টাইম ট্র্যাভেল কি শুধু ফিকশন! বাস্তবে সম্ভব কিনা ভেবে দেখেছেন কি কখনো? আসুন দেখি কিছু বাস্তব আলোচনা করা যাক  FavoriteLoadingবুকমার্ক

টাইম ট্র্যভেল নিয়ে অনেকেই তো কত সায়েন্স ফিকশনের বই পড়েছেন, মুভি দেখেছেন। কিন্তু ওগুলো যেভাবে দেখায় আসলে তেমন প্রযুক্তি আমাদের হাতে এখন নেই যে একটা ইলেক্ট্রিক ওয়েবের ভেতর ঢুকে গেলেন আর অতিত বা ভবিষ্যতে পৌঁছে গেলেন! আর সেগুলো শুধু ফিকশনই!

কিন্তু বাস্তবিক ভাবেই যদি আজ আপনাদের টাইম ট্র্যাভেল নিয়ে বলি তো কেমন হবে? বাস্তবিক মানে থিয়োরি মোতাবেক বাস্তবিক! এবং সেই থিওরি মত প্রযুক্তি আর যানবাহন হলেই টাইম ট্র্যাভেল সম্ভব! তবে অতিতে নয়, একতরফা ভবিষ্যতের দিকে শুধু। ফেরার কোনো উপায় নেই সেখান থেকে।

অতি কাল্পনিক কিছু না অবশ্যই! অলিক কোনো বস্তুও না! স্টিফেন হকিং আর জাফর ইকবালের ভাষ্যমতে আজ আপনাদের সম্পুর্ন বাস্তবিক দুইটা আইডিয়া নিয়েই বলবো যেগুলো প্রয়োগ করতে পারলে আসলেই একতরফা ভবিষ্যতের দিকে টাইম ট্র্যাভেল করা সম্ভব! অন্তত আমার কাছে অবশ্যই এগুলো লজিক্যাল মনে হয়!

স্টিফেন হকিং এর মতে সময় এক এক যায়গায় এক এক গতিতে চলে। নদীর স্রোতের মতোই। স্থান আর পাত্র ভেদে সময়ের গতি আলাদা হয়। একটা উচু ঢালু পাহাড়ি নদীর স্রোত আর সাধারন একটা নদীর স্রোত অবশ্যই আলাদা। তাদের গতি আলাদা। তেমন সময়ও স্থান ভেদে আলাদা গতিতে চলে।

একটা বিশাল ভারি বস্তুর কাছে সময় আসতে চলে। সময়ের গতি ওই বস্তুর ভর আর অভিকর্ষের জন্য স্লো হয়ে যায়। বাস্তব চোখে আমাদের কাছে এটা ধর না পড়লেও সেকেন্ডের লক্ষ ভাগ হলেও ধীরে চলে। অভিকর্ষ বল সময়ের গতিতে প্রভাব ফেলে।

একটা বাস্তব উদাহরন হলো আমাদের পৃথিবী আর পৃথিবীর হাজার হাজার মাইল উপরে ঘুরতে থাকা স্যাটেলাইট গুলার এটমিক ঘড়ি।

পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে অনেক দূরে থাকাতে সেখানে পৃথিবীর অভিকর্ষ বল পৃথিবী পৃষ্ঠের পরে থাকা বস্তুর চেয়ে কম। তাই সেই স্যাটেলাইটগুলোর যে ক্লক থাকে সেই ক্লক গুলো পৃথিবীতে থাকা ক্লকের চেয়ে দ্রুত গতিতে চলে। এই পার্থক্য এতই সামান্য যে এটাকে সেকেন্ডের হাজার হাজার ভাগের সমান ধরা হয়ে থাকে। এবং প্রতিনিয়ত বিজ্ঞানীদের সেই ক্লক গুলোর টাইমের এই হেরফের কারেকশন করতে হয় পৃথিবীর ক্লকের সাথে সমান গতিতে রাখতে। নাহলে জটিল হিসাব নিকাশে আর স্যাটেলাইট সিগনালের মারাত্বক গোলযোগ ঘটে যাবে।

সুতরাং পৃথিবীতে থাকা নরমাল সময়ের চেয়ে মহাকাশের ওই স্যাটেলাইট গুলোর সময় দ্রুত চলে পৃথিবীর অভিকর্ষ বলের হেরফেরের কারনে।

কিন্তু আমাদের পৃথিবীর এই সামান্য অভিকর্ষ বল ব্যবহার করে প্র্যাক্টিক্যালি টাইম ট্র্যাভেল হবেনা। এর জন্য আমাদের দরকার অতিকায় ভর আর অভিকর্ষ বিশিষ্ট কোনো বস্তু যার অসীম গ্র্যাভিটির কারনে সময় স্লো হবে চোখে পড়ার মত!

