তোমার অপেক্ষায়…! (লেখক : অস্পৃশ্য বন্ধু)

6
776
তোমার অপেক্ষায়...! (লেখক : অস্পৃশ্য বন্ধু)

অস্পৃশ্য বন্ধু

বর্তমান যুগ বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির যুগ...
আমি বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি প্রেমী একজন অতি সাধারণ মানুষ...
ইন্টারনেট, কম্পিউটার এবং প্রযুক্তি সম্পর্কে আবার প্রবল আগ্রহ...
আমার এই ইচ্ছাই আমার শক্তি...
তাই চেষ্টা করবো আপনাদের সাথে টিজনার পেজে থাকতে...
আপনাদের একান্ত সহযোগিতা আমার কাম্য...

ধন্যবাদ
তোমার অপেক্ষায়...! (লেখক : অস্পৃশ্য বন্ধু)

✒ ভূমিকা : প্রথমেই বলে নেয়া উচিত, এটাই আমার প্রকাশিত প্রথম লেখা…জানি না কেমন হয়েছে…মানুষ হিসেবে আমি অতি ক্ষুদ্র…আমার সৃষ্টিও যে ক্ষুদ্রই হবে, এতে অবাক হওয়ার কী আছে…
তবে আমি চেষ্টা করেছি আমার মনের ভাবটুকু ভালোবাসার তুলি দিয়ে প্রেমের ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলতে…জানি না আমি এ বিষয়ে কতটা সফল হয়েছি…

আমি জানি, আমার ভাষাশক্তি খুব দুর্বল…কারণ মাতৃভাষা আমার মনের ভিতরে এমনভাবে পুষ্পিত হয় নি যে তা দিয়ে সাহিত্য রচনা করে ফেলতে পারবো…তবুও যথাসম্ভব চেষ্টা করেছি…জানি না সঠিক উপমা-উদাহরণ ব্যবহার করতে পেরেছি কিনা…!

আশা করি, আমার প্রিয় বন্ধুরা আমার ভূল-ত্রুটিগুলো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবে…

গল্পটা আকারে একটু বড় হয়ে গেছে…তবুও তোমাদের প্রতি আমার অনুরোধ, তোমরা আমার এই গল্পটা মন দিয়ে পড়ে দেখো…কেমন লাগে তা মন্তব্যের ঘরে জানিয়ো…তোমাদের মন্তব্য আমাকে অনুপ্রাণিত করবে…
তাই তোমাদের মন্তব্যের অপেক্ষায় রইলাম…

> অস্পৃশ্য বন্ধু <

***************************************> শুরু <****************************************

তোমার অপেক্ষায়...! (লেখক : অস্পৃশ্য বন্ধু)

 

# পুরনো দিনের কথা #

নীলিমা ? !!!

বিকেলের পড়ন্ত রোদে পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে হাটছিল ওরা দুজন- ও আর আকাশ। হঠাৎ আকাশের ডাক শুনে থমকে দাড়িয়ে পড়লো নীলিমা…ওর ডাকে কী যেন একটা অসঙ্গতি আছে……ঠিক বুঝতে পারলো না ও !!!
তারপর হঠাৎ করেই বিষয়টা ধরতে পারলো ও…আকাশ ওকে নীলিমা বলে ডাকে না, নীলা বলে ডাকে…
আকাশের মুখে আজ হঠাৎ ওর এই নাম শুনে কিছুটা অবাক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকালো নীলিমা। কিন্তু আকাশ তখন দূর দিগন্তে কেমন যেন এক আনমনা ঘোরলাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে…! আকাশের এই চেহারা দেখে নীলিমার বুকের রক্ত কেমন যেন ছলকে উঠলো…

উদ্বেগের সাথে ও আকাশকে প্রশ্ন করলো, “কী হয়েছে আকাশ…? শরীর খারাপ নাকি ?”

আকাশ ওর কথার কোন উত্তর না দিয়ে তেমনিভাবেই উদাস দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো…

উত্তর না পেয়ে আকাশের হাত ধরে ঝাঁকালো নীলিমা, “কী হয়েছে বলছো না কেন ?”

এবার আকাশ ওর দিকে তাকালো…বললো, “আজ রাতের বাসেই আমাকে গ্রামে যেতে হবে।”

“কেন ?” নীলিমা প্রশ্ন করলো…

গ্রাম থেকে খবর এসেছে, মা নাকি খুব অসুস্থ্য…!

এই কথা শুনে কিছুক্ষণের জন্য নীলিমার বাকরুদ্ধ হয়ে গেল…তারপর সৎবিৎ ফিরে পেতেই উদ্বেগের সাথে ও প্রশ্ন করলো আকাশকে, “কেন ? কী হয়েছে মা’র ?”

“জানি না…আজ সকালেই গ্রাম থেকে খবর পেলাম- মা নাকি খুব অসুস্থ্য…হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমাকে তাড়াতাড়ি গ্রামে যাওয়ার জন্য খবর পাঠিয়েছে…।”

“ঠিক আছে, আমিও তোমার সাথে যাবো”, নীলিমা বলল।

“নাহ্ তোমাকে নেয়া যাবে না” হতাশার সুরে বললো আকাশ…।

“কেন ?” ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন করলো নীলিমা, “আমাকে নেয়া যাবে না কেন ?”

“সিট পাওয়া যাবে না বাসের…কিছুদিন পর-ই তো ঈদ…তাই সবাই যে যার গ্রামের দিকে ছুটছে…আমি কীভাবে যাবো সেটাই ভাবছি !”

“তুমি যেতে পারলে আমিও যেতে পারবো” জেদের সুরে বললো নীলিমা।

“পাগলামি করো না নীলিমা…প্লীজ একটু বোঝার চেষ্টা করো ব্যাপারটা…”

নীলিমা কী যেন বলতে গিয়েও আকাশের মুখের দিকে তাকিয়ে কী ভেবে যেন থেমে গেল…
তারপর বলল, “আচ্ছা ঠিক আছে…যাও তাহলে…কিন্তু গ্রামে পৌঁছেই আমাকে একটা খবর দিয়ো কিন্তু…”

“অবশ্যই দেবো” কথা দিল আকাশ…

“নীলিমা। এই নীলিমা !!!”

মায়ের ডাক শুনে দিবাস্বপ্নের জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে এলো নীলিমা।
বিকেল বেলা বারান্দায় বসে বৃষ্টি দেখছিল ও…দেখতে-দেখতে কখন যে ভাবনার জগতে হারিয়ে গেছে, ও নিজেও তা জানে না…!

“নীলিমা” মা আবার ডাকলেন।

“আসছি মা…।”
“ডাকছো কেন ?” কী হয়েছে বলো…।

“তরকারিটা একটু দেখতো মা…নাহলে পুড়ে যাবে…তোর বাবা আমাকে ডাকছে…আমাকে যেতে হবে…।”

“আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি যাও,আমি দেখছি…।”

তরকারির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নীলিমা আবার আনমনা হয়ে ভাবতে শুরু করলো….
আজ প্রায় ২ বছর হতে চললো…সেই যে গেল আকাশ, ওর আর কোন খোঁজ-ই পাওয়া গেল না…
কিন্তু ও তো আমাকে কথা দিয়েছিলো…তবে কেন ও ওর কথা রাখলো না ? কেন আমাকে এভাবে কষ্ট দিচ্ছে ও…?
দুঃখে হৃদয়টা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো ওর…
কী এক না বলা অভিমানে মনটা ওর ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যেতে লাগলো…ভাবলো, আমার সাথেই এমন কেন হলো…? কত সুন্দর ছিলো সেই দিনগুলো…সে দিনগুলো কি আর কোনদিন-ই ও ফিরে পাবে না ?
দুঃখের যে কালো মেঘ ওর মনে জমেছে, তা কি আর কোনদিনই কাটবে না ?
যাকে ভালবেসে প্রেমের অকূল পাথারে ও ভালবাসার তরী ভাসিয়েছিল, তাকে ছাড়া ওর এই তরী যে আজ দিকভ্রান্ত হয়ে হয়ে পড়েছে। অকুল পাথারে যে ও দিক হারিয়ে ফেলেছে। কোন-ও দিন-ই কি ও কোন ঘাটে তরী ভেড়াতে পারবে না ? চিরদিনই কি এভাবে ও দিকহারা নাবিকের মত অকূল পাথারে ঘুরে বেড়াবে। দুঃখের ঝড়ে হাবুডুবু খেতেই থাকবে ?
জীবনের সেই সোনালী দিনগুলো কি আর কোনদিনই ও ফিরে পাবে না…নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো নীলিমার বুক চিড়ে…

