেডিকেল শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেয়া সম্ভব। আবার সিম্যুলেটেড রোগীর উপর নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি পরীক্ষামূলকভাবে চালানো সম্ভব।

২. সামরিক বাহিনীতে অনেক বছর যাবৎ মিলিটারি প্রশিক্ষণে ফ্লাইট সিম্যুলেটর এর আরও উন্নতি সাধন করা সম্ভব। এছাড়াও ভার্চুয়াল রিয়ালিটির মাধ্যমে সিম্যুলেটেড ওয়ার দ্বারা সৈন্যদের অনেক বেশি বাস্তব ও উন্নত প্রশিক্ষণ দেয়া যাবে।

৩. ব্যবসা বাণিজ্যেও ভার্চুয়াল রিয়ালিটি ব্যবহার করে তথ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও সহজ করা সম্ভব। ভার্চুয়াল রিয়ালিটি ব্যবহারকারীকে ফাইল কেবিনেট দিয়ে কম্পিউটার ডেস্কতটপে তথ্য খুঁজতে হবে না। ব্যবহারকারী নিজেই ফাইল ড্রয়ার খুলতে পারবে এবং নিজের হাতে ফাইলগুলো সাজাতে পারবে।

ইন্ট্রোডিউসিং ভার্চুয়াল রিয়েলিটি

Source:
https://en.wikipedia.org/wiki/Virtual_reality
Information & Communication Technology (11,12) by Proff. Muzibur Rahman
http://www.google.com/cardboard

লেখক
এস.এ. সাদিক
কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং,
৪র্থ সেমিস্টার, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

টিউনারপেজের নতুন টিউন আপনাকে ইমেইল করব?
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here

four × 5 =