বিগ ব্যাং – কিভাবে শুরু হয় এই মহাবিশ্ব?

4
2408

একদিন সময়েরও জন্ম হলো। কোন বারে তা ? কেমন দিনে ? মেঘলা মেদুর সন্ধ্যায় ? বৃষ্টিতে ? এক চিলতে বিকেলে ? রোদ্দুরে ? কেমনইবা ছিল সেই ‘তারপর’ ? সময়েরইবা কি দায় ছিল অস্তিত্বের ? জানতে হলে কেউ চাইলে চলে যেতে পারেন ব্রহ্মান্ডের নিষিদ্ধ জনপদে। শোন যায় মহাবিস্ফোরণের উপকথায় সেখানে এক অজানার বাড়ি আছে। হয়ত সেখানে অমাবস্যার রাতে ঘুরঘুটি অন্ধকারে উত্তরেরা কারো অপেক্ষায় থাকে। হয়ত, শুধু হয়ত।

Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting

ক্ষণিক
‘বিজ্ঞান কি বলতে পারে মাহাবিশ্বের শুরু কবে ?’ বহু বছর ধরেই এ প্রশ্নটি বিজ্ঞানীদের ঘুম নষ্টের কারণ হয়ে আছে। আস্তিকেরা এটাকে দেখলেন ঈশ্বরের অস্তিত্বকে লোপ করবার চূড়ান্ত প্রশ্ন হিসেবে। আর নাস্তিকেরাও সাবধানে খানিকটা নড়েচড়ে বসলেন যেহেতু অস্তিত্বহীনতা (!) থেকে মহাবিশ্বের উৎপত্তির কল্পনাটা (Coming into being from nothing)  যেন ধর্মীয় সৃষ্টিতত্ত্বের কথাই বলছে বলে মনে হয়। ১৯৯১-তে কোনো এক জ্বালাময়ী(!) পত্রিকায় জ্যোর্তি বিজ্ঞানীকে বিদ্রুপ করে এই প্রসঙ্গে লেখিকা Fay Weldon-এর একটি মজার মন্তব্য ছাপা হয়েছিল- ‘Who cares about half a second after the Big Bing’ কিংবা আর একটু পেছনে ফিরে বলা যায়- ‘What about half a second before’ ? সত্যি কি ছিল ? খুব সরল করে বলতে গেলে উত্তরটা সৃষ্টির ‘আধ সেকেন্ড’ আগে বলতে কিছু নেই।
মজাটা হলো, এ প্রশ্নের উত্তর যদি পেতে হয় তবে চলে আসতে হবে অন্য একটি প্রশ্নে কেমন করে আমরা জানি যে মহাবিশ্বের অস্তিত্ব অনন্ত কাল ধরে ছিল না। অধিকাংশ বিজ্ঞানীই অনাদি অনন্তকালের মহাবিশ্বের ধারণাকে বাতিল করে দেন তাপগতিবিদ্যা (Thermodynamics) এর দ্বিতীয় সূত্রের কারণে। সাদা কথায় যার বক্তব্য হলো প্রতিটি প্রক্রিয়াতে বিশৃংখলা (Entropy)  সময়ের সাথে বৃদ্ধি পেতে থাকে। মহাবিশ্বের স্বরূপ জানবার শল্য চিকিৎসায় এ সূত্রের প্রয়োগ করতে গিয়ে দেখা গেল যে আমাদের বর্তমান মহাবিশ্ব একমুখি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলার একটি পরিণতিকে আলিঙ্গন করতে এগিয়ে চলেছে। কিন্তু মহাবিশ্ব যদি অনাদি কাল ধরে থাকত তাহলে অনন্ত এখনকার রূপে নিশ্চয়ই থাকত না। তাছাড়া সূর্য এবং সূর্যসদৃশ নক্ষত্রগুলো মহাবিশ্বের সঞ্চিত কার্যকর শক্তি ক্রমাগত শোষণ করে একমুখি প্রক্রিয়ায় জ্বলছে। মহাবিশ্ব মহাকাল ধরে বিরাজ করলে বহু আগেই এই নির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তি নিঃশেষিত হয়ে যাবার কথা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তো তা নয়।
ব্রহ্মান্ডের উৎপত্তির উৎস হিসেবে যে আদি মহাবিস্ফোরণের (Big Bang) কথা বলা হয়ে থাকে তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ হিসেবে ৩টি পর্যবেক্ষণলব্ধ কারণ দর্শানো হয় যে প্রধান ও প্রথম কথা হলো, আমাদের মহাবিশ্ব ক্রমাগত সম্পসারিত হচ্ছে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে মহাবিশ্বের সবদিকে ছড়িয়ে থাকা একটি সমসত্ত্ব তাপীয় বিকিরণের অস্তিত্ব যা আসলে মহাবিস্ফোরণের মুহূর্তে উদ্ভুত প্রচন্ড তাপের ভগ্নাবশেষকে ব্যাখ্যা করে। আর তৃতীয়টি হলো মহাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা রাসায়নিক মৌল এবং যৌগের তুলনামূলক আধিক্য যাদের সৃষ্টি হয়েছে মহাবিস্ফোরণের পরবর্তী অতি উত্তপ্ত ঘনীভূত পর্যায়ে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার মাধ্যমে।
