আমেরিকার নাসায় কর্মরত বাংলাদেশী বিজ্ঞানী তথা বাংলাদেশের গৌরব “আতিক উজ জামান” এর সাক্ষাতকারটি পড়ুন।

0
388

আসসালামুয়ালাইকুম। প্রথমেই জানাই Happy New Year 2015. আশা করি সবাই ভালো আছেন। দোয়া করি যেন নতোন বছর টি যেন সবার ই ভালো কাটে। আমার জন্য ও দোয়া করবেন।

বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে মানুষের জন্য কিছু করার স্বপ্ন দেখেছিলেন আতিক উজ জামান। নানা পথ ঘুরে পাড়ি জমিয়েছিলেন গবেষণার তীর্থভূমি আমেরিকায়। একসময় তিনি সারা দুনিয়ার বিজ্ঞানীদের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান নাসার সঙ্গে যুক্ত হন। বাংলাদেশের এই কৃতী সন্তানের মুখোমুখি হয়েছেন জায়েন আসনাম

জায়েন আসনাম : বাংলাদেশের ছেলে নাসার সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক হলো, গোড়া থেকে শুনতে চাই?

আতিক উজ জামান : আমি পড়াশোনা করেছি বুয়েটে, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। পাস করেছি ১৯৮২-তে, তারপর আমি বুয়েটের লেকচারার ছিলাম ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টে, এ সময় কমনওয়েলথ স্কলারশিপে পড়াশোনা করতে যাই (মাস্টার্স আর পিএইচডি) ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টারে, ইংল্যান্ডে। ওখান থেকে মাস্টার্স, পিএইচডি করে দেশে ফিরে এসে আবার বুয়েটে যোগ দেই অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে।

ছয় মাস বুয়েটে পড়াই, তারপর শিক্ষকতার চাকরি নিয়ে চলে যাই সৌদি আরবের কিং ফাহাদ ইউনিভার্সিটিতে, ওখান থেকে ইমিগ্রেশন নিয়ে চলে যাই অস্ট্রেলিয়ায়, ওখানে গিয়ে চাকরি পেয়ে গেলাম মনাশ ইউনিভার্সিটিতে, মেলবোর্নে। ওটাকে বলা যায়,  ‘টপ এইট’ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি। ওখানে পড়াতে পড়াতেই আমি কিছু কিছু কাজ শুরু করি কমিউনিকেশন নেটওয়ার্কিং নিয়ে। মুশকিল হয়, অস্ট্রেলিয়া এমন একটা দেশ যেখানে খুব বেশি রিসার্চ করার সুযোগ নেই, বেশিরভাগ বড় রিসার্চগুলো হয় মূলত ইউরোপ আর আমেরিকায়।

তখনই আসলে ঠিক করি, রিয়েল কাজ করতে হলে যা সোসাইটির কাজে লাগবে, আমাকে আমেরিকা-ইউরোপের দিকে যেতে হবে, ন্যাচারালি, এসব কারণেই আমি আমেরিকাতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। প্রথমে চাকরি নিলাম ইউনিভার্সিটি অব ডেটন, ওহাইয়োতে। ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। ওখানে থেকেই আমার সঙ্গে নাসার যোগাযোগ তৈরি হয়। ক্লিভল্যান্ডের নাসার একটা সেন্টার আছে, যার নাম গ্লেন রিসার্চ সেন্টার , ওই সেন্টারে নাসা কমিউনিকেশনের কাজটা করে, অর্থাৎ আমি যে ধরনের নেটওয়ার্কিংয়ের কাজ করি, এরকম আরও অনেক সেন্টার আছে নাসার, যেখানে নাসার স্পেস কার নিয়ে গবেষণা হয়, অমার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্লেন সেন্টারের দূরত্ব ছিল তিন-চার ঘণ্টা, আমার পক্ষে বড় সুবিধা ছিল আমি চাইলেই গাড়ি ড্রাইভ করে হাজির হয়ে যেতে পারতাম ওদের ওখানে, এবং সরাসরি কথা বলতে পারতাম ওদের সঙ্গে। খোঁজখবর করতাম ‘কী ধরনের কাজকর্ম তোমরা করছো, আমি কীভাবে তোমাদের হেল্প করতে পারি এসব আরকি’ দ্যাটস হাউ আই স্টারটেড।

আসনাম : পুরো ব্যাপারটার শুরু আপনার নিজের উদ্যোগে?

