পৃথিবীর ৫০ ভাগ পর্যন্ত জল সূর্যের চেয়েও প্রাচীণ

0
416

একদল বিজ্ঞানীর দাবি, পৃথিবীর ৫০ ভাগ পর্যন্ত জল সূর্যের চেয়েও প্রাচীণ। ২৫ সেপ্টেম্বর সায়েন্স জার্নালে তাদের গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হলে বিশ্ব গণমাধ্যমে, বিশেষত বিজ্ঞান বিষয়ক অনলাইন পোর্টালগুলোয় ফলাও করে ছাপা হয় খবরটি।

প্রজাতির উৎপত্তি নিয়ে ভাবতে গিয়ে চার্লস ডারউইন মুখোমুখি হয়েছিলেন একটা কঠিন সত্যের। তার মতবাদ এক ঝাটকায় মানুষকে ছুড়ে ফেলেছিল প্রভুত্বের মহাসন থেকে।

তেমনি জলের উৎপত্তি নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সাত বিজ্ঞানী মুখোমুখি হলেন আরেকটি কঠিন সত্যের। মহাজিজ্ঞাসার মুখোমুখি করলেন আমাকে-আপনাকে, পুরো পৃথিবীবাসীকে।

যে জলে গড়া মানবশরীর, মোড়া এই পৃথিবী— সেই জলের জন্ম এই সৌরজগতে নয়। আন্তঃনাক্ষত্রিক মেঘমালা থেকে নাকি জল এসেছে এই ধরায়।

এখানে উল্লেখ করা বাহুল্য হবে না যে, পৃথিবীর ৭১ ভাগ জলে মোড়া। মানবশরীরের ৬০ শতাংশই জল। আমাদের মস্তিষ্কের ৭০ ভাগ জলীয়। আর ফুসফুসের ৯০ ভাগই জল।

যখন সূর্য জ্বলেছিল

আন্তঃনাক্ষত্রিক মেঘমালা হলো গ্যাস ও ধূলিকণার বিশাল ঘন এক বস্তু। এই মেঘমালায় থাকে জলের প্রাচুর্য। যখন নক্ষত্রের জন্ম হয়, তখন নক্ষত্রের আলোয় মুশকিলে পড়ে এই মেঘ। তারার রশ্মিবন্যায় খুলে যায় মেঘের কঠিন বন্ধনগুলো। নক্ষত্রের আগুনে বাষ্পীভূত হয় সেই মেঘ। জল থেকে পৃথক হয়ে যায় এর ভেতরের হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন কণারা।

সূর্যেরও আগে জন্ম জলের2 পৃথিবীর ৫০ ভাগ পর্যন্ত জল সূর্যের চেয়েও প্রাচীণ

আমাদের সূর্যের জন্ম হয়েছিল যখন তখন কী ঘটেছিল? সূর্যের জন্মলিপি পড়তে গবেষণায় নামেন ইজাডোর ক্লিভেজ। ডাকনাম ইজা। যুক্তরাষ্ট্রের এই নারী বিজ্ঞানী রাইস ইউনিভার্সিটি থেকে জ্যোতিঃপদার্থবিদ্যায় স্নাতক। বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের পিএইচডি শিক্ষার্থী।

সূর্যের সৃষ্টিলগ্ন সম্পর্কে জানতে যে জিনিসটার ওপর ইজা তার মূল মনোযোগ নিবিষ্ট করেন তা হলো ডিউটেরিয়াম। হাইড্রোজেনের তিন রকম রূপভেদ (আইসোটোপ) আছে। এরা হলো- হাইড্রোজেন, ডিউটেরিয়াম ও ট্রিটিয়াম। তিনটির মধ্যে ব্যবধান গড়ে দিয়েছে এদের কেন্দ্র, বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় নিউক্লিয়াস।

প্রতিটি পরমাণুর কেন্দ্র বা নিউক্লিয়াসের চারপাশে মৌলিক কণিকা ইলেকট্রন চক্কর খায়। আর কেন্দ্রে থাকে দুটি স্থায়ী মৌলিক কণিকা প্রোটন ও নিউট্রন।

একটি সাধারণ পরমাণুতে যতটি ইলেকট্রন থাকে, ততটিই প্রোটন থাকে।

হাইড্রোজেন পরমাণুর ইলেকট্রন সংখ্যা একটি। ফলে এর কেন্দ্রে একটি প্রোটন থাকে। থাকার কথা কমপক্ষে একটি নিউট্রন কণিকাও। না, হাইড্রোজেন বলতে সাধারণত আমরা যে পরমাণুটিকে বুঝি, তার কেন্দ্রে কোনো নিউট্রন থাকে না। এটাই হলো হাইড্রোজেনের তিন রূপের প্রথমটি, যাকে হাইড্রোজেনই বলা হয়। আগে এর নাম ছিল প্রোটিয়াম, যেহেতু কেন্দ্রে শুধু প্রোটন থাকে।

