নোটবুক, ল্যাপটপ না নেটবুক??? কোনটির সাথে কী পার্থক্য???

18
2724

কেমন আছেন সবাই? আশা করি আল্লাহর রহমতে সবাই ভাল আছেন। অনেক দিন ধরেই চিন্তা করছিলাম ল্যাপটপ , নোটবুক আর নেটবুকের মধ্যে তফাৎ গুলো সবার সামনে তুলে ধরার জন্য। এই সবার মধ্যে অনেকেই আছেন যারা ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না কি এমন পার্থক্য এদের মাঝে। জানি অনেকেরই এই ব্যাপারে আগে থেকেই খুব ভাল ভাবে জানা আছে। যাদের নেই আসুন দেখে নেই এই জিনিস গুলো আসলে কি? তার আগে আসুন জেনে নেই এই মোবাইল এবং পোর্টেবল কম্পিউটারের ইতিহাস। সর্ব প্রথম বানিজ্যিক ভাবে যেই ল্যাপটপটি ছাড়া হয়ে ছিল সেটি আই বি এম ৫১০০ মডেলের। নিচের ছবিতে দেখুন।

নোটবুক, ল্যাপটপ না নেটবুক??? কোনটির সাথে কী পার্থক্য???

এটি ১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ছাড়া হয়। এবং ধীরে ধীরে নানা পরিবর্তন পরিবর্ধন ও সংস্করণের মাধ্যমে আজকের উন্নত ল্যাপটপে রুপ নিয়েছে। মুলত মোবাইল কম্পিউটার  ডেক্সটপ কম্পিউটারের রিপ্লেসমেন্ট হিসেবেই চলে এসেছে।এবার মূল বিষ্যে ফিরে আসি।

ল্যাপটপঃ

সারাক্ষন ল্যাপটপের নাম শুনতে শুনতে আমরা অভ্যস্থ হয়ে পড়েছি আবার নোটবুকও??? আসলে ল্যাপটপ আর নোটবুক একই জিনিস। এগুলোর কোন পার্থক্য নেই। যেমন ধরুন অ্যাপলের ল্যাপটপের নাম ম্যাকবুক, বেনকিউ তাদের উৎপাদিত ল্যাপটপকে বলে জয়বুক। তার মানে এই নয় যে ম্যাকবুক বা জয়বুক নতুন কোন ধরণের মোবাইল কম্পিউটার। বাস্তবে মোবাইল কম্পিউটার গুলো উন্নত বিশ্বে এখন আমাদের দেশেও নোটবুক হিসেবে ব্যাবহার হচ্ছে। আমরা আজ প্রায় সব ধরনের লেখাপড়ার কাজ ল্যাপটপ কম্পিউটারেই করতে পারছি। যা কিনা আগের খাতা কলমের বিকল্প হিসেবে তাই অনেক ক্ষেত্রেই ল্যাপটপকে নোটবুক হিসেবে অভিহিত করা হয়। ল্যাপটপ গুলো একেকটি পুর্ণাঙ্গ ডেস্কটপ পিসির রিপ্লেসমেন্ট। অনেক ব্লগে এমন কি বিভিন্ন দেশি কম্পিউটার ম্যাগাজিনেও ল্যাপটপ আর নোটবুককে দুই জিনিস হিসেবে দেখানো হয়েছে। আসলে নেটবুক আরেক জিনিস নোটবুক নয়। তারা ল্যাপটপ নোটবুক আর নেটবুকের মধ্যে এমন তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে যে বিভ্রান্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে এই টিউনের শেষের দিকে আমি নেটবুক ও নোটবুক তথা ল্যাপটপের পার্থক্যগুলো তুলে ধরবো।

ল্যাপটপ/নোটবুক

নেটবুকঃ

বর্তমান সময়ের আলোচিত ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস। অনেকেরই ধারণা নোটবুক(Notebook) আর নেটবুক(Netbook) একই জিনিস। বাস্তবে নয়। এটা মোবাইল পিসির একটা ক্ষুদ্র সংস্করণ আর মোবাইল পিসিগুলোকে আমরা হয়ত সবাই ল্যাপ্টপ বলেই ডাকি। এর পোর্টেবিলিটি “ল্যাপটপ বা নোটবুক” অপেক্ষা অনেক বেশি (বহন করার সুবিধার্থে ও আকার অনুযায়ী)। এক্ষেত্রও উদাহরন দেওয়া যেতে পারে, যেমন ধরুণ অ্যাপল তাদের নেটবুকের নাম দিয়েছে আই-বুক। অর্থাৎ বিভিন্ন কোম্পানি তাদের স্বকীয়তা প্রকাশের জন্য বিভিন্ন নামে বাজার জাত করতে পারে কিন্তু তাদের প্ল্যাটফর্ম কিন্তু একই থাকছে।