আতিক : হ্যাঁ, নিজের উদ্যোগেই। গ্র্যান্ড রিসার্চ সবই নিজের উদ্যোগে করতে হয়। ওরা তো শুধু ফান্ডিং করবে, যখন দেখবে আপনি ওদের একটা প্রবলেম সলভ করতে পারছেন এবং আপনার ওই ব্যাকগ্রাউন্ডটা আছে। তখন আরও ফান্ডিং দেবে।

আসনাম : এর সঙ্গে আপনার ইউনিভার্সিটির কোনো সম্পর্ক ছিল না?

আতিক : ইউনিভার্সিটি তো ইনভলভ হবেই, কিন্তু শুরুর উদ্যোগটা আপনাকেই নিতে হবে। এসব উদ্যোগ সব সময় নিজেকেই নিতে হয়, হ্যাঁ ইউনিভার্সিটি আপনাকে হেল্প করবে সব ব্যাপারে, কিন্তু বুদ্ধিটা আপনার নিজেকেই বের করতে হবে। আপনি আইডিয়া দিলে তাহলে ওরা দেখবে, ‘হ্যাঁ ওর নতুন একটা আইডিয়া আছে এবং ওর ব্যাকগ্রাউন্ড আছে করার মতো,’ তখন বিশ্ববিদ্যালয় আপনাকে হয়তো বলবে ঠিক আছে একটা প্রপোজাল লেখ, আপনি একটা প্রপোজাল লিখলেন, তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ওটা চলে যাবে ফান্ডিং যারা করবে তাদের কাছে। কাজগুলো এ ভাবেই হয়, ধরুন আপনি একটা অ্যাড জোগার করবেন পত্রিকার জন্য, আপনি নিজে আগে কথা বলে পরে অফিসকে ইনভলভ করবেন। তো এভাবেই আমরা কাজ শুরু করি। তারপরে একটা প্রজেক্ট করার পরে ওরা যখন দেখে যে রেজাল্ট ভালো আসছে, তখন আরও কনফিডেন্স গ্রো করে ‘এ পারবে করতে’ তখন আপনাকে আরও প্রজেক্ট দেয়।

আসনাম : শুরুতে নাসার কোন প্রজেক্টের সঙ্গে ছিলেন?

আতিক : ইন্টারনেটে মহাশূণ্য যানের সঙ্গে কিভাবে কমুনিকেট করা যায়, খুব ইম্পরটেন্ট কাজ। সহজভাবে বলি, আপনি যখন স্কাইপে কথা বলেন, তখন কথা স্পষ্ট হতে হবে অর্থাৎ কথা বলার সময় ডিলেটা কম হতে হবে, ডিলেটে বেশি হলে তো হবে না, আপনি একটা বললেন অনেকক্ষণ লাগল অন্যপ্রান্তে যেতে। আপনি হ্যাঁ হুঁ করছেন, কথা ভেঙে যাচ্ছে, কাজেই এই ডিলেটা খুব ইম্পরটেন্ট, এর সঙ্গে আরেকটা ব্যাপার হলো যে ব্যান্ড উইথ, ব্যান্ডউইথ হলো ডিলে না কিন্তু কথা ভেঙে যাচ্ছে। আরেকটা হলো যে, আপনার ডাটাটা লস হয়ে যায় কিনা, ওই লস হয়ে গেলে কথা থেকে যায়, এই তিনটি জিনিস ইম্পরটেন্ট, এই তিনটিকে বলে কোয়ালিটি অব সার্ভিস আপনি যদি কারও সঙ্গে কথা বলেন, ডিলে কম হতে হবে, আর এনাফ ব্যান্ডউইথ থাকতে হবেÑ মানে ক্যাপাসিটি থাকতে হবেÑ আর আপনার কথাবার্তা যেন ড্রপ হয়ে না যায়, লস না হয়। সব মিলেই কোয়ালিটি অব সার্ভিস। তো আমাদের প্রথম কাজ শুরু হয়, ইন্টারনেটে যদি কানেক্ট করতে হয় স্পেসে, তাহলে এই কোয়ালিটি অব সার্ভিসটা কেমন করে নিশ্চিত করা যেতে  পারে, প্রথমে এই ব্যাপারটা নিয়েই কাজ শুরু করি। তো ওই প্রজেক্ট শেষ হওয়ার পর এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেকটা প্রজেক্ট এসে যায়।

আসনাম : তাহলে ইন্টারনেটে স্পেসে যোগাযোগ সম্ভব হলে কোয়ালিটি অব সার্ভিসটা নিশ্চিত করার কাজে আপনারা সফল হলেন?

