মস্তিষ্কের সুস্থতার জন্য ঠিক কতটা ঘুম প্রয়োজন?

0
378

মস্তিষ্ক,ঘুম,পড়াশোনা এই শব্দগুলো নিয়ে নিয়ত লড়াই করি আমরা। কেউ ঘুমকে ছুটি দিয়ে মস্তিষ্ককে বোঝাই করি পড়াশোনা দিয়ে আর কেউবা পড়াশোনাকেই ছুটি দিই ঘুমের খাতিরে। কিন্তু মস্তিষ্কের সুস্থতার জন্য ঠিক কতটা ঘুম প্রয়োজন, কেন প্রয়োজন কিংবা আদৌ প্রয়োজনীয়তা আছে কি না এ নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। তবে বেশিরভাগ বিজ্ঞানীর পরীক্ষালব্ধ ও সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান ঘুমের অপরিহার্যতাকে স্বীকার করে নিয়েছে।

এই ২০১৩ সালেরই ৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি মেডিকেল জার্নাল আবার নতুন করে, নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের শোনাল সে কথা। প্রকাশিত গবেষণাপত্রে দেখান হয় যে, ঘুম মানুষের মস্তিষ্কের ক্ষয় পূরণে সহায়তা করে। প্রশ্ন আসতে পারে যে, পাঁচ থেকে সাত বছর বয়সের পরে তো নতুন কোন স্নায়ু কোষ তৈরি হয়না, তাহলে মস্তিষ্কের ক্ষয়পূরণ হওয়া কিভাবে সম্ভব? বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন নতুন স্নায়ু কোষ তৈরি না হলেও পূর্ববর্তী স্নায়ুকোষগুলোই দৈর্ঘ্যে বৃদ্ধি পায় এবং দেহের বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট ফাঁকা জায়গা পূর্ণ হয় বিভিন্ন সাহায্যকারী কোষ দ্বারা। এই সাহায্যকারী কোষগুলোর কাজ অনুযায়ী বিভিন্ন নাম রয়েছে। এরা হলঃ অলিগোডেনড্রোসাইট, মাইক্রোগ্লিয়া, এস্ট্রোসাইট ইত্যাদি। এর মাঝে অলিগোডেনড্রোসাইটই মূলত মস্তিষ্কের ক্ষয়পূরণে সাহায্য করে। এরা মস্তিষ্ক, সুষুম্না কান্ড (স্পাইনাল কর্ড) ও বিভিন্ন স্নায়ুর চারদিকে এক রক্ষাকারী আবরণ তৈরি করে। এই আবরণের নাম মায়োলিন শিথ। এই মায়োলিন শিথ স্নায়বিক অনুভূতি পরিবহনেও বিশেষ ভূমিকা রাখে।

ইংল্যান্ডের উইকনসিন ইউনিভার্সিটি, ম্যাডিসন এর বিজ্ঞানীরা ইঁদুরের উপর করা এক গবেষণায় মস্তিষ্কের ক্ষয়পূরণে ঘুমের ভূমিকার ব্যাপারটি প্রমান করেন। তাঁরা দেখান যে, ঘুমের সময় ইঁদুরের মায়োলিন শিথ তৈরিকারী জিন সক্রিয় হয় এবং এই সক্রিয়তার হার সাধারণ সময়ের প্রায় দ্বিগুণ। আর বিপরীতদিকে যেসব
ইঁদুরকে জোর করে বা ঔষধ দিয়ে জাগিয়ে রাখা হয়েছে তাদের মায়োলিন শিথ বা অলিগোডেনড্রোসাইটে সেই সময়ে কোষ ধ্বংসকারী জিনগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয় হয়। ফলে ক্ষয়পূরণ তো দূরের ব্যাপার, মস্তিষ্কের সাহায্যকারী কোষগুলো ধ্বংস হয়ে যায় বরং।

সুইজারল্যান্ডের লাউস্যান ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা এই গবেষণার সাথে সহমত প্রকাশ করে বলেন, ” এই গবেষণা আমাদেরকে ধারণা দেয় যে, ঘুম কিংবা ঘুমের অভাব কীভাবে মস্তিষ্কের ক্ষয়পূরণ বা মস্তিষ্কের ক্ষতি করতে পারে।”

এই প্রকাশনা মস্তিষ্ক ও ঘুমের সম্পর্ক নিয়ে সত্যিকার অর্থেই একটি নতুন দিগন্তের উন্মোচন ঘটিয়েছে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, যদিও ইঁদুরের সাথে মানুষের বৈশিষ্ট্যের অনেক বৈসাদৃশ রয়েছে, তবুও বিভিন্ন মানসিক রোগ ও মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস (এ রোগে মায়োলিন শিথ ক্ষতিগ্রস্থ হয়) এর মত রোগে ঘুমের খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিষয়ক গবেষণার পথ এই গবেষণার হাত ধরেই সৃষ্টি হবে। সব প্রানীর জন্য ঘুম সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ – কিন্তু কেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ আর সেই ঘুম কোথায়- কীভাবে কাজ করে সেই রহস্যের পর্দা সরতে শুরু করেছে মাত্র। এই গবেষণা সে যাত্রারই একটি ছোট্ট ধাপ এমনটাই মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

LEAVE A REPLY

15 + 11 =