ডলার প্রতারনা চক্রের কবলে ফ্রিলান্সিং !

1
343
চিত্র ১: ফেইসবুকে লোভনীয় বিজ্ঞাপন

আকাশ ইসলাম: “পেপাল, ওয়েবমানি, মানিবুকারস সহ যে কোন অনলাইন একাউন্টের জন্য ডলার কিনুন মাত্র ৭৪ টাকায়। ” লোভনীয় বিজ্ঞাপন। অতঃপর সেখানে দেয়া মোবাইল নম্বরে ফোন। আলাপচারিতা। এর পর ডলার অনুযায়ী টাকা প্রদান। বিনিময়ে প্রতারনা। ডলারতো দুরের কথা মোবাইলে কল রিসিফ করছে না ডলার বিক্রেতা।

ঘটনাটি সোমবার দুপুরের। সোহাগ তার ব্যক্তিগত ডোমেইন হোষ্টিং ব্যবসার জন্য জরুরি প্রয়োজন কিছু ডলার প্রয়োজন ছিল তার পেপাল একাউন্টের জন্য। এজন্য গুগলে সার্চ দিয়ে দেখল কারা ডলার বিক্রয় করছে। এভাবে পেয়েও গেল একজনকে। তার সাথে মোবাইলে পরিচয় এর পর স্কাইপিতে কথোপকথোন। বিস্তত হবার পর ডলার বিক্রেতার বিকাশ নাম্বারে টাকাও পাঠিয়ে দিল সে। এর পর শুধুই অপেক্ষা। কিছুক্ষন পর ডলার বিক্রেতা নিজেই ফোন করে বলল এই মুহুর্তে ৫০ ডলারের নিচে পাঠানো যাচ্ছে না। আপনি ইচ্ছে করলে টাকাটা ফেরত নিতে পারেন। এর পর টাকা ফেরত চাইল। বলল কিছুক্ষনের মধ্যে আপনার নাম্বারে টাকা ফেরত যাচ্ছে। এবারে কয়েক ঘন্টা অপেক্ষা। ফোন, এসএমএস কিছুই বাদ রইল না। বুঝতে পারল ফাঁদে পা দিয়েছে। রোজার মাসে এমন একটি প্রতারনা ফাঁদে পরবে বুঝতেও পারেনি সোহাগ।

Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting

যে কারনে বা যাদের ডলার প্রয়োজন হয়: যারা Free Launching, Odesk, বিভিন্ন PTCসাইট, ফরেক্স ট্রেড, Affiliate Marketing সহ অনলাইনে যারা টুকটাক কাজ করে থাকেন। তাদের প্রায় Liberty Reserve, Paypal, Payza, Moneybookers এর মাধ্যমে Dollar বেচাকিনা করতে হয়।বাংলাদেশে যেহুতু এইগুলো থেকে টাকা তোলা ও লোড দেয়া সময় ও ব্যায় সাপেক্ষ তাই অনেকে আমরা নিজেদের মধ্যে লেন দেন করেন। এভাবেই আমরা প্রতারকের খপ্পরে পরি।

যেভাবে প্রতারিত হওয়া: যারা অনলাইনে ফরেক্স, ইনভেস্টমেন্ট কিংবা আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে আয় করি তারা সবাই কম-বেশি অনলাইন ডলার ক্রয় বা বিক্রয় করি বিভিন্ন প্রয়োজনে। আর এ জন্য তারা সাহায্য নেয় বিভিন্ন অনলাইন ট্রান্সফার মাধ্যমের। যেমন- পাইজা (অ্যালার্টপে), পেপাল, লিবার্টি রিজার্ভ, মানি বুকার্স, পারফেক্ট মানি ইত্যাদি। যদিও পাইজা (অ্যালার্টপে) এবং পে-পালই ই আমাদের কাছে সুপরিচিত এবং এর লেন-দেন ই বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি। আর এরই সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু লোক শুরু করেছে এক অভিনব দুর্নীতি। তারা নগদ মূল্যে ডলার বিক্রি করে কিন্তু কিছুক্ষণ পরই তারা আবার বিক্রিত ডলার ফেরত নিয়ে যায় রিভার্স অপশন ব্যবহার করে এবং আবার তারা ওই ডলার বিক্রি করে। মানে তার ডলার তারই থেকে যায় মাঝখান থেকে আমাদের টাকা তাদের পকেটে আর আমরা বসি পথে। আর এভাবেই তারা হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

