উইন্ডোজ ১০ এর বৃত্তান্ত

0
188

গত মাসের ২৯ তারিখ প্রযুক্তি বিশ্বে অনেকটা হইচই ফেলেই মাইক্রোসফট অবমুক্ত করেছে তাদের উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমের সর্বশেষ সংস্করণ ‘উইন্ডোজ ১০’। আর ইতোমধ্যেই তা স্পর্শও করে নিয়েছে ১ কোটি ৪০ লক্ষবার ডাউনলোডের মাইলফলক। এর প্রধান কারণ হিসেবে টেক বোদ্ধারা এর বিনামূল্যের আপগ্রেডকেই চিহ্নিত করছেন। কিন্তু যেখানে কথা হচ্ছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে, সেখানে আমরা সবেমাত্র ঘুঘু দেখলেও বাকী রয়ে গেছে ফাঁদের কাহিনী।

চলুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক, কী থাকছে উইন্ডোজের এই সর্বশেষ সংস্করণটিতে যা কিনা তাদের পূর্ববর্তী উইন্ডোজগুলো থেকে এটাকে আলাদা করে ফেলেছে।

যদিও এই সংস্করণটির উল্লেখযোগ্য ফিচারের পরিমান অনেক বেশি তারপরও কিছু ঘটনা তো থেকেই যায় যা কিনা এমনকি আপনার হালনাগাদ করাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে সক্ষম।

index

যেসব কারনে হালনাগাদ করা উচিত:

মুল্য:

কিছু উইন্ডোজ ৭ এবং কিছু উইন্ডোজ ৮ ব্যবহারকারী বাদে প্রায় সবাই উইন্ডোজের এই সর্বশেষ সংস্করণটিকে বিনামূল্যে হালনাগাদ করে নিতে পারবেন। প্রথম নজরে অসম্ভব ভালো মনে হলেও উইন্ডোজ ১০ মোটেও সস্তা ঘাটের পানি নয়, উপরন্তু ‘উইন্ডোজ ১০ হোম’ এবং উইন্ডোজ ১০ প্রো’ এডিশনগুলোর মূল্য যথাক্রমে ১১৯ ডলার এবং ১৯৯ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে যা কিনা আবার বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৯২৬৫ এবং ১৫৪৯৩ টাকা!

বিপরীত দিকে যেখানে উইন্ডোজ ১০ বিনামূল্যে হালনাগাদ করা যাচ্ছে সেখানে উইন্ডোজ ৭ এবং উইন্ডোজ ৮ এর কোনটাই আসলে বিনামূল্যে পাওয়া যাচ্ছে না, যেটা করায় তাদের কোন আগ্রহও নেই। ফলশ্রুতিতে আপনি যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবার উইন্ডোজ ৭ অথবা উইন্ডোজ ৮ এ ফিরে আসেন তাহলে উইন্ডোজ ১০ এর বিনামূল্যে হালনাগাদ করাটা আপনার কাছে বোধগম্য হলেও হতে পারে কিন্তু তাও নির্ভর করছে ঠিক কতদিন এটা বিনামূল্যে পাওয়া যাবে তার উপর।

দীর্ঘ মেয়াদী সহায়তা:

উইন্ডোজের সর্বশেষ সংস্করণটিতে হালনাগাদ করার পেছনে আরেকটি কারণ হচ্ছে এর দীর্ঘমেয়াদী সাপোর্ট, যা কিনা উইন্ডোজ ৭ এবং উইন্ডোজ ৮ এই দুটোর সম্মিলিত মেয়াদ কাল থেকেও বেশী। উইন্ডোজ লাইফ সাইকেল পেজ ঘটনাটিকে ব্যাখ্যা করেছে এভাবে-

১। মেইনস্ট্রিম সাপোর্ট এবং
২। এক্সটেন্ডেড সাপোর্ট।

Windows-Lifecycle-Page

উপযোগিতা এবং ইউনিভার্সালিটি:

প্রধানত এটিই হচ্ছে উইন্ডোজ ১০ এর সবথেকে বড় সফলতা। কেননা উইন্ডোজ এর এই সংস্করণটির মাধ্যমে মাইক্রোসফট তাদের ভবিষ্যতের সব ডিভাইসের জন্য ‘এক অপারেটিং সিস্টেম’ এর যাত্রা শুরু করল। এখন থেকে মাইক্রোসফট এর ভবিষ্যতের সব ডিভাইস যেমন- পিসি, ল্যাপটপ, হাইব্রিড, ট্যাব, স্মার্টফোন নির্বিশেষে একই অপারেটিং সিস্টেম সমর্থন করবে।

এর ফলে যা যা সুবিধা পাওয়া যাবে:

