জৈবিক বুদ্ধিমত্তার নিরিখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

1
374

মানুষ এই পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত প্রাণী, কিন্তু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহারে মানুষ অনেক উন্নত একথা সত্যি হলেও বিস্ময়কর ভাবে আমাদের মস্তিষ্কটিই আমাদের কাছে বিরাট একটি বিস্ময় রয়ে গেছে। আমরা এখনো জানতে পারিনি, ঠিক কি ঘটছে মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে। আকাশের তারা দেখে যতটা ভাবনায় ডুব দিয়েছি, তার চেয়েও বিস্ময়কর ব্যাপার কিভাবে আমরা ভাবছি? কিভাবে শিখছি, কিভাবে সৃষ্টি করছি শিল্পের সব বিমূর্ত ধারণা? জানিনা, তবে থেমে নেই আমাদের জানার চেষ্টা। বিগত শতাব্দীর অনেকটা সময় জুড়েই মানুষের ধারনা ছিল, মানুষের মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে কি ঘটছে, তা জানা প্রায় অসম্ভব। চিকিৎসাবিজ্ঞানে হিউম্যান এনাটমী যেরকম যুগান্তকারী ভুমিকা রেখেছে, ততখানি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা নিউরোএনাটমি নিউরোসায়েন্সে রাখতে পারেনি। তার প্রধান কারনগুলোর মধ্যে পড়ে, মস্তিষ্ক বা নার্ভাস সিস্টেম মানব দেহের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ, যার ন্যূনতম বিচ্যুতির কারনে মানুষের কার্যক্রমে বড় রকমের প্রভাব পড়তে পারে। তার দরুন বর্তমান সময়ে এসেও আমরা সরাসরি জীবিত মানুষের মস্তিষ্কে কোন ইলেক্ট্রনিক প্রোব বসাতে পারিনা, মস্তিষ্কের কার্যক্রম বুঝতে গিয়ে যাতে মস্তিষ্কের ক্ষতি না হয়ে যায়, সেই দিকে সবসময় লক্ষ্য রাখতে হয়। মানব দেহ যতটুকু অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক প্রবাহ সহ্য করতে পারে, সেই সীমার মধ্যে আমাদের এক্সপেরিমেন্ট গুলো চালাতে হয়। কারণ মস্তিষ্কের একটি কোষও যদি ক্ষতিগ্রস্থ হয়, তা আর পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়া সম্ভব হবে না। মানবেহের অন্য সব কোষের স্বতঃস্ফূর্ত পুনঃস্থাপন প্রক্রিয়া থাকলেও নিউরণের নেই। তাই মস্তিষ্কের আঘাত বা কোন রকম ক্ষতিকে এড়ানোর সর্বোচ্চ চিন্তা মাথায় রেখেই কাজ করতে হয় এখানে। এখনও পর্যন্ত অনেক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় সাবজেক্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয় মানুষের নিকট আত্মীয় শিম্পাঞ্জী বা বানরকে। মানুষের মৃত্যুর পর পরই এর জৈব কোষগুলোর পচন প্রকিয়া শুরু হয়ে যায়। তখন মস্তিষ্ক কেটেকুটে দেখেও খুব বেশী লাভ নেই, সমস্ত স্নায়ুতন্ত্র জুড়েই নিউরণ ও তার এক্সনগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, কিন্তু মৃত্যুর সাথে সাথে তাদের নিউরাল অ্যাকটিভিটি বন্ধ হয়ে গেছে। এই সমস্ত সীমাবদ্ধতা এবং সেই সাথে মানুষের অর্জিত জ্ঞানের অভাবের কারনেই একটা সময় পর্যন্ত বিজ্ঞনীদের ধারনা ছিলো, মস্তিষ্ক নামের এই ব্ল্যাক বক্সটার প্রকৃত কার্যপ্রণালী জানা সম্ভব নয়। কিন্তু মানুষের আগ্রহ কি তাই বলে থেমে থাকতে জানে?

জৈবিক বুদ্ধিমত্তা কি?
মস্তিষ্ক নামের ব্ল্যাকবক্সটা যেমন আমাদের কাছে এখনও অব্দি বিশাল একটি বিস্ময়, তেমনি মানুষ এখন একটি প্রশ্নের কোন বৈজ্ঞানিক উত্তর দিতে পারেনা। প্রশ্নটি হল, বুদ্ধিমত্তা কি? প্রশ্নটি সরল মনে হলেও এরচেয়ে জটিল প্রশ্ন আমার জানা নেই। কোন একটি বিষয়কে বৈজ্ঞানিকভাবে সংগায়িত করতে গেলে সংগাটির অন্তত কতগুলো বৈশিষ্ট্য থাকতে হয়, ১.পরিমাপ যোগ্যতা (quantifiability) ২.প্রমাণযোগ্যতা বা পর্যবেক্ষনযোগ্যতা(falsifiability), যার ভিত্তিতে সঠিকভাবে পূর্বাভাস দান করা সম্ভব যা বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞার পূর্বশর্ত। খানিকটা দুখঃজনক হলে আসলে জৈবিক বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত এদুটির কোনটিই সম্ভব না যার উপর ভিত্তি করে এর বৈজ্ঞানিক সংগা দেয়া সম্ভব, তাই এখনও আমাদের কাছে বুদ্ধিমত্তার কোন সর্বজন স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক সংগা নেই। তবে বুদ্ধিমত্তার আপাত সংগায়ন সম্ভব, ১৯৯৪ সালে “মেইনস্ট্রিম সায়েন্স অফ ইন্টেলিজেন্স” আকারে ৫২ জন বিজ্ঞানীর সম্পাদনায় বুদ্ধিমত্তার একটি আপাত সংগায়ন করা হয়েছে, যাতে বলা হয়েছে,

Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting

A very general mental capability that, among other things, involves the ability to reason, plan, solve problems, think abstractly, comprehend complex ideas, learn quickly and learn from experience. It is not merely book learning, a narrow academic skill, or test-taking smarts. Rather, it reflects a broader and deeper capability for comprehending our surroundings—”catching on,” “making sense” of things, or “figuring out” what to do.

