বাংলা ব্লগ ও ব্লগিং এর অতিত বর্তমান ভবিষ্যৎ

0
305

আমাদের দেশে সীমিত পরিসরে জনপ্রিয়তা পেলেও ব্লগ বা ব্লগিং এখনো ব্যাপকভাবে পরিচিত কোনো শব্দ নয়। এর পেছনের কারণটি সহজেই অনুমান করা যায়। এদেশে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি আইটি শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে স্বল্প পরিসরে। যে অল্প মানুষের জানাশোনা আছে তাদের সবার ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ নেই। আবার ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ শুধু ইমেইল দেয়া-নেয়ার বাইরে কোনো কাজে অংশ নেন না। শিক্ষার্থীদের অনেকে শিক্ষা সংক্রান্ত খবর জোগাড় করার জন্য সীমিত আকারে ব্রাউজ করেন বটে কিন্তু ইন্টারনেটের ইন্টারএকটিভ কাজে সবাই অংশ নেন না। সবচেয়ে বড় সমস্যা ভাষাগত। বাংলা কম্পিউটিংয়ের বিকাশের ইতিহাস খুব দীর্ঘ নয়। আর এর পেছনে বড় সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতাও তেমন আসেনি। যা হয়েছে তা ওপেন সোর্স আন্দোলনের তরুণ নির্মাতাদের হাতেই হয়েছে।

বলা হয়ে থাকে, তথ্যপ্রযুক্তির আধুনিক যতো মাধ্যম তৈরি হয়েছে বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে ইন্টারনেট তাদের মধ্যে একদমই আলাদা। রেডিও, টেলিভিশন বা সংবাদপত্র মাধ্যমে শ্রোতা বা দর্শকরা শুধুই গ্রহীতা বা রিসিভার। একটি খবর বা অনুষ্ঠানের প্রতিক্রিয়া তারা জানাতে পারেন। কিন্তু সে কাজে সরাসরি ওই মাধ্যমটি ব্যবহার করতে পারেন না। তাদের চিঠি লিখতে হয় অথবা প্রতিবাদ জানাতে বা দ্বিমত প্রকাশ করতে সশরীরে হাজিরা দিতে হয় ওই মাধ্যমটির সম্প্রচার কেন্দ্রে। শুরুতে ইন্টারনেটেও ইউজার বা ব্যবহারকারীরা গ্রহীতার বাইরে কোনো ভূমিকা রাখতে পারতেন না। ব্যক্তিগতভাবে নিজের মত প্রকাশের জন্য আলাদা করে একটি ওয়েবসাইট খোলা ছিল কঠিন ব্যাপার। ওয়েবসাইটে মত প্রকাশ করে সেখানে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ আরো কঠিন কাজ। ওয়েবসাইটগুলো ছিল ব্যয়বহুল আর এটিতে কোনো লেখা প্রকাশ করার পদ্ধতি শিখতে রীতিমতো প্রোগামিংয়ের জ্ঞান দরকার হতো। ফলে, বড় প্রতিষ্ঠান বা প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি ছাড়া অন্য সাধারণ মানুষের ওয়েবসাইট ছিল খানিকটা কষ্টকল্পিত ব্যাপার।

Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting

এই কষ্টকল্পনাকে সুখকল্পনায় পরিণত করলো ব্লগ। শুরুতে এর নাম ছিল ওয়েবলগ। কাজ খানিকটা ব্যক্তিগত ডায়রির মতো। একে পরিচয় করিয়ে দেয়া হতো ব্যক্তিগত অনলাইন ডায়রি হিসেবে। এ ধরনের অনলাইন ডায়রির চল শুরু হয় ১৯৯৪-৯৫ সালে। ধীরে ধীরে এই অনলাইন ডায়রি বা ওয়েবলগের পরিধি বেড়ে গেলো। ওয়েবলগ নিজের ভারিক্কি নামটার খোলস পাল্ট নাম নিলো ব্লগ। ব্লগ একটি আলাদা ওয়েবসাইট হতে পারে, আবার অন্য ব্লগ প্রোভাইডার বা ব্লগ সেবাদানকারী ওয়েবসাইটের একটি স্বাধীন পেজ বা অংশ হতে পারে। আকারে বা গঠনে যাই হোক এর অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য ইন্টারএকটিভিটি বা মতামত আদান-প্রদানের সুযোগ। কঠিন বাংলায় যাকে বলা যায় মিথষ্ক্রিয়া।

ব্লগ শব্দটি দিয়ে ডায়রি লেখার ভার্চুয়াল স্পেসটিকে বোঝায়। আবার ব্লগ দেখভাল করাকেও ব্লগ বলা হয়। সেক্ষেত্রে এটি ক্রিয়াপদ। এখন এ কাজটি ব্যাপকভাবে ব্লগিং হিসেবে পরিচিত। আর যার নিজের এক বা একধিক ব্লগ আছে তাকে বলা হয় ব্লগার। একটি ব্লগ একজনের বেশি মানুষ ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু সাধারণভাবে একটি ব্লগ একজনই ব্যবহার করেন। খুব সহজে বিনা পয়সায় ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই ব্লগ খোলা যায়। ইমেইল ব্যবহারের মতো সহজ ব্লগের ব্যবহার।