কিন্তু এগুলোর পাশাপাশি রয়ে গেছে আরো কিছু ছোট-খাট একটি প্রশ্নের সারি। কি কারণে সেই আদি বিস্ফোরণ ঘটেছিল ? সেই বিস্ফোরণের কেন্দ্র কোথায় ? আমাদের ব্রহ্মান্ডের প্রান্তই বা কোথায় ? মহাবিস্ফোরণ কেন একটি কৃষ্ণ গহ্বরে পরিণত হয়ে যায় নি ? প্রশ্নগুলোকে মহাবিস্ফোরণ সম্পর্কে যথেষ্ট উপযুক্ত বলে মনে হতেই পারে। কিন্তু সত্যি কথাটি হলো এ প্রশ্নগুলো মহাবিস্ফোরণ সম্পর্কে যথেষ্ট ভুল একটি চিত্র তুলে ধরে। তাই সবার প্রথমে ধারণা করতে হবে মহাবিশ্বের প্রসারণ বলতে আসলে কি বোঝায়। এটা নিশ্চয়ই বোঝায় না যে ছায়াপথগুলো একটি বিস্ফোরণ থেকে প্রাপ্ত বেগের কারণে পরস্পর থেকে দূরে, বহুদূরে শূণ্যের মধ্যে ছুটে যাচ্ছে; বরং ছায়াপথসমূহের পরস্পরের মধ্যবর্তী স্থানগুলোই প্রসারিত হচ্ছে।
আর স্থান যে এভাবে সংকুচিত বা প্রসারিত হতে পারে তা বহু পরীক্ষিত আইনস্টাইন এর সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্বের একটি প্রধান অনুসিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তনুযায়ী স্থান কাল কোনো অবিনশ্বর স্থির ক্ষেত্র নয় বরং মহাকর্ষ দিয়ে প্রভাবিত কোন অঞ্চল। স্থান-কাল জ্যামিতিতে এ ধরণের অঞ্চলকে বলা হয় বক্রতা (Curvature)। আর বক্রতা ঘটে যখন মহাকর্ষের প্রভাবে স্থান এবং কাল একই সঙ্গে বেঁকে যায়।
একটি খুব সহজ অথচ ছোট্ট উদাহরণ  হতে পারে যখন ফুঁ দিয়ে কোনো বেলুনকে ফোলানো হয় যার গায়ে রয়েছে অসংখ্য ফুটকি বা ছোপ। যখন বেলুনটি ফুলতে থাকে তখন বেলুনের গায়ে ঐ ছোপগুলোর মাঝের দূরত্বও প্রসারিত হতে থাকে। এক্ষেত্রে ঐ ছোপগুলোকে আমরা ছায়াপথ হিসেবে ধরে নিতে পারি। তবে এটা মনে রাখতে হবে যে এই উদাহরণে বেলুনের পৃষ্ঠই শুধু আমাদের প্রসারমান মহাবিশ্বে, বেলুনের ভেতরের আয়তনটুকু নয়। তাই এখন যদি আমরা উল্টো করে দেখি অর্থাৎ ফাঁপানো বেলুন থেকে (এ পর্যায়ে বেলুনটাকে সম্পুর্ণ গোলাকার অবস্থায় থাকতে হবে) ধাপে ধাপে তার প্রাথমিক চুপসে থাকা অবস্থার দিকে ফিরে যাই তাহলে মহাবিশ্বের আরম্ভের চিত্রটা কিছুটা হয়ত বোঝা যাবে।
তাই এভাবেও বলা যেতে পারে, মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে স্থান তার অস্তিত্ব লাভ করল এবং আদি শূণ্যের মধ্যে বৃহৎ থেকে বৃহত্তর আয়তনে ছড়িয়ে যেতে থাকল। সম্ভবত আদি বিস্ফোরণের সাথে সাথেই কিংবা তার সামান্য পরেই মহাবিশ্বের যাবতীয় ভর ও শক্তির উৎপত্তি ঘটে এবং সময়ের সাথে তা মহাবিশ্বের সবখানে ছড়িয়ে যায়। এটা একটু জোর দিয়েই বলাই শ্রেয় যে, যে আদিবিন্দু থেকে এইসব অঘটনের জন্ম তা আসলে কোনোখানেই অবস্থিত নয়। হ্যাঁ ভয়ানক দুর্বোধ্য একটি ধারণা! এটা এমন কোনো বিন্দু নয় যাকে আমরা অসীম শূণ্যের মধ্যে চুপ করে বসে থাকা কোনো বস্তু বলে ভেবে নিতে পারি। প্রকৃতপক্ষে এই বিন্দু আসলে তা যেখানে স্থান বলতে যা বোঝানো  গেল (সত্যিই গেল কি!) তা প্রচন্ড সংকুচিত অবস্থায় আবদ্ধ ছিল। আবার এই বিন্দুও সে অসীম সময় ধরে সেখানে বসে ঢুলছিল তাও নয়। বরং বলা যেতে পারে সেটা যেন এইমাত্র সৃষ্টি হলো আর ঠিক তক্ষুনই প্রসারিত হলো। তাই কেন এটা একটি কৃষ্ণ গহ্বরের পরিণত হলো না এ প্রশ্ন অবান্তর। এদিকে আপেক্ষিকতা তত্ব আমাদের আরো বলে যে মহাকালের কোনো সময়ে বা মুহূর্তে এ বিন্দু অবস্থান  করছিল সে প্রশ্নটিও অহেতুক। কেননা কালের নিজেরই জন্ম হলো ঐ বিন্দু থেকে। কি ভয়ানক হেঁয়ালি!