অর্থাৎ বুদ্ধিমত্তা হচ্ছে একটা সাধারণ মানসিক ক্ষমতা যা যুক্তিসংগত কারণ সনাক্তকরণ, পরিকল্পনা, সমাস্যার সমাধান, বিমূর্ত চিন্তা, জটিল ধারণা অনুধাবণ, শেখার দ্রুততা এবং অভিজ্ঞতা থেকে শেখার সাথে সম্পৃক্ত। এটা কেবল বই থেকে শেখা, সংকীর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা অথবা পরীক্ষায় বুদ্ধির স্বাক্ষর রাখা নয় বরং এটি বিশদ এবং গভীরভাবে আমাদের পরিবৃত্তকে অনুধাবন করার যোগ্যতাকে প্রতিফলিত করে।

বুদ্ধিমত্তার এইরকম আপাত সংগা ইঙ্গিত করে, উপোরক্ত সকল যোগ্যতা সম্পন্ন প্রানীরাই বুদ্ধিমান। কিন্তু বাকিরা কি বুদ্ধিহীন? বুদ্ধিমত্তা পরিমাপের মাপকাঠি বা আদর্শ তাহলে কি? গাছে গাছে ঝুলে বেড়ানো বাঁদর যেভাবে তার চারপাশকে অনুধাবন করছে, তা তো তার জীবনযাপনের জন্য যথেষ্ঠ, বা এককোষী অ্যামিবা যেভাবে ছদ্মপদ সৃষ্টি করে চলাফেরা করে, যেদিকে ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি অনুভব করতে পারে, সেদিকটা এড়িয়ে অন্য দিকে চলে, নিজের প্রয়োজনীয় খ্যাদ্যের সন্ধান করে নেয়… তবে অ্যামিবার বুদ্ধিমত্তা কি অ্যামিবার জন্য যথেষ্ট নয়? বুদ্ধিমত্তার পূর্বশর্ত কি তার স্নায়ুকোষ থাকতেই হবে বুদ্ধিমান হবার জন্য? খুব সম্ভবত না।

মানুষ বুদ্ধিমান, একথা স্বীকার করতে আমার কোন আপত্তিই নেই, তবে সত্য হল, মানুষের সমস্ত বুদ্ধিমত্তার মূলে আছে স্নায়ুতন্ত্রে সঙ্ঘটিত বিভিন্ন রকমের জৈবরাসায়নিক ক্রিয়াবিক্রিয়া। অর্থাৎ জৈবিক বুদ্ধিমত্তা হল প্রানীর দেহে সঙ্ঘটিত জৈবরাসায়নিক ক্রিয়া বিক্রিয়ার ফলাফল। মানব দেহে জৈবরাসায়নিক ক্রিয়া এবং তার ফলাফল বানর, তিমি, প্রজাপতি, স্পঞ্জ বা গাছের জৈবরাসায়নিক ক্রিয়ার চেয়ে ভিন্ন, তাই প্রত্যেক প্রজাতির প্রাণীর বুদ্ধিমত্তার ধরণ আলাদা। কিন্তু একটি প্রজাতির প্রাণীর সাথে তুলনা করে আরেক প্রজাতির প্রাণীতে বুদ্ধিহীন বলার মত কোন ভিত্তি নেই জৈবিক বুদ্ধিমত্তায়। কারণ দিন শেষে দেখা যায়, মানবের স্নায়ুতন্ত্র বলি আর হরিণের, বা স্নায়ুবিহীন অথচ প্রকৃতির বুকে সফল ভাবে টিকে থাকতে সক্ষম ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র উদ্ভিদ বা প্রাণীই বলিনা কে, প্রত্যেক প্রজাতির জীবন এবং জীবন যাপন রহস্য নিহিত আছে তার ডিএনএ তেই। আমরা মানুষ বলেই মানব মস্তিষ্ক নিয়ে আমাদের আগ্রহ বেশী। আমরা বুদ্ধিমত্তার সংগা দিতে চাই মানব বুদ্ধিমত্তার আলোকে, আমাদের মনে থাকেনা, চিতাবাঘের মুখোমুখি পড়লে মানবীয় বুদ্ধিমত্তা দিয়ে চিতাবাঘের সামনে থাকে জান নিয়ে ফিরে আসার সম্ভাবনা কম, খুব কম। চিতাবাঘের যে ক্ষিপ্রতা, হিংস্রতা, তা তার স্নায়ুতন্ত্র, আরো সঠিক করে বললে তার জেনেটিক সিকোয়েন্সেরই ফলাফল।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) কি?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (Artificial Intelligence) জনক ব্রিটিশ গনিতবিদ অ্যালান টিউরিংও বুদ্ধিমত্তার সংজ্ঞা কি তা নিরুপণ করতে পারবেন বলে মনে করেননি, বা এ নিয়ে কারোর সাথে বিতর্কেও যেতে চাননি। বুদ্ধিমত্তা কাকে বলে, তা একটি বহুল বিতর্কিত বিষয়, সেটা টিউরিং সময়কালে তো বটেই, এমনকি বর্তমানেও বুদ্ধিমত্তাকে বৈজ্ঞানিকভাবে সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু টিউরিং এর ধারণা ছিল, মানুষের মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে ঠিক কি ঘটছে, তা মানুষ না জানলেও যন্ত্রের মাধ্যমে বুদ্ধিদীপ্ত কাজ করানো সম্ভব। তার এই ধারণার উপর ভিত্তি করেই ১৯৫০ সালের দিকে গড়ে উঠেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শাখাটি।

