সায়েন্স ফিকশন: চাঁদের আলো

2
542
সায়েন্স ফিকশন: চাঁদের আলো

এন.সি.

বাংলা ভাষার আইটি ও বিজ্ঞান বিষয়কম্যাগাজিন "মাসিক সায়েন্সটেক" নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে।
ভিজিট করুনঃ http://www.sciencetech.info/
সায়েন্স ফিকশন: চাঁদের আলো

সেদিন জ্যোৎস্নায় সাড়া পৃথিবী ভেসে গিয়েছিল। প্রেমিক-প্রেমিকারা পাগল হয়ে গিয়েছিল। ক্ষণিকের জন্য পুরো পৃথিবীতে শুরু হয়ে গিয়েছিল আনন্দ-উৎসব। কারণ এরকম মন পাগল করা জ্যোৎস্না এর আগে কখনো দেখা যায়নি।

আমি তখন টেলিভিশনে রাত দশটার খবর শুনছি। খবরের সময়ও কিছুক্ষণ পরপর বিজ্ঞাপন। মেজাজটা চড়ে গেল। আমি তখন জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। চাঁদ এমন উজ্জ্বল হয়ে আছে যে না তাকিয়ে পারলাম না। চাঁদের উজ্জ্বলতা অস্বাভাবিক মনে হলো। মনটা কেমন হুহু করে উঠলো। জ্যোৎস্না খুব প্রিয় আমার। জানালা ছেঁড়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। বিল্ডিংটা দশ তলা। আর আমি থাকি একদম উপর তলায়। তাই বারান্দায় এসে দাঁড়ালে পুরো শহরটার উপর চোখ বুলিয়ে নেয়া যায়।

সোডিয়ামের আলোতে ঝিলমিল করছে রাস্তার অসংখ্য গাড়ি; শহরটাকে আরও রমণীয় করে তুলেছে। একটা জিনিস খেয়াল করলাম; চাঁদের আলোতে অন্যসব আলো হার মেনেছে, সব উজ্জ্বলতা ম্লান হয়ে গেছে।

চাঁদের উজ্জ্বলতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে- এ খবরটা বোধহয় শহরবাসীর কাছে অনেক আগেই পোঁছে গেছে। দলে দলে সবাই বারান্দায় এসে জড়ো হচ্ছে। কারও কারও হাতে টেলিস্কোপ, তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। চাঁদটাকে ওরা আজ ভালোভাবে দেখতে চায়। কারণ চাঁদ আজ পাগল হয়ে গেছে। চাঁদের রুপালী আলোতে মানুষজনও যেন পাগল হতে চলেছে। আশেপাশে ছোটখাট বিল্ডিং। সেগুলোর ছাদেও দেখলাম সব বয়সের মানুষ। সবার মনে আজ আনন্দের বন্যা। কারণ চাঁদ আজ উদার হয়ে তার সর্বস্ব দিয়ে তার আলো বিচ্ছুরণ করছে। তার অস্বাভাবিক আলোতে রাতের অন্ধকারও লজ্জা পেয়েছে। রাত পরিণত হয়েছে অন্যান্য সব দিনের মতো। পুরুষরা খালি গায়ে; মেয়েরাও হালকা পোষাকে ছাদে জড়ো হয়েছে। কারণ গরমও পড়েছে খানিকটা বেশি। তারপরেও সব মানুষ আজ আনন্দে আত্মহারা।

মনটা কেন জানি উদাস হয়ে যাচ্ছে। বুকটা খালি খালি লাগছে। কোন বিপদের পূর্ব সংকেত না তো? কিন্তু বিপদটা কি হতে পারে সেটা আন্দাজ করতে পারছি না। শুনেছি চাঁদের আকর্ষণে জ়োয়ার-ভাটা হয়। আজ চাঁদের আকর্ষণে সমুদ্রের পানি ফুলে উঠে আমাদের ডেলটা আকৃতির বাংলাদেশটাকে ডুবিয়ে দিবে না তো? চাঁদ কি তাহলে বড় হয়ে গেছে? ওটা কি বেলুনের মতো ফুলছে? অথবা চাঁদ কি পৃথিবীর আরও কাছে চইলে আসছে।

হঠাৎ নিজেকে খুব গালি দিতে ইচ্ছে করছে। কারণ পেশায় আমি একজন বিজ্ঞান লেখক। বিজ্ঞানের উপর লেখা লিখেই আমার জীবন চলে। আর আমি কিনা এসব আবোল-তাবোল ভাবছি! না, চাঁদ বড় হতে পারে না। চাঁদ পৃথিবীর আরও কাছেও আসছে না। তাহলে ব্যাটা এত আলো ছড়াচ্ছে কিভাবে? হ্যাঁ, এই প্রশ্নটা যুক্তিযুক্ত মনে হচ্ছে। এর উত্তর খুঁজতে হবে।

