ফেইসবুকে ব্যবসার খুঁটিনাটি কিছু টিপস

1
214

ছোট করে ব্যবসা শুরু করার জন্য আজকাল ফেইসবুকের কোন জুড়ি নেই। আর শুধু কি ছোট ব্যবসাই? অনেক বড়সড় ব্যবসাও চমৎকার দাঁড়িয়ে আছে ফেইসবুক পেইজের উপর ভিত্তি করে। কতটা দক্ষতার সাথে পেইজকে পরিচালনা করা হচ্ছে, সেটার উপরেই এ ধরনের ব্যবসার সাফল্য নির্ভর করে। আজকাল ভুঁড়ি ভুঁড়ি পেইজ তৈরি হচ্ছে ব্যবসার উদ্দেশ্যে। কিন্তু এত এত পেইজের ভিড়ে আপনার পেইজটি আসলে কেমন করে টিকে আছে? সবার মত? না সবার চেয়ে আলাদা? সবার মত হয়ে কী লাভ? ব্যবসা করুন রাজার মত। কিন্তু বুঝতে পারছেন না কী করে সবার চেয়ে আলাদা হয়ে দেখাবেন? কিছু টিপস দেয়া যাক তাহলে। গত দু’বছরে আমার নিজের ব্যবসা নিয়ে অনেক সংগ্রাম করেছি। সমস্যায় পড়ে, সমস্যাকে মোকাবিলা করে আর সফল ব্যবসায়িদের দেখে যা কিছু শিখেছি, সেসবই আজ আপনাদের সাথে আলোচনা করছিঃ

6a01b7c6da9523970b01b8d06491a8970c ফেইসবুকে ব্যবসার খুঁটিনাটি কিছু টিপস

০১। সহজ ও সুন্দর নাম দিনঃ

ব্যবসার নাম যত সুন্দর ও সহজ হবে, কাস্টমারদের মনে রাখতে তত সুবিধা হবে। নাম হতে হবে এমন যেন শুনলেই নামের পেছনের গল্পটি কেউ আঁচ করে ফেলতে পারে। তাছাড়া ছোট ও সহজ নাম মানুষের মুখে মুখে ঘোরে। এটা খানিকটা ‘ওয়ার্ড অভ মাউথ’ এর কাজ করে দেয়।

০২। লোগো ও রঙে গুরুত্ব দিনঃ

ব্যবসার লোগোটি চেষ্টা করুন খুব ক্রিয়েটিভ করে তৈরি করতে। নামের মত সেখানেও যেন একটি গল্প থাকে। আর রঙের ক্ষেত্রে ব্যাকরণ মেনে চলার চেষ্টা করুন। একেকটি রঙের একেক অর্থ থাকে। সেসব মাথায় রেখে রঙ নির্বাচন করুন।

০৩। মার্কেট সম্পর্কে জানুনঃ

নিজের পছন্দ নয়, গুরুত্ব দিন কাস্টমারের পছন্দে। মার্কেটে কিসের চাহিদা রয়েছে, কোন জায়গাটি ফাঁকা রয়েছে, প্রতিযোগিরা কী করছে এসব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জেনে তবেই পা বাড়ান। অর্বাচীনের মত স্রোতে ভেসে যাওয়ার দরকার নেই। প্রচুর স্টাডি করুন, কাস্টমারের মন-মানসিকতা বোঝার চেষ্টা করুন। ঠকবেন না।

০৪। সঠিক পণ্য নির্বাচন করুনঃ

কাস্টমারের চাহিদা বুঝে পণ্য নির্বাচন করুন। তবে সবসময় যে কাস্টমারের চাহিদানুযায়ীই পণ্য তৈরি করতে হবে, তা নয়। নিজের সৃজনীশক্তিকেও কাজে লাগাতে পারেন। সেসব পণ্যের দিকে কাস্টমারকে আকর্ষণ করার টেকনিকও ভেবে রাখুন। এছাড়া কাস্টমাইজেশনের ব্যবস্থাও রাখুন। সাড়া মিলবে প্রচুর।

