বাংলাদেশে সাইবার হয়রানির শিকার ৭০ ভাগই নারী

0
138

সাইবার হয়রানি থেকে সুরক্ষা দিতে গঠিত সাইবার হেল্প ডেস্কে অভিযোগের পাহাড় জমছে। আর এই অভিযোগকারীদের ৭০ ভাগই নারী। নারীদের অভিযোগের  ৬০ ভাগেরও বেশি জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক নিয়ে। তবে ১০ ভাগ  বিপজ্জনক। এই ১০ ভাগের মধ্যে রয়েছে অন্যের ছবিতে ছবি জুড়ে দেওয়া (সুপার ইম্পোজ) এবং পর্নোগ্রাফি। হঠাৎ করেই ইউটিউব ও বিভিন্ন সাইটে এসব পর্নোগ্রাফি ও ছবি আপ করার হার বেড়েছে। সাইবার হেল্প ডেস্কে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

Cyber-crime1445861768 বাংলাদেশে সাইবার হয়রানির শিকার ৭০ ভাগই নারী

এই হেল্প ডেস্ক তৈরি করেছে সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ। সহযোগিতা করছে ইনসাইট বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন। সাইবার হেল্প ডেস্ক প্রতিষ্ঠার পর তেকে গত প্রায় দুই বছরে অভিযোগ জমা পড়েছে ১৭ হাজারের বেশি। এর মধ্যে গত মাসে ৭ হাজারের বেশি অভিযোগ জমা পড়ে।
হেল্প ডেস্কের সাইবার সিকিউরিটি ইউনিটের লিগ্যাল সাপোর্ট অ্যানালিস্ট (ইনসাইট বাংলাদেশ ফাউন্ডেশননের) অ্যাডভোকেট সূচনা ঘটক বলেন, গত ৭ মাসে হেল্প ডেস্কে অভিযোগ আসার হার হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে। ফেসবুক কেন্দ্রিক অভিযোগের পাশাপাশি বিপজ্জনক হারে বেড়ে গেছে পর্নোগ্রাফি নিয়ে অভিযোগ। অভিযোগকারীদের বেশির ভাগই নারী। তিনি বলেন, আসল চিত্র আরও ভয়াবহ। নারীরা সাধারণত লোক-লজ্জার ভয়ে অভিযোগ জানাতে আসেন না।  ভুক্তভোগীরা তাদের বাবা, ভাইকে পাঠান। অনেকে হয়তো আসেনই না। এসব ক্ষেত্রে তিনি নারীদের আরও সচেতন এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের বেলায় আরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।

অ্যাডভোকেট সূচনা ঘটক আরও বলেন, আমরা খেয়াল করেছি, গত ৩ মাসে পর্নোগ্রাফি এবং অন্যের ছবির সঙ্গে ছবি জুড়ে দিয়ে ছবি বিকৃত করার অভিযোগ বেশি আসছে। ফেসবুকের চ্যাট বা ভিডিও চ্যাটের ছবি একটু এদিকে ওদিক করে বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিডিওচিত্র দ্রুত ইউটিউবে বা বিভিন্ন পর্নো সাইটে শেয়ার করা হচ্ছে। এসব অনেকেরই এখন ইউটিউবে শেয়ার দেওয়া, পেমেন্ট পাওয়ার নেশায় পরিণত হয়েছে। এই নেশা যে কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে, তা ভুক্তভোগী ছাড়া অন্যকেউ কল্পনাও করতে পারবে না। আমাদের কাছে অভিযোগ আসার দুই-একদিনের মধ্যে রিপোর্ট করতে গিয়ে দেখা যায় তা কয়েক লাখবার শেয়ার হয়ে গেছে। গুগল তা মুছতে চায় না। ফলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।

অ্যাডভোকেট সূচনা ঘটক জানান, বর্তমানে প্রতিদিন তাদের হেল্প ডেস্কে ১০০-১৫০ অভিযোগ জমা পড়ছে। এসবের মধ্যে প্রায় ১০০টি সমস্যার সমাধান করা গেলেও অবশিষ্টগুলো করা যাচ্ছে না প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টের (কাগজপত্র) অভাবে। তিনি জানান, প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট বলতে যথাযথ কর্তৃপক্ষ অভিযোগকারীর পাসপোর্ট/জাতীয় পরিচয়পত্র/ ড্রাইভিং লাইসেন্সকে বুঝে থাকেন। এসব ডকুমেন্টের যে কোনও একটি দিলে সমস্যার সমাধান পাওয়া সহজ হয়। জন্ম-সনদ বা শিক্ষার্থীর আইডি কার্ডে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করতে চান না। ফেক বা নকল আইডি এবং হ্যাক হওয়া আইডি উদ্ধার বা বন্ধ করার বিষয়ে সফলতা এলেও জন্ম-সনদ বাংলায় থাকলে বা আইডি কার্ডে অপর্যাপ্ত তথ্য থাকায় সেগুলো কর্তৃপক্ষ গ্রহণ না করায় শতভাগ সফলতা আসছে না। তিনি আরও জানান, তবে ডিজঅ্যাবল হয়ে যাওয়া আইডি উদ্ধারে হেল্প ডেস্কের সহায়তা চাইলে সমাধান পাওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই।

