বিজ্ঞানের সাথে আল্লাহর পথে (মেগা টিউন)

0
493

যুক্তি ও প্রজ্ঞাতে আল্লাহঃ বিশ্বস্রষ্টা আল্লাহ পাকের সর্বব্যাপী অস্তিত্বের প্রমাণ রয়েছে তার প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যে। বিজ্ঞান যখন আকাশ ভেদ করেনি, শিল্প যখন ছিল সীমিত, বিশ্ব ছিল মূলত কৃষি নির্ভর সেই সময়ও মানুষের অসুবিধা হয়নি আল্লাহ পাকের অস্তিত্বকে অনুভব করতে। বিজ্ঞানের বিশাল উপস্থিতি ছাড়াও মানুষ কিভাবে আল্লাহকে আবিষ্কার করে তাঁর ঘনিষ্ঠ হতে পারে তার অন্যতম সেরা উদাহরণ হিসেবে পবিত্র কোরআনে অতীব গুরুত্বের সাথে উপস্থাপন করা হয়েছে হযরত ইব্রাহীম আ:-এর অকাট্য সব যুক্তি, প্রজ্ঞা ও জ্ঞানকে।

তৎকালীন লোকাচারের ভিত্তিতে ইব্রাহীম আ: চিন্তা করেছেন চন্দ্র, সূর্য, আকাশের নক্ষত্ররাজির এবং অন্যান্য বড় বড় জাগতিক ও মহাজাগতিক বস্তু সমূহের উপাস্য হওয়া বিষয়ে। কিন্তু সেগুলোর প্রতিটার মধ্যেই তিনি লক্ষ্য করেছেন অসীম সীমাবদ্ধতা। চাঁদ-সূর্য-নক্ষত্ররাজিকে দেখেছেন দিন আর রাতের মধ্যে হারিয়ে যেতে। পাহাড়-পর্বতকে দেখেছেন সীমাহীন অক্ষমতার সাথে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে। সাগর-মহাসাগরকে পেয়েছেন নির্ধারিত সীমার মাঝে আবদ্ধ জলরাশি হিসেবে। তাই তাৎক্ষণিক ভাবে সেগুলোকে বাদ দিয়েছেন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার তালিকা থেকে। আর জনগণের উপাস্য মূর্তিগুলোকেও বাদ দিয়েছেন কারণ সেসব তাদের নিজেদেরকেই রক্ষা করতে অক্ষম হয়েছিল ইব্রাহীম আ-এর কুড়ালের কোপ থেকে। মূর্তিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে যেটা ছিল বড় সেটা অক্ষম ছিল তার ছোট সঙ্গীদেরকে রক্ষা করতে এবং ভাংচুরকারীকে ধরিয়ে দিতে। এতে ইব্রাহীম আ: স্থির এই সিদ্ধান্তে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন যে এসবের কোনটাই সর্বময় ক্ষমতার অধিপতি স্রষ্টা হতে পারে না।

ইব্রাহীম আ:-এর এইসব প্রজ্ঞাময় ঘটনাবলী বিষয়ে আল্লাহ পাক বলেন, ‘আমি এভাবেই ইব্রাহীমকে নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের অত্যাশ্চর্য বস্তুগুলো দেখাতে লাগলাম যাতে সে দৃঢ় বিশ্বাসী হয়ে যায়’। তিনি আরও বলেন তিনি আরও বলেনতিনি আরও বলেন, ‘এসব ছিল আমার যুক্তি যা আমি ইব্রাহীমকে তার সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে প্রদান করেছিলাম। আমি যাকে ইচ্ছা মর্যাদা সমুন্নত করি। আপনার পালনকর্তা প্রজ্ঞাবান ও মহাজ্ঞানী’। (৬:৭৪~৭৯; ২১:৫৭~৬৭; ৩৭:৮৯~৯৬ দ্রষ্টব্য)।

একই কারণে ইব্রাহীম আ:-এর পক্ষে সম্ভব হয়েছিল নিজেকে সর্বশক্তিমান হিসেবে দাবীদার বাদশাহ নমরুদকে যথার্থ ভাবে চ্যালেঞ্জ করা। ইব্রাহীম আ:-এর চ্যালেঞ্জের মুখে নমরুদ ঠিকই বুঝেছিল যে সূর্যকে সে পশ্চিম দিকে থেকে উদিত করতে সক্ষম নয় তাই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে তার দাবী নিতান্তই অসার। তবে নমরুদের বদ্ধ ধারণা ছিল যে সে আল্লাহর মতই জীবন দান ও হরণ করতে সক্ষম। সেটা প্রমাণ করতে সে একজন ফাঁসির আসামিকে ছেড়ে দিয়েছিল আর তার জায়গায় ফাঁসি দিয়েছিল অন্য এক নিরপরাধ ব্যক্তিকে। কিন্তু সত্যিকারের সর্বস্রষ্টা মহান আল্লাহ পাক নমরুদের সেই উদ্ভট অহংকারকে বাতাসে মিলিয়ে দিয়েছিলেন নমরুদেরই বানানো অগ্নিকুণ্ডে ইব্রাহীম আ:-কে অক্ষত রেখে (২:২৫৮;৩৭:৯৭~৯৮ দ্রষ্টব্য)।

