সাবধান সবাই – নতুন মোড়কে বিক্রি হচ্ছে পুরনো হার্ডডিস্ক

0
449

উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ ৪-৬ বছর অথচ দেশের প্রযুক্তি বাজারে মিলছে বন্ধ হয়ে যাওয়া ওইসব প্রতিষ্ঠানের নতুন নতুন হার্ডডিস্ক! এসব হার্ডডিস্ক দেশে দেদার বিক্রি হচ্ছে। বিশেষ করে মফস্বলে এসব হার্ডডিস্কের চাহিদা এবং বিক্রি বেশি। অথচ এসব দেখার বা নিয়ন্ত্রণ করার কেউ নেই।

 বর্তমানে ডেস্কটপ কম্পিউটারের (পিসি) হার্ডডিস্ক উৎপাদন করছে সিগেট, তোশিবা আর ওয়েস্টার্ন ডিজিটাল (ডাব্লিউডি)। দেশের বাজারে এই তিন ব্র্যান্ডের হার্ডডিস্ক পাওয়ার কথা থাকলেও পাওয়া যাচ্ছে হিটাচি, ফুজিৎসু, স্যামসাং, ম্যাক্সটর-সহ আরও অনেক কোম্পানির হার্ডডিস্ক। এসব কোম্পানির কোনওটি ৪ বছর, কোনওটি ৫ বছর আবার কোনটি ৬ বছর আগে ডেস্কটপ পিসির হার্ডডিস্কের উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করেছে।

ডেস্কটপ পিসির জন্য হার্ডডিস্কের মেয়াদ ২ বছরের। ধরে নেওয়া যাক, হিটাচি, ফুজিৎসু, স্যামসাং, ম্যাক্সটরের যেসব হার্ডডিস্ক বাজারে পাওয়া যাচ্ছে, ২ বছর আগে সেসব হার্ডডিস্কের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। তাহলে ২০১৩ বা ২০১৪ সালের পরে এসব হার্ডডিস্ক বাজারে পাওয়া যাওয়ার কথা নয়। পাওয়া গেলেও তাতে মেয়াদ (ওয়ারেন্টি) থাকার কথা নয়। অথচ এসব হার্ডডিস্ক ওয়ারেন্টি ছাড়াই বিক্রি হচ্ছে বাজারে যেসব হার্ডডিস্ক পাওয়া যাচ্ছে, তার তিনভাগের এক ভাগ বা ক্ষেত্র বি‌‌‌শেষে অর্ধেক দামে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এর সঙ্গে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীরা জড়িত। এরা পুরনো হার্ডডিস্ক চীন, তাইওয়ান ও হংকং থেকে নতুন করে মোড়কজাত করে এনে বাজারে বিক্রি করছে। আর এসবই হচ্ছে আন অথরাইজড চ্যানেলে। এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ক্রেতারা। তারা পুরনো হার্ডডিস্ক নতুন মনে করে কিনে প্রতারিত হচ্ছেন। কোনও ধরনের ওয়ারেন্টি ছাড়া হার্ডডিস্ক কিনে সমস্যাগ্রস্ত হলেও কারও কাছে প্রতিকার চাইতে পারছেন না। সম্প্রতি ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডের কম্পিউটার মার্কেট থেকে এরকম হার্ডডিস্ক কিনে কয়েকজন সমস্যায় পড়েছে বলে জানা গেছে। ওদিকে দেশে হার্ডডিস্কের অথরাইজড ডিস্ট্রিবিউটররা অসাধু ব্যবসায়ীদের এই কুকর্ম ঠেকানো বিভিন্নমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করছে বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, হার্ডডিস্ক নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সিগেট ১৯৮৯ সালে সিডিসি, ১৯৯৬ সালে কোনার,  ২০০৬ সালে ম্যাক্সটর (ম্যাক্সটর ২০০০ সালে কোয়ান্টাম এবং ১৯৯০ সালে মিনি স্ক্রাইবকে কিনে নেয়) এবং ২০১১ সালে স্যামসাংয়ের হার্ডডিস্ক উৎপাদনকারী ইউনিটকে কিনে নেয়। অন্যদিকে ডাব্লিউডি ১৯৮৮ সালে ট্যান্ডনকে অধিগ্রহণ করে। আইবিএমকে ২০০২ সালে হিটাচি এবং হিটাচির একটি অংশকে (২.৫ ইঞ্চি) ২০১১ সালে ডাব্লিউডি এবং ৩.৫ ইঞ্চির ইউনিটকে ২০১২ সালে তোশিবা কিনে নেয়। এই তোশিবা আবার ২০০৯ সালে কিনে নেয় ফুজিৎসুর হার্ডডিস্ক নির্মাণকারী ইউনিটকে। ফলে এখন হার্ডডিস্ক (ডেস্কটপ) নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে রয়েছে সিগেট, তোশিবা এবং ডাব্লিউডি। এই তিনটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যসব প্রতিষ্ঠানের হার্ডডিস্ক উৎপাদনকারী ইউনিটের অস্তিত্বও নেই অথচ বাজারে এসব কোম্পানির হার্ডডিস্ক মিলছে।