নেটবুক নোটবুক, ল্যাপটপ না নেটবুক??? কোনটির সাথে কী পার্থক্য???
নেটবুক

আসুন এবার দেখে নেই এদের তুলনা মুলক বৈশিষ্ট্যঃ

প্রসেসরঃ নেটবুক-ইন্টেল অ্যাটম/সেলেরন এম/Via c7/ARM (কম শক্তি সম্পন্ন ও এনার্জি সেভিং)

ল্যাপটপ/নোটবুক- সেলেরন এম(পুরানো মডেলের ক্ষেত্রে)/ডুয়াল কোর থেকে কোর আই ৭ সহ সকল আধুনিক প্রসেসর (অধিক ক্ষমতা সম্পন্ন কোন কোন ক্ষেত্রে ডেস্কটপের মত)

স্ক্রীন সাইজঃ

নেটবুকে সাধারনত ৮-১১.২”

ল্যাপটপ/নোটবুকঃ ১২.১-১৯”

অপ্টিক্যাল ড্রাইভঃ

নেটবুকে থাকে না।

ল্যাপটপ/নোটবুকঃ সিডি রম থেকে শুরু করে ব্লু-রে (পর্যন্ত)

গ্রাফিক্সঃ

নেটবুকেঃ বিল্ট-ইন ( সাধারন মানের)

ল্যাপটপ/নোটবুকঃ গ্রাফিক্স কার্ড থাকে (সকল ক্ষেত্রে নয়)

কানেক্টিভিটিঃ

দুটোতেই একই ধরনের সুবিধা থাকে(যেমনঃ ওয়েব ক্যাম,ওয়াই ফাই,ব্লু টুথ,ল্যান আজকাল কোন কোনটিতে বিল্ট-ইন EDGE/3G/4G Wimax মডেম থাকে) তবে নেটবুকে ইউএসবি/ভিজিএ/এইচডিএমআই ইত্যাদি পোর্ট কম থাকে।

ল্যাপটপ/নোটবুক বেশি থাকে। [সাধারনত ভিজিএ/এইচডিএমআই পোর্ট উভয় ক্ষেত্রেই একই ধরনের থাকে]

ওজনঃ

নেটবুকের ওজন ১.৫ কেজির কম হয়।

ল্যপটপ/নোটবুকের তুলনামুলক বেশি ওজন হয়।

চার্জিং ব্যাকআপঃ

নেটবুকের ব্যাকআপ টাইম বেশি হয়। ৪ঘন্টা থেকে১২ ঘন্টা পর্যন্ত হয়ে থাকে।

ল্যাপটপের/নোটবুকের ব্যাকআপ তুলনামুলক কম হয় ২ ঘন্টা থেকে ৬ ঘন্টা পর্যন্ত।

কার্যক্ষমতাঃ

নেটবুকের ক্ষমতা খুবই কম সাধারন মাল্টিমিডীয়া ফাংশন ও অফিসের ছোট খাটো কাজ করা ইন্টারনেট ব্রাউজিং এই কার্যক্ষমতা সীমাবদ্ধ। উচ্চমানের গ্রাফিক্সের কাজ করা যায় না।

ল্যপটপ/নোটবুকের কার্যক্ষমতা অনেক বেশি হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডেস্কটপ পিসির সমমানের হয়ে থাকে।

নেটবুকের সুবিধাঃ ওজনে কম ও আকারে ছোট তাই সহজে বহন যোগ্য। একটানা দীর্ঘক্ষণ ব্যাকআপ দেয়। দামে সস্তা।অসুবিধাঃ নতুন পার্টস্‌ সংযোজন করা যায় না। অর্থাৎ কনফিগারেবল না। উচ্চমানের কাজ করা যায় না। অনেক সময় প্রিলোডেড ওএস-এর চেয়ে আপগ্রেড করা যায় না। অনেক সময় সফ্‌টওয়্যার ব্যাবহারের ক্ষঠাকে।সীমাবদ্ধতা থাকে।

ল্যাপটপ/নোটবুকের সুবিধাঃ কনফিগারেবল, র‍্যাম, হার্ডডিস্ক প্রভৃতি বাড়ানো যায়। অনেক ক্ষেত্রেই শক্তিশালী গ্রাফিক্সের কাজ করা যায়। গেমিং ল্যাপটপ বাজারে পাওয়া যায়। অসুবিধাঃ দাম অনেক বেশি (নেটবুকের তুলনায়), আকারে বড় আর ওজনেও বেশি তাই নেটবুকের তুলনায় বহন কিছুটা কঠিন। ব্যাকআপ টাইম অনেক কম হয়।

