প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ের ৭১ শতাংশ ই-বুকে রূপান্তর হয়েছে

0
371

উদ্যোগটা মহৎ। কিছুটা ব্যতিক্রমীও। পাঠ্যপুস্তককে ইলেকট্রনিক বা ই-বুকে রূপান্তরের প্রয়াস, যার শুরু ২০১১ সালে। এ উদ্যোগের সাফল্যও লক্ষণীয়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ের ৭১ শতাংশ এরই মধ্যে ই-বুকে রূপান্তর হয়েছে। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে এ উদ্যোগ বাংলাদেশেই প্রথম। এমনকি এ ধরনের নজির নেই মাথাপিছু আয়ে বাংলাদেশের সমপর্যায়ের আর কোনো দেশেই। স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষাবিদরা একে দেখছেন সরকারের সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে। ই-বুক নিয়ে এখন পর্যন্ত যে অর্জন, সেটাকেও দেখছেন বড় করে।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ের ৭১ শতাংশ ই-বুকে রূপান্তর হয়েছে

তারা বলছেন, উদ্যোগটি শতভাগ বাস্তবায়ন হলে বই নিয়ে দুশ্চিন্তার পুরোপুরি অবসান হবে। পাঠ্যপুস্তক ছাপাতে প্রতি বছর সরকারের যে বিপুল অঙ্ক ব্যয় হয়, কমানো যাবে তাও। ই-বুকের পাশাপাশি ডিভাইস নিশ্চিত করা গেলে বন্ধ হবে এ ব্যয়ের পুরোটাই। এতে বইয়ের বোঝা থেকে মুক্তি পাবে শিশুরা। পরিবেশের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। সর্বোপরি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাবে দেশ।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, উদ্যোগটি ভালো। তবে এক্ষেত্রে যাতে নতুন কোনো বৈষম্যের সৃষ্টি না হয়, সেদিকটাও খেয়াল রাখতে হবে। শহুরে শিশুদের পাশাপাশি পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশও শিক্ষা ব্যবস্থায় রয়েছে। তারাও যাতে এ সুযোগ সমানভাবে পায়, সেটি বিবেচনায় নিতে হবে।

পাঠ্যপুস্তক ই-বুকে রূপান্তরের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই প্রোগ্রাম ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রকল্পটির আওতায় ২৬৫টি বইয়ের মধ্যে ১৮৯টি এরই মধ্যে ই-বুকে রূপান্তর হয়েছে। ই-বুকে রূপান্তরিত প্রাথমিক স্তরের বই রয়েছে ৩৩টি, মাধ্যমিক স্তরের ৪৯, মাদ্রাসা শিক্ষার ৭৫ ও কারিগরি শিক্ষার ৩২টি। বইগুলো ওয়েবসাইটে আপলোডও করা হয়েছে। কয়েক বছরের মধ্যে বাকি বইগুলোও ই-বুকে রূপান্তর হয়ে যাবে। পাশাপাশি শিক্ষাসহায়ক বিভিন্ন বইও ই-বুকে রূপান্তরের কাজ চলছে।

ই-বুকের ফলে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষা-সংক্রান্ত বিভিন্ন সংস্থাও বিশ্বের যে কোনো প্রান্ত থেকে যে কোনো সময় পাঠ্যপুস্তক সংগ্রহের সুযোগ পাচ্ছে। উপকৃত হচ্ছে প্রবাসী বাংলাদেশী পরিবারও। কারণ এসব পরিবারের উল্লেখযোগ্য একটি অংশের সন্তানরাও দেশীয় মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। পাঠ্যপুস্তকের সীমাবদ্ধতার কারণে এসব শিক্ষার্থীকে এত দিন ভোগান্তির শিকার হতে হতো। ই-বুকের প্রচলনে সে দুর্ভোগ এখন অনেকটাই কমে এসেছে।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিশুশিক্ষার বিষয়টি বিবেচনা করেই সব বই সে অনুযায়ী অলঙ্করণ করা হয়েছে। বইয়ের বিভিন্ন চরিত্র রঙ ও নান্দনিক নকশায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এসব বই ডাউনলোড করার পাশাপাশি চাইলে অনলাইনে পড়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ওয়েবসাইটটিতে এখনো কিছু দুর্বলতা রয়েছে। তবে এগুলো দূর করে সাইটটি আরো বেশি শিশুবান্ধব করার কাজ চলছে বলে জানা গেছে।