তবে এটিই হচ্ছে মহাবিস্ফোরণ তত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল দিক। ঘটনাটা অনেকটা এমন  যে সত্যিকার অর্থে মহাবিশ্বের উৎপত্তি কার বা সময়কে সাথে করে অর্থাৎ কোনো নির্ধারিত কালের মধ্যে বা কোনো নির্দিষ্ট সময়ে নয়। আপেক্ষিকতা তত্ত্বের প্রধান বক্তব্যই হচ্ছে যে, স্থান এবং কাল হলো মহাবিশ্বেরই অংশ। এরা কোনো ব্যাখ্যার অতীত পটভূমি নয় যেখানে মহাবিশ্ব নিজেই ঘটে চলছে। তাই  আমাদের রহস্যময়ী মহাবিশ্বের উৎপত্তি নিশ্চিতভাবেই স্থান ও কালের উৎপত্তির কথা বলে। তারপরও প্রশ্ন করা যেতে পারে তেমন একটি উৎপত্তির উৎস আমরা কোথায় খুঁজব ? তাহলে আবারো ধর্না দিতে হবে আপেক্ষিকতার কাছে। সে বলছে যে, স্থান এবং কাল কিছু বিশেষ নির্দিষ্ট রূপ ধারণ করতে পারে। তাদেরকে বলা হচ্ছে Singularities  আর বাংলায় বলা যেতে পারে ‘এককত্ব’। যেমন কৃষ্ণ গহ্বরের কেন্দ্রে রয়েছে এমন এককত্বের অস্তিত্ব। আরেকটি উদাহরণ হতে পারে মহাবিস্ফোরণের মুহূর্তে স্থান কালের যে আদি অবস্থা ছিল সেরকম কিছুর কথা। ধারণাটা এমন যে, সময়ের যতই পেছনে যাওয়া যাবে মহাবিশ্ব ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসবে এবং স্থান কালের বক্রতা অসীম হতে পারে একটি চোঙের সাথে, যেটি সরল হতে হতে একটি বিন্দুতে এসে থামে। এবং ঠিক এই বিন্দু থেকেই শুরু কাল এবং স্থানের। যখনই এ ধারণাটা গ্রহণ করে নেওয়া গেল তখনই মহাবিস্ফোরণের আগে কি ঘটেছিল- এই প্রশ্নের আর কোনো অর্থ থাকল না।
যেহেতু কালের শুরুই মহাবিস্ফোরণ থেকে তাই মহাবিস্ফোরণের আগে কিছুই ছিল না। কিন্তু এই কিছু না থাকা কে অনেকে ভুল করে থাকেন কোনো শূণ্যস্থান হিসেবে। অথচ এটা ভেবে নেয়া টাই ভীষণ ভুল। যেহেতু আদিবিস্ফোরণের আগে স্থানও ছিল না।

তথাকথিত এই কিছুই না থাকা অর্থাৎ ‘Nothing’-কে নিয়ে আরেকটু ঘোট পাকানো যেতে পরে। যেমন : Stephen Hawking একবার প্রশ্ন করলেন উত্তর মেরুর উত্তরে কি ? এক্ষেত্রেও এই প্রশ্নের উত্তরে(!) বলা যায় ‘Nothing’  কিন্তু তার মানেত এই বোঝায় না যে উত্তর মেরুর উত্তরে রয়েছে কোনো জন মানুষহীন, প্রাণহীন, ধুসর, দুর্গম রহস্যময় একটি অঞ্চল। বরং বোঝায় সেই অঞ্চলকে যার কোনো লৌকিক এবং যৌক্তিক অস্তিত্ব নেই। মহাবিস্ফোরণের আগের অবস্থাটাও সেরকমই।
এবং এটা ভেবে নেয়াটাও খুব স্বাভাবিক নয় কি উজবুক বিজ্ঞানীর দল জানেনা তো সাদা কথাই বলেই দাওনা আমরা আসলে কিসসু জানিনে বাপু। এত হেঁয়ালির দরকারটা কি? কিন্তু ঠান্ডা মাথায় (!) ভাবতে হবে একটু। আমাদের মস্তিষ্ক সবকিছুর পেছনেই কোনো কারণ এবং ফলাফলকে খোঁজে। যেহেতু পার্থিব সাধারণ ঘটনাগুলো কোন না কোনো কারণের ফলে ঘটে থাকে। কখনো হয়ত একটি ঘটনার পেছনে কারণ হিসেবে আমরা আরেকটি ঘটনা খুঁজি। এভাবে ঘটনার পরে ঘটনা সাজিয়ে গড়ে উঠে একটি চক্র যার শুরুটা কোথায় সেটা ভাববার খুব একটা প্রয়োজন পড়ে না। আবার কখনো বা একটি সুনির্দ্দিষ্ট প্রথম কার্যকারণ বা প্রভাবক থেকে একগুচ্ছ ধারাবাহিক ঘটনার সূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু জ্যোর্তিবিজ্ঞানের এরকম একটি সমস্যায় এসে আমাদের ভাবতে হবে যে মহাবিশ্বের উৎপত্তি এমন একটি ঘটনা যার পেছনে প্রকৃত অর্থেই সাধারণ-অসাধারণ, প্রাকৃতিক-অপ্রাকৃতিক কোনো কার্যকারণ নেই। যেহেতু মহাবিস্ফোণের আগে কোনো কারণ থাকবার মত কোনো ক্ষেত্রই ছিল না।