তিনি বুদ্ধিমত্তার সংজ্ঞা নিরূপনের ঝামেলায় না গিয়ে তিনি যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তার অস্তিত্ব প্রমাণে সচেষ্ট হয়েছিলেন বিখ্যাত টিউরিং টেস্টের মাধ্যমে। এটি এমন একটি পরীক্ষা যাতে যন্ত্রঘটিত কাজ মানুষকে বিভ্রান্ত করে দেয়, কাজটি যন্ত্র করেছে নাকি মানুষ করেছে? এক্ষেত্রে একজন মানুষকে নিয়োজিত করা হয় কাজটির বিচারক হিসেবে, তাকে বলতে হবে, কাজটি কে করেছে। মানুষের বিবেচনায় যদি মনে হয় কাজটি যন্ত্র দ্বারা সম্পাদিত হয়েছে, তার অর্থ হল, যন্ত্রটির মানুষের অনুরূপ কাজ করার ক্ষমতা নেই, আর যন্ত্রের কাজ যদি মানুষকে এই অনুভূতি দেয়, যে কাজটি মানব দ্বারা সঙ্ঘটিত হলেও হতে পারে, সেক্ষেত্রে যন্ত্রটিকে মানুষের অনুরূপ বুদ্ধিমত্তার অধিকারী হিসেবে বিবেচনা করা যেতে। বর্তমান কালে যারা কম্পিউটার ব্যবহার করেছেন, তাদের মধ্যে অনেকে ELIZA প্রোগ্রামটির সাথে পরিচিত, যাতে কোন প্রশ্ন করলে, প্রোগ্রামটি আমাদের দৈনন্দিন কথোপকথনের মত পালটা প্রশ্ন করে বসে। স্বাভাবিকভাবেই বিস্মিত হতে হয়, কিভাবে একটি প্রোগ্রাম এমন প্রশ্ন করছে? এইভাবেই টিউরিং টেষ্ট এবং টিউরিং মেশিনের মাধ্যমে প্রচলিত হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই শাখাটি, যা প্রথম দিকে কম্পিউটিং সায়েন্সের জগতে বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। পরবর্তীতে কিছুটা সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই জগতে কাজ করা গবেষকেরা আশাজনক সাফল্য প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হন, বিধায় এই শাখাটি আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়ে যেতে থাকে, তবে এর পরবর্তী কালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করার প্রবণতা গবেষকদের মধ্যে আবারো বেড়েছে। বর্তমানে এর গবেষকেরা যা মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সন্তোষজনক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব যদি আরো বহুগুন দ্রুত কম্পিউটার আবিষ্কার করা যায়। অর্থাৎ তারা যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তা অর্জন করতে চান গাণিতিক দ্রুততার মাধ্যমে।

অ্যালান টিউরিং এর যুগান্তকারী ধারনাগুলোর একটি ইউনিভার্সাল কম্পিউটিং, যার মাধ্যমে টিউরিং গাণিতিক ভাবে প্রমান করেন, একটা গণনাকারী যন্ত্র গঠনগত দিক থেকে যেমনই হোক না, এর কিছু গানিতিক কাজ করার ক্ষমতা আছে, ০ এবং ১ এর সমন্বয়ে যদি গণনাকারী যন্ত্রকে ঠিক মত কিছু কাজ করার নিয়মাবলী সরবারহ করা সম্ভব হয়, এবং কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা সরবারহ করা সম্ভব হয়, তবে এটি অনেক জটিল জটিল গানিতিক কাজ করে ফেলতে পারে। অর্থাৎ সমস্ত ডিজিটাল কম্পিউটার যুক্তিগতভাবে একই, এর আর্কিটেকচার যেমনই হোক না কেন। বর্তমানে এই কল্পিত গণনাকারী যন্ত্রকে বলা হয় ইউনিভার্সাল টিউরিং মেশিন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংক্রান্ত ধারণার কেন্দ্রীয় বক্তব্য ছিল, মস্তিষ্ক স্রেফ আরেক ধরণের কম্পিউটার, কিভাবে একটি যন্ত্রকে বুদ্ধিমান করে তোলা হল, সেটা ব্যাপার না, ব্যাপার হল, মানবের অনুরূপ আচরণ প্রদর্শন করা। মস্তিষ্ক মস্তিষ্কের মত করে কাজ করবে, যন্ত্র যন্ত্রের মত করে কাজ করবে, বুদ্ধিমত্তা নিরুপিত হবে, কার্যপ্রণালী দিয়ে নয়, কার্যপ্রণালীর ফলাফল দিয়ে। কিভাবে মস্তিষ্ক কাজ করে, তা নিয়ে চিন্তিত না হয়ে নিয়োজিত হয়েছেন মস্তিষ্কের অনুরূপ কার্য প্রদর্শনে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গবেষকেরা মূলত আগ্রহী মানব সদৃশ আচরণ অর্জন করতে। এইখানেই একটা বিশাল পার্থক্য দাঁড়িয়ে গেছে যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তার সাথে জৈবিক বুদ্ধিমত্তার।

এইখানে বলে রাখি, মানব মস্তিষ্ক কিন্তু মোটেও দ্রুতগতিতে কজ করতে পারে বলে এতোটা বুদ্ধিমান নয়। এটি যেকোন চিন্তা, পদক্ষেপ, পরিকল্পনা ইত্যাদি দ্রুওতার সাথে করার জন্য মস্তিষ্ক অন্য কোন পন্থা অবলম্বন করে। একটা বাড়ি থেকে হাসপাতালে যাবার বেশ কয়েকটা পথ থাকতে পারে, তার মধ্যে একটা সংক্ষিপ্ততর পথ আছে, যে পথ দিয়ে গেলে সময় কম লাগে। মস্তিষ্কের এমন সংক্ষিপ্ততম বা সংক্ষিপ্ততর নিউরাল সংযোগের মাধ্যমে কাজ করার পদ্ধতি জানা আছে।