এটুআই প্রোগ্রামের জনপ্রেক্ষিত বিশেষজ্ঞ নাইমুজ্জামান মুক্তা বলেন, মূলত আপতকালীন ব্যবস্থা হিসেবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকগুলো ই-বুকে রূপান্তর করা হয়েছে। দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে যাতে পাঠ্যপুস্তকের অভাবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ না থাকে, সেজন্য উদ্যোগটি নেয়া হয়। এছাড়া ই-বুকে রূপান্তর করায় প্রবাসী বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য সহজেই পাঠ্যপুস্তক পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানসম্মত শিক্ষাদান নিশ্চিত করতে বর্তমানে ই-বুকগুলোকে ইন্টারঅ্যাকটিভ করা হচ্ছে। এতে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমে ইন্টারঅ্যাকটিভ ই-বুকের মাধ্যমে শিক্ষাদান কার্যক্রম আরো আনন্দদায়ক ও সহজবোধ্য করে তোলা সম্ভব হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশের সমপর্যায়ের তো বটেই, অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর অনেক দেশেও এ ধরনের উদ্যোগের নজির নেই। ২০১১ সালে প্রকল্পটি উদ্বোধনের পর এখন পর্যন্ত সফলভাবেই এগোচ্ছে এটি।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ অমি আজাদ বলেন, উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। প্রকল্পটি শতভাগ বাস্তবায়ন হলে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের পক্ষে পাঠ্যপুস্তক সংগ্রহ করা সহজ হবে। তবে ই-বুকের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সুলভে ট্যাবলেট কম্পিউটার বিতরণের উদ্যোগ নেয়া হলে প্রকল্পটি আরো কার্যকর হবে। ব্যাগের বোঝাও আর বইতে হবে না শিক্ষার্থীদের।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৮৪ লাখ। মাধ্যমিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭৯ লাখ ৪৮ হাজার। এছাড়া মাদ্রাসায় ৩০ লাখ ও কারিগরিতে ৬৫ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব পাঠ্যবই ই-বুকে রূপান্তর হলে এর সুফলভোগী হবে এ বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী। বছরের শুরুতে পাঠ্যপুস্তক নিয়ে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পাবেন অভিভাবকরা।

প্রাথমিকের একজন শিক্ষার্থীর অভিভাবক মিজানুর রহমান বলেন, ‘পাঠ্যপুস্তক ই-বুকে রূপান্তরের ফলে সহজেই সন্তানের পড়াশোনার খোঁজ রাখতে পারছি। অফিসে কাজের ফাঁকে বইয়ের বিভিন্ন অংশ নিজে দেখে নিতে পারছি। ফলে বাসায় বাড়তি সময় ব্যয় ছাড়াই সন্তানের পড়াশোনায় সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।’

ই-বুকের কারণে হাতের কাছে বই না থাকলেও এখন আর পড়ালেখায় সমস্যা হয় না বলে জানায় ঢাকার সেন্ট জোসেফ স্কুলের নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী আদীব করিম। তার ভাষায়, ই-বুক শিক্ষার জন্য বেশ সহায়ক। তবে এ নিয়ে তেমন কোনো প্রচার-প্রচারণা না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী বিষয়টি সেভাবে জানে না। ই-বুক চালু হওয়ায় পড়ালেখাও এখন ডিজিটাল হয়ে পড়েছে। হাতের কাছে বই না থাকলেও এখন তারা পড়ার সুযোগ পাচ্ছে।

একটি উত্তর ত্যাগ