সেদিন রাতেই আকাশ বাসে চড়ে গ্রামে উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল…কিন্তু ও আর ফিলে এলো না…আসতে পারলো না…!
ময়মনসিংহ যাবার পথেই শ্রীপুরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটা রাস্তার পাশের খাদে পড়ে যায়…সাথে সাথেই আগুন ধরে যায় বাসটিতে…জীবিত অবস্থায় আর কাউকেই উদ্ধার করা যায় নি…।
এই খবর শুনেই নীলিমা অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল…জ্ঞান ফেরার পর ও আবির কে নিয়ে পাগলের মত ছুটে গিয়েছিল ঘটনাস্থলে…
কিন্তু- আগুন লেগে সবার শরীর এমনভাবে পুড়ে গিয়েছিল যে, কাউকেই সনাক্ত করা সম্ভব হয় নি…!
ভগ্ন হৃদয়ে ও ফিরে এসেছিল সেখান থেকে। আকাশের মৃত্যুটা ও কোনমতেই মেনে নিতে পারছিল না।

সেই দিন থেকেই নীলিমা ওর হৃদয়ের অন্তঃস্থলে একটি নাম লিখে মৃত্যুর প্রহর গুণছে….!

“নীলিমা, এই নীলিমা…!!!”

মায়ের ডাকে আবারো সৎবিৎ ফিরে পেল নীলিমা…।

“কী হয়েছে মা ?”

“দেখতো, কিছু পুড়ছে নাকি ? কিসের যেন পোড়া পোড়া গন্ধ পাচ্ছি…!”

মায়ের কথা শুনে নীলিমা চুলার দিকে তাকালো…দেখলো- তরকারি পুড়ছে…! ও তাড়াতাড়ি তরকারির পাতিলটা নামাতে গেল চুলা থেকে…কিন্তু তাড়াহুড়োয় খালি হাতে ধরায়, ওর হাত পুড়ে গেল…হাত চেপে ধরে চিৎকার করে উঠলো নীলিমা…!

“নীলিমা, কী হয়েছে ?” উদ্বিগ্ন স্বরে প্রশ্ন করতে করতে মা তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে ছুটে এলেন…
রান্নাঘরে এসে তিনি দেখলেন- একদিকে চুলায় তরকারি পুড়ছে আর অন্যদিকে নীলিমা ওর হাত চেপে ধরে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে।
তিনি তাড়াতাড়ি গিয়ে চুলাটা বন্ধ করে নীলিমার সামনে এসে দাড়ালেন…জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে?”
“তরকারিটা পুড়ছিল দেখে চুলা থেকে পাতিলটা নামাতে গিয়েছিলাম…হাত পুড়ে গেছে।” নীলিমা কাতরাতে কাতরাতে জবাব দিল।

উনি লক্ষ্য করলেন- নীলিমার ফর্সা মুখটা নীল হয়ে গেছে ব্যথায়। তাই দেখে তিনি নীলিমাকে বললেন, “আমাকে দেখা হাতটা। দেখি কী হয়েছে।”

“না-না মা…সমস্যা নেই…তেমন কিছুই হয়নি…”

“তর্ক করবি না, দেখা বলছি…”

মায়ের মুখে প্রচ্ছন্ন হুমকির আভাস পেয়ে নীলিমা আর দ্বিরুক্তি না করে মায়ের দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিলো।

মা হাতটা নিয়ে আলোর দিকে উঁচু করে ধরলেন…দেখলেন- ইতিমধ্যেই হাতে ফোসকা পড়ে গেছে…
তিনি চোখ গরম করে নীলিমার দিকে তাকিয়ে রাগী স্বরে প্রশ্ন করলেন, “কিছু হয়নি ? ফোসকা পড়ে গেছে, আর তুই বলছিস কিছু হয়নি.??”
তাড়াতাড়ি আমার সাথে আয়…বরফ লাগাতে হবে এক্ষুণি…তারপর তোকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো…।

“না মা….প্লীজ…আমি ডাক্তারের কাছে যেতে পারবো না…আমাকে ডাক্তারের কাছে যেতে বলো না…” নীলিমা ক্ষীণস্বরে প্রতিবাদ করল।

“ঠিক আছে, তাহলে তোর ডাক্তার আংকেলকেই বাড়িতে খবর দিচ্ছি…”

“কী দরকার মা..? আমি তো ঠিকই আছি…”

“ফের তর্ক ? যা ঘরে গিয়ে চুপচাপ শুয়ে থাক…”

***********************************************************************************

# একটি অদ্ভূত ছেলের কথা #

এরপর আর কোন কথা না বলে নীলিমা ওর ঘরে ফিরে এসেছিল…।
বিছানায় শুয়ে জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে ও দেখলো যে, ইতিমধ্যেই বৃষ্টি কমে গেছে…মেঘের দু-একটা ছোট-ছোট টুকরো ছাড়া আকাশে আর কিছু্ই নেই। আকাশটা বিকেলের পড়ন্ত রোদে ঝলমল করছে…আকাশের পশ্চিম দিকে পড়ন্ত সূর্যের আলোতে কেমন যেন লাল লাল আভা দেখা যাচ্ছে…।

আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আকাশের সাথে পরিচয়ের সেই দিনটির কথা মনে পড়ে গেল নীলিমার…সেদিন ওদের দেখাটা একটা মজার ঘটনার মধ্য দিয়ে ঘটেছিল।

ও এমনিতে চুপচাপ স্বভাবের মেয়ে…ক্লাসের ছেলেদের সাথে তেমন একটা কথা বলে না…কিন্তু তা সত্ত্বেও ইউনিভার্সিটিতে একটা ছেলের সাথে ওর গভীর বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল…
নাম- আবির…সেদিন বিকেলে ওর সাথে বাইরে ঘুরতে যাবার কথা ছিলো নীলিমার…কিন্তু পুরো ভার্সিটি ঘুরেও যখন ও আবিরের দেখা পেলো না, তখন ও বুঝতে পারলো ওকে কোথায় পাওয়া যাবে…।
লাইব্রেরী !!!
পাগলটা পড়া ছাড়া আর কিছুই বোঝে না…তাই ফাঁক পেলেই লাইব্রেরীতে চলে যায়…বইয়ের মাঝে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মুখ গুজে পড়ে থাকে…দুনিয়ার কোন কিছুর কথাই তখন আর ওর খেয়াল থাকে না…এখন-ও নিশ্চয়ই পড়ার রাজ্যে হারিয়ে গিয়ে ওর সাথে ঘুরতে যাবার কথাটাও ভূলে গেছে ও…!
এই কথা ভেবেই লাইব্রেরীর দিকে হাটছিল ও…
হঠাৎ একটা ছেলের সাথে ধাক্কা লেগে গেল !!!
হাতের বইগুলো সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল চারদিকে…
ও রেগে গিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল…কিন্তু ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে থেমে গেল…।
ভাল মানুষের মত চেহারাটায় কেমন যেন হতবিহ্বল ভাব…মায়াময় চোখ দুটো ভীত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে…
এই দৃশ্য দেখে কেন যেন ওর রাগ মুহূর্তেই নেই হয়ে গেল। নিজেকে সামলে হাসিমুখে ও ছেলেটাকে উদ্দেশ্য করে বললো, “কী ব্যাপার ? খুব ব্যস্ত বুঝি ? তা এত তাড়াহুড়ো করে কোথায় চলছেন ?”

ছেলেটা ওর মুখ থেকে তীব্র ভৎসনা শোনার জন্য অপেক্ষা করছিল…কিন্তু ওর এই প্রশ্নে অবাক হয়ে কিছুক্ষণের জন্য ভাষা হারিয়ে ফেললো…
তারপর হঠাৎ করেই সৎবিৎ ফিরে পেতেই তাড়াতাড়ি নিচু হয়ে নীলিমার বইগুলো তুলে দিতে লাগলো ওর হাতে…মুখে বললো, “মাফ করবেন। আসলে আমি আমার এক বন্ধুকে খুঁজছি।”

ছেলেটার এই অবস্থা দেখে মনে মনে হাসছিলো নীলিমা…মুখে বললো, “আচ্ছা ঠিক আছে। যান তাহলে….তবে সাবধান আর কারো সাথে আবারো ধাক্কা লাগিয়ে বসবেন না যেন !”

