সহজ ডট কমের বিরুদ্ধে গ্রাহক হয়রানির অভিযোগ

0
474

অনলাইনে বাস টিকিট বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান সহজ ডট কমের বিরুদ্ধে গ্রাহক হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। গ্রাহকরা বলছেন, যানজট এবং হয়রানি থেকে মুক্তি পেতে স্বল্প সময়ে অনলাইনে বাসের টিকিট কাটতে গিয়ে চরম হয়রানির শিকার হতে হয়েছে তাদের।

ডট কমের বিরুদ্ধে গ্রাহক হয়রানির অভিযোগ সহজ ডট কমের বিরুদ্ধে গ্রাহক হয়রানির অভিযোগহয়রানির শিকার গ্রাহকরা প্রতিকার চেয়ে সহজ ডট কমে যোগাযোগ করলেও তাদের সমস্যার কোনও সুরাহা করেনি কর্তৃপক্ষ। হয়রানির শিকার গ্রাহকরা প্রতিকার না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে।

হয়রানির শিকার গ্রাহকদের মধ্যে ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ফ্রিল্যান্সার অাল-অামীন কবীর, তৌকির অাহমেদ, অাবদুল্লাহ অাল ইমরান, মোছাব্বের রিবন, পিযুষ মিশ্র, শামীম রিয়াজ এবং অাসিফ খান। তারা অনলাইনপ্রেমীদের পরামর্শ দিয়েছেন ‘সহজ ডট কম’ থেকে অার বাস টিকিট না কিনতে।

হয়রানি এবং ভোগান্তির শিকার ফ্রিল্যান্সার-ব্লগার অাল-অামীন কবীর বলেন, ‘গত ২৪ ডিসেম্বর আমি ঢাকার বাইরে যাওয়ার জন্য অনলাইনে সহজ ডট কম থেকে হানিফ পরিবহনের টিকিট কাটি। ঢাকার কলাবাগান থেকে বেলা ২টা ৫০ মিনিটে বাস ছেড়ে যাওয়ার কথা। পরবর্তীতে জানলাম, কলাবাগান থেকে দিনে হানিফ পরিবহনের কোনও বাসই ছাড়ে না!

সহজ ডট কম থেকে আমাকে ফোন দিয়ে বলা হয়, বাসটিতে উঠতে গেলে আমাকে কলেজ-গেট কাউন্টারে যেতে হবে। আমি টিকিটে লেখা সময়ের ৪৫ মিনিট আগে কলেজ-গেট কাউন্টারে পৌঁছাই। সেখান থেকে বলা হল টিকিটে কলাবাগান কাউন্টার লেখা আছে, সেখান থেকেই বাস ছাড়বে। কলেজ গেট থেকে কলাবাগানে এলে অামাকে বলা হয় এই কাউন্টার থেকে কোনও বাস ছাড়বে না।’

অাল-অামীন অারও বলেন, ‘এরপর আমি সহজ ডটকমে ফোন দিলে একজন ভদ্রমহিলা ফোন ধরে বলেন, ঠিক আছ স্যার। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন আমরা আপনাকে জানাচ্ছি। আপনাকে বাসে ওঠানোর দায়িত্ব আমাদের!’

আমি অপেক্ষা করতে থাকলাম। কেউ অামাকে ফোন করেনি। নিজ দায়িত্বে ফকিরাপুল চলে গেলাম। তখনও কেউ ফোন করেনি। আমি আবার তাদের ফোন দিলাম। একই ভদ্রমহিলা ফোন ধরলেন। আমি আমার ঘটনা বলার পরপরই বকাঝকা করেন, আপনাকে না বললাম ফকিরাপুল চলে যেতে?’

অাল-অামীন জানান, এর মধ্যে অনেক সময় পেরিয়ে যায়। এবার এক ভদ্রলোক ফোন দিলেন ‘সহজ’ থেকে। জানতে চাইলেন আমি কোথায়। বললাম ফকিরাপুলে দাঁড়িয়ে আছি। আমরা আরেকটা বাসে আপনার ব্যবস্থা করছি। আপনি ওখানেই থাকুন।

এরপরও তিনি অারও এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিলেন। অাল-অামীন জানান, তিনি অাবারও ফোন দেন সহজ ডট কমে। এক নারী ফোন রিসিভ করেই বলা শুরু করেন, ‘আপনি দেরি করে কাউন্টারে এসেছিলেন। এর দায়িত্ব আমাদের না!’ বলেই ফোন কেটে দেন তিনি।

অাল-অামীন বলেন, ‘আমি নির্ধারিত সময়ের অনেক আগে কাউন্টারে গিয়েছিলাম। এমনকি তাদের কমপ্লেইন যখন করেছি ফোনে তখনও আমার বাসের সময় ১০ মিনিট বাকি ছিল!’

