প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতা নিয়ে নতুন কিছু তথ্য

0
406

মিশরীয় সভ্যতা, ইনকা সভ্যতা, অ্যাজটেক সভ্যতা ইত্যাদি প্রাচীন অথচ সমৃদ্ধ সভ্যতা নিয়ে আমাদের রয়েছে অনেক কৌতূহল। কিন্তু একদম বাড়ির কাছেই থাকা প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতা নিয়ে আমরা কতটা জানি? সম্প্রতি পাঁচ বছরব্যাপী পরিচালিত এক জাপানি গবেষণায় উঠে এসেছে হারানো এই সভ্যতার ব্যাপারে নতুন কিছু তথ্য। তাদের অনুসন্ধানে ‘কানমার’ নামক স্থান থেকে পাওয়া যায় লকেট বা পেনডেন্ট এর মত কিছু অলংকার যা পাসপোর্ট হিসেবে ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সিন্ধু সভ্যতা প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতা নিয়ে নতুন কিছু তথ্য

ভারত এবং পাকিস্তানের কিছু অঞ্চলে অতীতে সিন্ধু সভ্যতার পত্তন হয়। এটা ছিল এমন একটি বাণিজ্যভিত্তিক সভ্যতা যার মাঝে মিশ্রণ ঘটে অনেক ভাষাভাষী সংস্কৃতির। আর এটা এমন একটা সংস্কৃতি যেখানে কোনো কেন্দ্রীয় প্রশাসন ছিল না। এই সভ্যতার অনেক বৈশিষ্ট্য এখনও রয়ে গেছে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক অঞ্চলে আর অতীত ও বর্তমানের মাঝে এই যোগসূত্র সব সময়েই উৎসাহী করে এসেছে গবেষকদের।

 

এই সভ্যতার ব্যাপারে একেবারে আনকোরা তথ্য উঠে এসেছে জাপানের কিয়োটোর Research Institute for Humanity and Nature এর গবেষণা থেকে। পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন দেশের ৪০ গবেষকের প্রচেষ্টার ফসল হল এসব তথ্য। Kyoto University Press এর অক্টোবর সংখ্যায় প্রকাশিত হয় ‘Indus: Exploring the Fundamental World of South Asia’ এবং ‘The Riddle of the Indus Civilization’ নামের দুই গবেষণাপত্র। দু’টিই তৈরি করেন গবেষণার নেতৃত্বে থাকা অধ্যাপক তোশিকি ওসাদা। ভারতে অবস্থিত সিন্ধু সভ্যতার বিভিন্ন এলাকায় এই গবেষণার আওতায় সর্বপ্রথম খননকার্য চালানো হয়।

 

সিন্ধু সভ্যতার পরিচিত যে দু’টি এলাকা আছে সেগুলো হলো হরপ্পা এবং মহেঞ্জোদারো, দু’টিই পাকিস্তানে অবস্থিত। সব মিলিয়ে রয়েছে পাঁচটি এলাকা যেখানে গবেষকরা বেশী মনোযোগ দেন। প্রথম দু’টি ছাড়া বাকিগুলো হলো পাকিস্তানের মরু অঞ্চল গানেরিওয়ালা, ভারতের ধোলাভিরা এবং রাখিগড়ি।

 

সিন্ধু সভ্যতা নিয়ে সাধারণ তত্বগুলোর একটি হল, সিন্ধু ছাড়াও অন্য কোনো নদী আশেপাশে বহমান ছিল। কোনো এলাকায় প্রাপ্য খনিজ স্ফটিকের পরিমানের ওপর নির্ভর করা একটি পরীক্ষায় সিন্ধুর মরু অঞ্চল পর্যবেক্ষণ করেন হোসেই ইউনিভার্সিটির হিদেয়াকি মায়েমোকুর নেতৃত্বে থাকা একটি গবেষক দল।

 

তারা দেখেন, এই এলাকায় থাকা বালিয়াড়িগুলো তৈরি হয়েছে একটি বিশাল নদীর কারণে। এই নদী বহমান ছিল সিন্ধু সভ্যতার পত্তনেরও অনেক আগে। আর সেই নদী বিলুপ্ত হয়ে যাবার পরই কেবল এই বালিয়াড়িগুলোর ওপরে মানবসভ্যতা স্থাপিত হয়।

 

ধোলাভিরায় পাওয়া যায় অন্যরকম তথ্য। সিন্ধু সভ্যতার উন্নত বানিজ্যের নিদর্শন পাওয়া যায় সেখানে। প্রাচীন মেসোপটেমিয়া সভ্যতার মানুষেরা আরব সাগর পাড়ি দিয়ে এখানে বাণিজ্য করতে আসতো বলে ধারণা করা হয়। সময়ের সাথে উপকূলের কাঠামোতে কি কি পরিবর্তন এসেছে তা নির্ণয় করা হয় একটি কম্পিউটার প্রোগ্রামের মাধ্যমে। এছাড়া ভৌগোলিক গঠনে কি কি পরিবর্তন এসেছে সেটাও দেখা হয়।

 

এতে দেখা যায়, সে সময়ে সমুদ্রের পানির উচ্চতা ছিল এখনকার চাইতে প্রায় দুই মিটার বেশী এবং উপকূল ছিল স্থলভাগের আরও ভেতরের দিকে। সেটা থেকেই ধারণা করা হচ্ছে সিন্ধু সভ্যতার অনেক এলাকা ছিল উপকূল ঘেঁষে এবং সাগরের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল ছিল এই সভ্যতা।

 

ধোলাভিরা থেকে কিছুটা দূরে থাকা কানমারেও খননকার্য চালানো হয়। এখানে যেসব নিদর্শন পাওয়া যায় তার মাঝে ছিল পোড়ামাটির তিনটি গোল চাকা। প্রতিটির মাঝে একটি করে ছিদ্র ছিল আর ইউনিকর্নের ছবি আঁকা ছিলো এক পাশে। অপর পাশে সিন্ধু সভ্যতার ভাষায় বিভিন্ন লেখা পাওয়া যায়। প্রতিটির মাঝে একই প্রাণীর ছবি থাকার কারণে অধ্যাপক ওসাদা ধারণা করেন, সিন্ধুর বিভিন্ন এলাকার মাঝে যাতায়াত করার সময় এগুলো পাসপোর্ট হিসেবে ব্যবহার করা হতো।

 

কখন এবং কেন সিন্ধু সভ্যতা বিলুপ্ত হয়ে যায় তা নিয়েও গবেষণা করেন তারা। দেখা যায়, এর বিলোপের আগে উত্তর ভারতের দিকে এই সভ্যতা সরে যেতে থাকে। সম্ভবত পরিবেশের পরিবর্তনের প্রভাব এড়ানোর জন্য তারা বিভিন্ন শহর পরিবর্তন করে চলে যেতে থাকে।

 

‘Indus Project নামে পরিচিত এই গবেষণার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাতে শুরু করছেন অন্যান্য অনেক বিজ্ঞানীও। কারণ এখানে অনেক আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষণা করা হচ্ছে এবং পাওয়া যাচ্ছে অনেক অজানা তথ্যের সন্ধান। এই সভ্যতার লিপির পাঠোদ্ধার এখন সম্ভব হয়নি, তাই গবেষণা করার অনেক সুযোগ আছে এখনো।

একটি উত্তর ত্যাগ