“না না…আর হবে না…লজ্জিত স্বরে কথাটা বলেই আরেকবার দুঃখ প্রকাশ করে ছেলেটা চলে গেলো।”

নীলিমা আবার লাইব্রেরীর উদ্দেশ্যে হাটতে লাগলো…লাইব্রেরীতে পৌঁছেই ও দেখলো, ও যা ভাবছিলো ঠিক তাই ঘটেছে…আবির টেবিলের উপর ঝুঁকে গভীর মনোযোগের সাথে একটা বই পড়ছে…!

এই দেখে ও আর কোন কথা না বলে আবিরের সামনের চেয়ারটায় বসে পড়লো…কিন্তু আবির তাকিয়েও দেখলো না কে এসেছে…ও তেমনি গভীর মনোযোগের সাথে বইটা পড়তে থাকলো…
নীলিমাও কোন কথা না বলে চুপচাপ বসে বসে আবিরের বই পড়া দেখতে লাগলো…
এই ছেলেটা আসলেই অদ্ভূত… ! ওর সাথে বন্ধুত্বের ঘটনাটাও বেশ নাটকীয়…!
একদিন ও আর ওর কিছু বান্ধবী গিয়েছে রেস্টুরেন্টে…সেখানে হঠাৎ ওর চোখে পড়ে একটা অদ্ভূত দৃশ্য…!
ভদ্র বেশভূষা সম্পন্ন একটা ছেলে কয়েকটি ছোট ছোট বাচ্চাকে নিয়ে রেস্টুরেন্টের এক কোণায় একটা টেবিলে বসে খাচ্ছে, কথা বলছে, হাসাহাসি করছে…!
বাচ্চাগুলোর পোশাক-আশাক দেখে সহজেই অনুমান করা যায় যে, ওরা দরিদ্র ঘরের…।
কিন্তু এই বাচ্চাগুলো এই ছেলেটার সাথে কেন ? বিষয়টা ওর কাছে বেশ অদ্ভূত মনে হয়েছিল…তাছাড়া ছেলেটাকে কেমন যেন চেনা চেনাও লাগছিল…!
নিশ্চিত হবার জন্য তাই ও নার্গিসকে প্রশ্ন করলো, “এই নার্গিস দেখতো ঐ ছেলেটাকে চিনিস কিনা…? ঐ যে কোণার ঐ টেবিলটাতে বসে আছে…।”

নার্গিস ছেলেটাকে দেখে বললো, “হ্যাঁ চিনবো না কেন…আমাদের সাথেই পড়ে। নামটা ঠিক মনে নেই…!”

“আবির” ওর আরেক বান্ধবী রূপা হঠাৎ করে বলে উঠলো।

কিন্তু নীলিমা প্রথমে ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি যে রূপা কী বলতে চাইছে…তাই ও রূপাকে জিজ্ঞেস করলো, “কী বলছিস ?”

রূপা বিরক্ত হয়ে বললো, “আরে বুঝতে পারিসনি…? আমি বললাম- আবির, ঐ ছেলেটার নাম…”

“ওহ্ আচ্ছা” নীলিমা বললো…।

সারা ক্লাসে “ছেলে বিশেষজ্ঞ” সম্পর্কে রূপার বিশেষ খ্যাতি ছিল…প্রেম-ভালাবাসা নামক বিষয়টা এড়িয়ে চললেও ক্লাসের প্রায় সব ছেলের সাথে ওর খুব ভালো চেনাজানা ছিল…অনেকের সাথে ভালো বন্ধুত্ব-ও ছিলো।…

কৌতুহল হওয়ায় নীলিমা ওকে প্রশ্ন করলো, “আচ্ছা ছেলেটা সম্পর্কে কী জানিস আর ?”

রূপা কৌতুক করে জিজ্ঞেস করল, “কেন ? পছন্দ হয়েছে নাকি ?”

“আরে নাহ” লজ্জা পেয়ে বললো নীলিমা…। ছেলেটার আচার-আচরণ আমার কাছে বেশ অদ্ভূত লাগছে…তাই জানতে চাইছি…।

রূপা বললো, “তা তো লাগবেই…তুই তো ওকে চিনিস-ই না…ওকে আমরা যারা চিনি তারাও ওর কাজ-কর্মে মাঝে মাঝে অবাক হয়ে যাই…”

“তাই নাকি ?” নীলিমা কৌতুহলী হয়ে প্রশ্ন করল…

“হ্যাঁ” রূপা জবাব দিলো…

“ওর আর কী কী অদ্ভূত বিষয় আছে, রূপা ?” নীলিমা আবারো প্রশ্ন করলো…।

“ও আর সব ছেলের মত না…বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান…গ্রামে বাবার বিশাল সম্পত্তি রয়েছে…কিন্তু দেখ, এখানে আর দশ জন সাধারণ ছেলের মত মেসে থেকে লেখাপড়া করছে…আর তাছাড়া—-”

“তাছাড়া কী ?” এবার নার্গিস-ও কিছুটা কৌতুহলী হয়ে উঠলো…

“ওর দারুণ একটা নাম আছে। আমরা দিয়েছি…” বলে ফিক করে হেসে দিল রূপা।

কী নাম ?

“শার্লক হোমস !”

শুনে নার্গিস হা হা করে হেসে উঠলো…তারপর কোনমতে হাসি চেপে ও বলল, “বাব্বাহ্, আমাদের ক্লাসে তাহলে শার্লক হোমস ও আছে ? জেমস বন্ড আর এরকুল পোয়ারো নেই ? কিংবা বাংলাদেশের মাসুদ রানা ? হাহাহাহাহাহাহাহ”

নীলিমা-ও নার্গিস এর কথা শুনে হাসলো। তারপর জিজ্ঞেস করলো, “তা এরকম নামকরণের কারণটা কী ?”

রূপা এবার ওর চোখটা একবার টিপে দিয়ে রহস্যভরে জবাব দিলো, “সেটা সময় হলেই বুঝতে পারবি…”

নীলিমার বিষয়টা জানতে ইচ্ছে করলেও রূপাকে আর কোন প্রশ্ন করলো না…কারণ ও জানে, রূপা যখন কিছু বলতে চায় না; তখন ওর পেটে বোমা মেরেও কোন কথা ওর মুখ দিয়ে বের করা যাবে না । তাই কৌতুহল চেপে রেখে ও আরেকটা প্রশ্ন করলো, “আচ্ছা ঐ বাচ্চাগুলো কারা ???”

রূপা ওর দিকে তাকিয়ে হেসে বললো, “এইটাও ওর একটা অদ্ভূত শখ বলতে পারিস…”

“কেন ?” নীলিমার কৌতুহল যেন আরো বেড়ে গেলো…

“এই বাচ্চাগুলোকে ও রাস্তা থেকে ধরে এনেছে !” রূপা উত্তর দিলো…।

“তুই জানলি কীভাবে ?” এবারের প্রশ্নটা নার্গিসের কাছ থেকে আসলো…

“জানি জানি…ওর সাথে পরিচয় থাকলে তুই-ও জানতে পারতি। অসহায় এই বাচ্চাগুলোর জন্য ওর মনে অনেক মমতা…ছিন্নমূল গরীব দুঃখী মানুষদের জন্য ওর প্রাণ সবসময়-ই কাঁদে…”

শম্পা এতক্ষণ একটাও কথা বলেনি…চুপচাপ শুধু শুনে গেছে…কিন্তু এখন আর থাকতে না পেরে বলে উঠলো, “দেখ রূপা ফালতু কথা বলিস না ! এমনভাবে বলছিস যেন ও কোন মানুষ না, একেবারে ফেরেশতা ? ওর শুধু গুণ-ই আছে, কোন দোষ নেই ?”

