পুরাতন মোবাইল ও অন্যান্য ইলেকট্রিক জিনিস কেনার আগে যে সকল সতর্কতা অবলম্বন করবেন

0
469

আমরা বর্তমানে আইপ্যাড ব্যবহার করি, অ্যান্ড্রয়েড ট্যাব ব্যবহার করি, ব্যবহার করি উইন্ডোজ ৮.১ এর টাচ পিসি এবং আরও কত কি না থাকে আমাদের এই নিত্যদিনের প্রযুক্তি পন্য ব্যবহারের লিস্টে। কিন্তু, ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তির এই যুগে যখন নিত্যদিন প্রযুক্তি বাজারে আসছে নিত্য নতুন সব চমক তখন আমাদের এই লিস্টেও জমা হয় নতুন সব ডিভাইসের নাম। ছোট্ট একটি উদাহরণই দেই! প্রথমে যখন আমাদের দেশীয় প্রতিষ্ঠান প্রথম অ্যান্ড্রয়েড ফোন বাজারে নিয়ে আসে তখন মাত্র ২৫৬ মেগাবাইট র‍্যাম বিশিষ্ট সিম্ফোনি এক্সপ্লোরার W5 এর দাম ছিল ৬৯৯০ টাকা, এক-দেড় বছরের ব্যবধানে কিছুদিনের মধ্যেই ১ গিগাবাইট র‍্যাম সমৃদ্ধ প্রিমো জিএইচ২ বাজারে নিয়ে আসছে ওয়ালটন যার মূল্য ১০ হাজার টাকার নিচে । তাই, প্রযুক্তির বাজার যে কতটা গতিশীল তা আসলেই স্পষ্ট এবং দৃশ্যমান।

অবলম্বন পুরাতন মোবাইল ও অন্যান্য ইলেকট্রিক জিনিস কেনার আগে যে সকল সতর্কতা অবলম্বন করবেন

কিন্তু, সবার আর্থিক অবস্থা এক না হওয়ায় আবার একই সাথে গ্যাজেট ফ্রিক হবার কারনে বাজারের সাথে তাল মিলিয়ে নতুন সব ডিভাইস ব্যবহার করা বলতে গেলে গড়ে সবার জন্যেই অসাধ্যের একটি বিষয়। আর এজন্যেই সৃষ্টি হয়েছে সেলবাজার, বিক্রয় ডট কম, ওএলএক্স ও ক্লিক বিডি’র মত সব ই-কমার্স সাইট গুলোর, যেখানে পুরাতন এবং নতুন দুই প্রকারের পন্যই বিক্রি হয়ে থাকে। বিক্রি হয় জামা থেকে শুরু করে ঘরের পরে থাকা অ্যান্টিক পর্যন্ত। এখানে কেনা কাটা করা বেশ নিরাপদ কিন্তু যখন প্রশ্ন ওঠে ‘ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য’ নিয়ে তখন অবশ্যই আলাদা সতর্কতা অবলম্বন করাটাই হয় বুদ্ধিমানের কাজ।

কেননা, একটি ইলেক্ট্রনিক্স পণ্যের সাথে শুধু মাত্র এর ‘লুকই’ যথেষ্ট হয় না, সাথে দেখতে হয় এর পারফর্মেন্স সহ অনান্য বিষয়, এক কথায় সামগ্রিক অবস্থা। আপনি একটি পণ্য কিনে বাসায় এসে বা দু’দিন ব্যবহারের পরেই যদি দেখতে পান যে ডিভাইসটি ভালো সার্ভিস দিচ্ছে না তখনতো আর আপনি ওয়ারেন্টি (ব্যতিক্রম রয়েছে) পাচ্ছেন না। তাই ঠিক কোন কোন বিষয় গুলোর উপর লক্ষ্য রেখে একটি পুরাতন ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য কেনা উচিৎ তাই আমি আজকে আপনাদের সাথে শেয়ার করতে চেষ্টা করব।

প্রথমে নিজে কিছুটা গবেষণা করে নিনঃ ধরুন, আপনি একটি নির্দিষ্ট স্মার্টফোন কিনতে চাচ্ছেন ই-কমার্স সাইট থেকে। এক্ষেত্রে, প্রথমেই আপনার উচিৎ সেই স্মার্টফোনটিতে কী আছে, কী নেই ইত্যাদি বিস্তারিত তথ্য জেনে নেয়া। এবং এটা অবশ্যই শুধু সেকেন্ড হ্যান্ড ডিভাইস নয় বরং নতুন ডিভাইসের জন্য আরও বেশি প্রয়োজন। এই গবেষণার দুটি লাভ আছে।

