মহাকাশজয়ী প্রথম নারী

0
369

১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল। এদিন এমন এক ঘটনা ঘটল যে সারা পৃথিবীতে ব্যাপক হৈ চৈ পড়ে গেলো। পেপার-পত্রিকা, হাট-বাজার থেকে শুরু করে বাড়ির রান্নাঘর– সব জায়গায় সেই একই আলোচনা। ইউরি গ্যাগারিন নামের ২৭ বছরের এক রাশান তরুণ মহাকাশ জয় করেছে! রকেটে করে এক ঘণ্টা ৪৮ মিনিট পৃথিবীর চারপাশে চক্কর দিয়ে আবার সহিসালামতে পৃথিবীতে ফিরে এসেছে! ভাবা যায়!

রাশিয়ার মাসলেননিকোভা গ্রামের এক মহিলা ঘটনা শুনে বললেন, ‘ছেলেরা তো মহাকাশের অভিজ্ঞতা নিয়ে এলো, এবার নিশ্চয়ই মেয়েরা যাবে।’ পাশের ঘর থেকে তার ২৪ বছর বয়সী মেয়ে কথাটি শুনলো। মায়ের কথাটি শুনে তরুণীটির মনে প্রবল আলোড়ন তৈরি হলো। তরুণীটি মনে মনে সংকল্প করলো- যে করেই হোক তাকে মহাশূণ্য জয় করতেই হবে। একজন মেয়েও যদি কোনদিন মহাশূণ্যে যায় তাহলে তাকেই হতে হবে সেই মেয়েটি।

এই স্বপ্নচারী দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মেয়েটির নাম ভ্যালেন্তিনা তেরেস্কোভা। পুরো নাম ভ্যালেন্তিনা ভ্লাদিনিরোভনা তেরেস্কোভা(Valentina Vladimirovna Tereshkova)। জন্ম ৬ মার্চ, ১৯৩৭ সালে। মধ্য রাশিয়ার ইয়ারোস্লাভ ওব্লাস্টের অধীনস্থ টুটায়েভস্কি জেলার মাসলেনিকোভো গ্রামে। তেরেস্কোভার বাবা ছিলেন ট্রাক্টর চালক আর মা কাপড় কারখানার শ্রমিক। এমনিতেই গরীব পরিবার, তার উপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বাবা মারা গেলে তাদের সংসারে কঠিন বিপর্যয় নেমে আসে।

মহাকাশজয়ী প্রথম নারী মহাকাশজয়ী প্রথম নারী

তবু, ১৯৪৫ সালে তেরেস্কোভার যখন আট বছর বয়স তখন তাকে তার মা স্কুলে ভর্তি করে দেন। কিন্তু পারিবারিক অবস্থা এক সময় এত খারাপ হলো যে তেরেস্কোভার যখন ১৬ বছর বয়স তখন তাকে বাধ্য হয়ে স্কুলে যাওয়া বাদ দিয়ে টায়ার কারখানায় কাজ নিতে হলো। কিন্তু তেরেস্কোভা হাল ছাড়লেন না। তিনি করেসপন্ডেস কোর্স (দূরশীক্ষণ কোর্স)-এর মাধ্যমে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে লাগলেন।

ছোটবেলা থেকেই প্যারাসুট নিয়ে ছিলো তেরেস্কোভার প্রবল কৌতুহল। তিনি বিমান থেকে প্যারাসুট নিয়ে লাফিয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখতেন। এই স্বপ্ন পূরণের জন্য তিনি স্থানীয় অ্যারোক্লাব স্কাই-ড্রাইভিংয়ে প্রশিক্ষণ নেন। তেরেস্কোভার যখন ২২ বছর বয়স তখন তিনি প্রথম প্যারাস্যুট নিয়ে ড্রাইভ দেন। অল্প কিছু দিনের মধ্যেই তিনি একজন দক্ষ প্যারাসুট জাম্পার হয়ে ওঠেন। তার এই দক্ষতাই তাকে মহাশূণ্য জয়ের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার সুযোগ করে দেয়।

ইউরি গ্যাগারিনের মহাকাশ জয়ের মাস কয়েক পরেই রাশিয়ার মহাকাশ সংস্থা ঘোষণা দেয়, এবার বিশ্বের প্রথম নারী হিসেবে একজনকে মহাকাশে পাঠানো হবে। আগ্রহীদের কাছ থেকে আবেদনপত্র আহবান করা হলো। চারশ’-এর চেয়েও বেশী আবেদনকারীর মধ্য থেকে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পাঁচ জনকে নির্বাচন করা হয়। এদের একজন তেরেস্কোভা।