আবার ঘরে ফিরে এলাম। এক কাপ চা নিয়ে বসলাম। লক্ষ লক্ষ মানুষ আজ চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে। চাঁদের অস্বাভাবিক আলো নিয়ে একটা দুর্দান্ত ফিচার লেখা যেতে পারে। যেটা বেশ ভালো দামেও বিক্রি করা যাবে। কম্পিউটারের সামনে বসলাম। ঠিক তখনই একটা সত্য আমার মনে উঁকি মারল। হৃদপিন্ড ভয়াবহভাবে মোচড় দিল। হার্টবিটিং বেড়ে গেল। কপালে জমতে লাগল ঘাম। ফিচার লেখার চিন্তাটা কর্পুরের মতো উড়ে গেল। কারণ আমার যুক্তি যদি সত্য হয়, তাহলে… .. .। আর ভাবতে পারলাম না। ছুটে এলাম বারান্দায়, তাকালাম আকাশে।

চারিদিকে জ্যোৎস্নার বন্যা বয়ে গেছে। এত আলো চাঁদ পেল কোথায়? এ আলো হৃদয়ে নয়, সোজা মগজে আঘাত করছে। এ আলোতেই তো মানুষ পাগল হয়ে যাবে। না, পাগল হওয়ার সময়টাও মানুষ পাবে না। তার আগেই… .. .। মনে হচ্ছে বারান্দা থেকে লাফ দেই। কিন্তু পারলাম না। কারণ দু’দিন পরেই আমার বিয়ে।

একটা সিগারেট ধরালাম। তারপর ঠান্ডা মাথায় পুরো ব্যাপারটা ভাবতে লাগলাম। আমার হিসেব ভুলও হতে পারে। সৃষ্টি্কর্তার কছে প্রার্থণা করলাম।, যেন আমার হিসেবটা ভুল হয়।

স্কুলের যে কোন ছাত্রই জানে যে চাঁদের নিজস্ব কোন আলো নেই। সূর্যের আলো চাঁদে প্রতিফলিত হয়ে পৃথিবীতে আসে। তাহলে চাঁদে নয়, আসল গন্ডগোলটা সূর্যে! সৃষ্টি্কর্তার কাছে যতই প্রার্থণা করি না কেন, আমার হিসেব ভুল হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। হ্যাঁ, আজ রাতের পরই পৃথিবীতে মানুষসহ জীব বলে কিছু থাকবে না।

বাইরে মানুষজনের সে কি আনন্দ! পুরো শহরটা আজ পিকনিকের সাজে সেজেছে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে রুপার কাছে ফোন করলাম। রাত বারোটার মতো বাজে। ও নিশ্চই জেগে আছে। সবার মতো সেও নিশ্চই তাকিয়ে আছে চাঁদের দিকে।

–‘অবশ্যই জ্যোৎস্না দেখছ? আমরা সবাই ছাদে। সারারাত জেগে থাকব। তোমাকে খুব মিস করছি। আসতে পারবা?’ রুপা বলল। রুপার আশেপাশে আত্মিয়-স্বজনেরা হাসি-ঠাট্টা করছে। তাদের আনন্দ মেশানো কন্ঠস্বরও ভেসে আসছে।

আমার হাত কাঁপছে। জানি, কথা বলতে গেলে কন্ঠস্বরও কাঁপবে।

–‘কি হলো? কথা বলছ না যে, বিল উঠছে তো!’ রুপা খুব হিসাবি মেয়ে। মোবাইলে বেশিক্ষণ কথা বলতে চায়না।

–‘আমার এখানে একবার আসতে পারবা?’ অবশেষে বললাম।

–‘কি হয়েছে তোমার?’

এবার কিছুটা সিরিয়াস হলো সে। আমার কথা শুনেই সে বুঝে ফেলেছে। কিছু একটা সমস্যা হয়েছে।

–‘ঠিক আছে আমি আসছি।’ রুপা বলল।

মোবাইলটা হাত থেকে পরে গেল। লাইন কাটতে মনে নেই। সেটা করেও কোন লাভ নেই। মোবাইল ফোনের আর প্রয়োজনও হবে না। পৃ্থিবীর এক পাশে থাকে সূর্যের আলো আর অন্য পাশে চাঁদের। তাহলে পৃথিবীর একপাশ এখন সূর্যের আলোতে জ্বলছে। কিন্তু এ খবর তো আমাদের জানার কথা। প্রিন্ট মিডিয়াতে এ খবরটা আসবে না। কারণ কাল সকালে কোন সংবাদপত্র প্রকাশিত হবে না। কিন্তু ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে তো খবরটা পৌঁছানোর কথা।

