স্বপ্নের ভেতর স্বপ্ন

0
430

বাসা থেকে বেরিয়ে হেঁটে স্কুলে যাবো। সকালে কিছু খেয়েছি কিনা তাও মনে নাই। কিভাবে গেট দিয়ে বেরলাম তাও  মনে আসছে না। বাসাটা কাফরুলের কোথাও মনে হচ্ছে। ৩ তলা বিল্ডিং। লাল রঙ।

বাসা থেকে বেরলাম, কড়া রোদ। রাস্তায় কোনও মানুষ নেই ,আজব!

আমার গায়ে অদ্ভুত কিছু ঝুলে আছে মনে হল। দেখলাম আমি এই গরমেও আমার গায়ে সোয়েটার। আজব! আমি ঘামছি না। রাস্তায় হেঁটে যেতে লাগলাম। মাথায় তখনও ঘুরছে, গরমকালে সুয়েটার পরলাম কোন আক্কেলে? আর আমার কোনও লাল সুয়েটার নেই। আশেপাশে কোনও মানুষও নেই, আমার খটকা লাগলো। আমি কি তবে ঘুমিয়ে আছি? স্বপ্ন দেখছি? সব মানুষ কোথায়?

হাঁটতে লাগলাম, রাস্তা খুব সুন্দর। কালো পিচে বাধানো। পাশে সবুজ ঝাউ গাছ। রোদ পড়ে সজীবতা বোঝা যাচ্ছে। যেন মাত্র বৃষ্টিতে ভিজলো। ফুটপাথ সুন্দর টাইলে বাধানো। দোকান সব বন্ধ।

হঠাৎ অজানা আশঙ্কা এসে আমাকে ভর করলো। আমার বাবা – মা, ভাই-বোন সবাই কোথায়? তাদের কি হয়েছে? হঠাৎ মনে হল এই রাস্তাও আমি চিনি না, কেউ আমাকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

একটু পর একটা বড় মাঠের সামনের বিল্ডিং দেখলাম। মনে হল সেটা আমার বিদ্যালয়। আমি সেখানে পড়ি। অনেক সুন্দর সেটা। ঘাস লেবু রঙের, সোঁদা গন্ধ নাকে লাগছিল। সুন্দর সমান করে ছাটা। আমি হেঁটে হেঁটে বিল্ডিঙের কাছে গেলাম। কিন্তু মনে হল এখানে মানুষ আছে।

খুঁজতেই আমি দুজনকে দেখতে পেলাম। মনে হল, এরা আমার পরিচিত। কাছে গেলাম, তারা মাঠের পাশে আম বনের সামনে দাড়িয়ে ছিল। তাদের একজনের নাম সালেহিন আসিফ, আরেকজন ইসরাত মাইশা। মনে হল তারা আমার ক্লাসের খুবই বন্ধু। আমার মাথায় আসছিল না, আমি কি করে এত কিছু জানি, আবার আমার মনে হচ্ছে আমি কিছুই জানি না। কেউ আমাকে মনে থেকে বলে দিচ্ছে।

তারা কিছু নিয়ে কথা বলছিল। আমি তাদের ডাকলাম। কিন্তু তারা কোনও সারা দিল না। যেন পাত্তাই দিল না, হতবাক হয়ে দেখলাম, আমি সালেহিনের ঘারে থাবা দিলাম। তাও কোনও কিছু বুজছেনা তারা। আমিও বিরক্ত হয়ে হাতা শুরু করলাম। সেই আগের একঘেয়ে রাস্তা, সজিব ঝাউ গাছ, কালো পিচের রাস্তা, যেন আমি কোনও কম্পিউটারের খেলার ভেতর হাটছি। কি করব বুঝতে পারছিলাম না। আমার শাতেহ কি ঘটছে। আমি হঠাৎ পাশে মোড় নিলাম।

সেখানে আরেকটা রাস্তার শুরু। সেখানে ঝাউ গাছ নেই, পাতাবাহার গাছ। আরও ভালো লাগলো আমার।

হঠাৎ মাটিতে হোঁচট খেয়ে পড়লাম, আর আশেপাশের সব কিছু যেন দপ করে সাদা হয়ে গেল, আমি কেবল অসীম সাদায়, আলোর কোনও উৎসই যেন নেই। সামনে কালো বিন্দুর মতো কোনও বস্তু দেখতে পাচ্ছি। সেটা যেন আমাকে কাছে টানল, আমার অনুভুতি হচ্ছিল আমাকে দরজার কাছে যেতে হবে, সেটা খুলতে হবে।

আমি যেন আবার অনন্তকালের হাটা শুরু করলাম। সাদার রাজ্জে কোনও প্রান নেই। অবশেষে আমি দরজার কাছে এলাম।

কাঁপা হাতে দরজা খুললাম। ভেতরে হালকা অন্ধকার, প্রচুর কম্পিউটার। বলাচলে, একটা গোটা পৃথিবীর কম্পিউটার সার্ভার যেন সেখানে। সেখানে একটাই কম্পিউটার চালু ছিল। তাতে একটা লোগো। জ্বলজ্বল করে সেটা হলগ্রাফিক স্ক্রিনে নাচছে। আমি সেটাতে টাচ করলাম। তাতে সাথে সাথে জায়গাটায় আলো জলে উঠলো। উজ্জল আলো। আমি দেখলাম, একটা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সফটওয়্যার চালু হল সেই কম্পিউটারে। একটা মানুষ মতো অবয়ব আমাকে স্বাগতম জানাল।

“স্বাগতম, তাওসিফ তুরাবি! ‘ইনফিনিটিভ ওয়ার্ল্ড’ স্লিপ সিমিউলেসশন সফটওয়্যারে আপনাকে স্বাগতম জানাচ্ছি!”

