যেখানে থমকে আছে বাংলাদেশের ক্রিকেট

0
323

টেস্ট স্ট্যাটাস প্রাপ্তির ১৪ বছর পূর্তি হয়ে গেছে।কিন্ত কোথায় যেন আজও এক অদৃশ্য হাহাকারের আওয়াজ পাওয়া যায় । এ যেন চার কদম এগিয়ে পাঁচ কদম পিছিয়ে যাওয়া। বাংলাদেশের ক্রিকেটের স্বপ্ন যাত্রার শুরু ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জয়ের মধ্য দিয়েই। সে বছরই ওয়ানডে স্ট্যাটাস লাভ।তার পরের বছরেই ভারতের হায়দ্রাবাদে কেনিয়ার বিপক্ষে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ জয়। এরপর ১৯৯৯ সালে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপেই স্কটল্যান্ড এবং পাকিস্তানকে হারিয়ে যেন স্বপ্ন ছোঁয়ার বিশ্বাস পেয়ে যায় টাইগাররা। এবার লক্ষ্য ক্রিকেটের অভিজাত পরিবারে নাম লেখানো। যার ধারাবাহিকতায় ২০০০ সালে মিলে টেস্ট স্ট্যাটাস। আর সেবছরেরই ১০ নভেম্বর খেলা হয়ে যায় অভিষেক টেস্ট। বাংলাদেশ ক্রিকেটের স্বপ্ন যাত্রার প্রথম পর্বটি এরকমই দুরন্ত দূর্বার।

এরপর যখন বাংলাদেশের কেবলই সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কথা কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য কারণে বারবার থমকে দাড়ানো। কিন্তু কেন এই থমকে দাঁড়ানো। সদ্য প্রয়াত আহসান জহির অনেক আক্ষেপ নিয়ে সেদিন বলেছিলেন,‘কিভাবে আমাদের ক্রিকেট এগিয়ে যাবে? টেস্ট স্ট্যাটাসের ১৪ বছর পরও প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেট পাঁচদিনের করতে পারল না বিসিবি। জাতীয় লিগে কেবল ফাইনালটাই হয় পাঁচদিনের। তাহলে কিভাবে আমাদের ক্রিকেটাররা পাচদিন লঢ়াই করারা মানসিকতা শিখবে। আসল লড়াইয়ের আগে্ইতো আমরা ১ দিন পিছিয়ে থাকি।এরপর আমাদের দেশে ক্রিকেটের নেই কোনো বিকেন্দ্রীকরণ। এখানেও আক্ষেপ ছিলো তার কন্ঠে। একদিন তিনি কোনো এক বিসিবি কর্মকর্তাকে ক্রিকেটের বিকেন্দ্রীকরনের কথা বলেছিলেন।

সেই কর্তার ঝটপট জবাব আমরা তো ক্রিকেটের বিকেন্দ্রীকরণ করেছিই! ঢাকার ক্রিকেটকে পাঠিয়ে দিয়েছি ঢাকার বাইরে! রাজশাহী, বগুড়া,ফতুল্লাতে। এর নাম বিকেন্দ্রীকরণ? ঢাকার ক্রিকেটকে ঢাকার বাইরে নয় বরং ক্রিকেটকে পুরো দেশে ছড়িয়ে দিতে হবে। বিভাগীয় এবং জেলার ক্রিকেট কাঠামোকে করতে হবে অনেক শক্তিশালী এবং স্বাধীন। অন্তত জেলা পর্যায়ে তৈরি করতে হবে আন্তর্জাতিক মানের উইকেট। অথচ বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেট মানেই একাদশে তিনজন বিশেষজ্ঞ স্পিনার এবং দুইজন পেসার। সেই দুজন পেসারও আবার নিজেদের বোলিং কোটা পূরন করেন অনেকটা কালেভদ্রেই! আর উইকেটে বাউন্স মানেই ব্যাটসম্যঅনের হাটুর উপর বল উঠা! বড় আক্ষেপের সুরেই সেদিন বলেছিলেনে এমনটা চলতে থাকলে কিভাবে আগাবে বাংলাদেশের ক্রিকেট?