ডিউটেরিয়ামের কেন্দ্রে একটি প্রোটনের সঙ্গে থাকে একটি নিউট্রন। নিশ্চয়ই পরের বাক্যটি কী লিখব, ইতোমধ্যে আপানার মুখে তা চলে এসেছে- ট্রিঢিয়ামের কেন্দ্রে প্রোটনের সঙ্গে থাকে দুটি নিউট্রন।

হাইড্রোজেনের এই তিনটি রূপের মধ্যে সবচেয়ে ভারী রূপটির নাম ডিউটেরিয়াম। এ জন্য একে ‘ভারী হাইড্রোজেন’ বলেও ডাকা হয়।

মার্কিন রসায়নবিদ হ্যারল্ড ক্লেটন আরে প্রথম ভারী হাইড্রোজেন আবিষ্কার করেন। তিনিই এর নাম করেন ডিউটেরিয়াম। গ্রিক ডিউটেরোস অর্থ দ্বিতীয়। হাইড্রোজেনের এই দ্বিতীয় আইসোটোপের কেন্দ্রে তো মোট দুটি কণিকাই আছে। কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৩৪ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন হ্যারল্ড ক্লেটন আরে।

ডিউটেরিয়াম নিয়ে গবেষণায় কী পেলেন ইজা? প্রশ্নটির উত্তর পাওয়ার আগে আরেকটি তথ্য সামনে আনতে হচ্ছে। হাইড্রোজেনের তিন আইসোটোপের মধ্যে প্রথমটি, মানে প্রোটিয়াম বা আমরা সাধারণ অর্থে বলি হাইড্রোজেন, শতকরা ৯৯ দশমিক ৯৮ ভাগ। ফলে বাকি দুটি আইসোটোপের উপস্থিতি যে কত নগণ্য, তা বলাই বাহুল্য।

এই নগণ্য হিসাবটাকে বোঝার জন্য বলছি, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে মোট ১০ লাখ হাইড্রোজেনের মধ্যে ডিউটেরিয়াম মিলবে মাত্র ২৬টি। কিন্তু পৃথিবীর জলে ডিউটেরিয়ামের শতকরা উপস্থিতি ‘সন্দেহজনক’। সাগরের জলে প্রতি ৬৪২০টি হাইড্রোজেনের বিপরীতে মেলে একটি করে ভারী হাইড্রোজেন। সাধারণ হিসেবের চেয়ে যা প্রায় ছয়গুণ।

কেন? এই প্রশ্নেরই পেছনে ছুটেছিলেন ইজা। না ইজা একা নন, সঙ্গে আরও ছয় বিজ্ঞানী। এদের দুজন ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের, একজন ওয়াশিংটনের কার্নিজ ইনস্টিটিউটের ও দুজন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের। দলের একমাত্র ব্রিটিশ গবেষকটি ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটারের জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী।

সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত প্রবন্ধে তাদের দাবি, পৃথিবীর জলে ডিউটেরিয়ামের আধিক্যের রহস্যটি তারা জানতে পেরেছেন। তারা বলছেন, এই জল তো এসেছে আন্তঃনাক্ষত্রিক মেঘমালা থেকে। এমন দাবির পেছনে সবচেয়ে শক্ত খুঁটি হলো, সেখানকার জলে তারা ডিউটেরিয়াম দেখেছেন সাধারণ হিসাবের চেয়ে অধিক সংখ্যায়।

তাই এই সাত বিজ্ঞানীর দাবি, সূর্যের জন্মের সময় তার প্রখর আলোর ধাক্কায় ও প্রতাপে আন্তঃনাক্ষত্রিক মেঘমালার বরফ টুকরো টুকরো হয়েছিল ও গলে গিয়েছিল। আর সেই গলে যাওয়া জলই আশ্রয় নিয়েছে পৃথিবীর বুকে এবং সৌরজগতের অন্যান্য অঙ্গেও, মানে অন্য গ্রহ, উপগ্রহ কিংবা ধূমকেতু বা গ্রহাণুর গায়ে।

