জীবিতজন (পর্ব ১):শোভন মুহাম্মাদ

1
550

alone জীবিতজন (পর্ব ১):শোভন মুহাম্মাদ

ছেলেটা ক্লান্ত হয়ে ঘাড় থেকে নামিয়ে রাখলো বস্তাটা। প্রচন্ড খাটনি হচ্ছে। গরমে ও অস্থির অবস্থা। এত গরম আগে কখনো খেয়াল করেছে কিনা মনে পড়ছে না তার। হয়তো অতিরিক্ত খাটনির কারনে গরমটা বেশী মনে হচ্ছে। ছেলেটা বস্তাটার দিকে তাকালো। ওটার ভিতরে একটা মেয়ে। বয়সে তার চেয়ে বড় হতে পারে। ওজন তো বেশীই। হয়তো আসলে কম, কিন্তু তার ভার বহনে অভ্যাস নেই তার ওজন বেশী লাগছে হয়তো। ছেলেটা বস্তার মুখটা একটু খুলে দিল। আগুনে ঝলসে বিভৎস হয়ে আছে মুখ। সেদিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো ছেলেটি। চোখ সরিয়ে উঠে দাড়ালো, দিগন্তের দিকে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষন। শহরটা কতো দূরে। বিশ্রাম নেয়া দরকার। অথচ তার হাতে সময় নেই। সাতদিনের ভিতর শহরে পৌছাতেই হবে। অথচ চারদিন হয়ে গেল প্রায়, শহরের দেখা নেই।

Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting

“তুমি আমাকে বাঁচাতে পারবেনা”

গলার আওয়াজ শুনে ভয়ানক চমকে উঠলো ছেলেটি। অবাক হয়ে দেখল কথা বলছে মেয়েটা। দেখার পর থেকে এই প্রথম কথা বললো। আহ্ মানুষের কন্ঠে কথা! জীবিত মানুষের মুখে কথা! এত মিষ্টি লাগবে ভাবে নি। কি বললো মেয়েটা? খেয়াল করা হয়নি।

“কি বলছ?”

“খামোখা খাঁটনি করছো। আমি বাঁচবোনা”

“অবশ্যই বাঁচবে। ” ছেলেটা ঝুঁকে পড়ে বস্তার এদিক সেদিকে দেখতে বললো,

“বাঁচতেই হবে। ”

“আমার বাঁচার কোন আশাই নেই। বরং বাড়তি খাঁটনি করে তুমি মারা যাবে। ”

“তোমাকে মরতে দিচ্ছিনা। পৃথিবীতে আর কোন মানুষ বেঁচে আছে কিনা কে জানে। তোমাকে মরতে দেয়া যায়না। ”

“মানুষ আছে। আর তাদের জন্যই আমার এ অবস্থা। ”

এমন আশংকাই করেছিলো ছেলেটি। মনটা খারাপ হয়ে গেল তার।

“কি হয়েছিল?”

“চার-পাচঁজন মানুষ। দেখতে ভাল মনে হয়নি আমার। ওড়া তাড়া করছিল। অনেকদিন ধরে। শেষ পর্যন্ত ধরা দেইনি দেখে বোমা ছুড়ে মারলো। ”

মন খারাপ হয়ে গেল ছেলেটির। মেয়েটিকে কি সান্তনা দেবে ভেবে পেলনা। চুপ হয়ে থাকলো অনেক্ষন। তারপর ঢোক গিলে বললো।
“আসলে মানসিক ভাবে অসুস্থ ছিল ওরা। ওদের কথা বাদ দাও। তোমার নাম বলো?”

“নাম বলে কি হবে? পরিচয় না হওয়াই ভাল।”

“কেন?”

“খামোকা কষ্ট পাবে তুমি। আমার অবস্থা যথেষ্ট খারাপ, আমি বুঝতে পারছি।”

ছেলেটা হাসলো একটু, “কোন খারাপ অবস্থা নাই তোমার। এইটা আসলে একটা লাইফ সাপোর্ট ব্যাগ। তোমার সারা শরীরে নার্বোটরিয়ান দেয়া হয়েছে। আল্লাহর দয়া জিনিসটা আমার সাথেই ছিল। তোমার শরীর সাড়ছে ধীরে ধীরে। তবে এটা সত্যি যে খুব দ্রুত তোমাকে কোন ভালো হাসপাতালে পৌছানো দরকার, যেটা এখন সম্পূর্ণ অসম্ভব। ”

“আমিও জানি পায়ে হেটেই এটা পুরোপুরি অসম্ভব। তারউপর কাধে আমার মতো ভারী বোঝা! এটা অসম্ভব।”

“আসলে শহরটা অনেক দূরে।”

“এর আগেও অনেকে মারা গেছে শহরটাতে পৌছাতে যেয়ে। তুমি কখনই এটা পারবেনা। ”

লোকেরা কেন মারা গেছে জানে ছেলেটি। কিন্তু বললো না। বরংচ জোরের সাথে উত্তর দিলো,
“যাই হোক আমি থামছি না। সম্ভবত, আমরা দুজনেই মারা যাবো এভাবে। কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না?”