যে জায়গায় আমাদের থাকার কথা ছিলো আদৌ কি আমরা সেখানে আছি? রেকর্ড বা পরিসংখ্যানই কি বলছে। একরাশ আক্ষেপের আর না পাওয়ার গল্পই হয়ত। অনকে সম্ভাবনা জাগিয়েও যে আজ বাংলাদেশের ক্রিকেট থেমে আছে একটা নির্দিষ্ট গন্ত্যব্যে। ভাবছেন আমরাতো থেমে নেই। মাঠের খেলায় এতগুলো জয় পেলাম। তারপর কিভাবে আমরা থেমে আছি। ক্রিকেট ব্যবস্থাপনা এতটাই গুরুত্বপূর্ন বিষয় যে ২০০৩ বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল খেলা কেনিয়া কিন্তু এখন কালের স্রোতে হারিয়ে গেছে। সেই ব্যবস্থাপনার অভাবেই জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটও আজ নিজেদের হাঁরিয়ে খোঁজছে। আমাদের সমস্যটা কোথায়। কেন আমরা থেমে আছি? এর উত্তর খোঁজতে গেলেই বেড়িয়ে আসবে পর্দার আড়ালের অনেক কিছুই। গেল সপ্তাহে লিজেন্ড অব রুপগঞ্জ ক্লাবের চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান বাদল এবং বিসিবির বোর্ড কর্মকর্তাদের মধ্যে যে কথার লড়াই জমে উঠেছিলো সেখান থেকেই অনেক অজানা বিষয় সামনে উঠে এসেছে। বাংলাদেশের ক্রিকেটের সমস্যার কথা নিয়ে দু এক কলম লেখার আগে এ কথা পরিস্কারভাবে বলে দেওয়া যায় সমস্যাটা আমাদের ক্রিকেটারদের নয়। তারা যথেষ্টই মেধাবী। আমাদের পাইপলাইনও এখন যথেষ্ট সমৃদ্ধ।

143838 যেখানে থমকে আছে বাংলাদেশের ক্রিকেট

প্রত্যেকটা পজিশনে আমাদের একাধিক বিশ্বমানের বিকল্প হাতে আছে।টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানদের কথা বললেই একসাথে চলে আসে দশজন নিয়মিত পারফর্মারের নাম। স্পিনারের কথা বললে তো কথাই নেই। সাকলাই, এনমুল জুনিয়র, নাবিল সামাদ, ইলয়াস সানি, মোশররফ রুবেলরা লড়ছেন এ দলে জায়গা পাওয়ার জন্য! শাহরিয়ার নাফিস, জহুরুল হক, জুনায়েদ সিদ্দিকি,লিটন কুমার দাস, মিজানুর রহমান, সাদমানরাও কেবল ইনিংস উদ্বোধনের জায়গাটার বিকল্প হিসেবে নিজেদেরে প্রস্তুত করে যাচ্ছেন। যে কারণে তাদের মতো নিয়মিত পারফর্মাররা এখন এ দলেও জায়গা পেতে লড়ছেন। এরপরও কি বলবেন আমাদের পাইপলাইন সমৃদ্ধ নয়?

তাহলে সমস্যাটা কোথায়। তবে কি সব দায় বিসিবির? মোটেই না। আসলে সমস্যাটা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সিস্টেমের। সেখানে চলমান বোর্ড কর্মকর্তাদের একতরফাভাবে দোষারুপ করাটা অন্যায়। হয়ত বর্তমান সময়ে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভুলগুলো বেশি চোখে পড়ছে। দেশের ক্রিকেটকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হলে বিসিবিকে হতে হবে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বডি। কিন্তু বিসিবি কি তার কুড়ি ভাগ্র পূর্ন করতে পেরেছে। গত এক দশক ধরে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় একাধিকবার খবরের শিরোনাম হয়ে এসেছে ক্লাবের কাছে অসহায় বিসিবি। একটা টেস্ট খেলুড়ে দেশের বোর্ড কিভাবে এতটা দূর্বল হতে পারে এ প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা নেই। কিন্তু একটু গভীরে গিয়ে অনুসন্ধান করলে প্রকৃত কারণটা অনুধাবন করা যায় সহজেই।