আতিক : হ্যাঁ আমাদের পার্টটায় আমরা সাকসেসফুল, তবে এটা আসলে একটা অনেক বড় প্রজেক্ট। স্পেসে ইন্টারনেট কিভাবে কাজ করবে এটা বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ করে করে নাসা কাজ করছে। আমরা কোয়ালিটি অব সার্ভিসের মতো ছোট একটা পার্ট করেছি।

আলীম : মানে আপনি আপনার পার্টে সফল ছিলেন।

আতিক : হ্যাঁ, সফল ছিলাম। পরে ওরা টেস্টিং করে, ইমপ্লিমেন্টিশন করার চেষ্টা করে, ওটা আদৌ ইমপ্লিমেন্ট করবে কিনা দেখে; এসব অনেক কিছু আছে, বিজনেস সাইডও আছে, আদৌ করা দরকার কিনা এটা। ওই প্রজেক্টটা হলো, তার পরের প্রজেক্টে আমরা শুরু করলাম যেÑ

আসনাম : দ্বিতীয় প্রজেক্টও ওই ইন্টারনেট কমুনিকেশন?

আতিক : হ্যাঁ। প্রথম প্রজেক্টে আমরা ছিলাম চারজন। সবাই আমেরিকান। সেকেন্ড পার্টে আমরা যেটা করি একজেক্টলি এর কন্টিনিশন না, এক এর রিলেটেড বলা যায়। এটা ছিল উড়োজাহাজের কমিনিউকেশন, ককপিটের সঙ্গে যে এন্টেনা থাকে, সেটা কমিউনিকেট করে বাইরে থেকে আসা ডাটা ডাউনলোডের মাধ্যমে, এটা কমিনিউকেট করে স্যাটেলাইটের সঙ্গে । এই কমিনিউকেশন হয় কোয়ার্সেল ফাইবার দিয়ে। কোয়ার্সেল ফাইবার আপনারা চেনেন, টিভির ডিস সংযোগ দেওয়া হয় যে তার দিয়ে। ওটাই কোয়ার্সেল কেবল। এখন আপনি যদি অনেকগুলো এন্টেনা বসান টিভিতে, আরও নতুন নতুন এন্টেনা বা সেন্সর বসানÑআজকাল তো খুব সেন্সর বসাচ্ছে চারিদিকেÑতাহলে কিন্তু অনেক তার টানতে হবে। এই কোয়ার্সেল ফাইবারগুলো খুব মোটা মোটা হয়।  প্লেনে কী হয়? বেশি তার হলে প্লেনের ওজন বেড়ে যায়। প্লেনের জন্য এটা একটা প্রবলেম, আরেকটা বিষয় আছে কেবলগুলো যদি সব একসঙ্গে করে দেন তাহলে আবার একটার সঙ্গে আরেকটার সিগনাল ইন্টারফেয়ার করবে, সিগনাল ইন্টারফেয়ার করলে সিগনাল লস হয়ে যাবে, ইনফরমেশন নষ্ট হবে। আর প্লেনের ভেতরে সিগনাল লস হওয়া মানে ডেনজারাস সমস্যা, বিশাল বিপদ হয়ে যাবে, জেনারেলি ইনফরমেশন লস হলে খুব একটা সমস্যা নেই কিন্তু প্লেনে তো বিপদ ঘটতে পারে। কিন্তু যোগাযগের শক্তি বাড়াতে হলে কোয়ার্সেল ফাইবার একটা বাধা। তাই নাসা চিন্তা করেছে যে ওই কোয়ার্সেল কেবল ফেলে দিয়ে একে কীভাবে অপটিক্যাল ফাইবার করা যায়।

আসনাম : প্লেনের ঠিক কোথায় এই কেবলগুলো থাকে?