আপনি গবেষণা করার সময় অনেক সাইট বা ফোরামে সেই নির্দিষ্ট ডিভাইসের অনেক ইউজার রিভিউ দেখতে পারবেন। এবং যেকোন ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইস কেনার ক্ষেত্রে এই ‘ইউজার রিভিউ’ এর উপর গুরুত্ব দেয়া খুবই প্রয়োজন। কেননা, একজন ব্যবহারকারী যে সেই নির্দিষ্ট ডিভাইসটি ব্যবহার করেছে সে নিশ্চয়ই ডিভাইসটির অফিশিয়াল তথ্যের বাইরেও অনেক তথ্য সরবারহ করবে এবং তার ব্যক্তিগত মতামত তো থাকছেই। এক্ষেত্রে, আপনি আপনার সেই নির্দিষ্ট পছন্দের ডিভাইসটির অনেক ত্রুটি জেনে যেতে পারেন যেমন, ডিভাইসটি সহজেই গরম হয়ে যায় বা ডিভাইসটির একটি নির্দিষ্ট ইউনিট খারাপ মানের ইত্যাদি তথ্য। এরকম তথ্য জানার পর নিশ্চয়ই আপনি আর সেই ডিভাইসটি না কিনে তার চাইতে ভালো মানের কোন ডিভাইসই কিনে থাকবেন।

অন্যদিকে, আপনি গবেষণা করার সময় জানতে পারবেন যে সেই ডিভাইসটির সাথে নির্মানকারি প্রতিষ্ঠান কী কী সরবরাহ করে থাকে। যেমন, একটি স্মার্ট ফোনের সাথে সাধারণত চার্জার, ব্যাটারী, মিনি ইউএসবি ক্যাবল, হেডফোন এবং নির্দেশিকা (ম্যানুয়াল) থেকে থাকে। কিন্তু ধরুন, কিছু ক্ষেত্রে দুইটি ব্যটারী, এইচডিএমআই ক্যাবল এবং ওটিজি ক্যাবলও থেকে থাকে। আপনি যদি নাই জেনে থাকেন যে সেই স্মার্টফোনটির সাথে কী কী থাকে তখন আপনি যার কাছে থেকে কিনছেন সে তো ওটিজি ক্যবল এবং এইচডিএমআই ক্যবলটি আপনাকে নাও দিতে পারে!! তখন, আবারও আপনাকে টাকা খরচ করে সেই এক্সেসরিজ গুলো কিনে নিতে হবে।

তাহলে বুঝতেই পারছেন, পুরাতন ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য কেনার আগে নিজে বসে ইন্টারনেটের সাহায্যে ‘গবেষণা’ করার কোন বিকল্প নেই।

ওয়ারেন্টি সম্পর্কে নিশ্চিত হনঃ আপনি যার কাছে থেকেই পণ্যটি কিনবেন অবশ্যই তার সাথে ওয়ারেন্টির কাগজ পত্রের কথা পরিষ্কার করে বলুন। বাইরের দেশে যেমন তেমন কিন্তু বাংলাদেশে এটা একটি গুরুত্বপূর্ন বিষয়। কেননা, ধরুন একজন পকেটমার বা ছিনতাইকারীও তো অন্য কারও ডিভাইস বিক্রি করার উদ্দেশ্যে ই-কমার্স সাইট গুলোতে বিজ্ঞাপন দিতে পারে। বিজ্ঞাপনেতো আর লেখা থাকবে না যে বিক্রেতা আসলে ভালো মানুষ না অন্য কিছু। তাই আপনাকে বিজ্ঞাপন খেয়াল করতে হবে। আমি উদাহরণ দিয়েই আপনাদের দেখাচ্ছি!

কিছু কিছু স্মার্ট ফোনের বিজ্ঞাপনে লেখা দেখেছি, “only set, no charger!’ – আমার প্রশ্ন হচ্ছে, কেন? বিক্রেতা কি চোর যে চার্জার চুরি করার সময় পাননি?

আবার দেখি, ‘no warrenty papers, lost it!’ বর্তমানে দামী স্মার্ট ফোন গুলো কেনার পর মূলত এখন আর মানুষ ওয়ারেন্টি পেপারকে এতটাও হেলাফেলা করেনা যে এটি হারিয়ে যাবে।

এরকম নানান ভাষার বিজ্ঞাপন দেখা যায়, আপনি যদি হ্যান্ডস-অন-প্রমাণ চান তবে বাংলাদেশের যে কোন ই-কমার্স সাইটে গিয়ে দেখতে পাবেন। তবে, আমি এও বলছিনা যে উপরের কথা গুলো একেবারেই মিথ্যে কথা। বিক্রেতার কথাও সত্য হতে পারে, হয়ত বেচারার চার্জার নষ্ট হয়ে গিয়েছে বা আসলেই ওয়ারেন্টির কাগজ খুঁজে পাচ্ছেন না। তবে, আমি যা বলছি তা হচ্ছে ‘সতর্ক থাকা ভালো’! তাই, আপনি এত কথার ধার না ধেরে ‘ওয়ারেন্টি পেপার’ সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নিন। যদিও শতভাগ নিশ্চয়তা দিতে পারছি না তবুও বলছি ওয়ারেন্টি কার্ড সরবরাহ করতে সক্ষম হলে বিক্রেতাকে ডিভাইসটির প্রকৃত মালিক রুপে অন্তত ৮০ শতাংশ ভেবে নেয়া যায়।