১। উইন্ডোজ স্টোর থেকে নামানো যে কোন অ্যাপ পিসি, ট্যাব নির্বিশেষে সবখানে একই ভাবে কাজ করবে। এর ফলে স্টোরে থাকা একই অ্যাংরি বার্ড গেমটি স্মার্টফোনে তো খেলা যাবেই একই সাথে খেলা যাবে পিসিতেও।

২। মাইক্রোসফট এর নতুন ফিচার ‘কন্টিনিউয়াম’ এর মাধ্যমে আপনার ফোনটিকে পিসির মত করে ব্যবহার করা যাবে আর এর জন্য ফোনটিকে শুধু মনিটর, কি বোর্ড এবং মাউস এর সাথে সংযোগ করে নিলেই হল। হ্যা, উইন্ডোজ ১০ আসলেই যেকোন ডিভাইসে নিজেকে অ্যাডপ্ট করে নিতে পারে তা হতে পারে ট্যাব, পিসি অথবা টাচ, মাউস, কি-বোর্ড ইন্টার‌্যাকশন।

গেমিং:

ফোর্বস সাময়িকীতে দেওয়া এই রিভিউতে বলা হয়েছে, সিরিয়াস গেমারদের জন্য উইন্ডোজ ১০ এ হালনাগাদ করা কিছুটা বাধ্যতামূলক। এর ব্যাখ্যা কিছুটা এরকম-

উইন্ডোজ ১০ এর সাথে ‘ডিরেক্ট এক্স’ ( যা কিনা মূলত উইন্ডোজ প্লাটফর্মের গেমিং এ.পি.আই) ভার্সন ১২ এর সমন্বয়ের কারণে গেমিংয়ের ক্ষেত্রে ৩০-৪০% পারফরমেন্স বুস্ট পাওয়া যাবে, যেটা বাস্তবিক ভাবে কোন অংশে ১০-২০% এর কম না। যদিও এটা ভাঙ্গা কলসে পানি ঢালার মতই তারপরও যেখানে উইন্ডোজ ৭ এবং উইন্ডোজ ৮ কখনই ডিরেক্ট এক্স ১২ এর এক্সেস পাবে না, সেখানে এটাকে তো একপ্রকার বিশাল সুবিধা বলা যেতে পারে।

অন্যদিকে উইন্ডোজ ১০ এর মাধ্যমে এক্সবক্স ওয়ান থেকে গেম স্ট্রিম করার সুবিধা তো আছেই। এছাড়া এক্সবক্স ওয়ান এর কন্ট্রোলার যুক্ত করার মাধ্যমে ‘দ্যা উইচার ৩’ এর মত গেমও মিনিটের মধ্যে খেলা শুরু করে দিতে পারেন আপনার ল্যাপটপ অথবা ডেস্কটপেই। আর এর সব থেকে ভালো ব্যাপার হচ্ছে প্রক্রিয়াটি বেশ ক্ষিপ্র এবং ডায়নামিক। আবারো বলে রাখি সুবিধা গুলো কিন্তু কখনই উইন্ডোজ ৭ অথবা উইন্ডোজ ৮ এর মাধ্যমে উপভোগ করা যাবে না।

device_family_continuum

কর্টানা:

এখন কিছুটা পেছনে ফিরে যাওয়া যাক। উইন্ডোজ ৮ থেকে মাইক্রোসফট তাদের বিতর্কিত স্টার্ট মেনুর সাথে যুক্ত করেছিল তথাকথিত অনলাইন সার্চ যা কিনা বিতর্কিতই থেকে গিয়েছিল। আর উইন্ডোজ ৭ এ ছিল শুধু লোকাল সার্চ এর সুবিধা। যেখানে উইন্ডোজ ১০ এদিক দিয়ে খুব সহজেই পিছনে ফেলে দিয়েছে এর পিছনের সংস্করণগুলোকে।

আর উইন্ডোজ ১০ এর এই সফলতার পেছনে সবথেকে বড় অবদান হচ্ছে মাইক্রোসফটের উইন্ডোজ ফোনের ভয়েস আসিসট্যান্ট কর্টানার। কর্টানা নামটি মূলত এসেছে মাইক্রোসফট এর ‘হালো’ ভিডিও গেম ফ্রাঞ্চাইজ থেকে। অ্যাপল এর ‘সিরি’ এবং গুগল এর ভয়েস সার্চ এর মত কর্টানাও বিভিন্ন ভয়েস কমান্ড নিয়ে কাজ করতে পারে। দ্রুত ইন্টারনেট সার্চ থেকে শুরু করে উইন্ডোজ ১০ এর বিভিন্ন টাস্ক যেমন নতুন কোন ই-মেইল ওপেন করা অথবা ক্যালেন্ডারে নতুন কোন ইভেন্ট ক্রিয়েট করা এবং আরো অনেক।

অবশ্যই এটা একদম স্বয়ংসম্পূর্ণ নয় উপরন্তু এটা যে কতটা উপযোগী হতে পারে তা শুধু এখন সময়ের ব্যাপার।