আতিক : বিভিন্ন জায়গায় যেমন ডানার ওপর থাকে, ছাদের ওপর থাকে, বিভিন্ন জায়গায় থাকে। বেশি ইনফরমেশন কোয়ারসেল কেবল দিয়ে গেলে ওই বেশি কেবল বসাতে হবে বিমানের ভেতর। তাতে ওজন বেড়ে যাবে বিমানের , এজন্য চিন্তা করলাম কোয়ারসেল কেবল ফেলে দিয়ে অপটিকাল ফাইবার বসালে কেমন হয়।

কিন্তু অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহারেও অনেক প্রবলেম আছে। যেমন ধরেন অপটিক্যাল ফাইবারের যন্ত্রপাতিগুলো খুব এক্সপেনসিভ, তারপর অপটিকাল ফাইবারের দুটি সিগনাল যদি একসঙ্গে জোড়া লাগাতে চান তাহলে খুব কঠিন, কারণ তাতে লাইট আসবে সো অপটিকাল ফাইবারের জোড়া লাগানো কঠিন, লাইটকে সøাইস করতে হয়, অনেকরকম যন্ত্রপাতি লাগে। তো এটাই আমাদের রিসার্চ ছিল, কোয়ারসেল কেবল বাদ দিয়ে ফাইবার কেবল ব্যবহার করা যায় কিনা, আর যদি বসানো যায় তাহলে কীভাবে বসানো যায়? আর্কিটেকচারটা কী হবে? প্ল্যানিংটা কী হবে সেটা নিয়ে আমরা রিসার্চ করি পরের প্রজেক্টে, মানে সেকেন্ড প্রজেক্টে, তো ওইটাতে আমরা অনেকদূর এগিয়ে ছিলাম। একটা ব্যাপার, রিসার্চের সঙ্গে ওরা কিন্তু আরেকটা ব্যাপার দেখে যে রিসার্চ করার পর ইমপ্লিমেন্ট করবে কিনা, অনেক সময় রিসার্চের পর পরই সঙ্গে সঙ্গে ইমপ্লিমেন্ট হয় না। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক ব্যাপারও যুক্ত থাকে। রিসার্চের পর তারা এটাও খতিয়ে দেখে যে ওটা আদৌ বাস্তবায়ন করা সম্ভব কিনা।

আসনাম : প্লেনে অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহারের গবেষণায়ও সফল হয়েছেন?

আতিক : হ্যাঁ, সাকসেসফুল, ইমপ্লিমেন্টেশন এখনও শুরু হয়নি। শুরু হবে কিনা তা নাসা ম্যানেজমেন্টের ডিসিশন, এখন ওই প্রজেক্টট ওরা বন্ধ করে দিয়েছে। মূল প্রজেক্টটা ছিল এয়ারক্রাফটের সেফটি কীভাবে বাড়ানো যায়, তার একটা পার্ট ছিল এটা, এখন ওই প্রজেক্টে মার্কিন গভমেন্ট আর ফান্ড করছে না।

আসনাম : এসব রিসার্চের পেটেন্ট কাদের কাছে থাকে?

আতিক : আমাদের ইউনিভার্সিটিতে আমরা যেসব রিসার্চ করি তা ওপেন হতে হবে। এটা পেটেন্ট করা যায় কিন্তু আমরা করি না। কারণ আমরা চাই সবাই এই উদ্ভাবনের কথা জানুক, ব্যবহার করুক। আমরা এডুকেশনের সঙ্গে যুক্ত, আমরা চাই শেখাতে। আমরা লুকাতে চাই না। আর আমাদের ইউনিভার্সিটিও নন প্রফিট।

আসনাম : তারমানে আপনি চাইলেও পেটেন্ট করতে পারতেন না?

আতিক : না। শুধু আমরা না। নাসাও চায় সবাই জানুক, কারণ নাসা চলে ট্যাক্সের পয়সায়। এখন আমরা যদি না জানাই তাহলে ট্যাক্সপেয়ারা কেন টাকা দেবে। ওদের জানাতে হবে ওদের টাকায় কী কী রিসার্চ হচ্ছে। হ্যাঁ, যখন ওরা ইমপ্লিমেন্ট করবে তখন জানাবে না কাউকে। সেটা হলো সিকিউরিটির জন্য।

আসনাম : থার্ড প্রজেক্ট?