রিটার্ন পলিসিঃ ইলেক্ট্রনিক্স সেকেন্ড হ্যান্ড পণ্য আপনি কেনার সময় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আর কতক্ষনই বা দেখবেন? আবার কিছু কিছু পণ্য এমন র‍্যাম, হার্ড ডিস্ক ড্রাইভ, প্রসেসর, মাদারবোর্ড, গ্রাফিক্স কার্ড – ইত্যাদি যদি আপনি কোন পার্সোনাল বিক্রেতার কাছ থেকে কেনেন তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখে নেয়া সম্ভব হয় না! আর তখন বিক্রেতার মুখের কথাতেই ভরসা রাখতে হয়। এজন্যেই চেষ্টা করবেন ‘রিটার্ন পলিসি’ পরিষ্কার রাখতে। এতে করে কোন কারনে বাসায় এসে যদি দেখতে পান যে ডিভাইসটি সমস্যা করছে তখন বিক্রেতার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেটি ফেরত দিয়ে দেয়া যাবে।

সম্ভব হলে পণ্যটি পরীক্ষা করে দেখুনঃ আসলে এই পয়েন্টটি প্রোডাক্টের উপর নির্ভর করে। তবে ধরুন, আপনি স্মার্টফোন কিনছেন। সেক্ষেত্রে, একটি গেইম ১ মিনিটি খেলে আপনি এর প্রসেসর, জিপিইউ এবং র‍্যামের পারফর্মেন্স সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারবেন। এভাবে গান শুনে মিউজিক কোয়ালিটি এবং ছবি বা ভিডিও’র মধ্যমে ক্যামেরার কোয়ালিটি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারবেন।

বিজ্ঞাপনটি মন দিয়ে পড়ুনঃ আসলে এই পয়েন্ট টি আসলে প্রথমেই আলচোনা করা উচিৎ ছিল। যাই হোক, প্রথমে বিজ্ঞাপনে বিক্রেতার দেয়া তথ্যগুলো মন দিয়ে পড়ুন। অনেক বিক্রেতারাই তাদের পণ্য সম্পর্কে বিস্তারিত লিখে মোটামুটি একটি পরিষ্কার ধারনা দিয়ে থাকেন যাতে ডিভাইসের দোষ-ত্রুটি থাকলে তাও উল্লেখ করা থাকে।

নিরাপত্তা নিশ্চিত করুনঃ এমন একটি স্থানে লেনদেন করার চেষ্টা করুন যাতে জন সমাগম বেশি থাকে এবং আমার মতে রাতের বেলায় লেনদেন না করাই ভালো। যেহেতু আপনি বিক্রেতাকে চেনেন না তাই এটি একটি ‘স্ক্যাম’ও তো হতে পারে। ধরুন একজন বাজে লোক এমনিই অ্যাড দিয়ে আপনাকে রাতের বেলায় ফার্মগেটে লেনদেনের সময় ফিক্সড করল। তখন আপনি টাকা নিয়ে যাবার পর দেখলেন আপনার টাকার অপেক্ষাতেই তিন চারজন বসে আছে, লেনদেনের কথা বাদই দিতে হবে তখন।

আশা করি, উপরের বিষয় গুলো অনুসরণ করলেই আপনি অন্তত ই-কমার্স সাইট গুলো থেকে লাভবানই হবেন। আজ এপর্যন্তই থাক, পরবর্তীতে নতুন কিছু নিয়ে হাজির হব ইনশাআল্লাহ্‌, সে পর্যন্ত প্রিয় টেকের সাথেই থাকুন।

কিছু কথাঃ আমাদের দেশের অনেকেই ই-কমার্স সাইট থেকে কেনা কাটাকে খারাপ চোখে দেখে থাকেন। অনেকেই মনে করেন যে এখানে শুধু চোরাই মাল ক্রয়-বিক্রয় হয়ে থাকে বা পুরাতন পণ্য কিনলে ‘স্ট্যাটাস’ এর অবনতি হয়। আমি তাদের চিন্তা-ভাবনা গুলোকে সম্মান জানাচ্ছি এবং এও বলতে চাচ্ছি যে তারা ঠিক নন। অনেকেই আছেন যারা নতুন পণ্য বাজারে আসার সাথে সাথেই সেটি কেনার জন্য তাদের কাছে থাকা ডিভাইস গুলো বিক্রি করে থাকেন। আবার অনেকেই তাদের সিস্টেম আপগ্রেড করার জন্য পুরাতন পণ্য গুলো বিক্রি করে থাকেন। তাই, বলা চলে ই-কমার্সের মাধ্যমে মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত মানুষেরাও মাঝে মাঝে কম দামে ভালো মানের ডিভাইস ব্যবহারের সুযোগ পেয়ে থাকে। আমার মতে এটাও এক প্রকারে ভারসাম্য।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here

9 − eight =