হ্যা! আপনি ঠিকই ভেবেছেন! একটা ব্ল্যাক হোল! ব্ল্যাক হোলের পৃথিবীর চেয়ে কোটি কোটি গুন বেশি ভর আর গ্র্যাভিটি আছে যা ব্যবহার করে বাস্তবিক ভাবেই টাইম ট্র্যাভেল সম্ভব!

কল্পনা করুন একটা স্পেসশিপে কয়েকজন মানুষ একটা ব্ল্যাকহোলের নিকটে যেয়ে তার চারপাশে চক্রাকারে ঘুরতে থাকলো। নিচের চিত্রের মত-

টাইম ট্র্যাভেল কি শুধু ফিকশন! বাস্তবে সম্ভব কিনা ভেবে দেখেছেন কি কখনো? আসুন দেখি কিছু বাস্তব আলোচনা করা যাক

তখন চমৎকার এক ঘটনা ঘটবে! ব্ল্যাকহোলের অসীম গ্র্যাভিটির টানে স্পেশিপের ভেতরে থাকা যাত্রীদের সময় স্লো হয়ে যাবে। বাইরের দুনিয়ার তুলনায় তাদের সময় ধীরে চলবে। অতি ধীরে! এভাবে কল্পনা করুন স্পেসশিপের ভেতরের মানুষদের মনে হচ্ছে তারা ১ সপ্তাহ ধরে তারা ব্ল্যাকহোলের পাশে ঘুরছে। কিন্তু স্বাভাবিক আমাদের পৃথিবীর সময়ে তারা মুলত কয়েক বছর ধরে ঘুরছে। অর্থাৎ স্পেসশিপের ১ সপ্তাহ সময় আমাদের পৃথিবীর কয়েক বছরের মত হবে! কারন অসীম গ্র্যাভিটির টানে স্পেসশিপের ভেতরের সময় স্লো হয়ে গিয়েছে।

ওই ব্ল্যাক হোলের গ্র্যাভিটেশনাল ফোর্সের বাইরে থেকে আমরা দেখলে মনে হবে স্পেসশিপটা অতি ধীরে ধীরে চক্রাকারে তার চারপাশে ঘুরছে। কিন্তু শিপের ভেতরের মানুষ বাইরের দুনিয়া দেখলে মনে হবে বাইরের সব কিছু অতি দ্রুত চলছে!

এভাবে স্পেসশিপটা কয়েক সপ্তাহ ঘোরার পর তারা যখন পৃথিবীতে ফিরে আসবে তারা তখন ফিরবে ভবিষ্যতের পৃথিবীতে! কয়েক সপ্তাহে তারা কয়েক শত বছর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে! ধরুন তারা ২০১০ সালে পৃথিবী থেকে চলে গেলো আর ১০০ বছর পর আবার ফিরে এলো। কিন্তু তাদের বয়স বাড়বে মাত্র কয়েক সপ্তাহ! আর সেই সময়ে পৃথিবী ১০০ বছর পার করে দিয়েছে।!

এভাবে গ্র্যাভিটিকে কাজে লাগিয়ে একতরফা ভবিষ্যতে যাওয়া সম্ভব যদি তেমন যানবাহন আর প্রযুক্তি নিয়ে আমরা একটা ব্ল্যাকহোলকে ব্যবহার করতে পারি!

সেকেন্ড আরেকটা উপায় হলো গতি! আমাদের অতি দ্রুত কোনো যানবাহনে ছুটতে হবে! অতি দ্রুত! প্রায় আলোর গতিতে!

অবাস্তব লাগলে এটার আগে আরেকটা জিনিষ দেখুন।

নিচের চিত্রটা দেখুন। মনে করুন একটা ট্রেনের ভেতর বসে আছেন। ট্রেনটা স্টেশনে থেমে আছে। আপনি হাতে একটা লেজার লাইট নিয়ে ৯০ ডিগ্রি এঙ্গেলে এটা ট্রেনের ছাদের দিকে তাক করে ধরে আছেন। লাইন AB বরাবর। আপনার হাতের লাইট হল A, আর ট্রেনের ছাদ হলো B.

