ফটোগ্রাফারদের ভুল ধারনা

0
355

ফটোগ্রাফারদের ভুল ধারনাঃ

১। অপব্যবহার- শ্যালো ডেপথ অফ ফিল্ডঃ
শ্যালো ডেপথ অফ ফিল্ড, সহজে বললে ছবির ফোকাস করা অংশ বাদে বাকিটা ঘোলাটে করে দেয়া অত্যন্ত সুন্দর একটি কাজ। পয়েন্ট এন্ড শ্যুট ক্যামেরা থেকে ডিএসএলআর এ আপগ্রেড হলে প্রথম পার্থক্যটাই সেটা। তাই অনেকে মনের আনন্দে মিস-ইউজ করা শুরু করে দেন। লেন্সের সর্বোচ্চ এ্যাপারচার থেকে নামতেই চান না। কারণ নামলেই ডিএসএলআর’এর মজা শেষ। কোন ছবিতে কতটা এ্যাপারচার রাখা উচিত তা শিখতে নীলক্ষেতের গাইডবই লাগেনা। ফ্লিকার ব্রাউজ করুন, ঘাগু ফটোগ্রাফারদের কাজকারবার দেখুন, নিজেই বুঝবেন।

২। অপব্যবহার- সাদা কালো এবং মনোক্রোমঃ
সব সাদাকালোই মনোক্রোম কিন্তু সব মনোক্রোম সাদাকালো নয়। একটি রঙের বিভিন্ন শেড দিয়ে ফুটিয়ে তোলা ছবি কে মনোক্রোম বলা হয়। মনোক্রোম ছবি রঙ্গিন ছবি থেকে সাধারণত বেশি নাটকীয় হয়। টেকনিক্যাল কারণটা বলা যায়- রঙ্গিন ছবিতে রঙের উপস্থিতি রেখা বা লাইনের থেকে মনোযোগটা সরিয়ে দ্যায়। অতঃপর সাদাকালোতে ড্রামাটিক দেখায় সবকিছুই। তাই উঠতি ফটোগ্রাফাররা এই টেকনিকটা দিয়ে হাবিজাবি ছবি পার করে দেবার প্রচেষ্টা চালান। একটা ছবি সাদাকালো ছবি তুলবেন কেন, নিজেকে নিজে প্রশ্ন করে উত্তর দিয়ে উত্তরটা পছন্দ হলে তারপর ছবিটা তুলন। যদি সাদাকালো ছবি তোলার যুক্তি সবসময়ই খুঁজে পেলে আপনাকে অনেক দূরে গিয়ে মুড়ি খেতে আহ্বান জানানো ছাড়া কিছু বলার নাই।

৩। অপব্যবহার- ফটোশপ:
ফেসবুকে একজনের চমৎকার স্ট্যাটাস দেখেছিলাম। ফটোশপ দিয়ে কবিতা লেখা গেলে দেশে ফটোগ্রাফার নয়, কবির সংখ্যা বেশি হতো। আমার ধারনা ফটোগ্রাফার হয়ে ফটোশপ ব্যবহার করা জায়েজ শুধুমাত্র যদি আপনার ছবিটা ৯৫% নিখুঁত, বাকি ৫% না শুধরালেই নয়। ফিল্ম আমলের ডার্করুম বর্তমান এডবি লাইটরুম। লাইটরুমে বিভিন্ন পেরিমিটার নাড়াচাড়া করে ছবিকে আর উপভোগ্য করা যায়। কিন্তু একটি যা’তা ছবি তুলে কেরামতি করে আপলোড করাটা ক্রিয়েটিভিটি নয়, অটিস্টিক বলা যেতে পারে। আপনার ফটোগ্রাফিতে যদি একটা ছবির পিছে বিনিয়োগ করা চিন্তাভাবনার ৫% এর বেশি পোস্ট-প্রোডাকশন নিয়ে হয়, তবে আপনার যত ফ্যান-ওয়ালা “কুদ্দুছ ফটোগ্রাফি” পেজই থাকুক না কেন, আপনি ফটোগ্রাফার নন। তবে আমি অনেক পাঙ্খা গ্রাফিক ডিজাইনারদের চিনি, যারা ক্যামেরা হাতে নিয়ে ছবি তুলছেন তাদের গ্রাফিক প্রজেক্ট চিন্তা করে। তারা ৫% এরও কম সময় ব্যয় করেন ছবি তুলতে, ৯৫%ভাগ প্রজেক্ট প্ল্যানিং আর পোস্ট-প্রোডাকশন নিয়ে। সেটা অন্য পেশা। তারা নিজেদের ফটোগ্রাফার দাবি করেন না। করলে তাদেরকেও দূরে গিয়ে মুড়ি খাবার আহ্বান জানাতাম।