“আসে যায়না কেন? আমি তো তোমার কেউ নই।”

“কেউ হবার দরকার নেই। আমার এভাবে বাঁচতে আর ভাল লাগছে না। তোমাকে বাচাঁতে না পারলে আবার একা হয়ে যাবো। নিঃসঙ্গতা আর উপভোগ করতে পারছিনা। ”

মেয়েটা সাবধানে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। চুপ থেকে কিছুক্ষন আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো। মেঘগুলো অনেক সুন্দর লাগছে তার।

“নিঃসঙ্গতার ব্যাপারটা আমি জানি। কিন্তু দুজনে মারা যেয়ে লাভটা কি? তুমি বেঁচে থাকো। হয়তো বা নিঃসঙ্গতা কেঁটে যাবে তোমার। মানুষ আরো আছে তাতো বললামই তোমাকে। বাঁচলে সঙ্গী পাবেই। ”

“যদি না পাই? আমার আর ভাল লাগছে না। দু বছর সম্পূর্ণ একা একা আছি আমি। এতদিন একটা মানুষও আমি দেখিনি। অবশ্য আমার নিজের ছেলেটার কথা আলাদা। ”

অবাক হল মেয়েটি, “তোমার ছেলে? বয়স কতো তোমার? ও বুঝেছি কুঁড়িয়ে পেয়েছ। ”
“কুঁড়িয়ে বাচ্চা পাবার মতো পরিবেশই এখন পৃথিবীতে তাইনা? রাস্তায় রাস্তায় শিশুরা গড়াগড়ি খায়! ওটা আমার বাচ্চা।”

“যাহ-”

“কি যাহ? আমার বয়স ১৭ বছর। বাবা আরো আগে বিয়ে দিয়েছিল আমার। পুরোন আমলের মানুষ কিনা! ”

“ও তাই বলো। এখান থেকে দেখতে আরো কম মনে হচ্ছিলো। ”

“তাই হবার কথা। তোমার বয়স কতো?”

“১৩। বাজে একটা সংখ্যা তাইনা। প্রমান হিসেবে দেখো আমি মরতে বসেছি। ”

“১৩? আমি তো ভেবেছিলাম অন্তত ১৯ হবে। ওজন বেশী লাগছিলো।”
বলতে গিয়ে জিভ কাটলো।
“ওজন বেশীই আমার। তুমি আর পাগলামো কোরোনা। এভাবে কিছুতেই নিতে পারবে না আমাকে। ছেড়ে দাও। নিজে বাঁচ।”
“হুমম, আমি বাঁচি আর তুমি অসহায় ভাবে মানুষের শুধু খারাপ দিকটা দেখে মারা যাও। তোমার জন্য যদি এখন মারা যাই তাহলে মানুষের ইজ্জত বাঁচে। তুমিই বলো মানুষের প্রতি তোমার ধারণা খারাপ না?”

মেয়েটা সে কথার জবাব দিলো না। বললো,

“বাচ্চাটার জন্য বাঁচ?”

“ তা আমি বেঁচেই আছি। কিন্তু মানুষের বাঁচার মতো পরিবেশ না এটা। চরম অনিশ্চিত জীবন। বাচ্চাটাকে কিছুই দিতে পারছিনা আমি। ওর একটা মা দরকার, খেলা ধুলার জন্য সাথী এবং বয়স হলে সঙ্গিনী। কিছুই কি দিতে পারবো আমি ওকে?”

 

উত্তর চায়নি ছেলেটা। মেয়েটা চুপ থাকলো। ছেলেটা কিছুক্ষন চুপ থেকে উঠে দাড়ালো,

“বিদঘুটে ভয়ংকর একটা ভবিষ্যত হতে যাচ্ছে ওর। পশুর মতো জীবন। তাই আমাদের বাচাঁ না বাঁচায় খুব বেশী কিছু আসে যায়না।”

“তুমি পাগল! ওদের মতই বদ্ধ উম্মাদ তুমি। একটা বাচ্চার জীবনের প্রশ্ন এটা আর তুমি কি হাবিজাবি বলছ! ”

“পাগল হতে পারি। বহু দিন নিঃসঙ্গ দিন কেটেছে আমার। ছেলেটাকে শীতল কক্ষে আটকে রেখেছিলাম ভাইরাসের ভয়ে। সম্পূর্ণ একা ছিলাম তখন। দুঃস্বপ্ন দেখতাম প্রতিদিন। পাগল হয়ে যেতে ও পারি। ”

“ছেলেটাকে এখন কোথায় রেখে এসেছ?”

“সেখানেই যাচ্ছি আমরা। একটা নার্সিং হোম। ”

“একা একা আছে কিভাবে ওইটুকু বাঁচ্চা। দুবছর বয়স বললে না?”

“ও একা একা থাকতে পারে। ট্রেনিং দেয়া আছে। কখন কি মরে টরে যাই তাই শিখিয়ে রেখেছি আগে থেকেই। তাছাড়া ওইটা একটা স্বয়ংক্রিয় চেম্বার। ও নিয়ে কোন ভয় নেই। ”

টিউনারপেজের নতুন টিউন আপনাকে ইমেইল করব?
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting

1 মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here

1 × 4 =