আতিক : থার্ড প্রজেক্ট ছিল ইন্টারনেট যদি স্পেশশীপের সঙ্গে কানেক্ট করি, তাহলে সেটা কীভাবে কানেক্ট করব? মহকাশে স্যাটেলাইটগুলোতে সব সময় মুভ করছে। এই মুভমেন্টে থাকলে স্যাটেলাইট কানেক্টিভিটি কীভাবে অটুট রাখা যাবে। এটা বিরাট একটা চ্যালেঞ্জ। কারণ স্যাটেলাইট কমিনিউকেট করে নিচের গ্রাউন্ড স্টেশনের সঙ্গে। যখন মুভ করে তখন কন্টাক্ট থাকে না। তখন যা হয় নিচে ডাটাগুলো স্টোর হতে শুরু করে। তারপর ঘুরতে ঘুরতে যখন আবার সংযোগ স্থাপন হয় আবার ডাটা স্টোর হতে শুরু করে। এই স্টোরিংয়ের কাজে প্রচুর টাইম লেগে যায়। এখন এমন যদি হয়, ডাটা যদি হয় রিয়েল টাইম, মানে সঙ্গে সঙ্গে জানাল। তাহলে বিরাট ব্যাপার হয়। এটা করার জন্য কী করতে হবে সব গ্রাউন্ড স্টেশন কাছাকাছি রাখতে হবে। কিন্তু এটা তো প্রায় অসম্ভব। এবং খুব এক্সপেনসিভও। তো ডাটা সরবরাহ কিভাবে কন্টিনিউ রাখা যায় সেটা নিয়েই আমরা অনেক বছর কাজ করছি। প্রায় ছয়-সাত বছর। আমরা এ সময়ে কিছু কিছু টেকনিক বের করেছি, কন্টিনিউয়াসলি যাতে কানেক্টিভিটি রাখা যায়। সেসবের কিছু কিছু আর্কিটেকচার করে আমরা নাসাকে দেখিয়েছি। আরও প্রপোজ করেছি। ওদের যখন প্রোপজ করা হয়, ওরা তখন বলে টেস্ট করে দেখাও, সম্ভব কিনা, একে বলে প্রোটোটাইপিং। এগুলো আমরা অনেক করেছি।

আমরা সাকসেস। কিন্তু এটা এখনকার টেকনোলজিতে পারা যাবে না। কারণ এখনকার স্যাটেলাইটগুলো একদিকে মুখ করে থাকে। মুভ করে না।

আসনাম : মানে অবস্থান সরলেও …

আতিক : হ্যাঁ, এখনকার স্যাটেলাইট যেহেতু মুভ করে না। আমরা যেভাবে বলেছি, তা করতে হলে স্যাটেলাইট চেঞ্জ করতে হবে। এটা আমরা ল্যাবে টেস্ট করে দেখিয়েছি। অপারেশন স্যাটেলাইট যেগুলো আছে আকাশে, তার উপরেও টেস্ট করেছি।

আসনাম : এই টিমে ক’জন ছিলেন আপনারা?

আতিক : এই টিম বিরাট ছিল, একেক সময় একেকজন, অলমোস্ট ১৫ জনের মতো।

আসনাম : এই প্রজেক্ট শেষ?

আতিক : অফিসিয়ালি শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা বাকি কাজটা করে যাচ্ছি। নেক্সট প্রজেক্টটা পাওয়ার জন্য।

তবে ওটা নিয়ে আমি এখনও শিওর না, ওরা কোন দিকে ফান্ড করার চেষ্টা করবে এটা ডিপেন্ড করে ওদের ইন্টাররেস্টের ওপর। এটা ডিপেন্ড করে ফেডারেল গভর্মেন্টের পলিসির উপরে।

আসনাম : সব দেশ তো অস্ত্র গবেষণায় বেশি আগ্রহী।

আতিক : ঠিক বলেছেন, যেমন ওদের টাকার শর্ট পড়ল তো তখন ওরা এসে বলবে স্পেস এক্সপ্লোর ইমার্জেন্সি না, আগে দেশ ঠিক করতে হবে।

আসনাম : বুশের সময় যেমন স্টার ওয়ার…

আতিক : এক্সাক্টলি টাকার টান পড়লে কোন সবার আগে বাদ দেয় রিসার্চ। কারণ রিসার্চ তো ২০/২৫ বছর পরে লাগে, তো ওইটা আপাতত স্থগিত রাখা হোক এ রকম আর কী। নাসার অনেক প্রোগ্রাম যেমন এখন অনেক স্থগিত হয়ে গেছে, আমেরিকার ফাইনান্সিয়াল ক্রাইসিসের কারণে।

আসনাম : গবেষণা থেকে সবে আসি। আপনার পড়ানোর বিষয় তো  কম্পিউটার সাইন্স ?