মস্তিষ্কের বরং দ্রুততার একটা সীমা আছে। বিবর্তন প্রক্রিয়ায় যদি স্বাভাবিক ভাবে কোনদিন নিউরণ বর্তমানের চেয়ে চিকন অ্যাক্সন তৈরী করে, তখন নিউরণের তথ্যপ্রবাহের গতিবৃদ্ধির সাথে মানুষের কাজ করার গতিও হয়ত এখনকার চেয়ে বাড়বে, কিন্তু তা কখন হবে কিনা তাতে সন্দেহ আছে, কারণ প্রাণীর বিবর্তন তো কেবল দ্রুততাকে বাড়াবার জন্য হবে না, যদি সামগ্রিক ভাবে সরু নিউরণ প্রাণীকে মানসিক কাজ, ভারসাম্য, দ্রুততা ইত্যাদি ব্যাপার মিলিয়ে অধিক সুবিধা দিতে পারে তাহলে হয়ত কখনও সেরূপ বিবর্তন হলেও হতে পারে। সেটা কেবলি সুদূর ভবিষ্যতের একটা অনিশ্চিত প্রাকৃতিক ব্যাপার, আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এখান থেকে একটা ব্যাপারই পরিষ্কার হয়, মানব নিউরণের তথ্য প্রবাহের গতির একটা উর্ধ্বসীমা আছে। মানুষের বুদ্ধিমত্তার জন্য যদি নিউরণের দ্রুততা প্রধান কারণ না হয়ে থাকে, মানবের অনুরূপ বুদ্ধিমত্তার জন্য কেবল দ্রুততা বাড়িয়ে আদৌ কি লাভ হবে? তাই জৈবিক বুদ্ধিমত্তার আলোকে অনুমাণ করা যেতে পারে, অ্যালান টিউরিং এর চিন্তাপ্রসূত বা পরবর্তীতে তার পদাংক অনুসরণ করা গবেষকদের মাঝে গড়ে ওঠা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আচরণকেন্দ্রিক কেন্দ্রীয় ধারণাটি সম্ভবত ভুল ছিল। সত্যি সত্যিই মানবের বুদ্ধিবৃত্তিক আচরণের অনুরূপ আচরণ অর্জন করতে হলে কিভাবে মানব মস্তিষ্ক কাজ করে তা বিবেচনায় নেয়া জরুরী। বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে যারা গবেষণা করে বা করবে, তারা এই মানব মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালীকে এই গুরুত্বটা দেবে বলে আশা রাখি, অনেকে হয়তো ইতিমধ্যে দিচ্ছেও।

অ্যালান টিউরিং এর সময়কালে মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণায় এতোটা অগ্রগতি ছিল না, সেই সময়ে মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালী জানার জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকলে আধুনিক কম্পিউটার প্রযুক্তি এতোদূর আসতে পারা যেতো কিনা সন্দেহ আছে, কিন্তু এখন সময়টা বদলে গেছে, বিগত ৬০ বছরে আমাদের মস্তিষ্ককে জানার চেষ্টায় আমরাও অনেক এগিয়ে গিয়েছি। মানব মস্তিষ্ক নিয়ে বর্তমানে যত গবেষণা চলে, তা সন্দেহাতীত ভাবে আগের যেকোন সময়ের চেয়ে বেশী। এখনকার সময়ের নিউরোসায়েন্টিস্টরা মনে করেন না মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালী জানা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। একদিকে যেমন প্রতিদিন মস্তিষ্কের ইলেক্ট্রিকাল অ্যাকটিভিটি কিভাবে আগের চেয়েও নিরাপদ ভাবে রেকর্ড করা সম্ভব, তা নিয়ে গবেষণা চলছে, ফাংকশনাল ম্যাগনেটিক রেসোনেন্স ইমেজিং টেকনোলজীর উন্নতি ঘটছে, মস্তিষ্ক নিয়ে নানাভাবে পরীক্ষানিরিক্ষা চলছে, আরেকদিকে থিওরিটিক্যাল নিউরোসায়েন্টিস্টের দল সচেষ্ট হয়েছে, পেরিফেরাল নার্ভাস সিস্টেম, সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম, নিউরনের থিওরিটিক্যাল মডেল, প্রাকটিক্যাল মডেল তৈরী করে চলেছে, যাতে ইচ্ছেমত পরীক্ষা নিরিক্ষা চালানোতে নেই কোন বাঁধা, এ গবেষণা যে জোরেশোরেই চলছে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারি। হয়ত অদূর ভবিষ্যতেই আমরা এক এক করে মস্তিষ্কের সব কাজের প্রক্রিয়া আবিষ্কার করে ফেলব।

আর্টিফিসিয়াল নিউরাল নেটওয়ার্কঃ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণা যখন একটা সময় কাঙ্খিত সাফল্য প্রদর্শন করতে ব্যার্থ হচ্ছিল তখন ১৯৮০ সালের দিকে নতুন এক পথে বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণা বেশ জমে উঠতে শুরু করে, যা মস্তিষ্কের বাস্তবতা তথা মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালী উপেক্ষা না করে তাকে অনুকরণ করেই যাত্রা শুরু করে। এই নতুন পথটির নাম নিউরাল নেটওয়ার্ক। নিউরাল নেটওয়ার্কের পদক্ষেপটি ছিল অনেকটা এমন, কয়েকটি আর্টিফিশিয়াল নিউরণকে বা প্রসেসিং ইউনিটকে পরষ্পরের সাথে সংযুক্ত করে কি ঘটে তা দেখা যাক। এইখানে সাধারণত এক সেট নিউরণ থাকে যার মাধ্যমে ইনপুট দেয়া হয়, এই ইনপুট গ্রহনকারী নিউরনের স্তরটি সংযুক্ত থাকে গোপন আরেক সেট নিউরনের স্তরের সাথে, আর সবশেষে থাকে আউটপুট লেয়ার যেটি যুক্ত থাকে পূর্বোক্ত গোপন স্তরটির সাথে। এটি একটি সাধারণ নিউরাল নেটওয়ার্কের ধারণা, যেখানে ইনপুট লেয়ারে প্রশিক্ষন মূলক তথ্য এবং পরীক্ষার জন্য তথ্য উভয়ই দেয়া সম্ভব। এইখানে বারবার নিউরন নিউরণ বলাতে এটা ভাবার কোন প্রয়োজন নেই, যে সত্যি এইখানে হাইড্রোকার্বন বা সিলিকন বা এইরকম বিভিন্ন পদার্থ দিয়ে নিউরণ বানানো হয়েছে কৃত্রিম ভাবে। বরং একেকটি নিউরণকে প্রকাশ করা হয় গাণিতিক ফাংশন রুপে। এই গাণিতিক ফাংশনগুলোকেই বিভিন্ন প্যাটার্ণের প্রশিক্ষন মূলক তথ্য দিয়ে শিখিয়ে পড়িয়ে পরিচিত করে নিতে হয় প্যাটার্নের সাথে। নিউরাল নেটওয়ার্ক তাতে সরবারহকৃত প্রশিক্ষন মূলক তথ্য থেকে প্যাটার্ণ চিনতে শিখে নেয়, শিখে নেয় কোন ধরনের প্যাটার্ন পেলে কোন ধরণের আউটপুট দিতে হবে বা ফায়ার করতে হবে, আর কোন ধরণের প্যাটার্ণ পেলে চুপ করে থাকতে হবে। অর্থাৎ এর শেখাটা কেবল ট্রেইনিং পর্যায়েই সীমাবদ্ধ, এরপর যত তথ্যই দেয়া হোক না কেন, পরিবর্তিত তথ্য সে নিজের মধ্যে সংরক্ষন করেনা। অর্থাৎ নিউরাল নেটওয়ার্কের কার্যক্রম অনেকটা স্থির প্রকৃতির, পরিবর্তনশীল নয়। সে নির্দিষ্ট কয়েকটা প্যাটার্ন শিখে রেখেছে, সেইগুলোই সে চিনতে পারে, বাকিগুলোকে সে কখনই চেনে না।