তাহলে কি এখানে এসেই থমকে দাঁড়াতে হবে? তা মোটেই না, প্রশ্ন আরো আছে। যেমন- হঠাৎ করেই সেই আদি বিন্দু থেকে স্থান এবং কালের জন্ম হতে গেল কেন ? এ সম্পর্কে সাম্প্রতিক সময়ে একটি ধারণা বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। আর তাহলে কণাবাদী বলবিদ্যা (Quantum Mechaincs) -এর একটি খুব সাধারণ প্রাকৃতিক পরিনতি। এই বলবিদ্যার মাথাব্যাথা আসলে যাবতীয় পরমাণু ও পারমাণবিক কণার আচরণ নিয়ে। পদার্থবিদ্যার এই শাখাটিতে রয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি তত্ত্ব (Heisenberg) -এর অনিশ্চয়তা নীতি। যার বক্তব্য ভরবেগ ও অবস্থান একই সঙ্গে সম্পূর্ণ নির্ভূল করে মাপা যাবে না। অর্থাৎ যদি কণার ভরবেগ পুরোপুরি নির্ভূল করে জানা যায় তবে তার অবস্থান সম্পর্কে সঠিক পরিমাপ পাওয়া যাবে না। তেমনি অবস্থান সঠিক জানতে পারলে ভরবেগ জানা যাবে না। অর্থাৎ অবস্থান বা ভরবেগ সম্পর্কে তথ্যের নির্ভূলতা বাড়লে যথাক্রমে ভরবেগ বা অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চয়তা কমবে। এবং এই অনিশ্চয়তা কণার একটি স্বতঃস্ফূর্ত মৌলিক ধর্ম প্রকৃতির গভীরে প্রোথিত একটি ধর্ম। কোনো রকম কোনো কারণ ছাড়াই এটা ঘটে। একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। ইউরেনিয়াম পরমাণু তার নিউক্লিয়াসে পারমাণবিক প্রক্রিয়ায় তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের শিকার হয় এবং একটি নির্দিষ্ট সময় পরে (অর্ধায়ু বা Half life)  নিউক্লিয়াসটি প্রাথমিক অবস্থা থেকে অর্ধেক ক্ষয়ে যায়। অনিশ্চয়তা নীতি বলছে ঠিক কোন সময়ে নিউক্লিয়াসটি ক্ষয়প্রাপ্ত হবে তার কোনো চূড়ান্ত ভবিষ্যৎদ্বাণী করা সম্ভব নয়। এখন কেউ যদি তার সামনেই চাক্ষুষ এরকম একটি নিউক্লিয়াসকে ক্ষয়ে যেতে দেখে এবং প্রশ্ন করে কেন সেই ঘটনাটি ঠিক ঐ মুহূর্তে ঘটল, অন্য সময়ে ঘটল না ? সে প্রশ্নের কোনো মানে নেই। কারণ ঐ ঘটনাটি একটি সাধারণ প্রাকৃতিক ঘটনা এবং ঐ সময়ে ঘটবার পেছনে এর  কোনো কারণ থাকবার কোনো প্রয়োজন নেই। হ্যাঁ, ঘটনাটা অবশ্যই অন্য কোনো মুহূর্তেও হয়ত ঘটতে পারত। কিন্তু সোজা কথা, ঘটনাটি শুধুই ঘটেছে। জট কি কিছুটা খুলেছে? নইলে কিন্তু ঘোর মুশকিল।
সে যাক। এখন কাজ হচ্ছে স্থান ও কালের উপ রের ‘প্রলাপগুলো’র প্রয়োগ। অর্থাৎ মহাকর্ষ ক্ষেত্রের ওপার কণাবাদী বলবিদ্যার প্রয়োগ। কারণ স্থান কাল হলো মহাকর্ষের প্রতিক্রিয়া। তবে মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে কণাবাদী বলবিদ্যার প্রয়োগে মহাকর্ষের কিছু অসভ্য লম্প ঝম্পের সমস্যার কারণে পদার্থবিদ্যাদের পা পিছলে যায়। তা সত্ত্বেও ঐসব সমস্যাগুলো গুম (!) করে আমরা ভেবে নিতে পারি যে আদিবিন্দু থেকে স্থান ও কালের জন্মাবার জন্য কোনো কারণের প্রয়োজন নেই, এটা শুধু ঘটেছে মাত্র। এবং আমরা দেখেছি যে কণাবাদী বলবিদ্যা কিভাবে তাকে সমর্থন করে।