আতিক : হ্যাঁ। ২০০১ থেকে, ১৩ বছর বছর ধরে পড়াচ্ছি ।

আসনাম : রিসার্চের টাইমটা কীভাবে বের করেন ?

আতিক : আমাদের যে ওয়ার্কিং টাইম তার ৪৫ ভাগ টাইম ইউজ করি টিচিং আর ৫০ ভাগ টাইম উইজ করি রিসার্চের জন্য। এটা ইউনিভার্সিটির কাছে অ্যাপ্রুভ করা আছে আমাদের।

আসনাম : রিসার্চ কি বাধ্যতামূলক?

আতিক : রিসার্চ করা বাধ্যতামূলক।

আসনাম : সপ্তাহে ক’দিন ক্লাস নিতে হয়?

আতিক : সপ্তাহে ২/৩ দিন ক্লাস নেই।

আসনাম : রিসার্চের বাইরে পড়ানো কতটা এনজয় করেন?

আতিক : পড়ানোটা আমার প্যাশন, ইনফ্যাক্ট বুয়েট থেকে পাস করার পর সব সময়ই আমি টিচিংয়ে ছিলাম। তবে আমি বেশি এনজয় করি যখন দেখি আমার রিসার্চ আপ্লাই হয়েছে। অর্থাৎ থিওরিটিক্যাল রিসার্চটা এপ্লাইড দেখতে চাই আর কী।

আসনাম : আপনি দেশে এবং বিদেশে, দু’জায়গাতেই পড়িয়েছেন, এই দুই জায়গায় আপনার অভিজ্ঞতা কেমন?

আতিক : বুয়েটের স্টুডেন্টরা খুবই ব্রাইট। কারণ সারা দেশ থেকে সিলেক্ট করে নেয়া হয় ওদের। ওরা সব সাকসেসফুল স্টুডেন্ট। বাইরের ইউনিভার্সিটিতে অত স্ট্রিক্ট না। এজন্য দেখা যায়, একইসঙ্গে খুব ভালো ব্রাইট ছেলে আছে আবার কম, মিডিয়াম, এভারেজ ছেলেও আছে, কারণ ওখানে শুরু মেরিট দেখে সিলেক্ট করা হয় না, ডাইভারসিটিও থাকতে হয় নির্বাচনে।

আসনাম : আপনার ইউনিভার্সিটির ছাত্র আর আমাদের বুয়েটের, কে ভালো?

আতিক : বুয়েটের। বুয়েটের সব ছাত্র, একদম ফিল্টারড। একটা দেশের একদম বেস্টকে আমরা নিচ্ছি ।

আসনাম : দেশ নিয়ে ভাবেন বা বলেন?

আতিক : আমি তো বাংলাদেশে বড় হয়েছি তো এটা তো আমার প্রাণের টান, ওখানে স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন আছে, বাংলাদেশী স্টুডেন্টদের ওখানে আমি অ্যাডভাইজার। আমরা কালচারাল বিভিন্ন অনুষ্ঠান করি, বিভিন্ন বাংলাদেশী স্পিকারদের ইনভাইট করি যেমন বাংলাদেশের প্রখ্যাত বিজ্ঞানী আতাউল করিম, ওনাকে ইনভাইট করেছিলাম। ইনফ্যান্ট আমরা ক্লোজ ফ্রেন্ডও। আমি যখন ডেটন ওহাইয়োতে উনিও তখন ওখানে চাকরি করতেন।

আলীম : আপনার দেশের বাড়ি কোথায়?

আতিক : নরসিংদী। আমি প্রতি বছর দেশে আসি এ বছর তিনবার এসেছি।

আলীম : আপনার ফ্যামিলির কথা বলেন?