০৫। প্রফেশনাল ছবি তুলুনঃ

অনেকেই যেন-তেন ছবি ফেইসবুকে দিয়ে দেন। এতে পণ্যের আসল চেহারাতো বোঝা যায়ই না, উল্টো ক্রেতারাও কোন আকর্ষণ খুঁজে পান না। কাজেই ছবি তুলুন খুব ভালো করে। যেহেতু পুরো ব্যাপারটাই অনলাইনে, ছবি দেখেই ক্রেতা সাড়া দেবে। সাথে মডেলিং এবং ছবির প্রপস ব্যবহারেও সৃজনশীলতা দেখাতে পারেন। বাড়তি আকর্ষণের সুযোগ থেকে থাকলে ছেড়ে দেবেন কেন?

০৬। গ্রুপ তৈরি করুনঃ

সাধারণত পেইজ খোলার পাশাপাশি একটি গ্রুপেও আপনি ব্যবসাটাকে পরিচালনা করতে পারেন। তাতে অনেক সময় পেইজের চেয়েও ভালো সাড়া মেলে। খুব বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে এবং কাস্টমারের সাথে ডিরেক্ট যোগাযোগের ফলে এক ধরনের পারিবারিক আবহ তৈরি হয় গ্রুপে। কাস্টমাররা ভরসা করতে পারে। তাদের মতামতকে মূল্য দিতে মাঝে-মধ্যে সাজেশানও নিতে পারেন পরবর্তী নতুন পণ্য তৈরির আগে। এতে তারা ঠিক কী চায়, সেটিও আপনার কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে।

০৭। পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে মনযোগী হনঃ

পণ্যের মূল্য যতই হোক না কেন কাস্টমারকে একবার যদি বোঝানো যায় যে আপনার পণ্যটিই সেরা, তবে সে মূল্য দিতে সদা প্রস্তুত। ব্যবসার একদম শুরু থেকে এ বিষয়ে খুব কঠোর হতে হবে আপনাকে। কিছুতেই পণ্যের মান নামতে দেবেন না। সুফল মিলবেই।

০৮। মূল্য ঠিক করুন যথাযথভাবেঃ

পণ্যের মূল্য কেমন হবে সেটি আসলে পণ্যের উপরেই নির্ভর করছে। ছোট-খাটো পণ্য সবসময় বাল্ক বা সেটে বিক্রি করার চেষ্টা করুন। দামটাও তাতে সহনীয় পর্যায়ে রাখা যায় আর ক্রেতারাও কিনে আরাম পায়। আর বড় ধরনের পণ্যে চেষ্টা করুন কাস্টমারকে বিভিন্ন রকম অপশান আর অফার দেখাতে। সে দেখে-শুনে বেছেই কিনুক। মানসিক পরিতৃপ্তি পাবে দু’পক্ষই।

০৯। বাড়তি সেবা দেয়ার ব্যবস্থা করুনঃ

একটি কথা সবসময় মাথায় রাখার চেষ্টা করুন, “Never just sell your products, rather sell your service”. অর্থাৎ শুধু পণ্য নয়, সাথে সেবাও দেয়ার চেষ্টা করুন। যেমনঃ ফ্রি হোম ডেলিভারি বা এক্সট্রা চার্জ মওকুফ, বা কোন গিফট কিংবা একটু মিষ্টি ব্যবহার! অল্পেই অনেক অনুগত কাস্টমার তৈরি হয়ে যাবে। সেই সাথে খুব ভালো কুরিয়ার সার্ভিস, পেমেন্ট অপশান দেয়ার চেষ্টা করুন।

১০। ভিডিও  তৈরি করুন পণ্যেরঃ

আজকাল অনেকেই ছবির পাশাপাশি পণ্যের ভিডিওও তৈরি করেন। আসলে এতে করে পণ্যটিকে আরও অনেক বেশি জীবন্ত মনে হয়। পণ্যের সাথে কাস্টমারের একটি ভার্চুয়াল সম্পর্ক তৈরি হয়। পণ্য হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করার একটি অনুভূতি পাওয়া যায়।