তবে এই ঘটনাটি অস্পস্ট বা ধোঁয়াটে হলেও এটা অনুমান করা ভুল হবে না যে এটার পেছনে স্থান কালের মধ্যকার কোনো পরকীয়া সম্পর্কের প্রভাব রয়ে গেছে। আপেক্ষিকতা তত্ত্ব স্থান এবং কালের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য করলেও আইনষ্টাইন এটা দেখিয়েছেন  যে এ দুইয়ের মধ্যে সম্পর্কটা খুব নিবিড়। কণাবাদী বলবিদ্যা একটি নতুন সম্ভবনার কথা বলেছে যে, Ultramicroscopic   পর্যায়ে এসে স্থান এবং কালের পার্থক্য অনেকটাই দূর হয়ে যায়। ১৯৮২-তে Hawking এবং Jim Hartle বললেন, যতই আদি থেকে আদিতে ফিরে যাওয়া যাবে কাল ততই স্থানের মাত্রা (দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ইত্যাদি) লাভ করতে থাকবে। অর্থাৎ যে কালিক সময়কে আমরা ঘড়ির কাঁটায় মাপি সে তার বিমূর্ত কালিক বৈশিষ্ট্যগুলো হারিয়ে মূর্ত স্থানিক বৈশিষ্ট্য লাভ করবে। এই বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন কিন্তু হঠাৎ করেই ঘটবে না, বরং অনিশ্চয়তা নীতির অনুসারে ঘটবে একটি বিশেষ পর্যায়ে এসে। অর্থাৎ Hawking এবং Hartle এর কথানুসারে একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় স্থান কালের উদ্ভব হবে। তাই কাল আদিবিন্দুর এপারে ঠিক কোনো মুহূর্তে আরম্ভ হল তেমন কোনো সুনির্দিষ্ট প্রথম মুহূর্ত নেই। আবার আদিবিন্দুর ওপারেও যে অসীম সময় ধরে তার অস্তিত্ব ছিল এমন ভাবভারও কোনো কারণ নেই।

জলকেলী
মহাবিশ্বের উৎপত্তি নিয়ে স্থান কালের জলকেলীতো অনেক হলো। এবারে জল একটু ঘোলাও করা যাক! ১৯৭৩-এ Edward Tryon এক কিম্ভুত তত্ত্ব এনে হাজির করলেন এই বলে যে, স্থানকাল হচ্ছে চিরন্তন আর তা মোটেও পদার্থ (Matter) নয়। তবে উৎপত্তি ঘটে মহাকালের সুবর্ণ অতীতে কোনো পারমাণবিক পর্যায়ে শূন্যক্ষেত্রের অস্থিরতার (Quantum Vacuum Fluctuations) ফলে সৃষ্ট এক ব্যাখ্যাতীত শূন্যতা (Void)  থেকে। এখন কেউ যদি এতত্ত্ব সমর্থন করেন এবং এও মেনে নেন যে মহাবিশ্বের উৎপত্তির পূর্বে কিছু ছিল না তাহলে কিন্তু এতক্ষণের সব প্যাঁচাল ভন্ডুল হয়ে যাবে। যেহেতু তথাকথিত Nothing  থেকে মহাবিশ্বের উৎপত্তি আর পরমাণু পর্যায়ের শূণ্যতার পটভূমি থেকে মহাবিশ্বের উৎপত্তি অবশ্যই এক নয়।
দেখা যায় যে, যদি কোনো সুনির্দিষ্ট সম্ভাবনা থেকে বিস্ফোরণের পথ ধরে পদার্থের জন্ম হয়ে থাকে তবে তা ঘটাতে হবে এক অসীম সময় আগে। ঠিক তক্ষুণিই এসে জুড়ে বসে তাপ গতিবিদ্যার সেই দ্বিতীয় তত্ত্বের উপদ্রব। তাই এই ধারণাটিকে মেনে নিতে কিছু ঘাপলা রয়েছে বৈকি।
এদিকে এতক্ষণ মহাবিশ্বের উৎপত্তির পেছনে আ্মরা পদার্থবিদ্যার কোনো তত্ত্বকে দাঁড় করাবার চেষ্টা করেছি। এখন যখন মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে তখন  এটা ভেবে নেয়াটা স্বাভাবিক যে পদার্থবিদ্যার নীতিগুলো মহাবিশ্বের উৎপত্তির আগেও হয়ত বিরাজ করত। কিন্তু আসলে তা হয়ত নয়- (হয়ত তা উত্তর মেরুর উত্তরে কি কল্পনা করবার চাইতে বেশি কিছু নয়) প্রকৃতপক্ষে পদার্থবিদ্যার নীতিগুলো কেবল প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোকে ব্যাখ্যা করে ; এদের  মধ্যে বিরাজ করে না। আবার এর অর্থ এও নয় যে এই নীতিগুলো মহাবিশ্বের উৎপত্তির সাথে সাথে অস্তিত্ব লাভ করেছিল। তাই যদি হতো তবে মহাবিস্ফোরণের আদিবিন্দুতে আমরা তাদের প্রয়োগ করতে পারতাম না। অতএব মহাবিশ্ব কি করে অস্তিত্ব লাভ করল তা জানবার বাসনা থেকে থাকলে এটাই আমাদের ধরে নিতে হবে যে নীতিগুলোর রয়েছে বিমূর্ত, চিরন্তন শাশ্বত চরিত্র। নইলে এইসব রহস্য সমাধানে কুয়াশাচ্ছন্ন এক বিজন দ্বীপের মধ্যে বসে দৈবাৎ কোনো জাহাজের নোঙরের প্রতীক্ষার মতো অনন্তকালের প্রহর গুণতে হবে! এবং  এখনই সব কিছু শেষ হয়ে গেল ন্ াআরো প্রশ্ন আছে।ঐ সূত্রগুলো এলো কোত্থেকে আর কেনইবা তারা আমরা তাদের যেমন দেখি সেরকম না হয়ে অন্যরকম হলো না ? সুদর্শন প্রশ্ন বটে! এক্ষেত্রে এসে আমাদের পূর্বে উল্লেখিত প্রথাগত কারণভিত্তিক ঘটনাচক্রকে একপাশে সরিয়ে ব্যাখ্যাভিত্তিক ঘটনাচক্রের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে। আগে যেখানে একগুচ্ছ ঘটনা ঘটবার পেছনে সবচে প্রথম কারণটিকে ক্রমে ক্রমে খোঁজা হত, এখন সেখানে ঘটনাগুলোকে কেবল ক্রমশ ব্যাখ্যা করা হবে সবচে প্রথম ব্যাখ্যাটি কোত্থেকে শুরু হলো সেটা দিয়ে।
