আওয়ামী লীগের ৪ বছর, ছাত্রলীগের ৫ মিনিট । রাজনীতি নয়,সচেতনতা ।

4
249

 

গতকাল মাত্র ৫ মিনিটের মধ্যে একটি ঘটনা ঘটিয়েছে সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। প্রকাশ্য দিবালোকে শত শত মানুষ এবং টিভি ক্যামেরার সামনে তারা কুপিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলছে বিশ্বজিৎ দাস নামের এক যুবককে। এখন প্রযুক্তির যুগ।তুমুল গতিতে এ সংক্রান্ত ছবি এবং ভিডিও বাংলাদেশের আনাচে কানাচে, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে দেরী হয়নি।

Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting

যারা বিশ্বজিত হত্যার ভিডিওটি বা ছবিগুলো দেখেছেন তারা সবাই একবাক্যে স্বীকার করবেন যে ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক এবং বর্বোরচিত। খবরে পাওয়া সূত্রে জানা যাচ্ছে যে, যারা এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছেন তারা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্র এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী। ছাত্রলীগের এমন অবিবেচক কর্মকাণ্ড এবারই প্রথম নয়। সরকারের গত চার বছরে বিরোধী দলের আন্দোলন সংগ্রাম যতো না আলোচিত তার চেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল এবং আছে- ছাত্রলীগ। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট অনেকেই এক বাক্যে স্বীকার করেন যে আগামী নির্বাচনে শুধু এক ছাত্রলীগের কারণেই আওয়ামী লীগের পতন হতে পারে।

ছাত্রলীগের কিন্তু তা নিয়ে কোন মাথাব্যথা নেই। তারা নিবিষ্ট মনে তাদের অছাত্রসুলভ কাজ করে যাচ্ছে, পত্রিকাতে নিয়মিত নেগেটিভ খবর হচ্ছে। দেশের প্রাচীন ছাত্রসংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগের যে যে সোনলী ঐতিহ্য আছে বর্তমান ছাত্রলীগের কর্মীরা তা ধূলোয় মিশিয়ে কবরে পাঠিয়ে দিচ্ছে।

বাংলাদেশের যে ছাত্র সংগঠনগুলো আছে তার ভেতর ছাত্রশিবির অনেক আগে থেকেই কুখ্যাত। ৭১ এর রাজাকারদারদের সমর্থনে রগ কেটে, মানুষ জবাই করে জামাত শিবির একটি বিশেষ ব্রান্ডে পরিণত হয়েছে, যার নাম শুনলেই মানুষ আতঙ্কে জমে যায়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে ছাত্রলীগ শিবিরের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশ্বজিতকে ওভাবে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মারার পর ছাত্রলীগকে যদি কেউ ছাত্রশিবিরের সাথে গুলিয়ে ফেলেন তাতে এখন আর অবাক হবার কিছু নেই।

ছাত্রলীগের এই অবক্ষয়ের কারণ হিসেবে অনেকে সংগঠনটির ভেতর শিবির ঢুকে পড়ার কথা বলে থাকেন। এ বিষয়ে আমার একটি অভিজ্ঞতা শেয়ার করা প্রয়োজন বলে মনে করছি। ২০০০ সালে আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই, আমার ছাত্রাবাস সার্জেন্ট জহুরুল হক হল তখন ছাত্রলীগের দখলে ছিল। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর হলটি ছাত্রদল দখল করে নেয়। তাদের ঘাড়ে চেপে আসে শিবির। হল দখল হতে না হতেই ছাত্রলীগের একদল নেতা শিবিরে যোগ দেয়। পরে জানা যায় যে এরা প্রথম থেকেই ছাত্রলীগের ভেতর শিবিরের এজেন্ট হিসেবে কাজ করতো। আরেকদল যোগ দেয় ছাত্রদলে। বাকিরা হল ছেড়ে পালায়। অর্থাৎ ছাত্রলীগে যে ঘাপটি মারা শিবির আছে এটা জ্বলজ্যান্ত সত্যি, কোন ধরনে প্রপাগান্ডা নয়। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতেই একবার রব উঠেছিলো যে ছাত্রলীগের নেতৃত্বেই শিবিরের লোকজন আছে।