 

আমার ধারণা পৃথিবী্র যে অংশটাতে এখন সূর্য আলো দিচ্ছে সেটা এখন পুড়ছে। সেখানে এখন নরক নেমে এসেছে। মানুষজন এখন জীবন বাঁচাতেই ব্যস্ত।

পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। একজন সাংবাদিকের কাছে এ খবরটার দাম তার  জীবনের থেকে  অনেক  বেশি । কিন্ত  সাংবাদিকরা এ খবরটা কোন মাধ্যমে পাঠাবে? পাঠাবার সব মাধ্যম তো এখন আগুনে পুড়ছে।

হ্যাঁ, আমার কথাই ঠিক। পৃথিবীর এক অংশ জ্বলছে এ খবরটা অপর অংশের মানুষেরা জানতে পারবে না। তাই আজ এখানে খুব আনন্দ। জ্যোৎস্নায় ভেসে গেছে শহর। এটাই এখন প্রধান খবর। কিন্তু কেন? এ প্রশ্নের উত্তর জানার সময় কারও নেই।

আবার হিসেব করতে লাগলাম। কোন এক কারণে সূর্যে ঝড় শুরু হয়েছে, সৌর ঝড়। সাথে সাথে পৃথিবীর দিনের অংশের সব সাগর-মহাসাগরের পানি টগ্‌বগিয়ে ফুট্‌তে শুরু করেছে। বাতাসও পুড়ছে। সাগর-মহাসাগরের পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যাছে। এরা শক-ওয়েভের আকারে এগিয়ে আসছে পৃথিবীর রাতের অংশে।

আমরা যে শহরে থাকি, সেখানেই প্রথম আঘাত হানবে এই শকওয়েভ। দু’টি পরস্পর বিরোধী বাষ্পের হারিকেন এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে। এরপর যারা জ্যোৎস্নায় আনন্দ-উল্লাস করছে, তাদের উপরই প্রথম আঘাত হানবে এই হারিকেন। তারপর যা ঘটবে তা খুব সহজেই অনুমেয়। শকওয়েভে মানুষগুলো শূণ্যে উড়ে যাবে; অনেকটা গাছের শুকনো পাতার মতো। শুকনো পাতায় আগুন লাগলে যা হয়, অনেকটা সে রকমই মানুষগুলো জ্বলে উঠবে। অথবা প্রচণ্ড তাপে কাবাব হতে থাকবে।

আমি অপেক্ষা করছি রুপার জন্য। রুপাকে শেষবারের মতো দেখার অপেক্ষায় আমি দারুণভাবে ঘামছি। পৃথিবী তার জন্মের পর থেকে অপেক্ষা করছে এই সময়টার জন্য। আর আমরা অপেক্ষা করছি মৃত্যুর জন্য।

পাঁচ’শ বিলিয়ন বছর ধরে সূর্য পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রেখেছে তার আলো দিয়ে। বিজ্ঞানীদের হিসাব মতে আরও পাঁচ’শ বিলিয়ন বছর সূর্য বেঁচে থাকবে। তাহলে এমন কি হল যার জন্য সূর্য মাঝ বয়সেই মরে যাবে। এটা খুব জানতে ইচ্ছে করছে; কিন্তু জানা হবে না।

কলিং বেলটা বেজে উঠল। বুকটা কেঁপে উঠল থরথর করে। তাহলে রুপা কি আসতে পেরেছে? দরজা খুললাম। দাঁড়িয়ে আছে রুপা। ঘামে সাড়া শরীর ভিজে গেছে।

–‘বাইরে দম বন্ধ করা গরম। সবার মনে আজ কতো আনন্দ, আর তুমি! আজও কি তোমার মনে সামান্য আবেগের সৃষ্টি হয়নি?’ রুপা বলল।

এমন সময় বাইরে থেকে ভেসে এলো। ঝড়ো হাওয়ার গর্জন ও মানুষদের মরণ চিৎকার শুনতে পেলাম। জড়িয়ে ধরলাম রুপাকে।

–‘কি হয়েছে তোমার? তুমি এমন করছ কেন?’ রুপা জিজ্ঞেস করল।

সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রর্থণা করছি, রুপা যাতে কিছু জানতে না পারে। রুপাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম।

তারপর কিছুক্ষণ পর সাদা আলো। চারদিক ঝলসে উঠল। কি হয়েছিল; রুপা শেষ পর্যন্ত জানতে পারেনি। ©

(বিঃদ্রঃ- পূর্বে  ই-পৃথিবী’র এপ্রিল’২০১১ সংখ্যায় প্রকাশিত)

2 মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