আজকাল পদার্থবিদ্যার কাজ হলো তত্ত্বগত অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিশ্বকে ব্যাখ্যা করা। কিন্তু যখনই তত্ত্বকে নিজেকে ব্যাখ্যা করবার অধিবিদ্যাগত সমস্যার উদ্রেক হয তখনই বিজ্ঞানীরা কয়েকটি পথে হাঁটেন। একদল হাঁটেন এই বলে যে নীতিগুলোকে নির্মম সত্যি হিসেবে মেনে নেয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। আরেকদল পথ দেখান যে যৌক্তিক প্রয়োজনেই নীতিগুলো এমন। অন্যরা বলেন, আসলে মহাবিশ্ব রয়েছে বহু যার প্রতিটিতে ভিন্ন ভিন্ন নীতির দল কাজ করে। এরমধ্যে কিছু রয়েছে আমাদের মহাবিশ্বের অনুরূপ যেখানে এমন বিশেষ কিছু নীতি বিরাজ করে যাতে প্রাণের এবং আমাদের মতো বুদ্ধিমান প্রাণীর উৎপত্তি ঘটে। কিন্তুু কেউ কেউ ভজঘট বাধিয়ে বসেন এই ভেবে নীতিগুলোর আসলে কোনো প্রকৃত অস্তিত্ব নেই। এসবই প্রকৃতপক্ষে ভৌত জগৎ সম্পর্কে ধারণা পেতে মানুষের কল্পবিলাসী ভাবনা। এতে লাভটা হয় কি, মহাবিশ্বের জন্মরহস্য উদ্ঘাটনের বাকি সম্ভাবনটাও ভেস্তে যায়! তবে অধিকাংশ পদার্থবিদ এটা গ্রহণ করে নেন যে, পদার্থবিদ্যার নীতিগুলোর এক ধরনের একান্ত নিজস্ব বাস্তবতা আছে। সে কারনেই যৌক্তিতভাবে বলা যায় যে, ঐ নীতিগুলো এই মহাবিশ্বের উৎপত্তির আগে থেকেই ছিল। তার মানে হলো মহাবিশ্বকে বিশ্লেষণ করবার প্রথম যৌক্তিক ব্যাখ্যামূলক পটভূমি গড়ে তোলা এই নীতিগুলো (ব্যাখ্যাভিত্তিক ঘটনাচক্র অনুসারে)। যেভাবে ইউক্লীডিয় স্বতঃসিদ্ধগুলো আধুনিক জ্যামিতির যৌক্তিক ভিত হিসেবে কাজ করে অনেকটা সেরকম। অবশ্য এই সূত্র বা নীতি গুলোই যে ব্যাখ্যা ভিত্তিক চক্রের প্রথম ধাপ এটা কেউ প্রমাণ করতে পারে না। কিন্তু এটা ঠিক যে যখনই মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করবার প্রথম ধাপটি খোঁজা হয়, তখন পদার্থবিদ্যার নীতি দিয়েই যে শুরু করতে হবে এমনটাই মনে হয়।
কেউ এটাও বলতে পারেন যে, আধুনিক জ্যামিতির উৎস খুঁজতে গিয়ে তিনি ইউক্লীডিয় স্বতঃসিদ্ধ দিয়ে শুরু করবেন না। তিনি বরং বেছে নেবেন পিথাগোরাসকে। দুটোর কোনোটাতেই কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু বিজ্ঞান বা গণিতের কাজটাই হলো সহজে, অর্থবহ করে জগৎকে ব্যাখ্যা করা। এবং ইউক্লীডিয় স্বতঃসিদ্ধ বা পদার্থবিদ্যার সূত্র উভয়েই এই কাজাটি দক্ষতার সঙ্গে  করে (দক্ষতার পরিচয় নিশ্চয়ই এতক্ষণে পাওযা গেছে)।
গণিতের Algorithmic Information Theory  ব্যবহার করে কয়েকটি ভিন্ন স্তরে বিভক্ত করে এ ধরণের কাজের জটিলতাকে কমিয়ে আনা যায়। আর অবশ্যই প্রাকৃতিক ঘটনার চেয়ে পদার্থবিদ্যা তার গাণিতিক ব্যাখ্যা অনেক জটিল। আবার Godel-এর বিখ্যাত Incompleteness Theorem of Logic বলছে কোনো বিষয়ে কেউ কোনো নীতি বা স্বতঃসিদ্ধান্তকে সবচে দৃঢ় বলে প্রমাণ করতে পারে না, বরং সে যা পারে তা হলো ঐ বিষয়ে অন্য কোনো স্বনির্ভর নীতি বা স্বতঃসিদ্ধ আছে কিনা তা গাণিতিকভাবে খুঁজে দেখতে। কেউ এটাও পারে তার নিজের মহাবিশ্বের ব্যাখ্যায় সে যে নীতিগুলো প্রয়োগ করছে তার মধ্যে কোনো বিশেষত্ব আছে কিনা তা খুঁজে দেখতে। বিশেষত্বটা হয়তো এটাই যে ঐ নীতিগুলোকে সেই মহাবিশ্বের প্রায় সবখানে বিপুল সার্থকতার সাথে প্রয়োগ করা যায়। আবার হয়তবা আমরা যৌক্তিক বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বিচার করি বলেই সূত্রগুলো এমন বিশেষরূপে উপস্থিত হয়।