কিন্তু গবেষকদের মধ্যে ছোট্ট একদল ছিল, যারা অন্য একটা পথ বের করেছিল যন্ত্রকে বুদ্ধিমান করে তোলার জন্য। সেখানে যেটা করা হত, যতবার একটি নিউরাল নেটওয়ার্ক যে ধরণের প্যাটার্ণের জন্য আউটপুট দিতো, ততবার যন্ত্রটি আউটপুটের রেকর্ডটি রেখে দিত। একে বলা হয় অটো এসোসিয়েটিভ মেমরী। ফলে যে ধরনের প্যাটার্ণ বেশী পেত, সেই ধরণের প্যাটার্ণ চিনতে পারার ক্ষমতাও তাদের বেড়ে যেতো। একটা সময় দেখা গেল, কোন একটি পরিচিত প্যাটার্ণ পুরোপুরি আসার আগেই বা পুরোপুরি না আসলেও যন্ত্রটি আউটপুট দিয়ে দিচ্ছে। কারণ ঐধরণের ইনপুট থেকে আউটপুট পর্যন্ত যাবার পথটি এতটাই শক্তিশালী হয়ে গেছে যে, প্যাটার্ণটি পুরোপুরি আসার আগেই সে সনাক্ত করতে পারছে এবং এই প্যাটার্ণটির ইনপুট থেকে আউটপুটে যাবার পথের কাছে অপেক্ষাকৃত কমবার আসা প্যাটার্ণগুলো থেকে আউটপুটে যাবার পথটি দূর্বল হয়ে গেছে। অর্থাৎ স্বয়ংকৃতভাবে ভাবে নিজের ভিতরে ইতিহাস লিপিবদ্ধ রাখার যোগ্যতা সম্পন্ন যন্ত্রটির দক্ষতা সাধারন মডেলের চেয়ে বেশী।

২০০১ সালে প্রকাশিত ইয়েল ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অফ সাইক্রিয়াট্রির প্রফেসর রালফ হফম্যান এবং থমাস ম্যাকগ্লাশান রচিত বইয়ে তারা উল্লেখ করেন, তাদের গবেষক দল ভাষা সনাক্তকরণের জন্য তৈরী করা নিউরাল নেটওয়ার্ক মডেলের মাধ্যমে ভয়েস হ্যালুসিনেশন ঘটনা ঘটিয়েছেন, যা স্কিৎজোফ্রেনিয়ার রোগীদের ডিলুশ্যনের ব্যাখ্যা দিতে পারে। এই নিউরাল নেটওয়ার্কটিতে আসলে যা ঘটেছে, তা হল, মডেলটিকে প্রথমে ভাষা সনাক্তকরনের জন্য প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে, স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে যখন মডেলটি অধিকমাত্রায় প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হয়েছে, তখন মডেলটির কিছু আর্টিফিসিয়াল নিউরনের পথ অতি শক্তিশালী হয়ে গেছে, যার ফলস্রুতিতে বাইরে থেকে কোন প্রকার ইনপুট না দেয়া স্বত্তেও মডেলটি নিজ থেকেই আউটপুট দিচ্ছিল। এই নিউরাল নেটওয়ার্কের মডেলটি একাধারে ভয়েস হ্যালুসিনেশন, ঘুমন্ত অবস্থায় স্বপ্ন দেখা, অন্যদের কন্ঠ শোনা ইত্যাদির আপাত ব্যাখ্যা দেয়, যদিও এইসম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে উপনীত হবার জন্যে আরো অনেক পরীক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে এখনও।