এ প্রসঙ্গ ধরেই পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ ও ছাত্রলীগে শিবির ঢুকে পড়েছে টাইপের বক্তব্য দিয়েছিলেন। তার ওই বক্তব্যের পর ছাত্রলীগের দেখভাল করার দায়িত্বে থাকা নেতাদের ভেতর রদবদল করা হয়।অনেকে ভেবেছিল এবার হাইকমান্ড ছাত্রলীগে শুদ্ধি অভিযান চালানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করবে। কিন্তু কীসের কী! সংগঠনটি যা ছিল তাই আছে। দল ক্ষমতায় আসা মাত্রই তারা হয়ে উঠেছে ঘাপটি মারা জামাত শিবির আর বখাটে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য। এই সন্ত্রাসীরা আবার যখন যে দল ক্ষমতায় যায় সে দলে ভিড়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে আমি ছাত্রদলের ভেতর এসব সন্ত্রাসীর আনাগোনা সবচেয়ে বেশি দেখেছি। ক্ষমতায় থাকাকালে বিএনপির ধারণা ছিল বিরোধী দলকে মোকাবিলায় তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলই যথেষ্ঠ। ১৯৯৬ ও ২০০৬ সালে ক্ষমতা হারানোর পর সেই পরাক্রমশালী ছাত্রদলের চিহ্ণও খুঁজে পাওয়া যায়নি। সন্দেহ নেই গা বাঁচাতে ছাত্রদলের সুবধাবাদী অনেকেই এখন ভোল পাল্টিয়ে ছাত্রলীগের বেশ নিয়েছে। এবং সংগঠনের নাম ভাঙ্গিয়ে খাওয়া নেতাকর্মীদের পাশাপশি দলের আদর্শহীন এসব কর্মীই, কেবল ছাত্রলীগকে নয় পুরো সরকারকে ডোবাচ্ছে।যার ফলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচালের দাবীতে ছাত্রশিবির যখন আদাজল খেয়ে সংঘবদ্ধভাবে মাঠে নেমেছে। রাজপথে জ্বালাও পোড়াও করছে। তার বিপরীতে ছাত্রলীগের কোন সক্রিয়তা নেই, কোন কর্মসূচী নেই। নিরীহ পথচারীদের কুপিয়ে বা স্কুল বালিকার ওড়না টান মেরে বা সাধারণ ছাত্রদের ভর্তি ফি কমানোর আন্দোলনে হামলা করে পত্রিকার শিরোণাম হতে পে্ই তারা বেশি আনন্দিত! এ কারণেই আওয়ামী লীগও ক্ষমতা হারালে ছাত্রলীগকে কোথাও আর খুঁজে পাওয়া যায় না। ১৯৭৫ সালের পর বলি আর ২০০১ সালের বিপর্যয়ের পর বলি, ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগকে ঝড় সামলাবার মতো কোন রসদই যোগান দিতে পারেনি। বলা বাহুল্য যে আওয়ামী লীগও ক্ষমতা হারালে ছাত্রলীগের অবস্থা এবার তার চেয়েও হাজার গুণ খারাপ হবার সম্ভাবনা প্রবল।

ছাত্রলীগের এসব নেগেটিভ কর্মকাণ্ডে না দলের না সরকারের না জনগণের লাভ হচ্ছে। এমনকী সাধারণ মানুষ যারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে জনমত সৃষ্টির জন্য রাত দিন খেটে অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলছে তাদের সব পরিশ্রমই ছাত্রলীগের চাপাতির নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে। এতে আখেরে যুদ্ধপরাধীদের পক্ষের শক্তিরাই লাভবান হচ্ছে। তারা জানে, কোন রকমে একবার বিচার কাজ ঠেকানো গেলে ভবিষ্যতে কারো পক্ষেই এই বিচার করা আর সম্ভব হবে না। তাই তারা দেশে বিদেশে কোটি কেটি টাকা খরচ করে, এর ওর ওপর গোয়েন্দাগিরি করে, এই রাষ্ট্র ওই রাষ্ট্রের মাধ্যমে অনৈতিক চাপ দিয়ে এই বিচার প্রক্রিয়াটি ভণ্ডুল করতে মরিয়া। প্রয়োজনে তারা সারা দেশে আগুন ধরিয়ে দিতে পিছ পা হবে না বলেও ঘোষণা দিয়েছে। হতাশার কথা হচ্ছে, তাদের এতোসব কূটকৌশলে মানুষ যতো না বিভ্রান্ত হচ্ছে তার চেয়ে বেশি হচ্ছে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে। আর এ কারণেই গত কয়েক সপ্তাহ ধরে জামাত শিবির সারা দেশে যে অবিশ্বাস্য ভয়াবহ তাণ্ডব চালিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করলো, বিশ্বজিত হত্যার মাধ্যমে তার পুরোটাই ছাত্রলীগ আড়ালে পাঠিয়ে দিয়ে নিজেরাই খলনায়ক বনে গেল! এমনকী বিরোধী দলও এই সুযোগে তাদের অবরোধ ডাকাকে জায়েজ প্রমাণ করে নিয়ে আরেকটি বাড়তি হরতাল জনগণের উপর চাপিয়ে দিল!

