অতৃপ্ত ভালবাসা[একটি ব্যতিক্রম ধর্মী পোস্ট]

0
1786
অতৃপ্ত ভালবাসা[একটি ব্যতিক্রম ধর্মী পোস্ট]

সুমন

তুমি যত টুকু মহৎ আমাকে ভাব আমি ঠিক তা নই।
তুমি যতটা নিকৃষ্ট আমাকে ভাব আমি তত টুকুও নই।
আমিঠিক তাই যত টুকু আমার দর-কার।

[যদি একাকিত্ব জীবনের চলার
পথের সাথী হয় তাহলে কষ্ট
পেয়ো না।
যেখানে প্রত্যেকটা মানুষের
জীবনের শুরু আর শেষ
একাকিত্বের মাঝে সেখানে মাঝে কিছুটা সময়
না হয় একাকীই কাটল।]
অতৃপ্ত ভালবাসা[একটি ব্যতিক্রম ধর্মী পোস্ট]

ছেলে অনেক বড় হবে,সংসারে কোন অভাব থাকবে না,অস্পৃশ্য বলে অবহেলা করবে না এটাই ছিল বিধাতার কাছে মমতাময়ী মায়ের ক্ষুদ্র চাওয়া। সারাদিনের দস্যিপনা সেরে মায়ের কোলে ফিরে নিশ্চুপ হয়ে পড়তে বসা আর মায়ের আদর পাওয়ার জন্য নানা রকম টালবাহানার কমতি থাকে না। মাও ছেলের(নাবিল) নাড়ি নক্ষত্র ভাল ভাবেই জানতেন,বাহানা গুলো ও ধরে ফেলতে পারতেন নিমিষে। ছেলের মুখের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে ভালবাসার গভীরতাও বুঝিয়ে দিতেন সাথে সাথে। নাবিলের মনের কোনে ফুটে থাকা স্বপ্ন গুলো মাকে ঘিরেই শোভা পাচ্ছে। নাবিলের ধ্যান জ্ঞান বলতে মাকে ঘিরে তার স্বপ্ন আর মায়ের স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেতনা।

এসবের বাইরে নাবিলের গানের গলা ছিল হৃদয় জুড়ানো। তাই ছেলে বড় হয়ে ভাল গায়ক হবে,এ নিয়ে মায়ের কৌতূহল আর সদিচ্ছার কোন কমতি ছিল না। গানের গলাটাকে আরো পাকাপোক্ত করার জন্য একটা গিটার তার খুব দরকার ছিল,তাই একটা আবদার পৌঁছে দিয়েছিল মায়ের কানে। সে জানে মা নিশ্চই একটা না একটা ব্যবস্থা করবে। দারিদ্রের কষাঘাতে প্রতিনিয়ত নিঃষ্পেসিত হয়ে বেচে থাকা কত যে কষ্ট তা নাবিলকে কখনো বুঝতে দেননি মমতাময়ী মা,আজ পর্যন্ত কোন আবদার ই অপূর্ণ রাখেননি তিনি, এটাও রাখবেন না।

Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting

এরি মধ্যে মায়ের কি জানি একটা অসুখ দেখা দিল,প্রায়ি রক্ত বমি হয়। বিকেলে স্কুল থেকে ফিরেই জোড় করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল সে। কয়েকটা টেস্ট দিলেন ডাক্তার,কিছুক্ষণ পরেই সবগুলো টেস্টের রিপোর্ট হাতে এসে গেল। মাকে নিয়ে ডাক্তারকে রিপোর্ট দেখাতে গেল সে। রিপোর্ট গুলো হাতে পেয়েই ডাক্তার কেমন জানি অন্যমনস্ক হয়ে পরলেন,অনাবশ্যক ভাবেই রিপোর্ট গুলো উলট পালট করতে লাগলেন। কিছু একটা বলতে চেয়েও মা-ছেলের দিকে তাকিয়ে আর পারলেন না। মা বোধ হয় ব্যাপারটা আচ করতে পেরেছিলেন তাই এক অদ্ভুত হাসি হেসে নাবিলকে বাহিরে পানি আনতে পাঠালেন। যাওয়ার পূর্বে মায়ের মুখটা ভালো করে দেখে গেল নাবিল।