এই পর্যন্ত পড়লে মনে হতে পারে, নিউরাল নেটওয়ার্ক বা অটো এসোসিয়েটিভ মেমরী মডেল সফলভাবে বুদ্ধিমত্তার সৃষ্টির উদাহরন গড়তে সক্ষম হয়েছে, কিন্তু আসলে তা নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কেন্দ্রীয় ধারণায় যে ভুলটি ছিল, সেই একই ভুল অর্থাৎ কার্যপ্রণালী বা এলগরিদম ভিত্তিক গবেষণার মনোযোগী হবার পরিবর্তে, কৃত্রিম আচরণে দক্ষতা অর্জনের নেশা নিউরাল নেটওয়ার্কের কার্যধারাকেও আক্রান্ত করেছে। নিউরাল নেটওয়ার্ক নিয়ে এখনো গবেষকেরা ব্যাপকভাবেই আগ্রহী, কিন্তু নিউরোসায়েন্টিস্টরা কিছুটা নিরাশ। তার একটি কারণ, নিউরাল নেটওয়ার্ক নিয়ে গবেষণা কার্যক্রম প্রতি বছর বিভিন্ন সংস্থা থেকে যে পরিমাণ অর্থায়ন পাচ্ছে, তা ইন্টেলিজেন্ট মেশিন বানাবার পরিবর্তে অনেকাংশেই বহু দিকে বিভ্রান্ত হয়ে গেছে, একদল হয়ত শেয়ার বাজারের হালচাল বুঝতে চেষ্টা করছে, কারখানার উৎপাদনশীলতার বা বাজার দরের হালচাল বোঝার কাজে ব্যবহার করছে। অর্থলগ্নিকারীরা নিউরাল নেটওয়ার্কের অ্যাপ্লিকেশনের দিকেই বেশী ঝুকছে। অগত্যা গবেষকরাও চালাচ্ছেন সেসব গবেষণাই। আমি বলছিনা, এসবের দরকার নেই, অবশ্যই দরকার আছে, কিন্তু বুদ্ধিমত্তা সৃষ্টিতে বা নিউরোসায়েন্সের দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের চাহিদা ভিন্ন। বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণার লক্ষ্যটা কেবল শেয়ারবাজারের হালচাল বোঝা নয়, বরং বেশ বিস্তৃত, মানবদেহের অনুরূপ জৈবিক বুদ্ধিমত্তাকে জৈবরসায়নের মোড়ক থেকে বের করে সিলিকন চিপের মোড়কে ঢুকিয়ে দেয়া, অর্থাৎ, মানববুদ্ধিমত্তার আপাত ধারনাটি যতগুলো বৈশিষ্ট্যর সমন্বয় নির্দেশ করে, তার সবকটাকে এক এক করে কৃত্রিম্ভাবে উদ্ভাবন করা। তাহলেই কেবল মাত্র অ্যালান টিউরিং এর সেই সুদূরপ্রসারী ভাবনা, যন্ত্রের দ্বারা বুদ্ধিদীপ্ত আচরণ করানো সম্ভব, তা বাস্তব রূপ নেবে।

এতোকাল অব্দি চর্চিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমস্যাগুলোঃ
প্রথমত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গবেষকদের বুঝে উঠতে হবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার লক্ষ্য মানবের অনুরূপ আচরণ অর্জন করা, নাকি মানবের অনুরূপ বুদ্ধিদীপ্ত হয়ে ওঠা। এই দুটো ব্যাপারের মাঝে পার্থক্য অনেক। মানুষ হাটতে পারে, হাত, আঙ্গুল নাড়াতে পারে, বই পড়তে পারে, লিখতে পারে, কথা বলতে পারে, কথা শুনতে পারে। খেয়াল করে দেখুন, এইসব কটি ব্যাপার কিন্তু খানিকটা যান্ত্রিক আচরণ। এইবং এই যান্ত্রিক আচরণগুলো অর্জন করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে সফল হয়েছে, এটাও আমরা জানি, হয়ত যন্ত্রগুলো এখনো মানুষের মত দৌড়াতে পারে না, কিন্তু হাটতে তো পারে রোবট। কিন্তু মানুষের বুদ্ধিদীপ্ততা এইসব যান্ত্রিক ব্যাপারেই সীমাবদ্ধ নয়। আমি সারাদিন ল্যাবের ডেস্কটায় বসে পড়ালেখা করি, আমার কাজ করি, করতে গিয়ে কখনো কিবোর্ডে খট খট শব্দ হয়, কখনো মাউসের ক্লিক। কিন্তু আঙ্গুল চালনা তো আমার বুদ্ধিমত্তার একমাত্র ব্যাপার নয়, বরং বলতে গেলে সামান্য একটি অংশ ছাড়া কিছুই নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রাথামিক চাওয়া ছিল, এটি একটি যন্ত্রকে আমার মত করে আঙ্গুল চালাবার ক্ষমতা দিতে চায়। কিন্তু আমি কেন আঙ্গুল চালাচ্ছি তা বুঝতে শেখাচ্ছে না এখনো। দিনের পর দিন যখন আমি পড়তে থাকি, এক একটি বিষয়ের রহস্যের অনুসন্ধানে অজস্র তথ্য খুজে বেড়াই, তখন যা আমাকে আমার কাজের পিছনে চালিত করে, তা আমার চিন্তা, আমার পরিকল্পনা, আমার অনুধাবন, আমার অনুসন্ধিৎসু মন। এই ব্যাপারটা পুরোপুরি পরাবাস্তব, যা বুঝতে প্রয়োজন একটি সৃজনশীল, চিন্তাশীল মনন। এই লেখাটি লেখার আগে আমি যতটা ভেবেছি, আমার চিন্তা, জ্ঞান সঠিক কিনা যাচাই করে দেখার জন্য যতটা তথ্য অনুসন্ধান করেছি, সেসবই ছিল আমার কীবোর্ডে খটখট করে আঙ্গুল চালিয়ে লেখাটি লিখে ফেলবার মূল চালিকা শক্তি, কেবল চোখ দিয়ে পড়ে ফেলা আর আঙ্গুল দিয়ে লিখে ফেলা নয়। মানবের অনুরূপ বুদ্ধিমত্তা অর্জন করতে হলে, যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তার গবেষণা এগুতে হবে, চিন্তাশীলতার প্রক্রিয়া, অনুধাবনের প্রক্রিয়া, স্থির লক্ষ্যে অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া, বহু জানা তথ্য সেচে নতুন সিদ্ধান্তে উপনীত হবার প্রক্রিয়া কৃত্রিমভাবে উদ্ভাবনের পথে, যে পথে পা বাড়ায়নি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার লক্ষ্য যদি গানিতিক সমস্যার সামাধান আর যান্ত্রিক দ্রুততা, দক্ষতা অর্জন করাও হয়, তবুও শেষ অব্দি অনেক সূক্ষতা স্বত্বেও যান্ত্রিকতা পাড়ি দিতে পারেনি জৈবিক দক্ষতাকে এখনও। পারেনি বাতাসে ছুড়ে দেয়া একটি ক্রিকেট বল মানুষের মত করে হাতের মুঠোয় নিতে।

