‘অকার্যকর’ তথ্যপ্রযুক্তি আইন

0
306
ঝিনাইদহের গৃহবধূ বিউটি খাতুন (২২)। ২০১৩ সালে তাকে তালাক দেয় স্বামী মিঠু। এক বছর পর আবারো ঘরে তোলার নাম করে তাকে নিয়ে যান নিজ বাড়িতে। সেখানে বন্ধুদের দিয়ে বিউটিকে ধর্ষণ করিয়ে সেই ভিডিও প্রকাশ করা হয় বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। আর এই লজ্জায় পরদিন আত্মহত্যা করেন বিউটি।

বিউটির মতো প্রতিদিন সাইবার ক্রাইমের শিকার হচ্ছেন মেয়েরা। রাজধানীতে জ্যামিতিক হারে বেড়েছে এ ধরনের সাইবার অপরাধ। খুব অল্পতেই প্রতিশোধ গ্রহণ, ব্ল্যাকমেইল ও চাঁদাবাজি করতে অপরাধীরা এখন প্রযুক্তির সহায়তা নিতে শুরু করেছে। তবে এ অপরাধ বন্ধে দেশে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন-২০০৬ নামে একটি আইন থাকলেও এর প্রয়োগ খুব কমই দেখা গেছে। এছাড়া বিভিন্ন ফাঁক-ফোকরের কারণে আইনটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় অপরাধের মাত্রা বেড়েই চলেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক বছরে সাইবার অপরাধের ঘটনায় ৯`শ মামলা নথিভুক্তির কথা বলা হয়েছে। যা গত বছরের চেয়ে ১.৭৮ গুণ বেশি। তবে বিশ্ব সাইবার নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাইমেনটেকের মতে,  গত বছরে মোট ৩৫ হাজার ২১৩টি সাইবার ক্রাইমের ঘটনা ঘটেছে। 

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, দেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিদ্যা এবং টেলিযোগাযাগ নেটওয়ার্কের দ্রুত প্রসারের কারণেই সাইবার ক্রাইমও বৃদ্ধি পাচ্ছে।  এদিকে, এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিটিআরসি। প্রতিষ্ঠানটির দেয়া তথ্যমতে দেশে সাইবার ক্রাইমের অভিযোগে এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৪`শ ওয়েবসাইট ব্লক করা হয়েছে। এদের মধ্যে ২৭৫টি দেশীয় পর্নো ওয়েবসাইট, বাকিগুলো দিয়ে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো হতো।

বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স রেগুলেটরি কমিটির (বিটিআরসি) সাবেক ইঞ্জিনিয়ার ইতেশামুল হক জাগো নিউজকে বলেন, সাইবার অপরাধের শিকার অনেক তরুণী সমাজে নানাভাবে হেয়-প্রতিপণ্য হচ্ছে। অনেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

তার মতে, দেশের শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন  ওয়েবসাইটতে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে সাইবার জগতে টেনে নেওয়া হচ্ছে তরুণ প্রজন্মকে। এরপর  ব্যবহারকারীদের নানা প্রলোভন দেখিয়ে অশ্লীল সাইটের সদস্য করা হচ্ছে। তখন অনেকেই নিজের ‘এ্যাড্রেস’ ও ‘পাসওয়ার্ড’ লিখে পর্ণ ব্লগের সদস্য হচ্ছে। তাদের এই অপকর্মের বিরুদ্ধে বিটিআরসি আগেও সচেষ্ট ছিল, এখনো রয়েছে।

সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ওয়েবসাইটের তথ্য চুরি করে ওয়েবসাইটটি বিকল করে দেয় কয়েকজন সাইবার অপরাধী। তবে এই অপরাধ বন্ধে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বদা সচেষ্ট রয়েছে বলে জাগো নিউজকে জানিয়েছেন র‌্যাবের পরিচালক (লিগ্যাল ও মিডিয়া উইং) মুফতি মাহমুদ খান।

তিনি জানান, ফেসবুকে নগ্ন ভিডিও আপলোডসহ যারা অনলাইন অপরাধের সঙ্গে জড়িত তাদের চিহ্নিত ও আটক করতে র‌্যাব আগেও কাজ করেছে, এখনো করছে। সাইবার অপরাধ দমনে র‌্যাব সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।

সাইবার অপরাধ বন্ধে স্বতন্ত্র আইনের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট হৃদয় স্বপ্ন জাগো নিউজকে বলেন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৮ম অধ্যায়ের এ ধরণের অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিতের কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে এই অপরাধ একজন মানুষের জীবন ধ্বংস করে দেয়, মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। তাই এই অপরাধের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিৎ।

সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে সাইবার অপরাধ জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। এ অপরাধ দমনে সাইবার সিকিউরিটি গাইডলাইন প্রণয়ন করা হয়েছে। সাইবার সিকিউরিটি আইন প্রণয়নের কাজও চলছে। চলতি বছরের মধ্যেই এ আইন কার্যকর করা হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here

three × four =