রূপা বেশ বিরক্ত হয়েই বলল, “আগেই তো বললাম ছেলেটা বেশ অদ্ভূত…। আর সবার সাথে ওর কোন মিল-ই খুঁজে পাবি না…মাঝে মাঝেই ও এরকম করে…রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে এমনভাবে বাচ্চাদের এনে রেস্টুরেন্টে খাওয়ায়…”

“স্ট্রেঞ্জ ! এমন ছেলেও তাহলে আছে…” নীলিমা অনেকটা আপন মনেই মন্তব্য করল…।

************************************************************************************

# আবিরের সাথে প্রথম কথা #

এর পরের দিন ভার্সিটিতে ঢুকছে এমন সময় নীলিমা গেটের কাছে আবিরকে দেখতে পেলো…ও অবাক হয়ে দেখলো, আবির নামে সেই অদ্ভূত ছেলেটি একজন বৃদ্ধা ভিক্ষুককে ধরে ধরে রাস্তা পার করে দিচ্ছে…
বৃদ্ধাকে রাস্তা পার করে দিয়ে আবির অনেকটা আপন মনেই কথা বলতে বলতে ভার্সিটির দিকে আসতে লাগলো…

কাছাকাছি আসার পর নীলিমা আবিরকে থামালো, “এক্সকিউজ মি ?”

আবির ওর ডাক শুনে থমকে দাড়ালো…
তারপর ওর দিকে তাকিয়ে হেসে বললো, “জ্বি, আমাকে বলছেন ?”

“হ্যাঁ, আপনাকেই বলছি” নীলিমা মৃদু হেসে উত্তর দিলো।

“জ্বি, বলুন…”

“আপনি আমাকে চিনতে পারছেন ?” নীলিমা আবিরকে প্রশ্ন করলো।

আবির কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থাকলো; তারপর হাসিমুখে বললো, “জ্বি চিনতে পেরেছি। আপনি আর আমি একই সাথে পড়ি…আপনি নীলিমা…”

“আপনি আমার নামও জানেন ?” অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো নীলিমা…

“হ্যাঁ, জানি….”

“কীভাবে ?” নীলিমা কিছুটা অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো।

আবির বললো, “রূপা কথায় কথায় একদিন বলেছিল ওর প্রিয় বান্ধবীদের নাম…তাদের সবাইকেই আমি চিনি, কিন্তু শুধুমাত্র নীলিমা নামের মেয়েটাকে চিনি না…সেদিন রেস্টুরেন্টে আপনাকে দেখেছিলাম রূপার সাথে…এই থেকেই বুঝে নিয়েছি…”

ছেলেটার এমন বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর শুনে নীলিমা কিছুটা চমৎকৃত হলো…ও হঠাৎ খেয়াল করলো, ছেলেটা ওর দিকে তাকিয়ে আপনমনে হাসছে…ও কিছুটা অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো, “কী হলো ? হাসছেন কেন ?”

“নাহ্ এমনিতেই…আসলে আপনাকে দেখে আমার ছেলেবেলার এক ক্লাসমেটের কথা মনে পড়ে গেল…”

“কী এমন কথা, যা মনে করে আপনি এমনভাবে হাসছেন ?” নীলিমা কিছুটা কৌতুহলী হয়ে প্রশ্ন করলো আবিরকে…

“শুনতে চান ? শুনুন তাহলে…আমি যখন স্কুলে পড়ি, তখন আমাদের ক্লাসে একটা মেয়ে ছিল; যার নাম নীলিমা…মেয়েটা ছিলো খুব কাঁদুনে স্বভাবের…কেউ রাগ করে ওকে কিছু বললে বা স্যার কখনও ওকে ধমক দিলেই ও ভ্যাঁ করে কেঁদে দিতো…সেই মেয়েটার কথা মনে পড়ে গেল, আপনাকে দেখে…”

“আমাকে দেখে আপনার কী মনে হচ্ছে, আমি ছিচকাঁদুনে স্বভাবের ?” হেসে দিয়ে প্রশ্নটা করলো নীলিমা…

“আরে না না…তা হবেন কেন…আসলে আপনার নামটা…এই জন্যই হাসি পেল” বলেই আবারো হেসে ফেললো আবির…

ওর এই হাসি দেখে নীলিমাও হেসে ফেললো…”আপনি তো আচ্ছা মানুষ…চলুন, সময় হয়ে গিয়েছে, ক্লাসে যেতে হবে…”

“ঠিক আছে, চলুন…”

ওরা দুজন হাটতে হাটতে ক্লাসের কাছাকাছি এসেছে এমন সময় আবির হঠাৎ বলে উঠলো, “যাদের মাইগ্রেনের সমস্যা আছে, তাদের এত রাত জাগা উচিত না। আর রাস্তায় কখনো তাড়াহুড়ো করবেন না, এক্সিডেন্ট হতে পারে। তবে আমিও কিন্তু আপনার মতই আর্জেন্টিনার সাপোর্টার, তাই রাত জেগে খেলাটা আমিও দেখেছি” কথাটা বলে মৃদু হেসে আবির ক্লাসরূমে ঢুকে গেল।

আবিরের কথা শুনে নীলিমা এত অবাক হয়ে গেল যে, কিছুক্ষণ কোন কথাই বলতে পারলো না। যখন বাকশক্তি ফিরে পেল ততক্ষণে আবির ক্লাসে ঢুকে গেছে।

ও-ও ক্লাসে ঢুকলো। রূপার পাশের সিটটা খালি রয়েছে দেখে সেখানে গিয়ে বসে পড়লো।

তারপর রূপাকে প্রশ্ন করলো, “আচ্ছা আবির কীভাবে জানলো আমার মাইগ্রেনের সমস্যা আছে ? আমি আর্জেন্টিনার সাপোর্টার এই কথাও জানে। আবার সকালে যে তাড়াহুড়ো করে ঘর থেকে বের হয়েছি এই কথাটাও বললো। প্রতিটা কথাই ঠিক। এইসব তো তোরাও জানিস না। ও কিভাবে জানলো ?”

রূপা হেসে বললো, “আরে আস্তে আস্তে বল। দম আটকে যাবে তো। আর এতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই। আমি তো তোকে গতকাল বলেছি-ই যে ওর পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা ভালো। তাই তো আমরা ওর নাম রেখেছি শার্লক হোমস।”

“শুনেছি কিন্তু তখন ঠিক বিশ্বাস করতে পারিনি” নীলিমা বললো।

“এখন করছিস ?” রূপা মৃদু হেসে প্রশ্ন করলো…

“হ্যাঁ। এখন না করে কোন উপায় আছে ? কিন্তু ও জানলো কীভাবে এতকিছু ? ওর সাথে তো আমার কোনদিন কোন কথা হয়নি। আচ্ছা তোরা কি কিছু বলেছিস ?”

“নাহ। আমরা কিছুই বলিনি। ও তোকে দেখেই বুঝে নিয়েছে সব।”

“কিভাবে ?” রূপা ভ্রুকুটি করলো।

“পর্যবেক্ষণ দ্বারা। কিন্তু আমাকে আবার জিজ্ঞেস করিস না কীভাবে। আমার জানা নেই। ওকে জিজ্ঞেস করেই জেনে নিস তুই।”

“ঠিক আছে” নীলিমা বললো।

এরপর ক্লাসে স্যার চলে আসায় ওদের মাঝে আর কোন কথা হলো না।

************************************************************************************

# শার্লক হোমস ! #

ক্লাস শেষের ঘণ্টা পড়লো। নীলিমা এতক্ষণ অস্থির হয়ে ছিল ক্লাস থেকে বের হবার জন্য। ঘণ্টা পড়তেই তাড়াতাড়ি বের হয়ে এলো ও।

বের হতেই ক্যাম্পাসে আবিরের সাথে দেখা হয়ে গেল; যাকে বলে মেঘ না চাইতেই জল। ওকেই তো খুঁজছিল ও মনে মনে।
আবিরকে দেখেই ও দ্রুত এগিয়ে গেল ওর দিকে। তারপর ওকে ডাকলো, “এই যে মিস্টার হোমস…!”

আবির এই ডাক শুনে থমকে দাড়ালো। তারপর পিছনে ফিরে নীলিমাকে দেখে একগাল হেসে বললো, “বাহ আমার টাইটেলটাও জেনে গেছেন দেখছি ! তা কী বলতে চান বলে ফেলুন।”

“আচ্ছা আপনি সকালে এতগুলো কথা কিভাবে বললেন ? আমার বান্ধবীরাও যা জানে না আপনি তা-ই ঠিক ঠিক বলে দিলেন। কীভাবে সম্ভব হলো এটা ?”