আতিক : আমার ওয়াইফ আছে, আমার মেয়ে চাকরি করে আমেরিকাতে, ছেলে ইউনিভার্সিটিতে ফার্স্ট ইয়ারে, আমার মেয়ে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পাস করেছে জর্জিয়াটেক থেকে, আটলান্টাতে এখন কাজ করে একটা কোম্পানিতে, ডেক্সটন বলে। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, আমার ওয়াইফও পাস করেছে বুয়েট থেকে। আমার ছেলেও কম্পিউটার সাইন্সে পড়াশোনা করছে আমাদের ইউনিভার্সিটিতে। আমরা চারজনই ইঞ্জিনিয়ার।

আসনাম : আপনার মেয়ের জন্ম হয়েছে সৌদি আরবে, ছেলের জন্ম হয়েছে অস্ট্রেলিয়াতে, ওরা বাংলাদেশের সঙ্গে কতটা পরিচিত?

আতিক : আমরা বাসায় সব সময় বাংলা বলি। বাসায় সব সময় বাঙালি খাবার-দাবার খাই। ওরা বাংলা লিখতে পারে না, পড়তে পারে একটু একটু বড় হেড লাইন…। কিন্তু বাংলায় কথা বলে ওরা সবাই। মানে আমরা পুরোই বাঙালি বলতে পারেন।

বাংলাদেশ ওদের খুব পছন্দ। ওরা খুব ইন্টারেস্টিং মনে করে, এনজয় করে দুয়েকটা জিনিস ছাড়া: ট্রাফিক আর মশার কামড়Ñ এগুলো ওরা সহ্য করতে পারে না লাল হয়ে যায়। এছাড়া খাবার-দাবার তারপর এখানে কাজের লোক আছে লাইফ কমফোরটেবল, দাদা-দাদি আছে খুব আদর করে। এসব খুব পছন্দ করে, ওখানে তো এসব পায় না।

আসনাম : ভবিষ্যতের কি প্ল্যান?

আতিক : যেহেতু আমার ছেলেমেয়েরা ও দেশে বড় হচ্ছে ওখানেই চাকরি করবে, ওখানেই থাকবে আমার হয়তো এখানে আসাটা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। যেখানে ছেলেমেয়ে থাকে ন্যাচারালি আমিও সেখানেই থাকব। এখনও এ রকমই প্ল্যান।

আসনাম : বাংলাদেশের জন্য কিছু করতে চান?

আতিক : বাংলাদেশের জন্য কিছু করতে পারলে তো খুব ভালো। সে রকম কোন প্রজেক্টে থাকতে পারলে…।

সেরকম হয়তো অনেক সুযোগও আছে। কিন্তু আমি সেভাবে ইনভলভ না। তবে আমার রেগুলার বুয়েটের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। বুয়েট থেকে অনেক ছেলেমেয়ে যায় পিএইচডি করতে। তখন ওদের হেল্প করি। বুয়েটে গেলে সেমিনার দেই। রিক্রুটমেন্ট দেই বুয়েট থেকে। বাংলাদেশ থেকে দুটি কনফারেন্স হয় বড় বড়, একটা আতাউল করিম সাহেব করেন ওঈঈওঞ। ওটাতে আমি কি-স্পিকার থাকি সব সময়, কয়েক বছর ধরে। এ বছরও দিলাম খুলনা ইউনিভার্সিটিতে। কনফারেন্স ক্যানসেল হয়ে গেল হরতালের জন্য। তারপর আরেকটা কনফারেন্স হয় ঊওঈঞ বলে, ওটাও ক্যানসেল হয়ে গেছে।

আসনাম : বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আপনার কী মতামত?

আতিক : আমার মনে হয় বাংলাদেশের যে গ্রোথ তা কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ইজ গ্রোইং ভেরি ফাস্ট। যেমন আমি দেশের বাইরে আছি অলমোস্ট ৩০ বছর থেকে। যদি কম্পেয়ার করি। ব্যাংকিং সেক্টর অনেক ভালো হয়েছে। সার্ভিস ভালো হয়েছে। এডুকেশন সেক্টর ভালো হয়েছে। আগে তো প্রাইভেট ভার্সিটি ছিল না। টেলিকম, আগে তো শুধু ল্যান্ডলাইন ছিল, গভর্মেন্টের। এখন তো কত ক্যারিয়ার। ইন্টারনেটে কত সুবিধা হয়েছে। একমাত্র খারাপ যেটা হয়েছে ট্রাফিক জ্যাম। দেশের যে প্রগ্রেসটা চলছিল গার্মেন্ট সেক্টরে সবই পিছিয়ে যাবে এসব চলতে থাকলে। এটা একটা বড় সমস্যা।