A থেকে B এর দুরত্ত ধরুন ৩ মিটার।

টাইম ট্র্যাভেল কি শুধু ফিকশন! বাস্তবে সম্ভব কিনা ভেবে দেখেছেন কি কখনো? আসুন দেখি কিছু বাস্তব আলোচনা করা যাক

কোনো চলন্ত বাহনে, যখন তা সামনের দিকে ছুটে চলে, আপনি পেছন দিকে একটা টান অনুভব করবেন। এটা হয়ত বোঝানো লাগবেনা। একটা ট্রেন যখন সুপার স্পীডে চলে তখন ট্রেনের ভেতরে থাকা যাত্রীদের পেছন দিকে একটা টান থাকে। গতির কারনে এটা হয়ে থাকে।

ঠিক এমন কারনেই কল্পনা করুন আপনার ট্রেনটা অতি অতি দ্রুত বেগে চলছে। যার কারনে সম্মুখ গতির কারনে আপনার হাতে থাকে লেজার লাইটের আলো টা সোজা ৯০ ডিগ্রিতে না যেয়ে সামান্য পেছনে বেকে যাবে। AC লাইন বরাবর। অবশ্যই AB থেকে AC এর দৈর্ঘ বেশি হবে। যদি হাতের লাইট থেকে আলো ছাদে পৌছানোর সময়টাকে একটা পালস ধরি, তবে AC লাইনে পালস কমপ্লিট করতে AB এর চেয়ে সময় বেশি লাগবে। অর্থাৎ স্থির অবস্থায় ট্রেন যখন স্টেশনে ছিলো তখন এক পালসের জন্য লাইটকে এবি লাইনে ৩ মিটার পার করতে হবে। আর চলন্ত অবস্থায় গতির কারনে লাইট বিম সামন্য পেছনে হেলে যাওয়াতে এসি লাইন বরাবর এক পালসে ধরুন ৩.৫ মিটার যেতে হচ্ছে। অর্থাৎ চলন্ত ট্রেনে এক পালস কমপ্লিট করতে স্থির ট্রেনের চেয়ে সময় বেশি লাগার কথা। সামন্য হলেও, অতি সামান্য হলেও বেশি লাগবে। কারন এসি লাইনের দৈর্ঘ্য বেশি।

সুতরাং কি দাড়ালো? স্থির ট্রেনের তুলনায় চলন্ত ট্রেনের ভেতর আলোর পালস কমপ্লিট করতে সময় বেশি লাগছে। অর্থাৎ সময় স্লো হয়ে গিয়েছে!

যদি আমরা অতি অতি দ্রুতবেগ সম্পন্ন কোনো যানবাহন বানাতে পারি, যেটা আলোর সমান না হলেও, ধরে নিন যে আলোর গতির ৯৯% সমান গতিতে ছুটতে পারে! তাহলে সেই যানবাহনের ভেতর সময় উপরের নিয়মের কারনে স্লো চলবে!

ধরে নিন একটা রকেট বানানো হলো, যেটা আলোর ৯৯% গতিতে ছুটতে পারবে মহাকাশে, তখন ওই গতির কারনে রকেটের ভেতরের সময় পৃথিবীর তুলনায় স্লো চলবে!

আলোর গতি যদি ছুতে পারি তবে সময় স্থীর হয়ে যাবে! আর যদি আলোর গতি পার করতে পারে তবে সময় উলটো চলবে!

অতোদুর না যাই আমরা! আলোর গতি ছোয়া বাস্তবিকে সম্ভব না!

তবে এই আলোর গতির কাছাকাছি চলার মতো প্রযুক্তি অলরেডি গবেষণার ভেতর রয়েছে। সুইজারল্যান্ডের জেনাভায় মাটির নিচে ২৭ কিমি লম্বা একটা চক্রাকার টানেলের ভেতর প্রোটন পার্টিকেল আলোর কাছাকাছি গতিতে চালনা করা হয়। এই প্রোটন কনা গুলো অতি সামান্য সময় স্থায়ী হয়। সেকেন্ডের ভগ্নাংশের সমান সময়। অতি ক্ষনস্থায়ী। কিন্তু আলোর কাছাকাছি গতিতে ছুটার কারনে সেগুলোর জীবন কাল ৩০% বেড়ে যায়। অর্থাৎ বাস্তবিক ওই কনা গুলো টাইম ট্র্যাভেলার!

টিউনটা কেমন লাগলো টিউমেন্ট করে জানাবেন।  অনেক কষ্ট হয়েছে লিখতে। সম্পুর্ন আমার হাতে লেখা।

এই জাতীয় আরো টিউন

আপনিও লিখুন মতামতের উত্তর

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

four + 6 =