সত্যি কথা বলতে কি ‘মহাবিস্ফোরণের আগে কী ?’ কেবল এই প্রশ্ন নিয়ে গোয়াতুর্মি করে খুব একটা লাভ নেই। বরং মহাবিস্ফোরণ সম্পর্কিত যাবতীয় প্রশ্নের একটি সৈনিকদলই বিজ্ঞানের অধিনায়কত্বে পারে মহাবিশ্বের রহস্যদূর্গের পতন ঘটাতে।

প্রহরান্তে কুহেলী গীত
মহাবিশ্বের উৎপত্তি সম্পর্কে যে প্রবাদটি পুরোপুরি খাটে তা হচ্ছে ‘নানা মুনির নানা মত’। তবে মহাবিশ্ব তার শৈশবে যে অতিতপ্ত এবং ঘনীভূত ছিল সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু কাল নিয়ে নাড়াচড়া করতে গেলেই তথাকথিত প্লাঙ্ক পর্যায়ে মোটামুটি মহাবিশ্বে  এসে স্থান এবং কাল জগাখিচুড়ি পাকিয়ে যায়। তখন কাল ঠিক কাল থাকে না (যা বেশ আগেই বলা হয়েছে)। তাই সে অবস্থা থেকে পিছিয়ে ‘মহাবিস্ফোরণের অমুক পরিমাণ সময় আগে কি ছিল ?’ সে প্রশ্ন করে লাভ কি যেহেতু সে পর্যায়ে তখনো কোনো কাল বা সময় গড়ে ওঠে নি।
মহাকর্ষ আর কণাবাদী তত্ত্বের মিল বন্ধন ঘটাতে তখন এই বিপদ থেকে উদ্ধারের আশায় ক্ষীণ আলো জ্বলে ‘Superstring Theory’  বাংলাতে ‘অতিতন্তু’ বললে কেমন হয় ? এ তত্ত্ব বলে যে প্রতিটি পদার্থই অতিক্ষুদ্র দশমাত্রা বিশিষ্ট কিছু সূক্ষ্ম তন্তুু বা সুতো (আমাদের আটপৌরে সুতো ভেবে বসলে কিন্তু ভুল) দিয়ে গঠিত। কিন্তু আমরাতো আমাদের জগৎ স্থানের ৩টি এবং সময়ের শুধু একটি মাত্রা অনুভব করি। তাহলে বাকিগুলো ? বাকিগুলো খুব আঁটোসাটো অবস্থায় পাকিয়ে থাকে বলে আমরা সরাসরি তাদের পত্যক্ষ করি না। কিন্তু সমস্যা হলো প্লাঙ্ক পর্যায়কে সরলীকরণ করতে এই তত্ত্বের প্রয়োগে সমস্যা আরো বেড়ে যায়। কারণ অবশিষ্ট মাত্রাগুলোও তখন ঘোঁট পাকাতে আদাজল খেয়ে লাগে। হয়ত দেখা যায় যে কালের দুই বা ততোধিক ধরণের মাত্রা এসে হাজির।
১৯৮২-তে Vilenkin মহাবিশ্বের ভূঁইফোড় সদৃশ জন্ম সম্পর্কে বললেন যে, আক্ষরিক অর্থেই ব্রহ্মান্ডের উৎপত্তি হয়েছে একটি সুরঙ্গের ভেতর দিয়ে যা আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহারিক ধ্যানধারণার সাথে খাপ খায়না ঠিকই, কিন্তু কণাবাদী তত্ত্ব একে সমর্থন করে। আমাদের আটপৌরে জগৎ কোনো গর্তের নিচ থেকে কোনো ভারি বস্তুকে উপরের প্রান্তে আনতে গেলে বল প্রয়োাগ করতে হয়। কিন্তু কণাজগতে কোনো একটি বস্তুর ক্ষেত্রে বাইরের কোনো সাহায্য ছাড়াই আপনা আপনি এমন ঘটনা ঘটবার একটি ক্ষুদ্র কিন্তু সম্ভাব্য নিশ্চয়তা রয়েছে। তবে শর্ত একটাই, এহেন অবস্থার পরিবর্তনে কোনো শক্তিবৃদ্ধি ঘটবে না।