প্রতারক সরিফুল ইসলাম সম্রাট

শুরুটা হয় আপনি যখন ডলার বিক্রেতাকে কল দিবেন সে আপনাকে বলবে পেইমেন্ট সেন্ড করতে। তারা এ ক্ষেত্রে বিকাশ, ব্রাক ব্যাংকের অনলাইন ব্যাংকিং বেশি ব্যবহার করে। বেশির ভাগ ক্রেতাই বিকাশে লেনদেন বেশি পছন্দ করে। এ জন্যই প্রতারক চক্র এই সুযোগটাকেই বেশি কাজে লাগায়। বিকাশে টাকা পাঠানো পর ডলার বিক্রেতাকে কল করে আর পাওয়া যায়না বা কল রিসিফ করে না। অনেক ক্ষেত্রে সিম পরিবর্তন করে ফেলে। ক্রেতা একটু চালাক হলে বিশ্বস্ততা অর্জন করতে নানা রকম ভুল তথ্য উপস্থাপন করে।

অনুসন্ধানে বের হয়ে আসল এক প্রতারকের পরিচয়: উপরে বর্নিত সোহাগ চরিত্রটি একটি বাস্তব ভিত্তি। প্রতারিত হয়ে নিজেই অনুসন্ধানী হয়ে উঠে এ ক্ষেত্রে সাহায্য করে বিডি টুয়েন্টিফোর লাইভ ডট কমের আইটি টিম। প্রথমে চলুন বিজ্ঞাপনটি দেখে আসি।

চিত্র ১: স্ক্রিন সটটি লক্ষ করুন অথবা লিংটিতে ক্লিক করুন। প্রতারক চক্র একটি ফেইসবুক গ্রুপ তৈরি করেছে যেখানে ডলার বেচা কেনার জন্য নিজেরাই বিজ্ঞাপন দেয়। সেরকই একটি বিজ্ঞাপনে ডলারের দাম সহ পোষ্ট করা হয়েছে। এবং নিচে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে একটি মোবাইল নম্বর দেয়া হয়। সাথে রয়েছে একটি স্কাইপি আইডি।

চিত্র ২: নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় উপস্থাপনের চেষ্টা

চিত্র ২: বিকাশে টাকা পাঠানোর পর বিক্রেতা আর ফোন রিসিভ করেনি। সেক্ষেত্রে তার মোবাইল নম্বরটি অনুসন্ধানে ব্যবহার করা যেতে পারে। চলুন দেখি গুগলে সার্চ দিলে এই নম্বরটির (০১৭৫০২৬৯১৫১) অবস্থান কি। এখানে আমরা প্রথম দিকে অনেকগুলো ফেইসবুক গ্রপ/পেইজে বিজ্ঞাপনের লিংক পাবো। একটু নিচের দিকে গেলে একটি লিংক পাব যাতে ক্লিক করলে জার্নাল প্রোফাইল নাকে একটি পাতা দেখতে পাবেন। যেখানে তার নাম সরিফুল ইসলাম সম্রাট হিসেবে অন্তভূক্ত আছে। সেখানে যে নিজের দুটো মোবাইল নম্বর দিয়ে বিজ্ঞাপন প্রদান করেছে। এবং সেখানে তার ছবিও রয়েছে। এবার চলুন সেখানে পাওয়া নামটা গুগলে সার্চ দেই। প্রথমেই তার একটি কিউপ নামের সোর্সাল সাইটে প্রোফাইল পাবো। সেখানে সে তার নাম সরিফুল ইসলাম স¤্রাট দেয়া আছে এবং ঠিকানা হিসেবে কিশোগঞ্জ বাংলাদেশ দেয়া আছে। বয়স ২৪ দেয়া আছে। প্রোফাইল ছবিটি দেখে রাখুন। এর পর চলুন পরের লিংকটি দেখি। এখানে সে বরবধু নামের একটি ওয়েব সাইটে নিজের বৃত্তান্ত বর্ননা করেছে এবং ছবিও দিয়ে রেখেছে। সেখানে দেয়া ছবিটি এবং কিউপ ওয়েবে দেয়া ছবিটি একই। এখানে প্রতারক তার ঠিকানা দিয়েছে গ্রাম/সিটি: পাকুনদিয়া, জেলা: কিশোরগঞ্জ। এখানে শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে মাষ্টার্স পাস দেখিয়েছে। এবং নিজের কর্মস্থানে লেকচারার হিসেবে পরিচয় দিয়েছে।