মাকে এমনভাবে কখনও দেখেনি সে। সেদিন অনেক রাত করে ফিরল ওরা। রাস্তায় অনেকবার জিজ্ঞেস করল,”মা কি হয়েছে তোমার?” মা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে উত্তর দেন,”তেমন কিছু না।” নিজের মধ্যে থাকা চাপা কষ্টটা প্রকাশ করতে চান না ছেলের কাছে। কিছুদিন পরের কথা।

স্কুল থেকে ফিরে মাকে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলো,”আজ অনেক সুন্দর একটা গিটার দেখে এসেছি,লাল রঙ্গের গিটারটা দেখতে খুব সুন্দর।” অতি আল্লাদ দেখে মা ও বুঝতে পারলেন ছেলে কি বুঝাতে চাচ্ছে। মা বললেন,”গিটারটার দাম কতরে নাবিল?”
নাবিল : দাম জিজ্ঞেস করি নি। কিনতে পারবো না অযথা দাম জিজ্ঞেস করে লাভ কি? (ছেলের কণ্ঠে খানিকটা অভিমান ঝরে পড়ল).
মা ছেলের অভিমানের কারন বুঝতে পেরে মুচকি হাসি হেসে বললেন, “পাগল ছেলে,যদি ঐ গিটারটা তোর হয়?”
নাবিল : সত্যি বলছো মা?
মা : হ্যাঁ রে পাগল সত্যি। ছেলের মুখে এক চিলতে হাসি দেখে মনের গহীনে থাকা সহস্র যন্ত্রণার মুখচ্ছবি মুহূর্তেই উবে গেল। বাঁকা চাঁদ প্রতিফলিত হল ঠোঁটের কোনে,অজানা কারনে চোখের পাতা বেয়ে গড়িয়ে পড়ল দু ফোটা অশ্রু।

আত্মঘাতী রোগের পদচারনায় মৃত্যু যেখানে সতত তাড়া করে বেড়াচ্ছে সেখানে প্রতিদিন ঔষধ খেয়ে টাকা নষ্ট করার চেয়ে বরং ছেলের মুখের হাসিটা মায়ের কাছে বড় হয়ে ভেসে উঠল।

পরদিন পাখির ডাকে ঘুম ভাঙ্গে নাবিলের। ঘুম ভেঙ্গে যা দেখল তাতে নিজের চোখকে বিশ্বাস করাতে পারছিল না,সত্যি কিনা বুঝতে নিজেকেই চিমটি কাটল নাবিল,হ্যাঁ সত্যি ই তো। দৌড়ে যেয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে নাচতে শুরু করে দিল। আনন্দে আটখানা ছেলের
খুশিতে নিজেও যেন হাজার বছরের সুখ পেলেন মা। আরে আরে কি করিস?
আমি পড়ে যাবো তো। হা হা হা……. পরবে না,আমি আছি না। আমি যখন বড় গায়ক হবো তখন তোমাকে কাঁধে করে নিয়ে ঘুরবো আর সবাইকে দেখিয়ে বলবো,এই আমার মা। তখন সবাই আমাকে না তোমাকে দেখতে আসবে।

আমিও দোয়া করি তোর মনের আশা যেন আল্লাহ্‌ পূরণ করেন।
কথাটা বলতে যায়ে মায়ের গলাটা ভারী হয়ে এলো।

কয়েক মাস পরের কথা, সবে মাত্র এস,এস,সি পরীক্ষা শেষ করেছে নাবিল। ইতিমধ্যেই একটা লাইভ অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার সুযোগ ও পেয়ে গেল সে।

রাতে এসে খবরটা জানালো মাকে।
সেদিন রাতে খুব একটা ঘুম হলো না নাবিলের, অন্যদিন মা ডেকে তুলতেন ছেলেকে কিন্তু আজ ছেলে নিজে যেয়ে মাকে নামাজ পরার জন্য ডাকল।

ঘুম থেকে উঠে নামাজ পরলেন মা। মাকে প্রতিদিনকার মত স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল না।
কেমন জানি অন্য মনষ্ক হয়ে গেছেন,কিছু একটা ভাবছেন নিশ্চই।
পানি গরম করে গোসল করিয়ে দিচ্ছেন ছেলেকে। মা তোমার কি কিছু হয়েছে?