১১। প্রচুর এক্সিবিশান করুনঃ

বাংলাদেশি ক্রেতাদের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তারা পণ্য স্পর্শ করে, দেখেশুনে, দর কষাকষি করে কেনাকাটা করতে অভ্যস্ত। অনলাইনে সেটা সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে প্রচুর মেলা বা প্রদর্শনীর আয়োজন করলে কাস্টমার ডিরেক্ট কন্ট্যাক্টে আসার সুযোগ পায়। আর তাছাড়া এভাবে পণ্য বিক্রিও হয় বেশি।

১২। সুবিন্যস্ত নেটওয়ার্ক তৈরি করুনঃ

কে বলতে পারে কখন, কোথা থেকে আপনার ব্যবসায় একটি ইতিবাচক আমূল পরিবর্তন হতে পারে শুধুমাত্র একটুখানি যোগাযোগ রক্ষার কারণে? কাজেই এই দিকটায় বেশি করে নজর দিন। কাস্টমার থেকে শুরু করে হোলসেলার, প্রতিযোগী, দেশি-বিদেশি সবার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করুন দক্ষভাবে। কাজে লাগবেই!

১৩। প্রমোশান করুন সর্বোত্তম উপায়েঃ

আপনার সমস্ত অনলাইন অ্যাক্টিভিটিতে আপনার ব্যবসাকে হাইলাইট করুন। এখানে-সেখানে সাক্ষাৎকার দিন, সেগুলো ছড়িয়ে দিন প্রাসঙ্গিক অনলাইন ফোরামগুলোতে। দরকারে স্পন্সরড অ্যাডভার্টাইজিং-এর সাহায্য নিন। পজিটিভ কাস্টমার রিভিউগুলোকে সকলের সামনে নিয়ে আসুন। আর ফেইসবুক পেইজ বা গ্রুপটিকে নিজের প্রোফাইলের মত করেই গুছিয়ে রাখুন এবং তাতে সময়ও দিন। খুব দরকার আছে এ জিনিসটির। অবহেলা করবেন না একদম।

১৪। অফলাইনেও ব্যবসা বিস্তার করুনঃ

ব্যবসা মানুষ করেই বিস্তারের আশায়। কাজেই ফেইসবুকে গুটিয়ে না থেকে অফলাইনেও ডালপালা মেলার ব্যবস্থা করুন। সাধ্য থাকলে শো-রুম নিন। নাহলে আজকাল সুপার শপগুলো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের থেকে সাপ্লাই নেয় অনেক কিছু, তাদের সাথে যোগাযোগ করুন। আপনার পণ্যের মার্কেটিং এমনিই হয়ে যাবে যদি তা খুব বেশি ইউনিক কিছু হয়। এছাড়া প্রচুর ই-কমার্স সাইট তৈরি হয়েছে, হচ্ছে ইদানিং। তাদেরকেও আপনার পণ্য সরবরাহ করতে পারেন।

১৫। সবশেষে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা। সর্বাবস্থায় নিজের পণ্যকে ইউনিক রাখার চেষ্টা করুন। প্রতিযোগির সাথে আপনার পার্থক্য খুব স্পষ্টভাবে কাস্টমারের মাথায় ঢুকিয়ে দিন। অনেক অনেক কমনের ভিড়ে একটু আনকমন থাকা গেলে চাহিদা তৈরি হবেই। এবার শুধু লক্ষ্যটাকে স্থির করে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ুন।

তবে যাই শুরু করুন না কেন, স্টাডির কোন বিকল্প নেই। অনুপ্রেরণা, আত্মবিশ্বাস, অন্যের অভিজ্ঞতা আর নিজের সমস্ত শক্তিকে জড়ো করে তৈরি হতে থাকুন যুদ্ধে যাওয়ার জন্য। সাফল্য ধরা দেবেই।

1 মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