মাইক্রোসফট এজ ব্রাউজার এবং ভার্চুয়াল ডেক্সটপ:

এই দুটো ফিচারকে একই লিস্ট এ ফেলার কারণ হচ্ছে এ দুটোই দারুণ আকর্ষণীয়। প্রযুক্তি বুড়োরা মনে করছেন মাইক্রোসফটের নতুন এই ব্রাউজার (যার ফিচারগুলো এখনো লিমিটেড) ক্রোম ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করার একটি মাধ্যম মাত্র। এক্ষেত্রে সবথেকে ভাল ব্যাপারটি হচ্ছে ‘এজ’ ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার থেকে বহু গুনে দ্রুত কাজ করতে সক্ষম এবং শুধু মাত্র উইন্ডোজ ১০ এর মাধ্যমেই এটিকে এক্সেস করা যাবে।
অন্যদিকে ম্যাক ওসএক্স এবং লিনাক্সের মত উইন্ডোজ ১০ এর সাথেও যুক্ত করা হয়েছে ভার্চুয়াল ডেস্কটপ সুবিধা। এর মাধ্যমে এখন থেকে থার্ড পার্টি অ্যাপ অথবা মাল্টি-মনিটর ছাড়াই মাল্টিপল ভার্চুয়াল ডেস্কটপ ব্যবহারের সুবিধা পাওয়া যাবে। চমৎকার এই ফিচারটির মাধ্যমে ওয়ার্কস্পেস ভাগ করে প্রোডাক্টিভিটি বাড়িয়ে নেয়া যাবে কয়েক গুন।

ন্যূন্যতম যা প্রয়োজন:

টেকনিক্যাল রিকোয়ারমেন্টের এই ক্যাটাগরিতে মাইক্রোসফট এর অবস্থান বেশ একটা সুবিধার নয়। যদিও ২ বছর আগের উইন্ডোজ ৮ এবং ৫ বছর আগের উইন্ডোজ ৭ পিসির তুলনায় এই রিকোয়ারমেন্ট প্রশংসার দাবিদার।

র‍্যাম: ১ গিগাবাইট (৩২ বিট) অথবা ২ গিগাবাইট (৬৪ বিট)
হার্ডডিস্ক স্পেস: ১৬ গিগাবাইট (৩২ বিট) অথবা ২০ গিগাবাইট (৬৪ বিট)
গ্রাফিক্স কার্ড: ডাইরেক্ট এক্স ৯ অথবা WDDM 1.0 ড্রাইভার
ডিসপ্লে: ৮০০X৬০০ পিক্সেল

সিকিউরিটি:

যেখানে উইন্ডোজ ৭ এবং উইন্ডোজ ৮ দুটোই ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা বিষয়ে যথেষ্ট বেগবান বলে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিল সেখানে উইন্ডোজ ১০ একধাপ এগিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছে নিরাপত্তার এই ধাঁধায় কতটা পারদর্শী হওয়া সম্ভব।

ডিভাইস গার্ড: এর মাধ্যমে (জিরো ডে অ্যাটাক) আন-ভেরিফাইড সফটওয়্যারগুলোকে পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে ব্লক করে দেওয়া হবে। ডিভাইস গার্ড ভার্চুয়ালিও কাজ করতে সক্ষম। এ জন্য এমনকি এর রিমোট ভার্সনও ম্যালিসিয়াস সফটওয়্যারগুলোকে নিউট্রালাইজ করতে সক্ষম।

উইন্ডোজ হ্যালো: উইন্ডোজের প্রথম বায়োমেট্রিক সিকিউরিটি সিস্টেম। উপযুক্ত ডিভাইস সংযুক্ত করার মাধ্যমে মুখাবয়ব, আইরিস অথবা ফিঙ্গারপ্রিন্টকে পাসওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। এই সিকিউরিটি সিস্টেমের প্রাথমিক রিভিউ বেশ ভালো, কারণ এটা কাজ করে এবং তা বেশ ভালভাবেই।

আর এখন থেকে মাইক্রোসফট তাদের উইন্ডোজ আপডেট এর বাইরেও সিকিউরিটি প্যাচ অবমুক্ত করবে। এর মাধ্যমে যখনই সিকিউরিটি প্যাচ গুলোকে মুক্ত করা হবে, ঠিক তখনই তা উইন্ডোজ ১০ এ সংযুক্ত হয়ে যাবে এবং এর মাধ্যমে আর না হোক হ্যাকারদের উপরই যে এক হাত নিল তা আর বলতে বাকী রাখল না মাইক্রোসফট।

এতকিছুর পরও ওই যে কিছু ঘটনা তো থেকেই যায় … !
ঠিক কী কী কারণে উইন্ডোজ ১০-এ আপগ্রেড করা উচিৎ হবে না তা জানতে চোখ রাখুন পরবর্তী পর্বে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here

15 − six =