৪। অপব্যবহার- গামছা(!):
অন লোকেশন ফটোগ্রাফি করতে গামছা অনেক মহৎ জিনিস। ঘাম মুছা, লেন্স মুছা থেকে শুরু করে লেন্সে পেঁচিয়ে শিশির থেকে রক্ষা করার মত মহান কাজ করা যায় গামছা দিয়ে। তবে অনেকের ধারনা গামছা গলায় না ঝুললে ফটোগ্রাফার হওয়া যায়না, তারাই কিছুদিন আগে ভাবতেন আজিজ সুপার মার্কেটে দাঁড়িয়ে বাকিতে চা খেতে খেতে পিকাসোর ছবির সমালোচনা না করলে বোদ্ধা হওয়া যায়না। গামছা গলায় ঝুললে আপনার ক্যামেরা নিজে থেকে ফটাফট কোপা ছামছু ছবি তুলা শুরু করে দিবেনা, বরং শোঅফ ভুগিচুগি ছেড়ে ইউটিউবে দুনিয়ার সেরা ফটোগ্রাফারদের টিউটোরিয়াল ফলো করুন, দেখুন তারা কতো সিম্পল মানুষ।

৫। মানুষের ছবি পজিটিভ ক্রিটিসিজম করা-
ইতিবাচক সমালোচনা না বলে পজিটিভ ক্রিটিসিজম বললাম, যেন কথাগুলো সহজে বুঝতে পারেন। মানুষের ছবি যদি কোনও কারণে মন্দ লাগে তবে “তোমাকে দিয়ে হবেনা” টাইপ কথা না বলে কেন মন্দ লাগলো সেটা জানান। কারণ ক্রিটিসিজম শুনলেই বুঝা যায় আপনি কোন ক্লাসের চিড়িয়া। আমি অনেকদিন আগে ফেসবুকে একটা ছবি দেখেছিলাম, একজন নবিশ ফটোগ্রাফার প্যানশট ট্রাই করেছিলো। অনেক বোদ্ধা ফটোগ্রাফার তাকে খুব জ্ঞান দিচ্ছিলেন, কিন্তু কেউ বলছিলেন না তার প্রব্লেমটা কোথায়। এই পয়েন্টটা বলতে গিয়ে আমার ছবি তোলার প্রথম দিনগুলির কথা মনে পড়লো। আমার বিখ্যাত মুরুব্বি ফটোগ্রাফাররা আমার ছবিতে এসে নেতিবাচক কমেন্ট দিতেন। ভবিষ্যৎ ভুল এড়াতে যখন জানতে চাইতাম ছবিটার সমস্যাটা কোথায়, মহামানবেরা প্রশ্নটাকে অপমান করার প্রয়াস ভেবে উত্তর দিতেন না। অনেকটা এই ক্ষোভ থেকে আমরা পরবর্তীতে “ফটো-ফ্যাক্টরি” নামে একটা গ্রুপ করেছি, যেখানে কেউ নেই এমন যে কারো সাথে জ্ঞান শেয়ার করতে না চাইবার মত ছোট মনের। যদি মনে করেন কারও ছবি একটু ভালো হতে পারতো, তবে সেই আইডিয়াটা তাকে দিন। বিশ্বাস করুন, সে কৃতজ্ঞ থাকবে, এবং কোনও না কোনও দিক থেকে একদিন আপনি এর প্রতিদান পাবেনই। আই কছম!

৬। মাইওয়ে অর হাইওয়ে:
“একটু ডানে হলে ভালো হতো, একটু বামে হলে ভালো হতো” সবার তোলা সব ছবি যদি আপনার মনের মত হয়, তবে সবার সাথে আপনার পার্থক্য থাকলো কোথায়? আপনি নিজেকে ঘাগু ফটোগ্রাফার ভেবে যেরকম কোন একটা কিছু চিন্তা করে একটা ছবি তুলছেন, সেরকমই অন্য আরেকজন অন্য কিছু ভেবেই তুলেছে। এমনও হতে পারে আপনিই বোঝেন নাই। যদি বিশ্বাস করেন “ভুল ছবি” বলে কিছু আছে তবে আপনার নাম এফিডেভিট করে পালটে বকরি রাখুন। কোন ছবি যদি “এর চেয়ে ভালো হতে পারতো” অবস্থা হয়, তার মানে কি ছবিটা ভুল?

৭। গ্রামারের বাইরে যেতে অনীহা:
কিতাবে লিখা আছে বলে তাই চোখ বুজে ফলো করতে হবে এটা যদি আপনার ধারনা হয়, তাইলে উপরের লেখা সবকিছু আপনার জন্য নয়। গ্রামার অবশ্যই জানতে হবে, যতটা সম্ভব মানতে হবে। তবে তার মধ্যেই আটকে পরে থাকলে জেনে রাখুন -জীবনে অনেক কিছু মিস করে ফেললেন, দাদা।

৮। অতিপ্রাকৃতিক বিবাহ:
টাইটেলটা শুনে বিষম খেলেন? খোলাসা করছি। অনেক ওয়েডিং ফটোগ্রাফ দেখা যায় “ক্রিয়েটিভটি” দেখাতে গিয়ে ভুতের সিনেমার পোস্টার বানিয়ে ফেলেন। গ্ল্যামার ফটোগ্রাফির উদ্দেশ্য আর বিয়ের ছবি কিন্তু এক না। মাত্রাতিরিক্ত পৈতালি করে বিয়ের ছবিটাকে হালুয়া বানাবেন না। এটা আর্টিস্টিক কাজ নয়, অটিস্টিক।

LEAVE A REPLY

2 × 5 =