এ বিষয়ে জানার জন্য সহজ ডট কমের প্রধান নির্বাহী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মালিহা এম. কাদিরের মোবাইলফোনে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি ধরেননি। এই প্রতিবেদক তার পরিচয় জানিয়ে কথা বলার জন্য এসএমএস পাঠালেও তিনি উত্তর দেননি। তবে প্রতিষ্ঠানটির বিক্রয় বিভাগের প্রধান শাকিল জাওয়াদ রহিম ফোন করে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন।

অাল-অামীন কবীরের বিষয়টি তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি ভুল বোঝাবুঝি থেকে হয়েছিল। ভোগান্তির জন্য অামরা তার কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছি।’ তবে তিনি স্বীকার করেন, অনলাইনে টিকিট বিক্রি নিয়ে ‘কিছু’ সমস্যা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এসব থাকবে না বলে তিনি তাদের ওপর ভরসা রাখতে বলেন।

তিনি বলেন, ‘চালুর পর থেকে গত ৮ মাসে অামরা এক লাখেরও বেশি বাস টিকিট বিক্রি করেছি। এর মধ্যে কিছু সমস্যা হয়েছে। এগুলো বাস টিকিট বিক্রির অনুপাতে খুব বেশি নয়।’ এই প্রতিবেদককে বিষয়টি ‘বড়’ করে না দেখার পরামর্শ দিয়ে শাকিল জাওয়াদ রহিম বলেন, নতুন এই মাধ্যমটিকে অাপনারা অারও বেশি বেশি করে প্রচার করুন। এখনই নেতিবাচক লিখলে প্রতিষ্ঠানটি কখনওই দাঁড়াবে না।’

এ ব্যাপারে অাল-অামীন কবীরের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সহজ ডট কম থেকে কেনা টিকিটে অামি চট্টগ্রাম যেতে পারিনি। ওইদিন রাতে অামি অন্য একটি বাসের টিকিট কিনে চট্টগ্রামে যাই।’ তিনি অারও বলেন, ‘সহজ ডট কম কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে ফোনে অামার কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে তবে ঘটনার তিন দিন পরে। তবে অাজ পর্যন্ত তারা অামার টাকা ফেরৎ দেয়নি। অামার টাকা না মিললেও হয়রানি মিলেছে সহজে।’

তৌকির আহামেদ নামের অপর একজনও ‘সহজ’-এর ‘সেবায়’ ভুক্তভোগী। তিনি বলেন, ‘সিলেটের টিকিট কেটেছিলাম। কিন্তু আমারটা অন্য জায়গায় আবার বেচে ফেলেছে। কত কষ্ট করে সিলেটে আসছি, সেটা আমি জানি।’

অারেক ভুক্তভোগী আবদুল্লাহ আল ইমরান বলেন, ‘১৫ দিন আগে টিকিট বুক করেছিলাম, আমারে না বলে সেই টিকিট বেচে দিয়েছে। পরে অভিযোগ করলে অন্য বাসের টিকিট দিয়ে বলে বাস কোম্পানি ভাড়া বাড়িয়েছে। ওই মুহূর্তে আমার আর উপায় ছিল না।’

পিযুষ মিশ্র জানান, তার জানা-শোনা কয়েকজনও এমন ভোগান্তির শিকার হয়েছেন।

শামীম রিয়াজ বলেন, “গত ১৬ ডিসেম্বর আমি ‘সহজ’ থেকে ১৮ তারিখ সকালের সৌদিয়া এয়ারকন এর (ঢাকা টু চট্টগ্রাম) টিকেট করি এবং অনলাইনে পেমেন্ট করি।