সারা বিশ্বে ব্লগারের মোট সংখ্যাটা অনেক বড়। এই কমিউনিটির অধিকাংশই তরুণ ও প্রযুক্তি বিষয়ে অভিজ্ঞ। সামাজিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগে সক্রিয়। আজ হয়তো এখনো এই কমিউনিটিকে ছোট বলে বিবেচনা করার অবকাশ থেকে যাচ্ছে, কিন্তু আগামী দিনের পৃথিবীতে এরাই প্রধান কণ্ঠস্বর হিসেবে বিবেচিত হবে। আমাদের দেশেও ব্লগ এখন গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রথম আলো ব্লগের মাধ্যমে প্রথম কোনো বড় মিডিয়া ব্লগকে নাগরিক মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি দিলো। আমেরিকা বা ইউরোপের অধিকাংশ পত্রিকার ওয়েবসাইট খুব যতেœর সঙ্গে ব্লগিংয়ের সুবিধা যোগ করছে। পত্রিকা ভেদে এই সুবিধা ব্যবহার করে কন্ট্রিবিউটর, সাংবাদিক, পাঠক এতে ব্লগিং করতে পারেন। ব্লগ অপশন চালু করে তারা পত্রিকাকে আরো ইন্টারএকটিভ হিসেবে প্রস্তুত করেছে। স্বভাবের দিক থেকে প্রথম আলো ব্লগ একটি কমিউনিটি ব্লগ। অনেক মানুষ শুধু এখানে ব্লগিং করছেন না। তারা পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগও করছেন। ফলে গোষ্ঠীবদ্ধতার সূত্রগুলো এর জন্য বিশেষভাবে প্রযোজ্য।

নিজের নামে পছন্দসই একটা ব্লগ খোলা সহজ কাজ। কিন্তু ব্লগিং ব্যাপারটিকে কার্যকর করতে হলে ব্লগের কিছু নিয়ম-কানুন, সামাজিকতা মেনে চলতে হয়। একথা ঠিক, ব্লগিং এমন একটি মুক্ত পৃথিবীর সন্ধান দিয়েছে যেখানে আইন-কানুন বা সেন্সরশিপের প্রয়োগ ঘটানো খুবই কঠিন। ফলে ব্লগাররা স্বাধীনভাবে তাদের মতপ্রকাশ করেন। স্বাধীনভাবে মত গড়েও তুলতে পারেন। তারপরও ব্লগাররা যাতে মোটামুটি একটা নিয়মের মধ্যে থাকেন এজন্য প্রত্যেক ব্লগের একটা নিজস্ব নীতিমালা থাকে। কোনো বিশেষ ব্লগে রেজিস্ট্রেশন বা সাইন আপ করার আগে নীতিমালাটি পড়ে নেয়া ভালো। এ নীতিমালা মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে খুব বেশি সমস্যা তৈরি করে না। বরং অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে ভিন্নমতাবলম্বীদের সাদরেই সহব্লগাররা সমর্থন করেন আবার মত গঠনের ক্ষেত্রেও তাকে সহায়তা দেন।

এসব নিয়ম-কানুনের বাইরে কিছু সামাজিকতা ও আচার মানতে হয় ব্লগারদের। এগুলো ঠিক নিয়ম নয়, কিন্তু এগুলো ব্লগিংয়ের জন্য জরুরি। ব্লগকে জনপ্রিয় করার জন্য দরকারি। যেমন, ব্লগিং শুরু করার পর পাঠক টানতে হবে ব্লগের দিকে। যিনি ব্লগিং শুরুর আগে থেকেই সেলিব্রেটি তাকে হয়তো পাঠক বা ভিজিটর নিয়ে ভাবতে হয় না। কোনোভাবে ব্লগের ঠিকানাটা জানালেই সেখানে ভক্তরা ভিড় জমায়। কিন্তু যারা সাধারণ ব্লগার তাদের জন্য নিজের ব্লগের সামাজিকায়ন জরুরি। সামাজিকায়নের বড় একটি উপায় অন্যদের ব্লগ ভিজিট করা। সমমনা ব্লগারদের খুঁজে বের করা। তাদের ব্লগে মন্তব্য করা। এভাবে একটা নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে।

অনেক ব্লগ আছে যেখানে ভিজিটর বা পাঠক আসে না। তাদের ব্লগে কেউ মন্তব্যও করে না। কেউ যদি হাজার হাজার ব্লগারের মধ্য থেকে বেরিয়ে ভাগ্যবান কয়েক শতের মধ্যে আসতে চান তবে তাকে উদ্যোগ নিতে হবে। এই কয়েক হাজার ব্লগই পাঠকরা নিয়মিত পড়ে এবং মন্তব্য করে। এই দলে আসতে হলে সহজ কিছু বিষয় মাথায় রাখলেই চলবে। ওয়ার্ডপ্রেস কিছু পরামর্শ দেয় তাদের ব্লগারদের উদ্দেশে। তেমন কিছু পরামর্শ এখানে তুলে ধরা হলো

ক. নিয়মিত পোস্ট দিন (ব্লগে লিখুন), কিন্তু মূল্যবান কিছু যদি বলার না থাকে তবে লেখার দরকার নেই।

খ. লেখার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের দিকে মনোযোগ দিন।

গ. বিষয় স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন থিম ব্যবহার করুন।

ঘ. উপভোগ করুন। কারণ আনন্দের জন্যই ব্লগ। অন্যদের ব্লগ ভ্রমণ করুন। যাতে তারাও আপনার ব্লগে আসতে পারে সে জন্য মন্তব্য করুন।

টিউনারপেজের নতুন টিউন আপনাকে ইমেইল করব?
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here

2 × one =