মুন্না ভাইয়ের অনুরোধের প্রেক্ষিতে আবার একটু সংযোজন করতে আসলাম।

ট্যাবলেট পিসিঃ

এটি মোবাইল কম্পিউটারের আরেকটি সংস্করন। এটি সাধারনত ইন্টারনেট সুবিধা ব্যাবহারের জন্যই ব্যবহৃত হয়। এর আকার ৮-১৪” পর্যন্ত হয়ে থাকে। মনিটর ৭-১২.১” পর্যন্ত হয়ে থাকে যা সম্পুর্ণ স্পর্শকাতর পর্দার হয়ে থাকে(টাচ স্ক্রিন)। এর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এর স্টাইলাশ (এক ধরনের কলম সদৃশ বস্তু)। এতে সেলেরন থেকে শুরু করে কোর২ডুও প্রসেসর পর্যন্ত ব্যবহার হচ্ছে (Intel® Core™2 Duo ULV processor SU9400 (1.4GHz)) যেমন ডেলের ল্যাটিচিউড এক্সটি২। এতে ইউএসবি ও ভিজিএ পোর্ট থাকে। কোন কোন ট্যাবলেট পিসিতে প্রি লোডেড অফিস সফ্‌টওয়্যার দেওয়া থাকে। কোন কোন ক্ষেত্রে ল্যাপটপের ট্যাবলেট ভার্শনে ল্যাপটপের প্রায় সকল সুবিধাই দেওয়া থাকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ওজন ০.৮ কেজি থেকে ১.৩ কেজির মধ্যে হয়ে থাকে। নেটবুকের মত এতেও কোন অপ্টিক্যাল ড্রাইভ থাকে না। (ব্যাতিক্রম টাচ স্ক্রিন ল্যাপ্টপ)। এতে ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক ব্যাবহারের সুবিধা থাকে। WLAN, 3G/4G কানেক্টিভিটিও থাকে মডেল ভেদে। তবে এর ব্যাকআপ টাইম নেটবুকের চেয়ে তুলনামুলক কম হয় ২ঘন্টা থেকে৬ ঘন্টা। মুল্য নেটবুক অপেক্ষা বেশি। বিভিন্ন কনফারেন্সে ব্যবহারের বিশেষ উপযোগী। কনফিগারেবল নয়। কোন কোনটির সাথে রিমুভেবল কী বোর্ড দেওয়া হয়। ইউএসবির মাধ্যমে অপ্টিক্যাল ড্রাইভ/মাউস/কী বোর্ড ব্যবহার করা যায়।

ট্যাবলেট পিসি নোটবুক, ল্যাপটপ না নেটবুক??? কোনটির সাথে কী পার্থক্য???
ট্যাবলেট পিসি

এই হল আমাদের ল্যাপটপ-নোটবুক-নেটবুক সমাচার। আসলে নেটবুক ল্যাপটপ গোত্রের হলেও এটি ল্যাপটপ নয় ঠিক যেমন বাঘ আর বিড়াল। আপনাদের কাজে আসলেই টিউনের সার্থকতা। মন্তব্যে ভাল লাগা বা মন্দ লাগার কথা জানাবেন। সবাই ভাল থাকবেন। এই কামনায় আজ এ পর্যন্তই। ধন্যবাদ।

আর হ্যা, নোটবুক আর ল্যাপটপ যে একই জিনিস এসুম্পর্কে জানতে একটু গুগল করে দেখবেন। আর উইকি লিঙ্কটা এখানে দিচ্ছি চাইলে দেখে আসতে পারেন। আবারও ধন্যবাদ।

18 মন্তব্য

  1. নেটবুকের কথা যখন উঠলই তখন প্রাসংগিক একটা বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা বলি। কিছুদিন আগে এক ক্লাসমেটের হাতে দেখলাম প্রোলিঙ্ক নেটবুক- ২১ হাজার টাকায় কেনা। ব্যাটারি ব্যাকআপের অবস্থা খুবই করূণ, যদিও বিক্রেতা বলেছিল ৪ ঘন্টার ব্যাকআপ দিবে কিন্তু আদতে আড়াই ঘন্টার বেশি ব্যাকআপ পাওয়া যায়না। তাই, পরামর্শ থাকবে ভাল ব্র্যান্ডের নেটবুক কেনার…আউল-ফাউল জিনিষ কেনার চাইতে না কেনা ভাল

একটি উত্তর ত্যাগ