আবির হেসে বললো, “খুবই সহজ কিছু বিষয় দেখে। আপনার চোখের নিচে হালকা কালির দাগ; রাতে ঘুম কম হলে যা হয়। তারপর আপনার হাতে লেখা “Ar” অক্ষরদুটো। মুছে ফেলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু অন্য অক্ষরগুলো মুছে গেলেও এই দুটো অক্ষর পুরোপুরি মোছেনি এখনও। এখন প্রশ্ন হলো, অক্ষরদুটি দিয়ে কী হতে পারে। রাতে দেরি করে ঘুমিয়েছেন এবং হাতে “Ar” অক্ষরদুটো লেখা। এই দুটো বিষয় থেকে বুঝে গেলাম রাত জেগে আর্জেন্টিনার খেলা দেখেছেন। আগেই বলেছি, খেলাটা আমিও দেখেছিলাম… ”

“তা নাহয় বুঝলাম। কিন্তু আমার মাইগ্রেনের সমস্যা আছে আর সকালে যে তাড়াহুড়ো করেছি সেইটা কীভাবে বুঝলেন ?” নীলিমা প্রশ্ন করলো।

“এইটাও পর্যবেক্ষণ”, আবির হাসিমুখে জবাব দিল।
“আপনার নাকের উপর চশমার হালকা দাগ দেখা যাচ্ছে। খুব ভালোমতো খেয়াল না করলে বোঝা যায় না। এমনিতে দিনে আপনি চশমা পড়েন না, তারমানে আপনার চোখে দিনে কোন সমস্যা হয় না। কিন্তু আপনাকে চশমা পড়তে হয়। প্রশ্নটা হলো, কেন পড়তে হয়? উত্তরটাও খুব সহজ। আপনার মাইগ্রেনের সমস্যা আছে সেইজন্য। সম্ভবত, রাতে পড়তে বসলে আপনার এই সমস্যাটা হয়।
আর তাড়াহুড়ো করে যে বেড়িয়েছেন, সেটা আপনার হাত ঘড়ির দিকে তাকালেই যে কেউ বলে দিতে পারবে। ঘড়িটা আপনি উল্টো করে পড়েছেন।”

আবিরের কথায় নীলিমা হাত ঘড়ির দিকে তাকালো। দেখলো, ও সত্যিই ঘড়িটা উল্টো করে পড়েছে। বিষয়টা দেখে ও খুব লজ্জা পেল। তারপর প্রশংসার সুরে আবিরকে বললো, “আপনি সত্যি-ই শার্লক হোমসের বাস্তব সংস্করণ। আপনার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা সত্যিই অসাধারণ!”

আবির ওর কথায় মৃদু হাসলো। তারপর প্রশ্ন করল, “আশা করি আপনার কৌতুহল মিটেছে ?”

“হ্যাঁ, তা মিটেছে” নীলিমা উত্তর দিল।

“ঠিক আছে তাহলে এখন আমি যাই। আমার একটা জরুরী কাজ আছে। আপনার সাথে অন্যদিন আবারো কথা হবে।”

“আচ্ছা ঠিক আছে, যান তাহলে। ভালো থাকবেন। আর আপনার মত বুদ্ধিমান একজনের সাথে পরিচিত হয়ে খুব খুশি হলাম।”

আবির মুচকি হেসে বললো, “আমিও আপনার সাথে পরিচিত হয়ে খুব খুশি হলাম।” কথাটা বলেই ও আর দাড়ালো না। ধীরে ধীরে হেটে ভার্সিটির গেট দিয়ে বের হয়ে গেল।

এভাবেই আবির নামের অদ্ভূত এই ছেলেটির সাথে নীলিমার পরিচয়। ধীরে ধীরে গভীর বন্ধুত্ব। তারপর—

হঠাৎ লাইব্রেরীয়ানের কথায় নীলিমা ভাবনার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে এলো।

ও শুনলো, লাইব্রেরীয়ান আবিরকে বলছে, “এখন উঠুন, লাইব্রেরী বন্ধ হয়ে যাবে এখন।”
আবির ওর হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো ৫ টা প্রায় বাজে। ৫ টায় লাইব্রেরী বন্ধ করে দেয়া হয়। ও বইগুলো গুছিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠবে, এমন সময় প্রথমবারের মত ও নীলিমাকে খেয়াল করল…
আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করল ও নীলিমাকে, “আরে নীলিমা, তুমি কখন এলে ?”

নীলিমা রাগের ভান করে বলল, “তুমি এখন দেখছো আমাকে ? আমি আধা ঘণ্টা ধরে বসে আছি তোমার সামনে !”

“দুঃখিত ! আসলে এই বইটা খুব ইন্টারেস্টিং। তাই…। তুমি সময় পেলে পড়ে দেখো।”

নীলিমা দেখল বইটা, নাম- “A Brief History of Time”; লেখক- Stephen Hawking
“কিসের উপর ভিত্তি করে লেখা বইটা ?” আবিরকে ও প্রশ্ন করলো।

“ব্ল্যাকহোল আর বিগব্যাঙ এর উপর।” আবির উত্তর দিল।

“ধুর ! বাদ দাও। আমার এত ধৈর্য নেই। তোমার ভালো লাগে, তুমি পড়ো। ব্ল্যাকহোল হোক আর হোয়াইটহোল, বিগব্যাঙ হোক আর স্মল ব্যাঙ হোক; আমার এসব বই পড়ার কোন আগ্রহ নেই।
আরে, আসল কথাই তো ভূলে গিয়েছি দেখছি।
আজকে কী কথা ছিল ? তুমি ভূলে গেছ ?” ও আবিরকে প্রশ্ন করলো।

“কী কথা…. !!!
ওহ আচ্ছা, মনে পড়েছে। তোমাকে নিয়ে ঘুরতে যাবো বলেছিলাম। কিন্তু আজকে তো সন্ধ্যা হয়ে এল। তোমাকে আমি কালকে বিকেলে নিয়ে যাবো।”

“ঠিক আছে। তবে তোমাকে প্রমিজ করতে হবে।” নীলিমা বললো।

“ঠিক আছে, প্রমিজ করলাম।”

***********************************************************************************

# আকাশের সাথে পরিচয় #

পরদিন বিকেল বেলা।
ওরা দুজন বের হয়েছে ঘুরতে।

আবির নীলিমাকে বললো, “আজকে তোমার সাথে আমার একজন বন্ধুর পরিচয় করিয়ে দেব। গতকাল বিকেলে ও গ্রাম থেকে এসেছে এখানে চাকুরির খোঁজে। তবে বন্ধু হলেও, ও আমার সিনিয়র। ভিন্ন গ্রামের হলেও স্কুলের মাঠে এক সঙ্গেই খেলাধুলা করতাম। সেই থেকেই বন্ধুত্ব। আমারা এক সাথেই থাকবো। তবে ঠিক করেছি, একটা ছোট-খাট বাড়ি ভাড়া নেবো।

“তাই নাকি ? নাম কী উনার ?” কিছুটা কৌতুহলের সাথে প্রশ্ন করলো নীলিমা, কারণ আবিরের কাছে কখনও কাউকে আসতে দেখেনি ও।

“আকাশ।” তবে শুধু নামে না; আসলেই ওর মনটা আকাশের মতই বিশাল। দার্শনিক টাইপের বলতে পারো। খুব-ই ভালো ছেলে। আমি মেয়ে হলে অবশ্যই ওর প্রেমে পড়ে যেতাম।

নীলিমা ওর কথা শুনে হেসে দিল। বললো, “তা যে করতে তুমি তাতে কোন সন্দেহ নেই।”

হাটতে হাটতে রমনা পার্কের ভিতরে ঢুকে পড়লো ওরা।

পার্কে প্রবেশ করতেই গেটের কাছে সেই ছেলেটার সাথে দেখা হয়ে গেল নীলিমার, যার সাথে ও ভার্সিটিতে ধাক্কা খেয়েছিল।

আবির ওকে দেখেই ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলে উঠল, “আকাশ এই হচ্ছে আমার সেই বন্ধু; নীলিমা। যার কথা তোকে গতকাল বলেছিলাম।”

আকাশ ওর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে, ভাবছে গতকালকের সেই ঘটনাটা মেয়েটা না আবার আবিরের সামনে বলে ফেলে ! ভীষণ লজ্জার ব্যাপার হবে তাহলে।

কিন্তু নীলিমা সে রকম কিছুই করল না। বরং হাসিমুখে বলল, “আকাশ, আবির আমাকে আপনার কথা বলেছে।”

মেয়েটার ব্যবহারে আকাশ মুগ্ধ হলেও বাহিরে সেটা প্রকাশ করল না। মুখে বলল, “হ্যাঁ। আমিই আকাশ। আপনার সাথে পরিচিত হয়ে খুব খুশি হলাম নীলিমা।”

“আমিও” নীলিমা বলল।

পরিচয় পর্ব শেষ হতেই আবির আকাশকে প্রশ্ন করল, “আচ্ছা তোর ইন্টারভিউ এর খবর কী ?”