ছেলের কথা শুনে অপলক নয়নে ছেলের দিকে তাকায়। যেন প্রান ভরে দেখে নিচ্ছেন,বিদায়ের শেষ ঘণ্টা অবিরত বেজেই চলছে।
অন্তিম ঘণ্টাটিও বেজে উঠতে খুব একটা দেরি নেই।
অভাগা ছেলেও জানে না কি ঘটতে চলছে তার জীবনে।

গোসল করিয়ে ছেলের মুখে ভাত তুলে দিচ্ছেন আর চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে মাটিতে।
মাগো তুমি কাদতেছো কেন?
জানো না তুমে কাঁদলে আমার খুব কষ্ট হয়?
তোমার চোখের পানি আমার সহ্য হয় না,মরে যেতে ইচ্ছে করে।
মা ছেলের মুখ চেপে ধরেন,ভুলেও মরার কথা মুখে আনবি না।
তুই মরে গেলে আমার সকল কষ্ট,প্রচেষ্টা,স্বপ্ন সবকিছুই ব্যার্থ হয়ে যাবে।

তাহলে তুমি কাঁদছ কেন?

চোখে কিছু পরেছে বোধ হয়।
দেখছিস না কেমন ঝর্নার মত জল ঝরেই যাচ্ছে।
বাবা শোন,বাড়ি এসে যদি আমাকে না পাস তাহলে চিন্তা করিস না,মনে রাখবি আমার দোয়া সব সময় তোর সাথে আছে।
কোথাও যাচ্ছ নাকি তুমি?

চোখের জলে মুচতে মুচতে মা জবাব দেয়,হ্যাঁ রে আমাকে আজ অনেক দূরে এক জায়গায় যেতে হবে।
কোথায়? অজানা উত্‌কণ্ঠা নিয়ে নাবিল জিজ্ঞেস করে।
অনেকদিন ধরে যাব যাব বলে কথা দিয়ে আসছিলাম কিন্তু,আজ বোধ হয় নিতে আসবে।
আমাকে বেশ কয়েকদিন থাকতে হবে সেখানে। তুই খাওয়া দাওয়া ঠিক মত করবি,শরীরের যত্ন নিবি আর আমি ভাত বেড়ে রেখে যাবো তুই রাতের খাবারটাও খেয়ে নিস।

মায়ের এসব কথা বার্তার মানে খুঁজতে গিয়েও ব্যার্থ হল নাবিল।
মায়ের আজকের কোন কিছুই স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারছে না সে।

একটা মৃদু কম্পন বয়ে গেল সারা শরীর জুড়ে।
মা কি কোন কিছু লুকচ্ছে আমার সাথে?
নাহ,তা কি করে হয়!!!!
এসব নিয়ে চিন্তা শেষ হতে না হতেই মায়ের রক্ত বমিটা আবার শুরু হয়েছে।

এদিকে নাবিলের অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় ও প্রায় হয়ে আসতেছে।
মাকে এ অবস্থায় রেখে কোথাও যাওয়া ঠিক হবে না।
তাই সে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল কোথায় যাবে না মায়ের পাশেই থাকবে।

মা ব্যাপারটা বুঝতে পাড়ে নাবিলকে কাছে ডাকলেন।

কপালে একটা চুমো দিয়ে বলল,বাবা আমার কাছে আয়তো,আমাকে একটু জড়িয়ে ধরবি?
অবুঝ শিশুর মত মাকে জড়িয়ে ধরল নাবিল।
২টি জীবের মৌন কান্নায় ঘরের ভিতরের বায়ু ভারী হয়ে যেতে লাগলো।

মাকে খুব ভালবাসিস না?
(মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে জিজ্ঞেস করল মা)
নাবিল : হুম।
(কান্নায় নীচু হয়ে যাওয়া কণ্ঠে এর বেশি কিছু বলতে পারে না)
মা : মায়ের একটা কথা রাখবি?
নাবিল : তোমার কথা অমান্য করেছি কখনো?
মা : জানিস তো,আমার অনেকদিনের স্বপ্ন তুই অনেক বড় গায়ক হবি,রাখবি বাবা?
আমাকে নিয়া ভাবিস না,আমি ঠিক হয়ে যাব।
নাবিল : ডান বাহু দিয়ে চোখের জল মুছে,হা রাখবো।
গীটারটা হাতে নিয়ে মাকে সালাম করে আর পেছনে তাকায় নি।
ভিতরটা ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছিল তার পরেও খুব দ্রুত চলে গেল।


সারাদিন অনেক ব্যস্তটায় কাটলো।
সবাই তার কণ্ঠের প্রশংসা করল।
একটা এলবাম করার কন্ট্রাক ও পেয়ে গেলো।
খুশিতে আত্ম হারা নাবিল।
মার স্বপ্ন আজ সত্যি হতে চলছে।
তাড়াতারি বাড়ি ফিরতে হবে।