এ প্রসঙ্গে স্মার্ট টেকনোলজিস বিডি লিমিটেডের (সিগেট ও তোশিবা হার্ডডিস্কের অনুমোদিত পরিবেশক) মহাব্যবস্থাপক (বিক্রয় ও বিপণন) মুজাহিদ আলবেরুনী সুজন বললেন, একটি হার্ডডিস্ক বিক্রি করলে কত টাকা মুনাফা থাকে- ৫০-১০০ টাকা। আর যেসব হার্ডডিস্ক নতুনরূপে বাজারে আসছে সেসব বিক্রি করে খুচরা ব্যবসায়ীরা কয়েকগুণ মুনাফা করছে। তাহলে অরিজিনালটি আমাদের কাছ থেকে নেবে কেন। মুজাহিদ আলবেরুনী সুজন জানান, ঢাকার ক্রেতারা অনেক সচেতন। ফলে ঢাকায় এটা খুব বেশি না চললেও মফস্বলের লোকজন কমটাকায় এসব হার্ডডিস্ক মুড়িমুড়কির মতো কিনছে। তাদের কাছে পণ্যের কোয়ালিটির কাছে দামটাই আসল। তিনি বলেন, মফস্বলের ডিলাররা আমাদের পণ্য বিক্রির চেয়ে হারিয়ে যাওয়া কোম্পানির হার্ডডিস্ক বিক্রি করতে বেশি আগ্রহী।

মুজাহিদ আলবেরুনী সুজন আরও বলেন, যেসব হার্ডডিস্ক (হিটাচি, ফুজিৎসু, স্যামসাং, ম্যাক্সটর-সহ আরও অনকে) আমরা মেরামত বা রিপ্লেসমেন্টের জন্য উৎপাদকদের কাছে পাঠাই দেখা যায় সেসবের বিপরীতে আমাদের ক্রেডিট নোট দেওয়া হয় বা অন্যকোনওভাবে পাওনা সমন্বয় করা হয়। আর ওইসব পণ্য ‘ফ্যাক্টরি রি-সার্টিফায়েড’ করে নতুন মোড়কে অন্যরা দেশের বাজারে আনছে যা দিন দিন ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির (বিসিএস) মহাসচিব নজরুল ইসলাম মিলন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, এ ধরনের কথা তারাও শুনেছেন। তারা সোর্স চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন। এজন্য তারা কাস্টমসের সঙ্গে বসে বিষয়টির সুরাহা করতে উদ্যোগী হবেন বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, একেবারে সাপ্লাইয়ের জায়গাটি যদি বন্ধ করে দেওয়া যায় তাহলে এ ধরনের পণ্যগুলো আর বাজারে আসবে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলেও তা একেবারে বাজার থেকে শেষ হয়ে যায় না। নানাভাবে বিশেষ করে গ্রে মার্কেট দিয়ে এটি মূল বাজারে প্রবেশ করে।

হার্ডডিস্ক কেনার আগে ক্রেতাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন স্মার্ট টেকনোলজিসের পণ্য ব্যবস্থাপক (হার্ডডিস্ক) মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, বাজার থেকে হার্ডডিস্ক কেনার সময় খেয়াল রাখতে হবে পণ্যটিতে ওয়ারেন্টি রয়েছে কি না। ওয়ারেন্টি না থাকলে তা কেনা সমীচীন হবে না। চ্যানেলবিহীন পণ্য (তিন অনুমোদিত পরিবেশক ছাড়া) না কিনতেও তিনি অনুরোধ জানান। এই তিন প্রতিষ্ঠানের বাইরে থেকে হার্ডডিস্ক কিনলে তা নিশ্চিতভাবেই বন্ধ হয়ে যাওয়া কোম্পানিগুলোর। এসব হার্ডডিস্ক কিনলে কিছুদিনের মধ্যেই সমস্যা দেখা দেবে, ব্যাডসেক্টর পড়বে। ডাটা গায়েব হয়ে যাওয়া-সহ যেকোনও সময় তা ক্র্যাশও করতে পারে। ফলে হার্ডডিস্ক কিনতে সাবধান।

বাজারে স্যামসাংয়ের নকল মেমোরি কার্ড:

হার্ডডিস্কের পাশাপাশি প্রযুক্তি বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে নকল মেমোরি কার্ড। স্যামসাং কোনও মেমোরি কার্ড উৎপাদন না করলেও এর নাম ব্যবহার করে বিক্রি হচ্ছে ম‌‌‌েমোরি কার্ড। মেমোরি কার্ড ভর্তি স্যামসাংয়ের লোগোযুক্ত প্যাকেট দেখে বোঝার উপায় নেই যে এগুলো স্যামসাংয়ের নয়, নকল মেমোরি কার্ড। খোঁজ করে জানা গেছে, স্যামসাং কোনও ধরনের মেমোরি কার্ড উৎপাদন ও বিক্রি করে না। স্যামাংয়ের নাম ভাঙিয়ে নকল এসব কার্ড এক ধরনের অসাধু ব্যবসায়ীরা তৈরি করে বাজারজাত করছে। নিম্নমানের এসব কার্ড দামেও সস্তা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্যামসাং বাংলাদেশের মোবাইলফোন বিভাগের প্রধান হাসান মেহদী বলেন, স্যামসাং কোনও মেমোরি কার্ড তৈরি করে না। কারা এবং কীভাবে এটি বিক্রি করছে তা আমাদের জানা নেই।

LEAVE A REPLY

three × five =