একটু খেয়াল করলে দেখবেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের যারা বোর্ড ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তাদের বেশির ভাগই ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের কোনো না কোনো ক্লাবের সভাপতি না হয় সাধারণ সম্পাদক। বাস্তবিক অর্থেই ঐসব প্রভাবশালী কর্তাদের উপেক্ষা করা বিসিবির পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। গত তিন বছরে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের চিত্র লক্ষ্য করলে দেখবেন এখানে বিসিবি এবং সিসিডিএম ক্লাবের কাছে কতটা অসহায়। গত তিন বছর কেন সর্বশেষ কবে কোন মৌসুমে সিসিডিএম সঠিক তারিখে লিগ আয়োজন করতে পেরেছিলো তার কথা কেউই সঠিকভাবে বলতে পারেন না। ২০১১-১২ মৌসুমের কথা মনে আছে। সেবার এক মোহাম্মদ ইউসুফ নাটকেই লিগ থেমে ছিলো প্রায় চল্লিশ দিন! লিগ শুরুর সম্ভাব্য দিন তারিখও পরিবর্তন করা হয়েছিলো ৬ থেকে ৭ বার! কোনো একটা দেশের শীর্ষ লিগ কিনা একজন খেলোয়াড়ের জটিলতায় থেমে ছিলো একমাসেরও বেসি সময়! এমন নজির বিশ্বের আর কোথাও দেখা যায়নি।

শুধু ক্লাবের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে ২০১২-১৩ মৌসুমে ক্রিকেট বিশ্বকে নতুন ও উদ্ভট এক প্লেয়ার বাই চয়েজ এবং রোটেশন পদ্ধতির ‘দলবদল’ উপহার দেয়। যেখানে চূড়ান্তভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলো ক্রিকেটাররাই। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় আন্তর্জাতিক সিরিজ চলাকালে গত ছয়-সাত বছরে কখনোই জাতীয় দলের ক্রিকটোরদের ছাড়া লিগ মাঠে গড়ায়নি। কিন্তু এবার হয়েছে! কিভাবে এই অসাধ্য সাধন করল বিসিবি? প্রশ্নের উত্তরের খানিকটা পাওয়া গেল লিজেন্ড অব রুপগঞ্জের কর্ণধার লুৎফর রহমান বাদলের বিস্ফোরক কথামালার ভেতরেই। কারণ চলতি প্রিমিয়ার লিগে সবচেয়ে ব্যায়বহুল টিম গড়েছিলো লিজেন্ড অব রুপগঞ্জ। যে দলে সাকিব সহ জাতীয় দলের একাধিক তারকা সমৃদ্ধ খেলোয়াড় ছিলেন। তার মানে রুপগঞ্জ বিগ-থ্রির একটি নয় বলেই কি এবার জাতীয় দলের খোলায়াড় ছাড়াই লিগ শুরু হয়েছিলো। সাকিব-তামিমরা যদি আবাহনী, মোহামেডান কিংবা প্রাইম ব্যাংকের হতেন তাহলেও এমন দৃশ্য দেখা যেত? প্রশ্ন এখানেই। কারণ বিসিবির বর্তমান পরিচালকদের অন্তত একজন করে আছেন আবাহনী,মোহামেডান এবং প্রাইম ব্যাংক থেকে। লিগে তাদের অবস্থান দেখলেও অনেকটা বোঝা যায়!images2 যেখানে থমকে আছে বাংলাদেশের ক্রিকেট