“কি! কি এটা? আমি এখানে কি করে এলাম ? তুমি কে?”

আমি মোটামোটি ভিরমি খেয়ে গেলাম। ব্যাটা বলে কি??

“আপনি এই সফটওয়্যারের আবিষ্কর্তাদের একজন। আপনি বর্তমানে ২০৩৫ সালে আছেন। প্রোগ্রাম চালুর সময় আপনার এজ প্রসেট ১৫ বছর দেওয়া হয়েছে। আমি আপনাকে সারাক্ষণ নজরে রেখেছি। আমি এই বিশাল সফটওয়্যারের সবছে নিরাপদ ও সুরক্ষিত অংশ ‘কেয়ারটেকার’। আমি কোনও ভাবেই মুছে যেতে পারি না আপনার বিশেষ কম্যান্ড ছাড়া।”

আমি জিজ্ঞাস না করে পারলাম না, “আমি এখানে এলাম কি করে?????”

“আপনি স্বপ্নের মাধ্যমে এখানে প্রবেশ করেছেন। আপনার ঘুমের আগের মাথায় অন্যান্য আবিষ্কর্তারা সেরেব্রাল সেন্সর ইনপুট ডিভাইস সেট করে দিয়েছেন। যেতা অনেকটা হেলমেটের মতো। এখান থেকে বেরোতে হলে আপনার ঘুম বাহির থেকে ভাংতে হবে।”

“সেজন্য আমাকে কতক্ষন অপেক্ষা করতে হবে?”

“প্রায় ৩ ঘণ্টা ৭ মিনিট ৫৬, ৫৫, ৫৪ … সেকেন্ড”

আমার মনে আরও প্রস্ন ছিল। যেটা মাথায় আগে এল সেটাই বললাম, “আমার দুই বন্ধু আমাকে কথার জবাব দেয়নি, এমনকি দেখেওনি, কেন?”

“তারা আপনার সাথে এখানে আসেন নি। আপনি তাদের প্রতিচ্ছবি দেখেছেন। আপনি ঘুমের আগে তাদের দেখেছিলেন। আপনার মস্তিষ্ক তাই আপনাকে স্বপ্নের মাঝে ভ্রম দেখিয়েছে। এছাড়া আপনার সকল পরিচিত বন্ধুর ৩ডি মডেল আমার ডাটাবেজে আছে। সেখানে থেকে আপনার মস্তিস্কই এত নিখুত ভ্রম তৈরি করেছে। সমগ্র পৃথিবীতে একটা মানুষ একা থাকলে কেমন লাগবে তা জানার জন্য আপনারা এই সফটওয়্যারে পরীক্ষা করছেন। আপনি তার গিনিপিগ।…….”

শুনতে শুন্তেই যেন আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। আমার ঘুম ভাংলো একটা বেডে।

পাশে কো-ডিরেক্টর অব আপেক্ষিক সফটওয়ার ইনকর্পোরেটেড তালহা কম্পিউটারে কাজ করছে। তার সাথে মাহমুদুজ্জামান কমল। বাম পাশে সালেহিন ও মাইশা। সবাইকে দেখে আমার খুব ভালো লাগলো। পৃথিবীতে আমি।

সকলে আমাকে সুস্থ দেখে খুশি।

মনে পড়ে গেল, অসীম পৃথিবী নামের সফটওয়্যারে কাজ করছি আমরা। তাও মজা করে জিজ্ঞাস করলাম,”তোরা কি আসল না নকলরে? বুঝতে পারছি না…..” সবাই হেসে উঠলো।

আমাদের গবেষণার রিপোর্ট অনলাইনে বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। বিদেশি সাংবাদিকরা আসছেন। তালহা তাদের ব্রিফ করছে। আমি চলে এলাম আমার রুমে। কম্পিউটারে ডায়রি লিখতে লাগলাম। এমন সময় ভুমিকম্প!!!!!

আল্লাহ! বাঁচাও!!!

ঘুম থেকে উঠে দেখলাম আমি খাটে শুয়ে আছি, আম্মু বলল, “চেচাস কেন? ঘুম থেকে ওঠ! কাল না বিজ্ঞান জয়োৎসব! প্রোজেক্ট বানানো শেষ হয়েছে?”

আমি উঠে মোবাইল দেখলাম, ২০১৫ সাল। হাহ! বাঁচলাম! স্বপ্নের ভেতর স্বপ্ন দেখছিলাম।

নামাজ পড়ে নাস্তা খেয়ে কম্পিউটারে প্রোজেক্ট নিয়ে বসলাম। মাঝেই তালহা আর কমল এসে পড়লো।

তাদের ঘটনা খুলে বললাম। সবাই শুনে হেসে লুটোপুটি। আমি গম্বীর হয়ে বললাম, ” সত্যি হলে তোদের এতক্ষনে খবর করে ফেলতাম!”

জানালা দিয়ে বাহিরে তাকালাম, একটা শালিক ডাকছে।

নাহ! আসল পৃথিবীই ভালো।

কেবল বোকা মানুষ না বুঝে নষ্ট করে দিচ্ছে পৃথিবীকে।

© তাওসিফ তুরাবি

এই পোস্টের সাইন্স ফিকশনটি আমার ব্লগে প্রথম পাবলিশ হয়

উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

seventeen − 7 =