আকাশ বলল, “দিয়ে তো এলাম, কালকে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কালকেই জানা যাবে চাকুরী হবে কিনা।”

“হুম ! তবে চিন্তা করিস না। তুই নিশ্চয়ই পেয়ে যাবি চাকুরীটা।”, আবির ওকে ভরসা দিল।

“দেখা যাক কী হয়।”

“আচ্ছা, আমার কয়েকটা প্রশ্ন আছে” নীলিমা আকাশকে উদ্দেশ্য করে বলল।

আকাশ হাসিমুখে বলল, “হ্যাঁ করুন…”

“আবিরের কাছ থেকে আমি শুনলাম আপনি নাকি দার্শনিক। তাই কিছু বিষয় সম্পর্কে আপনার দর্শন জানতে চাচ্ছি…”

আকাশ আবিরের দিকে তাকিয়ে চোখ পাকিয়ে বলল, “দাড়া, আজ বাড়ি গিয়ে নেই…তারপর–”

নীলিমা আকাশকে প্রশ্ন করলো, “কী এত ফিসফিস করছেন বলুন তো?”

তখন আকাশ নীলিমার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল, “হ্যাঁ, বলুন…”

নীলিমা তখন আকাশকে প্রশ্ন করলো, “প্রেম-ভালবাসা বলতে আপনি কী বোঝেন ?”

আকাশ মৃদু হেসে বলল, “ভাললাগার পরিপূর্ণতাই হচ্ছে ভালবাসা…সেই ভালবাসার নদী যখন দুটি হৃদয়ের মধ্যে দিয়ে সবেগে প্রবাহিত হয়, তখন তাকে বলে প্রেম…”

নীলিমা মুগ্ধ স্বরে বলল, “বাহ ! বেশ সুন্দর করে বলেছেন তো…”
“আচ্ছা তাহলে জীবনকে আপনি কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন ?” ও আবারো প্রশ্ন করলো…

আকাশ বলল, “আসলে জীবন সম্পর্কে একেক জনের ধারণা একেক রকম…আমার মনে হয় জীবন মানে হচ্ছে বাস্তবতাকে সহজে মেনে নেয়া। যে যত সহজভাবে বাস্তবতাকে মেনে নিতে পারবে, তার জীবন ততই সুন্দর হবে…।

“বাহ্….আপনার দর্শন সত্যিই খুব দারুণ…” প্রশংসার সুরে নীলিমা আকাশকে বলল…

আকাশ মৃদু হেসে বলল, “ধন্যবাদ…”

তারপর নীলিমা বলল, “আচ্ছা দাড়িয়ে দাড়িয়ে শুধু গল্প করলেই হবে ? চল কোন রেস্টুরেন্টে যাই। আমার খিদে পেয়েছে।”

আকাশ বলল, “যাওয়া যেতে পারে…আমার কোন আপত্তি নেই। ”

আবির বলল, “আমি যেতে পারি। তবে এক শর্তে…!”

“তোমার আবার কিসের শর্ত ?” চোখ পাকিয়ে প্রশ্ন করল নীলিমা।

“বিলটা কিন্তু আমিই দিব।”

ও এমনভাবে বলল যে কথাটা শুনে নীলিমা আর আকাশ দুজনেই হেসে ফেলল।

তারপর নীলিমা মুখ গম্ভীর করে বলল, “ঠিক আছে। তোমার আবেদন মঞ্জুর করা হল।”

আবির হেসে বলল, “ধন্যবাদ।”

************************************************************************************

# ভালোবাসা #

সেদিন আকাশের বলা সেই কথাগুলো থেকেই আকাশকে নীলিমার ভালো লেগে যায়…তারপর ধীরে ধীরে ভালোবাসা…

প্রথমে ও কিছু বলতে পারেনি আকাশকে…আবিরকেও কিছু বলেনি…কিন্তু পাগলটা কীভাবে যেন ধরে ফেলল…! তারপর ওকে যখন আবির জিজ্ঞেস করল, তখন ও আর অস্বীকার করেনি বিষয়টা…লজ্জিত ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে বসেছিল…এই দেখেই আবির যা বোঝার বুঝে নিয়েছিল…
তারপর আর কী ? সব ব্যবস্থা ঐ পাগলটাই করে দিল…

আবিরের পরামর্শেই ভ্যালেন্টাইনস ডে টে ও আকাশের সামনে দাড়িয়ে বলল, “আমি তোমাকে ভালোবাসি…”

আকাশ কিছু বলেনি, শুধু হেসেছিল…এমন হাসি বিধাতা যাকে দিয়েছেন, মুখে তার কিছু বলতে হয় না…

সেই থেকেই ওদের ভালোবাসার সূচনা…

************************************************************************************

# প্রতীক্ষিত সেই দিনটি ! #


দরজার বেল বেজে উঠায় নীলিমা বাস্তবে ফিরে এল।
মা বললেন, “মনে হয় তোর ডাক্তার আংকেল এসেছেন। তুই বোস আমি খুলছি।”

নীলিমা আপত্তি করে বলল, “না-না…তুমি থাক…আমি খুলছি।”

মা বললেন, “ঠিক আছে। যা তাহলে।”

নীলিমা দরজা খুলে দেখল, আবির দাড়িয়ে আছে।
ও মুখে হাসি টেনে বলল, “আরে আবির তুমি ? এস এস ঘরে এস…”

হঠাৎ ওর পেছনে চোখ পড়ল নীলিমার এবং জীবনে দ্বিতীয়বারের মত জ্ঞান হারাল ও !

জ্ঞান ফেরার পর, কিছুক্ষণ পর্যন্ত নীলিমা কিছুই মনে করতে পারল না। তারপর যখন মনে পড়ল, তখন ও ঝট করে উঠে বসল।
এদিক ওদিক তাকিয়ে শুধু আবিরকেই ওর খাটের সামনে চেয়ার নিয়ে বসে থাকতে দেখল। হতাশ হয়ে শুয়ে পড়তে যাবে, এমন সময় সেই কণ্ঠটি শুনল; যা শোনার জন্য গত দুই বছর ধরে চাতকের মত অপেক্ষা করছে ও !

নীলিমা !

জানালার দিকে তাকাতেই অতি পরিচিত প্রিয় সেই মুখটি দেখতে পেল নীলিমা।

আকাশ !

সেই আগের মতই আছে ও। গায়ের রংটা শুধু একটু গাঢ় হয়েছে। কিছুটা শুকিয়েও গেছে। আর তাছাড়া সেই আগের মতই। সেই মুখ, সেই হাসি, সেই মায়াময় দুই চোখ। কোন কিছুই বদলায়নি।
সৎবিৎ ফিরে পেতেই আকাশ বলে চিৎকার করে উঠে নীলিমা ছুটে গিয়ে আকাশকে জড়িয়ে ধরল…তারপর ফোঁপাতে ফোঁপাতে জিজ্ঞেস করল, “এতদিন কোথায় ছিলে তুমি ? তুমি কথা দিয়েও কেন আমাকে খবর দিলে না ? তুমি কি জান এতগুলো দিন আমি কতটা কষ্টে ছিলাম ?”

আকাশ ওর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল, “সে কাহিনী নাহয় নাই বা শুনলে এখন…”

“আমি শুনব” নীলিমা কান্না ভেজা চোখে আকাশের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল।

“ঠিক আছে। তবে তুমি চল, খাটে গিয়ে বসি। তারপর বলছি।
আগে একটা কথা বলতো, তুমি হাত পুড়লে কিভাবে ?”

নীলিমা মাথা নিচু করে লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল, চুলা থেকে তরকারি নামাতে গিয়েছিলাম…।

আবির ওর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হাসতে হাসতে বলল, “নিশ্চয়ই খালি হাত দিয়ে ? তা তুমি কি তোমার হাতটাকে হিট প্রুফ মনে করেছিলে নাকি ?”