পাঠকদের মনে প্রশ্ন আসতে পারে এখানেতো তার মোবাইল নম্বর নাই তাহলে কিভাবে নিশ্চিত যে এটা ঐ মোবাইল ব্যবহার কারির প্রোফাইল। পূর্বের কিউপ লিংকা লক্ষ্য করুন সেখানে তার নাম এবং ছবিটি এই ছবি এবং নামের হুবহু দেয়া আছে। এবং নিজের জেলার নামটিও ঠিক দেয়া আছে। শেষ লগইন করেছে গত বছরের জুন মাসে ১৫ তারিখে। এবারে চলুন তার ফেইসবুক প্রোফাইলটি দেখি। সেখানে তার নাম এবং ছবির সাথে আমাদের আগে প্রাপ্ত ছবিগুলোর সম্পূর্ণ মিল আছে। ফেইসবুক প্রোফাইলের তথ্য অনুযায়ী সে ২০০৪ সালে প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে অনার্স পাস করে। এখানেও সে হোম টাইন কিশোগঞ্জ উল্লেখ করেছে।

নিজেকে পির হিসেবে উপস্থাপন: প্রতারককে খুজতে গিয়ে আরো কিছু তথ্য আমাদের কাছে আসে। নিজেকে পির এ কামেল হিসেবে প্রকাশ করে সে।

ভুক্তোভোগীদের কথা: এই ব্যক্তির প্রতারনা ফাঁদে পা দিয়েছে এমন কয়েকজনের সাথে কথা হয়। এমনই একজন রিফাত যার কাছ থেকে প্রতারনা করে হাতিয়ে নেয়া হয় ডলার। রিফাত বলে এরকম প্রতারক চক্র বাংলাদেশে আরো বিদ্যমান। যাদের কারনে প্রতিনিয়ত ফ্রিলান্সিং কাজে আগ্রহ হারাচ্ছে অনেকেই।

চিত্র ৩: কিউপ নামের একটি ওয়েবে নিজের পরিচয় উপস্থাপন

যা করতে পারে গ্রাহকরা: দেশে প্রতিনিয়ত ফ্রিলান্সিং এর কাজের পরিধি বারছে। কিন্তু পেমেন্ট গ্রহনের ক্ষেত্রে দেখা যায় যত জটিলতা। বাংলাদেশে কোন অনলাইন পেমেন্ট সুবিধা না থাকায় খুব সহজেই প্রতরনা স্বীকার হয় গ্রাহকরা। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা টাকা লেনদেনের জন্য ব্যাংক, ভিসা কার্ড, মাষ্টার কার্ড ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন। অপরিচিত কারো সাথে নিষেধও করেছেন তারা।

ধরুন আপনি Dollar Sell করবেন। বিভিন্ন জায়গায় অনলাইনে এড দিলেন। অবশেষে ত্রেতাও পেলেন। চ্যাট হল, ফোনে কথাও হল। আপনার বিশ্বাস হল। Dollar পাঠিয়ে দিলেন। আশায় আছেন টাকা আসবে। কিন্তু এল না। এটা কমন প্রতারণা। এখানে লক্ষনীয় প্রতি ৫ টা প্রতারণার ৩ তাই এই টাইপের।

ধরুন কারও সাথে আপনি ১০০ ডলার বাই করবেন বলে ঠিক করলেন। কিন্তু আপনি তাকে বিশ্বাস করতে পারছেন না।সে বলল “বিশ্বাস না করলে আপনি আগে ২০ ডলার এর টাকা পাঠান আমি আপনাকে ডলার সাথে সাথে পাঠাচ্ছি।আপনার দরকার টা বেশি বলে আপনি পাঠাবেন এবং সাথে সাথে ডলারও পেয়েও যাবেন। বিশ্বাস অর্জন হল ,বাকি ৮০ ডলার এর টাকাও পাঠিয়ে দিলেন। অতঃপর খেলেন ধরা। ১০০ ডলার এর টাকায় কিনলেন ২০ ডলার ।

আমাদের প্রতিবেদনের প্রথমে যে ব্যক্তির কথা বলা হয়েছিল সে জানিয়েছে যে সে আইনের আশ্রয় নিবে এবং এই প্রতারককে আইনের আওতায় আনবে। যদিও থানায় গিয়ে পুলিশকে এসব বলার পর তারা কিছুই বুঝেনি। এ জন্য প্রয়োজন পুলিশের আধুনিকায়ন। প্রতিবেদনটি এখানে প্রকাশিত হয়েছে

টিউনারপেজের নতুন টিউন আপনাকে ইমেইল করব?
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting

1 মন্তব্য

মন্তব্য দিন আপনার