রোজার শিক্ষা ও সহমর্মিতার সমাজ

2
362

মানুষের জীবনে রয়েছে সীমাহীন চাহিদা, কিন্তু পৃথিবীর কোনো মানুষই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। নিজের জীবনের সব প্রয়োজন নিজেই পূরণ করবে, এমন সামর্থ্য পৃথিবীর কারো নেই। নিজের প্রয়োজনে তাই মানুষকে ছুটে যেতে হয় অন্যের কাছে। আবার অন্যের প্রয়োজন পূরণে নিজেকে নিবেদন করতে হয়। জীবনের সীমাহীন চাহিদা থেকেই সামাজিক বন্ধনের সৃষ্টি। তাই সামাজিক শান্তি আর শৃঙ্খলার জন্য সহমর্মিতা সব থেকে বড় উপাদান। সহমর্মিতা না থাকলে সামাজিক বন্ধন শিথিল হয়ে পড়বে, জীবনযাত্রা বাধাগ্রস্ত হবে। আর তাই প্রতিটি মুমিনকে সহমর্মিতায় উদ্বুদ্ধ করতে মহান আল্লাহ রোজার বিধান অপরিহার্য করে দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (স.) একবার শাবান মাসের শেষ দিনে সাহাবায়ে কেরামের সমাবেশে মাহে রমজান সমপর্কে এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দান করেন। ভাষণের একপর্যায়ে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘হুয়া শাহরুল মুওয়াসাতি’ অর্থাৎ রমজান হলো সহমর্মিতার মাস। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বক্তব্যে এ বিষয়টি স্পষ্ট, রমজান মাসের রোজার অনুশীলনের মাধ্যমে প্রতিটি মুমিনের হৃদয় সহমর্মিতার মহৎ গুণে পূর্ণ হয়ে ওঠে। আর সহমর্মিতার মাধমে মুসলিম সমাজ আত্মার বন্ধনে সুদৃঢ় ও শান্তিপূর্ণ হবে। এ উদ্দেশ্যেই মাহে রমজানের রোজাকে ফরজ করা হয়েছে। যেমনটি রাসুলের বাণীতে বিধৃত হয়েছে, হজরত আবু মুসা আশআরী (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা.) বলেছেন, একজন মুমিন অন্য মুমিনের জন্য একটি প্রাচীর সাদৃশ, যার এক অংশ অন্য অংশকে শক্তি দান করে। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর দুই হাতের আঙুলগুলো পরস্পর মিলিয়ে দেখালেন। (বোখারি ও মুসলিম) হজরত নুমান বিন বাশির (রা.) হতে বর্ণিত, এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সব মুমিনের অবস্থান হবে অভিন্ন, একটি শরীরের মতো। যদি তার চোখ ব্যথাতুর হয় তাহলে গোটা শরীর সে ব্যথা অনুভব করবে, যদি তার মাথায় ব্যথা পায় তাহলে সারা শরীর সে ব্যথা অনুভব করবে।’ (মুসলিম) উপরের দুটি হাদিসে বর্ণিত স্বরূপে সহমর্মিতার বন্ধনে একটি আদর্শ ও সাম্যপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য মহান আল্লাহ রোজাকে ফরজ করেছেন।
মানুষের জীবনে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অর্থ, অর্থ ছাড়া জীবনের কোনো কাজই সম্ভব নয়। এমনকি ইবাদত-বন্দেগিতেও অর্থের প্রয়োজন। মহান আল্লাহ পৃথিবীতে যত মানুষ পাঠিয়েছেন, সবার জীবন স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণভাবে চলতে পারে তেমন সম্পদও আল্লাহ পৃথিবীতে দিয়েছেন। কিন্তু সম্পদ এমনিতেই কারো অধিকারে আসে না। সম্পদ অর্জন করতে হয়। উপার্জন করতে হয়। তাই যোগ্যতার ব্যবধানে কেউ বিশাল বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়ে ওঠে। আবার কেউ দারিদ্র্যক্লিষ্ট জীবনে অসহায়, বেদনাবিভোর। মুসলিম সমাজে সামাজিক অবস্থান যেন মধুময় হয়, মানুষে মানুষে বৈষম্য যেন সামাজিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে না ওঠে, সেটাই ইসলামী অনুশাসনের মূল লক্ষ্য। সব মুসলমান রমজান মাসে রোজা রাখবে। আর রোজার অনুশীলনের মাধ্যমে দারিদ্র্যপীড়িত মানুষগুলো তাদের জীবনযন্ত্রণার মাহাত্ম উপলব্ধি করে সবর করবে। কারণ রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ক্ষুধা-তৃষ্ণার দ্বারা জান্নাতের কড়া নাড়লে, তার দরজা খুলে দেওয়া হবে।’ রাসুল (সা.) আরো বলেছেন, রমজান হলো সবরের মাস, আর সবরের বিনিময় হলো জান্নাত।’ তাই রোজার শিক্ষা ধারণ করে সমাজের গরিব মানুষগুলো জান্নাতের আশায় তাদের জীবনযন্ত্রণাকে সবরের মাধ্যমে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেবে। আর সমাজের যারা বিত্তশালী, তারা এক মাসের সিয়াম সাধনার মাধ্যমে দিনহীন মানুষের জীবনযন্ত্রণার বাস্তব উপলব্ধি অর্জন করবে। বস্তিবাসী, ফুটপাতে আশ্রয়ী মানুষের জঠর জ্বালার বাস্তব উপলব্ধি অর্জন করে তাদের প্রতি সহযোগিতর হাত বাড়িয়ে দেবে।
হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সে ব্যক্তি আমার ওপর ইমান আনেনি, যে তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত জানার পরও রাতে পরিতৃপ্ত হয়ে খেয়ে ঘুমাল।’ (মুজামে কাবীর) হজরত আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত অন্য এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের কোনো বিপদ দূর করে দেবেন। আল্লাহ তার কিয়ামতের দিনের বিপদ দূর করে দিবেন। আর যে কোনো ঋণী ব্যক্তিকে ঋণ পরিশোধে সহযোগিতা করবে, আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে সহযাগিতা করবেন। (আবু দাউদ, তিরমিজী) হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো বলেছেন, যে কোনো বস্ত্রহীন মুসলমানকে কাপড় দান করবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতের সবুজ পোশাক পরাবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো ক্ষুধার্ত মুসলমানকে খাবার খাওয়াবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতের ফল খাওয়াবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো পিপাসার্ত মুসলমানকে পানি পান করাবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতের সুগন্ধিযুক্ত সিপিআটা শরবত পান করাবেন। (আবু দাউদ তিরমিজী) ধনীদের তাদের কর্তব্যে উৎসাহিত করতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উপরোক্ত বাণীগুলো খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। আর দরিদ্রদের জন্য রাসুলের বাণী, ‘আল্লাহর সঙ্গে ফকির হয়ে সাক্ষাৎ করো, ধনী হয়ে নয়।’ হজরত বেলালকে রাসুল (সা.) উপরোক্ত উপদেশ দিয়েছিলেন। অন্য এক হাদিসে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ ওইসব ফকিরকে ভালোবাসেন যারা সওয়াল করে না।’ ধনীরা রোজা পালনের মাধ্যমে সহমর্মী হবে, দরিদ্রদের প্রতি তাদের কর্তব্য পালনে আন্তরিক হবে আর গরিবরা দরিদ্রদের মহিমা উপলব্ধি করে সবর করবে। এ জন্যই রোজার বিধান। আর এ শিক্ষা গ্রহণ না করলে সবার রোজাই মূল্যহীন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বহু রোজাদার এমন আছে, যারা তাদের রোজার বিনিময়ে ক্ষুধা আর তৃষ্ণার কষ্ট ছাড়া আর কিছুই পায় না।’ সহমর্মিতার গুণটি সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে পূর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান ছিল। তাই তো তাদের জীবনে কোনো অপূর্ণতা, কোনো হাহাকার ছিল না। হজরত আবু জাহম ইবনে হোরাইয়া (রা.) বর্ণনা করেছেন, ‘আমি ইয়ারমুকের যুদ্ধের সময় আমার চাচাত ভাইকে তালাশ করতে বের হলাম। কারণ তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আমি এক মশক পানি সঙ্গে নিয়ে নিলাম যাতে পিপাসার্ত থাকলে তাকে পানি পান করাতে পারি। এক সময় তাঁকে এক জায়গায় আহত ও মুমূর্ষু অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখলাম। আমি তার কাছে গিয়ে পানি দেব কি না জিজ্ঞাসা করলে তিনি ইশারায় হ্যাঁ বললেন। আমি তাঁকে পানি দিয়ে যাচ্ছি এমন সময় তাঁর পাশে পড়ে থাকা, মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতর অপর একজন আহ করে উঠল। আমার ভাই পানি পান না করে আমাকে তাঁর কাছে যেতে ইশারা করলেন। আমি তাঁর কাছে গেলাম। তিনি ছিলেন হিশাম ইবনে আবিল আস। আমি তার কাছে পেঁৗছামাত্রই তৃতীয় একজন মৃত্যু যন্ত্রণায় আহ করে উঠল। হিশাম আমাকে তাঁর কাছে যেতে বললেন। আমি তাঁর কাছে পেঁৗছে দেখি তিনি ইন্তেকাল করেছেন। অতঃপর হিশামের কাছে ফিরে এসে দেখি তিনিও পরপারে পাড়ি জামিয়েছেন। সবশেষে আমার চাচাত ভাইয়ের কাছে এসে দেখি তিনিও শাহাদাতবরণ করেছেন। এটাই ছিল সাহাবায়ে কেরামের সহমর্মিতার নমুনা। তারা অপরের প্রয়োজনে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করতে সর্বদা প্রস্তুত ছিলেন।
লেখক : পেশ ইমাম ও খতীব
রাজশাহী কলেজ কেন্দ্রীয় মসজিদ

টিউনারপেজের নতুন টিউন আপনাকে ইমেইল করব?
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting

2 মন্তব্য

মন্তব্য দিন আপনার