বিসিবির সাথে যুক্ত নন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এমন অনেক সাবেক ক্রিকেটারই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘আক্ষেপের কথা কি আর বলব। এটাই ঢাকার ক্রিকেট যেখানে খেলা হয় টেবিলে। সে জন্য কোনোভাবেই একতরফাভাবে বিসিবির বর্তমান কমিটিকে দোষারুপ করা ঠিক নয়। কারণ এমনটা হয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরেই। আমাদের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় সমস্যাটাই বোধহয় এখানে। সাথে লুৎফর রহমান বাদলের কথাও যদি আমলে নেয়া হয় তাহলে একথা নিশ্চিত আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা ব্যাবস্থাপনায়। বিসিবি কেন ক্লাবের আজ্ঞাবহ হতে যাবে?কিন্তু বাস্তবতা বড়ই নিষ্ঠুর। এমনভাবে সবকিছু চলে আসছে যে এখন বিসিবি চাইলেই ক্লাবের এই দাপট কমাতে পারেবে না। সেজন্য প্রয়োজন বিসিবির গঠনতন্ত্রের সংশোধন। সে কাজটি কি আর বললেই হয়? তবে এ সমস্যা সমাধানের উপায়ও জানা আছে আামদের। সেজন্য বিসিবিকে হতে হবে অনেক বেশি আন্তরিক।

ঢাকার ক্লাবগুলোর একচ্ছত্র আধিপাত্য কমাতে হলে প্রথমেই নিয়ম করতে হবে কোনো ক্লাবের কর্মকর্তা বিসিবির বোর্ড ডিরেক্টর হতে পারবে না। বোর্ড ডিরেক্টর হবেন জেলা ক্রীড়া সংস্থা এবং বিভাগীয় ক্রিড়া সংস্থা থেকে গনতান্ত্রিক পন্থায় নির্বাচিত হয়ে আসা প্রতিনিধীরা। তাহলে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের কর্তৃত্ব একেবারেই কমে যাবে। বিসিবিও পারবে স্বাধীনভাবে কাজ করতে। সিসিডিমকেও আর ছয়-সাতবার তারিখ পরিবর্তন করে লিগ আয়োজনের দু:স্বপ্ন তাড়িয়ে বেড়াতে হবে না। একবার ভেবে দেখুন একজন বোর্ড ডিরেক্টর একই সাথে কিভাবে গেম ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান, এক দলের কোচ সাথে অন্য আরেকটি দলের ম্যানজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন?

এটাই বা কোন ধরনের ব্যবস্থপনা? নাকি বিসিবিতে লোকবলের অভাব? সম্প্রতি লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা এমন সব বিষয় নিয়ে ক্ষোভের বহি:প্রকাশ করেছেন লিজেন্ডস অব রুপগঞ্জের চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান বাদল। তিনি অভিযোগ করেছেন আম্পায়রদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ করেছেন বোর্ড প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধেও। কিন্তু আবেগের বহি:প্রকাশ হিসেবে যে ভাষা তিনি প্রয়োগ করেছেন সেটি অবশ্য মোটেও কাম্য নয়। দেশের ক্রিকেটকে যারা ভালোবাসেন তাদের প্রতিনিধী হয়ে এই কামনটাই শুধু করব যেন সব সমস্যা দূর হয়ে দেশের ক্রিকেট এগিয়ে যায় বহুদূর। বিসিবি বাংলাদেশের ক্রিকেটকে অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে এমন প্রত্যাশাই আমাদের। ক্লাবের আধিপাত্য নিপাত যাক। বেঁচে থাকুক বাংলাদেশের ক্রিকেট। ভালো থাকুক টাইগারদের ক্রিকেট।

লেখাটা ভালো লাগলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় স্পোর্ট নিউজ পোর্টাল থেকে ঘুড়ে আসতে পারেন: <a href=”http://www.bspn24.com”>Bangladesh Sports</a>

লেখক: মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম, সম্পাদক,বিএসপিএন২৪.কম

একটি উত্তর ত্যাগ