ইনসাইট বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের পরিচালক তানভীর চৌধুরী বলেন, ফেসবুকে ভুয়া আইডি খুলে হয়রানির অভিযোগ বেশি আসছে। এ ধরনের অপরাধের মূল শিকার নারী। কখনও ভুক্তভোগী নিজে বা তার কোনও স্বজন আমাদের কাছে এসে অভিযোগ জানান। আমরা আগে ফেক আইডিটা চিহ্নিত করি। এ কাজের কিছু প্রক্রিয়া আছে। সেটা ব্যবহার করে আমরা ওই আইডি বন্ধ করে দেই।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এ কাজে তাদের সফলতার হার ৮০ ভাগ। কারও ফেসবুক ওয়াল থেকে বাজে পোস্ট হয়েছে—এমন অভিযোগও আমরা পাই। অভিযোগকারীর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে আইপি (ইন্টারনেট প্রটোকল) নম্বর দেখে সংশ্লিষ্ট পোস্ট বন্ধ করার ব্যবস্থা করি। তিনি জানান, তবে আইপি লোকেশন ডিটেক্ট করার ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে সমস্যা হয়।

জানা গেল, অভিযোগের দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে বাজে তথ্য বা বিকৃত ছবি প্রকাশ। এ ধরনের অসংখ্য অভিযোগ জমা হচ্ছে হেল্প ডেস্কে। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ইউটিউব। এই পোর্টালে ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও আপ করার মতো অসংখ্য অভিযোগ আসছে।

প্রসঙ্গত, দেশে সাইবার অপরাধ ও সাইবার হয়রানি বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে আইসিটি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। ওই পোস্টে তিনি সাইবার হয়রানি থেকে রক্ষা পেতে একটি ‘হেল্পলাইন’ প্রকাশ করেন। সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ এবং দমনে চালু হেল্পলাইন (০১৭৬৬৬৭৮৮৮৮) সপ্তাহের সাত দিন, ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। বাংলাদেশের যেকোনও জায়গা থেকে যে কেউ হেল্পলাইনে সরাসরি ফোন করে অথবা এসএমএস-এর মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে পারবেন।

তানভীর চৌধুরী আরও জানান, হেল্প ডেস্কে যেসব অভিযোগ গ্রহণ করা হয় তার অধিকাংশই ভুয়া ফেসবুক আইডি, হ্যাকড ফেসবুক, ই-মেইল আইডি হ্যাকড, বিভিন্ন ধরনের পর্নোসাইট বা ব্যক্তিগত ছবি পর্নোসাইট ছেড়ে দেওয়া সংক্রান্ত। তিনি বলেন, ওয়েবসাইটের (http://cybernirapotta.net.bd) লাইভ মেসেঞ্জার ব্যবহার করেও অনেকে অভিযোগ করেন। ফেসবুক পেজের মাধ্যমেও প্রতিদিন অভিযোগ আমাদের কাছে আসছে। ই-মেইলের মাধ্যমে দিনে ৮-১০টি অভিযোগ আসে। তবে আমরা সাধারণত ই-মেইলের মাধ্যমে অভিযোগকারীকে ডকুমেন্ট পাঠাতে অনুরোধ করি।

অভিযোগের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি জানান, অভিযোগ যেমনই হোক না কেন হেল্প ডেস্ক থেকে অভিযোগকারীকে অবশ্যই প্রথমে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করতে বলা হয়। কারও আইডি হ্যাকড হলে সেক্ষেত্রে জিডিতে অবশ্যই লিখতে হবে ‘এই আইডির মাধ্যমে যদি সরকারবিরোধী, সমাজবিরোধী বা রাষ্ট্রবিরোধী কোনও কার্যক্রম হয়ে থাকে তার জন্য আমি দায়ী থাকব না।’ পরবর্তী সময়ে সেই সাধারণ ডায়েরির স্ক্যান কপি ই-মেইলে পাঠাতে বলা হয়। হেল্প ডেস্কে কর্মরত আইনজীবীরা যদি মনে করেন, অন্য কোনও ডকুমেন্টের প্রয়োজন আছে, তাহলে পরবর্তী সময়ে কী কী করতে হবে, সেটা তারা বলে দেন।

সমাধান দেওয়ার পাশাপাশি সাইবার দুনিয়ায় কিভাবে নিরাপদ থাকতে হবে, সে বিষয়েও পরামর্শও দেওয়া হয় হেল্প ডেস্ক থেকে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here