কম্পিউটার সফটওয়্যারের মাধ্যমে কম্পিউটারে গাণিতিক নির্দেশাবলী সরবরাহ করা হচ্ছে, কিভাবে কম্পিউটার একটি সমস্যার সমাধান করবে, আর কম্পিউটারও ওই নিয়মাবলীর বৃত্তেই ঘুরপাক খেতে থাকে। সমস্ত গাণিতিক নিয়ম শিখিয়ে পড়িয়ে দেয়া কম্পিউটার আর একজন গনিতবিদের মাঝে প্রকৃত পার্থক্য থেকে যায়, গনিতবিদ একসময় সাধারণ সমাধানের বাইরে এসে নিজের অনুধাবনের কারণে দীর্ঘদিনের অসমাধানে পড়ে থাকা সমস্যার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ একসময় বলে ওঠে, “ইউরেকা!” সমাধানটি হয়ত নিতান্ত সহজ, কিন্তু এই নিতান্ত সহজ সমাধানটি বের করার জন্য যে সৃজনশীলতা প্রয়োজন হয়, তা কম্পিউটারের নেই। এখন প্রশ্ন হল, খুব আশাবাদী হয়ে কি আমরা বলতে পারিনা, পারবে, পারবে… একদিন কম্পিউটার বা যন্ত্রও পারবে। আসলেই পারবে কিনা কখনো তা আমাদের জানা নেই হয়তো কারোর, কিন্তু আমার বেয়াড়া মন আমার ভিতর থেকে কিভাবে যেনো জানান দেয়, সম্ভব নয়, ঐ ইউরেকা মুহুর্তের সাথে জড়িয়ে আছে, গণিতের প্রতি ভালোবাসা, চেষ্টা, আগ্রহ! যন্ত্র গাণিতিক সমস্যার সমাধান দিতে জানলেও গণিতকে ভালোবাসতে জানে না, এইসব বিমূর্ত ব্যাপারস্যাপার নেই তার হার্ডডিস্কে! এম. আই. টির পরীক্ষাগারে কগ নামের যে রোবট তৈরী হয়েছে, সে মানুষের আবেগের সাথে সাড়া দিতে পারে। কিন্তু তার পক্ষে এটা বোঝা সম্ভব নয়, কেন একটি চলচিত্র দেখতে দেখতে মানুষ কেঁদে ফেলে!

কিসের অভাব তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায়?
যদি ডিপ ব্লু নামের সুপার কম্পিউটার কতৃক গ্যারী ক্যাসপারভরের মত সেরা সেরা দাবাড়ুরা হেরে যায়, তবে কেন আমরা ডিপ ব্লু কে বুদ্ধিমান বলতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছি? হফম্যানের দলের নিউরাল নেটওয়ার্ক মডেল কিনা হ্যালুসিনেশন ব্যাখ্যা করে ফেলল, তবু কিনা আমরা বলছি, বুদ্ধিমত্তার সঠিক ধারণাই এই কৃত্রিম শাখাগুলো বুঝতে পারেনি। কিসের অভাব তাতে? অভাব আসলে দুটি।
১. একটি বা কয়েকটি এলগরিদমের, যে এলগরিদমের সাহায্যে মানব মস্তিষ্ক কাজ করে।
২. কানেকশন প্লাস্টিসিটি।

এইদুটো বৈশিষ্ট্যের কারণের জৈবিক বুদ্ধিমত্তার সাথে এখনো পর্যন্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিদ্বন্দীতা চলে না বা সুদূর ভবিষ্যতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানব বুদ্ধিমত্তার সমকক্ষ হয়ে উঠবে কিনা সন্দেহ আছে। জৈবিক বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে মানব মস্তিষ্ক কোন এলগরিদম অনুসরণ করে কাজ করছে, তা আমরা এখনও সঠিক ভাবে জানিনা, বড়জোড় কয়েকটি অনুমাণ নির্ভর অনুকল্প আছে, যার একটি হল জেফ হকিন্সের মেমরী-প্রেডিকশন ফ্রেমওয়ার্ক। কিন্তু বিজ্ঞানের জগতে অনুকল্পের গ্রহনযোগ্যতা প্রমাণসাপেক্ষ। এই মুহুর্তে যা বলতে পারি, এই একটি বা কয়েকটি এলগরিদমের পিছনেই নিউরোসায়েন্টিস্টরা মাথা ঠুকে মরছে। এইসব নিউরোসায়েন্টিস্টদের মত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গবেষকেরা মানব সদৃশ আচরণ অর্জনের জন্য এলগরিদমের ব্যাপারে অধিক মনোযোগী হলে বিজ্ঞানের জগতে হয় একটি সত্যিকারের বিপ্লব ঘটে যেতে পারতো। এমনও হতে পারতো, যেখানে নিউরোসায়েন্টিস্টরা মানবদেহে পরীক্ষণ চালাবার নৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালী সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে কিছু বলতে পারছেন না, সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গবেষণায় উদ্ভাবিত এলগরিদম হয়ত নিউরোসায়েন্টিস্টদের মস্তিষ্ক সম্পর্কে আরো পরিষ্কার এবং গভীর ধারণা দিতে পারতো।দিন শেষে তো উভয় শাখা কাজ করে বুদ্ধিমত্তা নিয়েই।