কিন্তু আমাদের মহাবিশ্বে এর প্রয়োগ করা যায় কীভাবে ? তার জন্য আমরা ধরে নিচ্ছি মহাবিশ্বের উৎপত্তি পূর্ব উল্লেখিত অস্তিত্বহীনতা বা ‘Nothing’  থেকে । তাই আমরা বলতে পারি যে তখন মোট শক্তির পরিমাণও ছিল শূণ্য। তাহলে বর্তমান মহাবিশ্বের যাবতীয় স্থান, কাল এবং পদার্থের মোট শক্তিও শূণ্য হওয়া প্রয়োজন, অবস্থাটা সত্যিই কী তাই ?  অস্তিত্বহীনতা থেকে তা যৌগিকভাবে কোনো কিছুর অসিত্ত্ব সম্ভব নয়। কিন্তু Vilenkin বলেন, ‘But the Universe is an Execption’ কারণ মহাকর্ষ শক্তি ঋণাত্মক আর পদার্থের শক্তি ধনাত্মক। একটি আবদ্ধ মহাবিশ্বে কেউ যদি একই দিকে চলতে থাকে তাবে সে পুনরায় তার আরম্ভ বিন্দুতে ফিরে আসবে (অনেকটা কোনো বৃহত্তর পরিধি বেয়ে চলবার মতো)। সে রকমই মহাকর্ষের ও পদার্থের বিপরীত শক্তি পরস্পরকে হুবহু নাকচ করে। ফলে মোট শক্তির পরিমাণ হলো শূন্য।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে মহাবিশ্ব মহাবিস্ফোরণের মধ্য দিয়েই জন্মেছে, নাকি অনন্ত কাল ধরেই সে ছিল আমরা আদৌ জানতে পারব কী ? এরকম একটি সন্দেহের উদ্রেক হয় যখন ’৮০-র দশকে মহাবিস্ফোরণ তত্ত্বে Inflartion বা ‘স্ফীতি’ জায়গা করে নেয়। শুরুতে বলা হলো এই ‘স্ফীতি’ আসলে মহাবিস্ফোরণের পরমুহূর্তেই মহাবিশ্ব হঠাৎ ছিটকে প্রসারিত হয়ে যাবার ঘটনা; সেকেন্ডের মাত্র ভগ্নাংশ সময়ের মধ্যেই তার ব্যাস বৃদ্ধি পেয়ে বহু কোটি কোটিগুণ হয়ে গেল। এরপরেই এই স্ফীতি দশা ধীর হয়ে এলো। কিন্তু ’৮০-র দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসে Andrei Linde দেখতে পেলেন যে এ ধরণের একটি স্ফীতিতে স্ব-পুনরাবৃত্তি ঘটবে। একবার আরম্ভ হবার পর অনন্তকাল ধরে তা চলতে থাকবে।
তিনি কারণ দেখালেন যে, যখন মহাবিশ্ব স্ফীতিদশা থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করবে তখনো মহাবিশ্বের অন্য কোথাও অসংখ্য অস্থির অঞ্চলগুলোতে স্ফীতি থাকবে। ফলে সেগুলো প্রত্যেকেই মুহূর্তের মধ্যে বৃহদাকৃতির মধ্যে থাকবে অগুনতি প্রসারমান অঞ্চল। যার দৃশ্যপট অবশ্যই আমাদের মহাবিশ্ব থেকে ভিন্ন হবে। তাহলে বলতে হয় ঐ রকম ভিন্ন ইতিহাসের কোনো অঞ্চল থেকে আমরা আমাদের মহাবিশ্ব নিয়ে সরে এসেছি অনেক দূরে। সে অনুসারে Steinhardt -এর মতে আমরা আমাদের বিশ্ব অঞ্চলের সঠিক প্রান্তটি কখনই খুঁজে পাব না। একটি উদাহরণ টানা যেতে পারে। ধরা যাক এক থোকা বুদবুদগুচ্ছের কথা যার প্রতিটি থেকে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন একটি বুদবুদের। সেরকমই কোনো একটি বুদবুদে আমাদের নিবাস। আসলে এরকম একটি অনুমান আমাদের অবান্তর এক তেপান্তরের মধ্যিখানে ফেলে দেয়। কারণ, তাহলে আমাদের ভাববার কোনো অবকাশ নেই যে আমাদেরটাই প্রথম অথবা শততম। তখন আমাদের নিজস্ব মহাবিস্ফোরণ অতি সাধারণ একটিতে পরিণত হয়, সেই পরম বিস্ফোরণের তুলনায় যে সামগ্রিক ব্রহ্মান্ডের আদিম পিতা।

অন্ত
কোথায় সে ? কোথায়ই বা সেইসব উত্থাপিত প্রশ্নের সুনিশ্চিত উত্তর ? আদৌ আছে কি ? আসলে এই প্রবন্ধ তেপান্তর হেঁটে এসে অজানার বাড়ি। যার দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে অলিন্দ, এ ঘর থেকে সেঘর, জানালা থেকে ঝুল বারান্দা পেরিয়ে হঠাৎ আবার নিরুদ্দিষ্ট প্রশ্ন তেপান্তর।
কিছু উত্তর পাওয়া গেল। কিছুটা হয়তো বোঝাও গেল। অনেকটাই হয়তো গেল না। তাই সবিনয়ে পাঠকের কাছে প্রশ্ন হলো- আর কি হলো জানি না। তবে ‘অন্ধের হস্তী থুড়ি মহাবিশ্ব দর্শন’ হলো না তো ?

– অনিরুদ্ধ হাসান

টিউনারপেজের নতুন টিউন আপনাকে ইমেইল করব?
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting
Unlimited Web Hosting

4 মন্তব্য

  1. আমার মতে এই লিখাতে আরও অনেক কমেন্ট পরা উচিত ছিল। ধন্যবাদ আপনাকে (লেখককে) একটি পরিপূর্ণ লিখা দেয়ার জন্য।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here

3 + sixteen =