নীলিমা আবিরের কথা শুনে লজ্জা পেয়ে গেল।
তারপর চোখ গরম করে ও আবিরকে হুমকি দিল, “দেখো, ভালো হবে না বলে দিচ্ছি !”

জবাবে আবির আবারো হো হো করে হেসে উঠলো।
তারপর সিরিয়াস ভঙ্গিতে আকাশকে বলল, “দোস্ত, তোর ঘটনাটা বলে ফেল্ তো। আমিও তো শুনি নি। তু্ই আসার পর আমরা তো সরাসরি এখানেই চলে এলাম।”

আকাশ বলল, “হ্যাঁ বলছি, শোন তাহলে….সেই অ্যাকসিডেন্ট-এ কারও বেঁচে থাকার কথা নয়। কেউ বাঁচেও নি। ‌আমি যদি সেই বাসটায় থাকতাম, তবে আমিও বাঁচতাম না…

আবির অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো, “তারমানে তুই সেই বাসটায় ছিলি না…?”

আকাশ মাথা নেড়ে বলল, “নাহ…ছিলাম না…”
তারপর ও নীলিমার দিকে তাকিয়ে বলল, “যেদিন তোমার সাথে আমার শেষ দেখা…সেদিন রাতের বাসেই আমার গ্রামে যাওয়ার কথা ছিল…তোমার সাথে কথা হওয়ার পর আমি বাড়ি ফিরে যাচ্ছি, তখন আমাদের গ্রামের এক পরিচিত লোকের সাথে দেখা…ঈদ উপলক্ষ্যে উনিও গ্রামে যাবেন…কথায় কথায় যখন উনাকে বললাম যে মা অসু্স্থ্য, তাই আমিও গ্রামে যাবো আজ রাতের বাসে…কথাটা শুনে উনি উনার টিকিট টা আমাকে দিয়ে বললেন, তুমি এটা নিয়ে এখনই চলে যাও…সাতটা সময় বাস ছাড়বে…আমি নিতে না চাইলেও উনি জোর করে আমাকে দিয়ে বললেন, তুমি চলে যাও…তোমার মায়ের সাথে তাড়াতাড়ি দেখা করাটা খুব জরুরী…তুমি তাড়াতাড়ি চলে যাও সেখানে…আমি চেষ্টা করবো পরের বাসটা ধরার…তুমি কথা না বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি চলে যাও…সাতটা বাজতে বেশিক্ষণ বাকি নেই…তারপর, আমি বাসায় ফিরে তাড়াতাড়ি জামাকাপড় গোছগাছ করে সেই বাসে চড়েই চলে গিয়েছিলাম…”
একসাথে এতগুলো কথা বলে আকাশ দম নেওয়ার জন্য একটু থামলো…

“তাহলে তুমি ফিরে আসোনি কেন ? তুমি জানো না তোমাকে আমি কতটা ভালবাসি ? কেন আমাকে এভাবে কষ্ট দিলে…?” নীলিমা আবার কাঁদতে কাঁদতে আকাশকে প্রশ্ন করলো…

আকাশ বলল, “প্লীজ নীলা…তুমি কেঁদো না…তুমি কাঁদলে আমার খুব কষ্ট হয়…”

“তাহলে তুমি বলো, কেন তুমি ফিরে এলে না…”

আকাশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো, তারপর ধীরে ধীরে বলল, “নীলা, সেদিন রাতে গ্রামে গিয়ে দেখি মায়ের অবস্থা খুব খারাপ…তিনি তখন মৃত্যু শয্যায়…আমি হাসপাতালে যাওয়ার পরই তিনি তাড়াতাড়ি আামকে কাছে ডাকলেন…তারপর বললেন, আমি যেন তার বান্ধবীর মেয়ে শর্মিলাকে বিয়ে করি…মেয়েটা মায়ের মৃত্যুর পর থেকে আমাদের বাড়িতেই থাকত…মায়ের মৃত্যুর পর মেয়েটার জীবনে তিন কূলে কেউ ছিলোনা…তিনি তার বান্ধবীকে মৃত্যুর সময় কথা দিয়েছিলেন, যে তার মেয়েকে দেখে শুনে রাখবেন…তার মেয়ের সাথে আমার বিয়ে দেবেন…কথাটা আমি কখনই জানতাম না…শর্মিলার সাথে আমার সম্পর্কটা ছিলো বন্ধুর মত…তাই কথাটা শুনে আমি প্রথমে স্তব্ধ হয়ে গেলাম…তারপর মাকে যখন বলতে গেলাম, কিন্তু মা—!!! মা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “বাবা তুই আর আপত্তি করিস না…আমার সময় শেষ…তোদের দুজনের বিয়েটা দেখে আমি মরতে চাই…মায়ের কথার মর্যাদা রাখতে সেদিন রাতেই আমি শর্মিলাকে বিয়ে করি…”
এই পর্যন্ত বলে আকাশ মাথা নিচু করে বসে থাকল…

নীলিমা ধীরে ধীরে বলল, “আকাশ তুমি ভূল কিছু করোনি…তোমার জায়গায় আমি থাকলেও ঠিক এই কাজটাও করতাম…”

এই পর্যায়ে আবির ধীরে ধীরে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো…আকাশ বিষয়টা লক্ষ্য করলেও কিছু বলল না…

আবির বের হয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর আকাশ নীলিমাকে ডাকল, “নীলা…”

নীলিমা ধীরে ধীরে বলল, “বলো আকাশ…”

তোমার মনে নিশ্চয়ই প্রশ্ন জাগছে যে আমি এতদিন পর কেন ফিরে এলাম…?

“হ্যাঁ…তুমি কী এই কথাগুলো বলতেই আমার কাছে ফিরে এসেছো ?”

“না নীলা…শুধু এই কথাগুলো বলতেই আমি ফিরে আসিনি…আমি ফিরে এসেছি তোমাকে একটা সত্যি জানাতে…!”

নীলিমা কিছুটা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, “কী সত্য ?”

“তোমার সাথে কখনও দেখা সাক্ষাৎ না করলেও আমি কিন্তু সবসময় তোমার খোঁজ-খবর রাখতাম…আমি ভেবেছিলাম তুমি নিজে থেকেই বিষয়টা বুঝতে পারবে অথবা আবির নিজে থেকেই তোমাকে সব খুলে বলবে…কিন্তু তুমি যেমন কিছু বুঝতে পারো নি, তেমনি আবির-ও তোমাকে কিছু বলেনি…”

“আমি কী বুঝব ?” নীলিমা কিছুটা আশ্চর্য হয়ে প্রশ্নটা করল।

“সর্বশেষ যেদিন তোমার সাথে দেখা করেছিলাম সেদিন দুপুরে হঠাৎ করেই টেবিলের উপর আবিরের ডায়েরিটার উপর আমার চোখ পড়ে যায়…ও যে ডায়েরি লেখে ব্যাপারটা আমার জানা ছিল না…আগে কখনও ডায়েরিটা দেখিও নি…তাই কৌতুহল হওয়ায় খুলে দেখেছিলাম–ডায়েরিটা পড়ে আমি চমকে গিয়েছিলাম…”

“কি এমন লেখা ছিল সেখানে, যা দেখে তুমি চমকে গেলে ?” নীলিমা প্রশ্ন করল…

আকাশ এক টুকরো কাগজ বের করে ওর দিকে বাড়িয়ে দিলো; বললো, “দেখো এই কাগজটা…তাহলেই তোমার কাছে সব পরিষ্কার হয়ে যাবে…আমি ডায়েরি থেকে এই কাগজটায় কথাগুলো লিখে নিয়েছিলাম…”