এইবার চলুন কানেনশন প্লাস্টিসিটি সম্পর্কে সামান্য জানার চেষ্টা করি। একটি মানব শিশুর যখন স্নায়ুতন্ত্র তৈরী হয়ে, প্রাথামিক অবস্থায়, তাতে প্রচুর সংখ্যক নিউরন বা স্নায়ুকোষ আর গ্লিয়াল সেল ছাড়া কিছু নেই, নেই কোন বুদ্ধিমত্তা। এরপর বহিঃজগত থেকে একটি একটি করে স্টিমুলেশন, যেমন ধরুন, শব্দ, গন্ধ, আলো ইত্যাদি যেতে শুরু করে, আর তার মস্তিষ্কের মধ্যে এই বাইরের স্টিমুলেশন ইলেক্ট্রিক সিগন্যালে রুপান্তরিত হয়ে মস্তিষ্কের মাঝে একটি নিউরণ থেকে আরেকটি নিউরণে চলতে শুরু করে। একটি ইলেক্ট্রিক সিগন্যাল যে কটি নিউরণের মধ্যদিয়ে চলাচল করে, সেই পথটিকে ধরা যায় ঐ সিগন্যালের জন্য নিউরাল পাথ। মস্তিষ্কে নতুন নতুন নিউরাল পাথওয়ে তৈরী হওয়া যেমন স্বাভাবিক ঘটনা, দীর্ঘদিন অব্যবহারে পুরনো পাথওয়ে দূর্বল হয়ে যাওয়া তেমনি স্বভাবিক ঘটনা, অর্থাৎ পাথওয়ে গুলো বৈদ্যুতিক তারের মত স্থির নয়। ধরা যাক, হঠাত আমি অন্ধ হয়ে গেলাম, তাহলে আমার দৃষ্টি শক্তির জন্য যে অঞ্চল নিয়োজিত ছিল তাও বেকার হয়ে যাবে। কিন্তু সে এভাবে বেকার থাকবে না, আস্তে আস্তে অন্যান্য নিউরাল প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত হয়ে যতখানি কার্যক্ষম থাকা যায় তাই থাকার চেষ্টা করবে। এই নতুন কাজটা তাকে আগের মত লাল গোলাপ বা নীল আকাশ দেখতে দিচ্ছে না সত্যি, কিন্তু হয়তো, পাখির ডাক শুনে অনুভব করতে দিচ্ছে, এটা পাখি, এটা কোকিল, এখন বসন্ত। একটি নার্ভের হয়তো চোখের ফটো রিসেপ্টরের সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, কিন্তু সেই নার্ভটি বসে না থেকে নতুন একটি নার্ভের সাথে সংযোগ তৈরী করে ফেলেছে। এতো কথায় যা বোঝাতে চাচ্ছি তা হল, নিউরাল প্লাস্টিসিটি বা কানেকশন প্লাস্টিসিটি, যা বোঝায় নার্ভ সংযোগগুলোর পরিবর্তনশীলতা। এতো স্বতস্ফূর্ত পরিবর্তনশীলতা জৈবিক দেহের বাইরে অর্জন করা সম্ভব কিনা, আমি সন্দিহান।

মানব মস্তিষ্ক ভুল করে, অনেক অনেক ভুল করে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভুল করে না। একটি কাজ করার জন্য যদি তার একহাজার শর্ত পরীক্ষা করে দেখা দরকার হয় তবে, তাই করবে সফটওয়্যার, অতঃপর সঠিকতম সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু মানব মস্তিষ্ক মোটেও এত সঠিকের ধার ধারবে না, তাৎক্ষনিক ভাবে যে কটি সম্ভাব্য পথ এবং শর্তের কথা মনে পড়বে, সেই অল্পকটার মধ্যে যেটা সঠিক মনে হবে তাই করে ফেলবে, এবং কার্য সমাধা করে ফেলবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সব সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত পরীক্ষা করে শেষ করার আগেই। এই কারনের জৈবিক বুদ্ধিমত্তা সহস্র বিপদসংকুল পরিবেশের সাথে যুদ্ধ করে স্বঃতস্ফুর্তভাবে টিকে থাকছে, থাকতে পেরেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে যদি প্রকৃতির সাথে লড়াই করে টিকে থাকতে হত, তাহলে, অনেক আগেই এটি হারিয়ে যেতো পৃথিবীর ইতিহাস থেকে, তা হয়নি, কারণ মানুষ এর উদ্ভাবনই করেছে তাদের কাজে সাহায্য করার জন্য। তবে কল্পবিজ্ঞানের লেখকেরা বা চলৎচিত্র নির্মাণকারীরা কি এক অদ্ভুত কারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে মানব সভ্যতার জন্য হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করতেই বেশী ভালোবাসে। অথচত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তার জন্মকাল থেকেই মানবের কাজের সাহায্যকারী, এর কাজ মানুষের যান্ত্রিক আচরণের দক্ষতার অনুরূপ যান্ত্রিক দক্ষতা অর্জন করে, গানিতিক দ্রুততায় মানুষের কাজ সহজ করে দেয়া, মানুষের জৈবিক বুদ্ধিমত্তার প্রতিদ্বন্দী হয়ে ওঠা নয়। কল্পবিজ্ঞান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে যতই আতংক সৃষ্টি করুক, একদিন মানব সৃষ্ট কৃত্রিম দানবের পদতলে চলে যাবে মানব সভ্যতা, বাস্তবে তা ঘটবে না কোনদিন। সেই সাথে যারা একদিন ভাবতো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চটজলদি অর্জন করে ফেলবে মানবের অনুরূপ বুদ্ধিমত্তা, বা আজো যারা বলে মানুষের মস্তিষ্ক আরেক ধরণের কম্পিউটার, সেসব ধারণা স্বপ্নবিলাসী মানুষের অযৌক্তিক স্বপ্নের অতিরঞ্জন বৈ আর কিছু নয়।

——————————————————————

তথ্যসূত্রঃ

১/ Jeff Hawkins and Sandra Blakeslee, On Intelligence, Times Books (2004).

২/ Haring, K. Intelligence Considered. Brain (1998).

৩/ Davide Castelvecchi, Faster, Smaller, Better: Does Physics Put an Upper Limit on Brain Efficiency? (2011)

৪/ Hoffman, R.E. & Mcglashan, T.H. Neural Network Models of Schizophrenia. The Neuroscientist 7, 7-8 (2008).

 

টিউনারপেজের নতুন টিউন আপনাকে ইমেইল করব?
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting

1 মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here

13 − ten =