টিকিট কাটার আধঘণ্টা পরে সহজ ডট কম থেকে একজন ফোন দিয়ে আমাকে জানায় ১৮ তারিখ তাদের কোনও টিকেট নেই। ওয়েবসাইটে ভুল ছিল এজন্য তারা দুঃখিত। আমি অন্য কোনও তারিখে যাব কি না সেটা জানতে চায়। অার তা না হলে আমাকে টাকা ফেরত দেবে। আমার ওইদিন যাওয়া জরুরি ছিল তাই আমি টাকা ফেরৎ চাই।

এরপর তারা আমাকে বলে, রিফান্ড পেতে হলে আমাকে আমাদের ই-মেইল ঠিকানায় টিকেটের ডিটেইল দিয়ে মেইল করতে হবে। আমি মেইল করি এবং তাদের কল সেন্টারে ফোন দিয়ে জানতে চাই কবে আমি আমার রিফান্ড পাব? তারা জানায়, ৩ দিন লাগতে পারে। কিন্তু ৫ দিন পর ২১ ডিসেম্বরও আমার রিফান্ড না আসাতে আবার তাদের কাস্টমার কেয়ারে কল দিই। তারা আমার ডিটেইল নেয়ার পর জানায়, তারা রিফান্ডের জন্য কোনও মেইল পায়নি। আমি তাদের দেওয়া অন্য একটা ই-মেইল ঠিাকানায় আবার মেইল করি।

এবার তারা অামাকে জানায়, ২ দিনের মধ্যে আমি রিফান্ড পাব। ২৩ তারিখেও কোনও রিফান্ড না আসায় আমি আবার কল দিই তাদের কাস্টমার কেয়ারে। এবার তারা জানায় ১ দিন লাগবে। অবশেষে ২৪ তারিখ আমি রিফান্ড পাই, তাও যা খরচ করেছি তার থেকে কম। সম্ভবতঃ তারা পেমেন্ট গেটওয়ে ফি কেটে রেখে বাকিটা রিফান্ড করেছে। যদিও সম্পূর্ণ তাদের ভুলে আমাকে এই ঝামেলা পোহাতে হয়েছে।” তিনি বিক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘নাম সহজ হলেও তাদের কাজ কারবার মোটেই সহজ মনে হয়নি।’

এদিকে, মোছাব্বের রিবন নামে অপর একজন বলেন, ‘আমি কুড়িগ্রাম যাব বলে অনলাইনে নাবিল পরিবহন বলে সার্চ দিই। ফেসবুকে নাবিলের একটা পেজে গ্রামীণফোন নম্বর পেয়ে ফোন দিলাম। ফোন ধরলে আমি জানতে চাই, এটা নাবিল পরিবহনের নম্বর কি না? বললো, হ্যাঁ।

আমি বললাম, কুড়িগ্রামের বাস কোনটা কখন? আমাকে ওই প্রান্ত থেকে বলা হয়, আপনি সহজ ডট কমে ফোন দেন। আমি বলি, আপনি যদি নাবিলের লোক হন তাহলে আমাকে সময় সূচি বলেন। বুঝলাম সহজ ডট কম ওই ফেসবুক পেজ চালু করেছে নাবিলের নাম দিয়ে। আর তাদের প্রচারণা চালাচ্ছে।’

এদিকে, অাসিফ খান নামে এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘হরতালের কারণে পরিবহন কর্তৃপক্ষ বাসযাত্রা বাতিল করে। তারপরও টাকা ফেরৎ দেওয়ার সময় অামার ৪টি টিকিটের জন্য সহজ ডট কম সার্ভিস চার্জ কেটে রেখেছে। বাসযাত্রা তো তারা বাতিল করেছে, অামি নই। তাহলে অামাকে সার্ভিস চার্জ দিতে হবে কেন? এই হলো সহজ ডট কমের সেবার নমুনা!’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই কয়েক মাস অাগেও সহজ ডট কম প্রতিদিন ২০০ বাস টিকিট ‌‌বিক্রি করত। ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার কারণে হালে তা প্রতিদিন ৬ হাজারে পৌঁছেছে। এ কার‌‌ণে তাদের সেবার এই হাল।’

এ বিষয়ে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) কর্তৃপক্ষের ভাষ্য হলো, ই-কমার্সে আস্থা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা যেন সবাই মনে রাখে। যাদের সমস্যা হচ্ছে বা হয়েছে তাদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়ার অাহ্বান জানান ই-ক্যাব কর্তৃপক্ষ।’

একটি উত্তর ত্যাগ