সবাইকে বিদায় জানিয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়ালো।

অনুষ্ঠানের পরিচালক খুশি হয়ে ৫হাজার টাকা তার হাতে দিল।
ফেরার পথে শাড়ীর দোকান থেকে হাজার টাঁকা দিয়ে হালকা নীল-সাদা একটা শাড়ী কিনলো মায়ের জন্য।

আশার পথে মাকে নিয়ে তার বুনা স্বপ্ন গুলোকে আরো একবার ঝালিয়ে নিলো।
আকাশে উড়ার স্বপ্নে বিভোর নাবিল কখনো যে বাসার পাশে চলে আসলো টের ই পেল না।

এ পাশ থেকে কান্নার আওয়াজ আসছিল।
বুকের বাম দিকটা চিন চিন করা উঠলো।
কোথা থেকে আসছে এ আওয়াজ,কে কাঁদছে,কেনই বা কাঁদছে!!!!

কান্নার সুর ধরে আর একটু এগোল।
তার পরিচিত গলাই শোনা যাচ্ছে,হে এতক্ষণে চিনতে পেরেছে।

বড় বোন কাঁদছে কেন!!!!
অজানা আশংকায় ভাবনার আকাশটা কালো মেঘে ঢেকে গেল,ভিতরটাও কেমন জানি হু হু করে উঠল।

কিছুটা বিরক্তিও এসে গেল সাথে সাথে,
এই জিনিসটাই সহ্য করতে পারে না সে,কিছু হতে না হতেই এভাবে কাঁদতে হয় নাকি!!!
মেয়েদের এই ব্যাপারটা একদম বেশী বারাবারি।

এমন সুখের দিনে কই আনন্দ করবে তা না মায়া কান্না শুরু করে দিয়েছে।
মাও জানি কেমন,আজকেই উনাকে বেড়াতে যেতে হবে।
আবার ফিরলে মায়ের সাথে কথা বলবো না।

কান্নার কথা গুলো যতোই স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হতে লাগলো মায়ের প্রতি অস্থিরতাটা ততই দ্রুত বেড়ে চলছিল।
ঘরের দোয়ার পর্যন্ত পৌঁছতেই বোনের বিলাপ শুনে মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করতে লাগলো,চোখের দৃষ্টি ক্ষীন হয়ে আসলো পৃথিবীটা পাল্টি খেতে লাগলো,
সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললো নাবিল।

সকাল বেলা হুস ফিরল,চোখ খুলেই অনেক লোকের ভীড় দেখতে পেল।
উঠোনের এক কোনায় খাটিয়ার উপর একটা লাশ শুয়ানো,সেখানেই সবাই ভীড় করছে।

বড় বোনের কান্নায় গিটারটাও দৃষ্টি গোচর হল।

হাতের পাশেই মায়ের জন্য আনা শাড়ীটা।
শাড়ীটা হাতে নিয়েই মায়ের লাশের পাশে গেল।
মাগো তুমার তো এই শাড়ীটা পরার কথা ছিলো,সাদা কাপড় কেন পরেছ?
দেখ তোমার ছেলে বড় গায়ক হয়ে ফিরেছে।
চোখ খোল মা। আমার কাঁধে চড়ার এতোই শখ ছিলো তুমার?
আমি তো মায়ের লাশ কাঁধে নিতে চাই নি শুধু মাকে কাঁধে নিতে চেয়েছিলাম।

হাজারো আহাজারিতে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হতে লাগলো।
ছেলেটির কান্না দেখে নিষ্ঠুর পাথর ও কেঁদেছিল সেদিন।

মায়ের অকৃত্তিম ভালবাসায় আজ সে মস্ত বড় গায়ক। সময়ের প্রতিটি পরতে পরতে আজো সে মায়ের অস্তিত্‌ব খুঁজে।

কখনও বা গীটারের তারে কখনও আবার গানের সুরে।

“মায়ের ভালোবাসা কখনো পৃথিবীর বিধি নিষেধের বেড়া জালে আটকে থাকে না।
মায়ের ভালবাসা অতুলনীয় ও অপ্রতিরোদ্ধ।”

আই লাভ মাই মাদার

চাইলে পেইজটি থেকে ঘুরে আসতে পারেন।

বাংলাদেশ আমার অহংকার

টিউনারপেজের নতুন টিউন আপনাকে ইমেইল করব?
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here

5 × 1 =