মহাকাশ অভিযানের আগে এই পাঁচজনকে নিয়ে শুরু হয় ক্যাম্পিং। তাদেরকে ভরশূন্য পরিবেশে থাকার কৌশল, রকেট এবং নভোযানের খুঁটিনাটি, MIG-15UTI বিমান চালনাসহ নানা রকম বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ক্যাম্পিং এর অংশ হিসেবে তেরেস্কোভা প্যারাসুট নিয়ে লাফ দেন ১২০ বার! প্রশিক্ষণ শেষে এই পাঁচ জনের পরীক্ষা নেয়া হয় এবং পাঁচ জনকেই সোভিয়েত বিমান বাহিনীতে জুনিয়র লেফট্যান্ট পদ দেয়া হয়। সর্বোচ্চ নম্বরের ভিত্তিতে এই পাঁচজন থেকে দুজনকে নির্বাচন করা হল। তেরেস্কোভা ছাড়া অপরজন ছিলেন ভ্যালেন্তিনা পোনোমারিয়োভা। পরবর্তীতে মহাকাশ অভিযানে তেরেস্কোভাকেই চূরান্তভাবে বেছে নেয়া হয়।

১৯৬৩ সালের ১৬ জুন। পৃথিবীর ইতিহাসে আরেকটি স্মরণীয় দিন। পৃথিবীর মানুষ অবাক হয়ে জানতে পারলো এবার ছেলে নয়, মহাকাশ জয় করল একজন মেয়ে। রাশিয়ার মহাকাশযান ভোস্তক ৬- এ চড়ে পৃথিবীর প্রথম নারী হিসেবে মহাকাশজয় করেন ভ্যালেন্তিনা তেরেস্কোভা। তেরেস্কোভা মোট ৪৮ বার পৃথিবী প্রদক্ষিন করেন। এসময় তিনি মহাকাশের প্রচুর ছবি তোলেন এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য নানা রকম তথ্য সংগ্রহ করেন। মোট ৭০ ঘণ্টা ৫০ মিনিট অর্থাৎ দুই দিন ২২ ঘণ্টা ৫০ মিনিট মহাশূন্যে অবস্থান করে ১৯৬৩ সালের ১৯ জুন তেরেস্কোভা পৃথিবীতে ফিরে আসেন। তেরেস্কোভা শুধু প্রথম নারীই নন, তিনি প্রথম বেসামরিক ব্যক্তি হিসেবেও মহাকাশ জয় করেন!

মহাকাশজয়ী প্রথম নারী2 মহাকাশজয়ী প্রথম নারী

তেরেস্কোভার এই মহাকাশ জয় পৃথিবীর মানুষের বুকে এক বিরাট স্পন্দন ঘটায়। তেরেস্কোভা প্রমাণ করে দেন সাহস, মেধা আর জ্ঞানের রাজ্যে ছেলেরা রাজা আর মেয়েরা প্রজা এই ধারণা ঠিক নয়।

তেরেস্কোভা পরবর্তীতে ‘ঝুকোভ্‌স্কি এয়ার ফোর্স একাডেমি’ থেকে মহাকাশ প্রকৌশল বিদ্যায় গ্রাজুয়েশন শেষ করেন। একই সাথে তিনি সোভিয়েত রাশিয়ার রাজনীতিতেও প্রবেশ করেন এবং রাজনীতিতেও তিনি সফল হন। ১৯৬৬ সালে তেরেস্কোভা সোভিয়েত ইউনিয়নের সুপ্রিম সোভিয়েতের সদস্য নির্বাচিত হন। তেরেস্কোভা সারা জীবন এত পদক আর এত সন্মাননা পেয়েছেন যে, সবগুলো একের পর এক সাজিয়ে লিখতে গেলে এই লেখাটির সমান আরেকটি লেখা লিখতে হবে।

রহস্যময় মঙ্গল গ্রহ তেরেস্কোভার সবচেয়ে প্রিয় গ্রহ। মঙ্গল গ্রহে মানুষের যাবার সম্ভাবনা নিয়েও তিনি কাজ করেছেন। তার দৃঢ় বিশ্বাস মানুষ একদিন অবশ্যই মঙ্গল গ্রহ জয় করবে। মঙ্গলগ্রহের প্রতি তার কৌতুহল এতই তীব্র যে, ‘পৃথিবীতে ফিরে আসার কোন সুযোগ না থাকলেও তিনি মঙ্গল গ্রহে যেতে আগ্রহী’ – ২০১৩ সালের শুরুতে এরকম একটি ঘোষণা দিয়ে পৃথিবীর মানুষকে তিনি দ্বিতীয় বারের মত চমকে দেন! এ ঘোষণার সময় তার বয়স ছিলো মাত্র ৭৬ বছর!

একটি উত্তর ত্যাগ