নীলিমা উঠে বসে কাগজটা হাতে নিল…তারপর খুলে দেখল লেখা রয়েছে,

“আজ আমার খুব খুশি খুশি লাগছে…
যদিও প্রিয় মানুষকে হারানোর বেদনায় মনটা ব্যাথায় কাতর !
একেই বোধহয় বলে, করুণ রস !
আমি কখনও বুঝতে পারিনি ওকে কতটা ভালোবাসি আমি…
আজ যখন শুনলাম ও আকাশকে ভালোবাসে,
তখন আমি বুঝতে পারলাম আমি ওকে কতটা ভালোবাসি…।
কিন্তু তবুও কেন যেন আমার একটুও কষ্ট হচ্ছে না…
কারণ ও যাকে ভালবাসে সে যে আমারই একটা অংশ !
ও আকাশকে ভালবাসে, তারমানে আমার ভালবাসাকেই ভালবাসে…
আল্লাহ যেন ওদের দুজনকে সুখী করেন, এই দোয়া করি…
আমি আর লিখতে পারছি না…
আমার কলমটা কেমন যেন আটকে আটকে যাচ্ছে…
আজ থাকুক, আরেকদিন আবার লিখবো…
নীলিমা, তুমি ভালো থেকো…
তোমার আর আকাশের ভালো থাকা মানেই তো আমার ভালো থাকা…”

লেখাটা পড়া শেষ হলে নীলিমা আবিষ্কার করল ওর চোখ দিয়ে অবিরত পানি বের হচ্ছে, ও কখনই বুঝতে পারেনি যে আবির ওকে এতটা ভালবাসে…
ও নিজেও কখনও বুঝতে পারেনি যে আবিরের জন্য ওর হৃদয়ে কতটা ভালবাসা রয়েছে…!
আকাশ না জানালে কখনও ও নিজেও হয়ত বুঝতে পারত না…আর আবির নিজে থেকে কোনদিন বলতো না ওকে…
না জেনে ও ওর সবচেয়ে ভালো বন্ধুকে এতটা কষ্ট দিয়েছে !!!
নীলিমা কান্নায় ভেঙে পড়লো…

আকাশ ওকে সামলে নেওয়ার জন্য কিছুক্ষণ সময় দিলো; তারপর বলল, “নীলা, তুমি আর দেরি করো না…তুমি ওর কাছে যাও…পাগলটা তোমাকে সত্যিই খুব ভালবাসে…”

নীলিমা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি কেন কখনও বুঝতে পারলাম না ??? এতগুলো দিন ওকে শুধু শুধু কষ্ট দিলাম কেন ???”

আকাশ বলল, “তোমার কোন দোষ নেই…আসলে দোষ আমারই…আমারই বলা উচিত ছিল সব…কিন্তু আমি চাইছিলাম তুমি নিজে থেকেই বিষয়টা বুঝে নাও…কিন্তু তুমি আমাকে নিয়ে এতটাই ইমোশনাল হয়ে পড়েছিলে যে, আশেপাশের কিছুই আর তোমার চোখে পড়ে নি…”

নীলিমা কিছু বলল না, শুধু ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলো…

************************************************************************************

# তোমাকেই ভালোবাসি…! #

পরদিন পুরো ভার্সিটিতে খুঁজেও আবিরকে না পেয়ে নীলিমা রমনা পার্কে চলে এলো…
এখানে লেক এর পাশে একটা বেঞ্চ আছে…আবির মাঝে মাঝেই এখানে চলে আসে…

নীলিমা দেখলো, সত্যিই আবির একটা বেঞ্চে একাকি বসে আছে…ও কোন কথা না বলে ধীরে ধীরে আবিরের পিছনে এসে দাড়ালো…
ও অবাক হয়ে আবিষ্কার করল, আবির কাঁদছে…!
হাসিখুশি এই ছেলেটাকে ও কোনদিন কাঁদতে দেখেনি…
তবে আজ কেন ???
নীলিমা ধীরে ধীরে আবিরের পাশে বসে পড়লো…
আবির পাশে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে তাকালো…নীলিমাকে দেখে ও খুব চমকে গিয়ে তাড়াতাড়ি ওর চোখদুটো রুমাল দিয়ে মুছে নিল…
তারপর নীলিমার দিকে তাকিয়ে ওর পরিচিত সেই হাসিটা মুখে টেনে বলল, “নীলিমা…তুমি এখানে ? আকাশ কোথায় ?”

নীলিমা কোন কথা না বলে একদৃষ্টিতে আবিরের দিকে তাকিয়ে রইল…
তারপর ধীরে ধীরে বলল, “তুমি কখনও বলো নি কেন আমাকে ?”

আবির কিছুটা থতমত খেয়ে বলল, “কী বলবো ?”

“তুমি আমাকে এতটা ভালোবাসা সে কথা…”

আবির কিছুটা চমকে গেলেও সাথে সাথেই সামলে নিয়ে বলল, “আরে এটা বলার কি আছে ? তুমি তো জানোই যে আমি আমার সব বন্ধুদের কতটা ভালোবাসি…”

নীলিমা কোন কথা না বলে সেই কাগজের টুকরাটা ধীরে ধীরে ওর দিকে বাড়িয়ে ধরল…

আবির জিজ্ঞেস করল, “এইটা কী ?”

নীলিমা কোন উত্তর না দেয়ায় ও হাত বাড়িয়ে কাগজের টুকরাটা নিল…
পড়েই ও চমকে গেল…এইটা কীভাবে নীলিমার কাছে…!!!

নীলিমা যেন ওর মনের প্রশ্নটা বুঝতে পেরেই বলল, “আকাশ…তোমার ডায়েরিটা ও পড়েছিল…”

আবির কোন কথা না বলে অপরাধীর মত মুখ নিচু করে বসে থাকলো…

নীলিমা ওর হাতদুটো চেপে ধরে বলল, “আবির, তুমি আমাকে প্লীজ ক্ষমা করে দাও…আমি কোনদিনই বুঝতে পারিনি যে তুমি আমাকে ভালোবাসো…যদি বুঝতাম, বিশ্বাস করো তোমাকে আমি কোনদিন-ই কষ্ট দিতাম না…কারণ আমি যে তোমাকে ভালোবাসি…”

আবির কোন কথা বলল না, শুধু ওর চোখ দুটো আবার জলে ভরে উঠল…
ওদের দুজনের মুখেই হাসি কিন্তু চোখে কান্না…

ওরা কোন কথা না বলে দুজন দুজনের হাত ধরে চুপচাপ বসে রইল…।

************************************************************************************

# শেষকথা #

সেদিন রাতে আকাশ নীলিমাকে আবিরের কথা বলেই বিদায় নিয়ে চলে এসেছিল…
আসার আগে নীলিমাকে ও বলেছিল, “আমার বন্ধুটা তোমাকে খুব ভালোবাসে…ওকে তুমি কষ্ট দিয়ো না…আর যদি পারো আমাকে ক্ষমা করে দিও…”

ও নীলিমাকে কোনদিন মিথ্যা বলেনি…
কিন্তু সেদিন একটা মিথ্যা বলেছিল…
ও শর্মিলা নামে কাউকেই বিয়ে করেনি…কাউকে বিয়ে করা ওর পক্ষে সম্ভব-ও না…
কেননা কোন মেয়েকেই যে ও ওর হৃদয়ে স্থান দিতে পারবে না…
নীলিমা-ই ওর একমাত্র প্রেম, একমাত্র ভালোবাসা…

আবির ওর জন্য নিজের ভালোবাসাকে উৎসর্গ করেছিল…
তাহলে ও কেন পারবে না…???
ও-ও তো আবিরকে ওর নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে…

ও নিজেও জানে না কীভাবে ও কাজটা করতে পারলো…
ভাবলো, হয়ত একেই বলে বন্ধুত্ব…!

***************************************> শেষ <**************************************


লেখকের মন্তব্য :
জানি না লেখক হিসেবে আমি কতটুকু সফল।
এটিই আমার প্রথম লেখা, তাই আমার ধারণা লেখাটা তেমন একটা মানসম্মত হয়নি…
প্রিয় বন্ধুদের নিকট তাই আমার অনুরোধ, কারো যদি কোনরূপ ভূল-ত্রুটি চোখে পড়ে থাকে তাহলে আমাকে অবশ্যই সে সম্পর্কে অবহিত করবেন…

এতক্ষণ ধরে কষ্ট করে লেখাটি পড়ার জন্য সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ…
সবাই ভালো থাকবেন…

“আল্লাহ হাফেজ”

6 মন্তব্য

  1. নদীর জলে থাকি রে কান পেতে
    কাঁপেরে প্রাণ পাতার মর্মরেতে ||
    মনে হয় যে পাবো খুজে ফুলের ভাষা যদি বুঝি রে
    যেপথ গেছে সন্ধ্যাতারার পারে
    তুই ফেলে এসেছিস কারে মন মনরে আমার ।

একটি উত্তর ত্যাগ