ছাত্রলীগের এমন হঠকারী আচরণ আজকের নয়। গত ৪ বছরে কারণে অকারণে বহুবার তাদের কারণে সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে। তারপরও সরকারের হুশ হয় নি। অথচ অনেক আগে থেকেই ছাত্রলীগ নামধারী সন্ত্রাসীদের দল থেকে বহিষ্কার করে বিচারের মুখোমুখি করলে আজ ছাত্রলীগের কারণে আওয়ামী লীগকে এতো দুর্নাম কুড়াতে হেতো না। এমনকী বিশ্বজিত হত্যার পরপরই যদি সরকার দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে খুনিদের ধরে বিচারের আওতায় আনতো তাহলেও মানুষ সাধুবাদ জানাতো, নিশ্চিন্ত বোধ করতো, গত ৪ বছরে সরকারের করা ভুলগুলোকেও তারা নিরীহ চোখে দেখতো।তা না করায়, মাত্র ৫ মিনিটের একটি ঘটনার কারণে মানুষ আওয়ামী লীগের গত ৪ বছরের আমলনামা ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে দেখতে শুরু করে দিয়েছে, যা রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের জন্য চরম অশনী সংকেত।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব যদি মনে করে “যুদ্ধাপরাধীদের বিচার” এই ইস্যুটির কারণেই মানুষ তাদেরকে সমর্থন দিয়ে যাবে, তা ভুল। মুক্তবুদ্ধির মানুষেরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অবশ্যই চায়। তার পাশাপাশি মানুষ আইনের শাসন চায়,ব্যক্তিগত জানমালের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চায়। এবং সেটি নিশ্চিত করতে হলে ছাত্রলীগকে আগে সামলানো প্রয়োজন।ছাত্রলীগে শিবির ঢুকে স্যাবোটাজ করছে এ ধরণের কথা বলে পার পাবার সময় পার হয়ে গেছে।নিজেদের ছাত্র সংগঠনে যদি শিবির ঢুকে শেকড়বাকড় গেড়ে থাকে তবে তা দূর করার দায়িত্ব স্বয়ং আওয়ামী লীগের, আম জনতার নয়।এই অবস্থায়, দুষ্ট গরুর চেয়ে শূণ্য গোয়াল অনেক ভালো এটি আওয়ামী নেতৃত্ব যতো তাড়াতাড়ি বুঝবে ততো তাড়াতাড়িই তারা তাদের অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারবে। তা না হলে ছাত্রলীগের বিশ্বজিত হত্যার মতো ৫ মিনিটের কর্মকাণ্ডে সরকারের প্রতি জনসমর্থনের পারদ যে টুকু অবশিষ্ট আছে আগামী এক বছরে তা দিনকে দিন কমতেই থাকবে। আর যেহেতু দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ইতিমধ্যেই যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে মাঠে নেমেছে সেহেতু আওয়ামী লীগের লক্ষ্যে পৌঁছানোটা যুদ্ধাপরাধী মুক্ত বাংলাদেশের জন্য কেন একান্ত প্রয়োজন, তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।

( সংগৃহীত )

 

টিউনারপেজের নতুন টিউন আপনাকে ইমেইল করব?
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting

4 মন্তব্য

  1. জানিন ভাই আপনার কথায় মনটা খুব খারাপ হইলো আমি কোন দল সমর্থন করি না । দয়া করে এই পোস্টটা দেখবেন ।http://www.tunerpage.com/archives/194828

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here

one × four =