সৌরজগতে পৃথিবীর বাইরে অন্যান্য গ্রহ-উপগ্রহেও জলের সাক্ষর পাওয়া গেছে। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, একদা চাঁদে জল ছিল। একদা জলের ধারা ছিল লালগ্রহ মঙ্গলেও। বলয়গ্রহ শনির সবচেয়ে বড় চাঁদ টাইটান তো এখন জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের অন্যতম আগ্রহের উপগ্রহ। সৌরজগতের ধূমকেতু ও অনেক গ্রহাণুর গায়েও জলের দেখা মিলেছে। এ সবের জলেও ডিউটেরিয়ামের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি।
সূর্যেরও আগে জন্ম জলের পৃথিবীর ৫০ ভাগ পর্যন্ত জল সূর্যের চেয়েও প্রাচীণ
আশাজাগানিয়া

জল যদি ভিননক্ষত্র থেকে উড়েই এসে থাকে এই পৃথিবীতে, তাহলে এটা অনেক বড় আশার কথা। অন্তত যারা বিশ্বাস করেন এবং খুঁজে মরছেন ভিনগ্রহে বুদ্ধিমান প্রাণীদের অস্তিত্ব।

আন্তঃনাক্ষত্রিক মেঘমালার জল যেমন এই পৃথিবীতে এসেছে, হতেও পারে অন্য কোনো গ্রহেও সেই জলের ছিটেফোঁটা গিয়ে পড়েছে। আর জল থাকা মানেই জীবন থাকবে সেখানে।

ইজা ক্লিভেজ যেমনটা মন্তব্য করেছেন, ‘সূর্যের বেলায় যদি এ কথা খাটে যে, তার সৃষ্টিলগ্নেই আন্তঃনাক্ষত্রিক মাধ্যম থেকে জল এসে ঠাঁই পেয়েছে সৌরজগতে; তাহলে বহির্জগতেও এমন এরকম সৌরব্যবস্থা থাকা অস্বাভাবিক নয়, যেখানে জলের উপস্থিতি আছে।’

বহির্জগতে বুদ্ধিমান প্রাণীর সন্ধানে বিজ্ঞানীদের এবং তাদের টেলিস্কোপের প্রথম লক্ষ্য থাকে জলের খোঁজ করা। বিগত ১৯ বছরে প্রায় ১৯০০ বহির্জাগতিক গ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে। এদের মধ্যে বেশ কিছু ভিনগ্রহে ‘জলের সাক্ষর’ দেখা গেছে।

অতি সম্প্রতি ১২০ আলোকবর্ষ দূরের একটি গ্রহে জলীয়বাষ্পের উপস্থিতি ধরা পড়েছে নাসার টেলিস্কোপে। সিগনাস নক্ষত্রপুঞ্জের ওই গ্রহটির আপাত নাম এইচএটি পি-১১বি।

একবার কিছুদিনের জন্য ইংরেজি সাহিত্যের অ-আ-ক-খ শ্রেণীর ছাত্র হিসেবে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করতাম। তখন পরিচয় হয়েছিল ব্রিটিশ কবি স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজের সঙ্গে। না, তার সঙ্গে আমার প্রজন্মান্তরের দূরত্ব। কিন্তু তিনি তার পঙক্তিতে আমার মতো অনেকেরই খুব কাছের মানুষ।

কোলরিজের ‘দ্য রাইম অব দ্য অ্যানসিয়েন্ট মেরিনার’ কবিতাটি পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে। কবিতাটিতে এক নাবিক তার দুর্ভাগ্যের গল্প বর্ণনা করেছেন। অ্যান্টার্কটিকার বিপদসংকুল পরিস্থিতি থেকে যে আলবাট্রস পাখি তার জাহাজকে ও সহ-নাবিকদের রক্ষা করেছে, নাবিকটি সেই পাখিকেই গুলি করে মারে।

এই পাপ নাবিককে মহাশাস্তির মুখোমুখি করে। পুরো সমুদ্রে উথাল-পাথাল ঢেউ, জল আর জল। কিন্তু পানযোগ্য কোনো জল নেই! কী ভয়ঙ্কর! নাবিক তখন বলছেন, ‘ওয়াটার, ওয়াটার, এভরিহোয়্যার, নর অ্যানি ড্রপ টু ড্রিংক।’

ইজা এবং তার সহকর্মীদের নতুন সন্ধান আমাদের মনে আশা জাগায়। আমাদের বলতে ইচ্ছে হয়, ‘ওয়াটার, ওয়াটার এভরিহোয়্যার, এভরি প্ল্যানেট ক্যান হ্যাভ এ ড্রিংক।’

LEAVE A REPLY

twenty + nineteen =