এ সমস্যা না থাকলে বাংলাদেশের খুবই ব্রাইট ফিউচার। ইনফ্যাক্ট অনেক ছেলেমেয়ে আমেরিকায় পড়াশোনা করে দেশে চলে আসছে কারণ দেশের ফিউচার অনেক ভালো। ২৫ বছর আগেও এটাও ছিল না। আমি এদের এনকারেজ করি, তুমি যদি দেশে গিয়ে কমফোরটেবল ফিল কর তোমার অপারচুনিটি অনেক বেশি। বাংলাদেশে যেভাবে গ্রো করছে তাতে ইড হ্যাব নাইস ফিউচার।

আসনাম : আপনার শৈশব সম্পর্কে বলুন।

আতিক : আমি তো পড়াশোনা করেছি সেন্ট যোশেফ হাইস্কুলে মোহাম্মদপুর। আমরা থাকতাম তখন শেরেবালা নগরে। আমার আব্বা জাজ। আমরা যখন ঢাকা ছিলাম আমার আব্বা ন্যাশনাল অ্যাসেম্বিলিতে অ্যাসিটেন্ট সেক্রেটারি ছিলেন। তারপর সেন্ট যোশেফে ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়ার পর ধানমন্ডি গভমেন্ট বয়েজ হাইস্কুলে, ছয় মাস নাইনে, তারপর আব্বা বদলি হয়ে যান ময়মনসিংহ। তারপর মেট্রিক পাস করি ময়মনসিংহ জেলা স্কুল থেকে। তারপর বাবা বদলি হয়ে যান সিলেটে। তারপর আমি ইন্টারমিডিয়েট পাস করি সিলেট গভর্নমেন্ট কলেজ থেকে। সিলেট বোর্ডে চতুর্থ ছিলাম। মেট্রিকেও চতুর্থ ছিলাম, কুমিল্লা বোর্ডে। তারপর আব্বা বরিশালে বদলি হয়ে যান। আমি তখন বুয়েটে ভর্তি হই। বুয়েটে পাস করে বুয়েটে জয়েন করি।

ছেলেবেলায় খুব টেবিল টেনিস খেলতাম। তারপর ক্রিকেট-ফুটবল খেলতাম।

আসনাম : বাংলাদেশের ক্রিকেট ফলো করেন?

আতিক : অবশ্যই, রাতে জেগে খেলা দেখি। ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্টদের নিয়ে সারা রাত জেগে, প্রজেক্টর লাগিয়ে বড় স্ক্রিনে খেলা দেখি আমার বাসায়।

আসনাম : শিক্ষকতার কোনো একটা ইন্টারেস্টিং অভিজ্ঞতা দিয়ে সাক্ষাৎকারটা শেষ করি।

আতিক : টিচিংয়ের ক্ষেত্রে একবার হয়েছে কি এটা অস্ট্রেলিয়াতে থাকতে, ক্লাস নিতে গিয়ে খেয়াল করলাম, এক ছেলে পেপার পড়ছে এর মানে সে বোঝাতে চাইছে যে আমার ক্লাসে সে ইন্টারেস্টেড না, কিন্তু এটা আমি যদি এলাও করি তাহলে পুরো ক্লাস এফেক্টেড হবে। আবার ওকে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যেতেও বলতে পারছি না কারণ সে তো কাউকে ডিস্টার্ব করছে না, ইউনিভার্সিটি রুলসেও পড়ে না। ছেলেটা পেপার পড়ছে আর একা একা হাসছে, তো আমি ওকে বললাম তুমি তো ক্লাসের চেয়েও ইন্টারেস্টিং কিছু পড়ছ বলে মনে হচ্ছে, আমাদেরও শোনাও না কী পড়ছ। আমাদের সঙ্গেও শেয়ার করো, তখন ও সমানে না না করছে, তো আমি আবার ওকে ইনসিস্ট করলাম তো পড়ে শোনালো ও। আমি আবার লেকচার দেয়া শুরু করলাম। তখন ও পেপার পড়া বন্ধ করে দিল। হি গট দি  মেসেজ একচুয়ালি।

সংগ্রহ করাঃ প্রথম-আলো

 সৌজন্যেঃ আমার ছোট্ট ব্লগ Ahsan Cy । ভালো লাগলে ঘুরে আসুন Ahsan Cy.

LEAVE A REPLY

2 + 5 =