এতকিছুর পরও নমরুদের প্রজন্ম একেবারে মিলিয়ে যায়নি দুনিয়া থেকে। এখনও তারা আল্লাহর কালামকে অপদস্থ করে। ছিঁড়ে ফেলে। ঘটা করে পুড়িয়েও ফেলে। তাদের দাবী আল্লাহ যদি সত্যিই থেকে থাকে তাহলে বাঁচাক দেখি তাঁর কোরআনকে আগুনের হাত থেকে। নমরুদের মতই মোটা মাথার এই মূর্খরা দেখেও দেখে না যে যুগের পর যুগ ধরে কোরআন ছিঁড়ে ফেলা, পুড়িয়ে ফেলার পরও আল-কোরআন এখনও বিশ্ব জুড়ে টিকে আছে সগৌরবে, স্ব-মহিমায়। আল-কোরআন টিকে আছে কোটি-কোটি মানুষের অন্তরে ও কণ্ঠে। প্রতি মূহুর্ত এই গ্রন্থের প্রতিটি অক্ষর কোন না কোন ভাবে পঠিত হচ্ছে দুনিয়ার কোন না কোন জনপদে।

কোরআন রক্ষায় আল্লাহ পাককে আরশ ছেড়ে নেমে আসতে হয় না দুনিয়ায়। সূর্য যেমন কোটি কোটি মাইল দূরে থেকেও আলোকিত করতে পারে পৃথিবীর প্রতিটি গৃহ কোণকে ঠিক একই ভাবে দুনিয়ার বুকে না নেমেও আল্লাহ পাক বিরাজ করতে পারেন মানুষের অতি নিকটে, তাদের কণ্ঠনালীর চেয়েও কাছে (২:১৮৬; ৫০:১৬ দ্রষ্টব্য)। যেই মানুষের এতটা ঘনিষ্ঠ হয়ে সর্বদা বিরাজ করেন মহান আল্লাহ পাক সেই মানুষকে দিয়েই তিনি রক্ষা করে থাকেন, হেফাজত করেন তাঁর কালামকে, তাঁর দ্বীনকে। ইবলিসের সহযোগী নমরুদরূপী মানুষেরা কোরআনকে অপদস্থ করলেও কোরআন প্রেমী মানুষকে দিয়ে কিভাবে তা প্রতিহত করতে হয় সেটা অজানা নয় সর্বশক্তিমান আল্লাহ তা’য়ালার। তাই আল্লাহর কালাম এবং আল্লাহর প্রিয় বান্দারা সম্মানিত হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকেন আজন্ম কাল। অন্যদিকে লাঞ্ছিত ও ধিক্কৃত হয়ে ঘৃণার সাথে টিকে থাকে নমরুদদের নাম।

সৃষ্টিকে দেখে এবং নিজের বিবেক ও চিন্তার দ্বারা সাধনা করে স্রষ্টাকে চেনা ও জানার সেই ধারা এখন ম্রিয়মাণ প্রায়। এখন মানুষের হাতে সময় নেই। বিজ্ঞানের জোয়ারে তার ভাবনার জগত গেছে পাল্টে। তার গতি গেছে বেড়ে, কাজও বেড়েছে অনেক। সৃষ্টিকে চোখ মেলে দেখার চিন্তা দূরে থাকুক নিজের দেহ ঘড়ির দিকে তাকানোরও তার যেন আর অবসর নেই। অথচ তার এই দেহখানাই হতে পারে স্রষ্টাকে জানার সেরা পাথেয় কারণ মানব কাঠামোর মত এমন অনুপম সৃষ্টি এর স্রষ্টার দিকে পথ নির্দেশ না করে পারে না।

তবে মানুষের সময় না থাকলেও দয়াময় আল্লাহ পাক তাঁর এই প্রিয় সৃষ্টিকে কখনই ভুলে থাকেননি, তাকে সঠিক পথে রাখতে তিনি যেন বদ্ধপরিকর। তাই মানুষ যতই সরে যাচ্ছে তার স্রষ্টার কাছ থেকে স্রষ্টাও আসছেন যেন তার আরও কাছে। মানুষের চোখের সামনে তিনি নিজেকে তুলে ধরছেন আরও স্পষ্ট ভাবে, আরও সহজ করে। ব্যাপারটা খারাপ ছাত্রদের জন্যে প্রশ্নপত্র সহজ করার মত, গ্রেস দিয়ে পাস করানোর মত। গ্রেস দিয়ে হলেও শেষ বেলার এই মানুষগুলোকে আল্লাহ পাক বস্তুত রক্ষা করতে আগ্রহী। তাই আল্লাহর ব্যাপারে সামান্যতম আগ্রহও এখন অনেকের ক্ষেত্রে আল্লাহ পাকের অস্তিত্ব অনুধাবনের জন্য হতে পারে যথেষ্ট।

উদাহরণ স্বরূপ হাল আমলের ভিডিও, কম্পিউটার, মোবাইল, স্কাইপির কথা বলা যায়। এগুলো স্পষ্টতই বুঝিয়ে দিচ্ছে যে মানুষের প্রতিটি কাজের রেকর্ড তথা আমল নামা সংরক্ষণ এবং শেষ বিচারের মাঠে তা উপস্থাপন করা আল্লাহ পাকের জন্যে কতই না সহজ। এখন থেকে পঞ্চাশ-একশত বছর আগের মানুষের পক্ষেও আল্লাহ পকের মহা বিচারের বাণী সমূহের সত্যতা এত সহজে অনুধাবন করা সম্ভব ছিল না।
কিন্তু এরপরও জটিলতার যেন শেষ নেই। প্রশ্ন আর জিজ্ঞাসা যেন শেষ হবার নয় কিছুতেই। এমনই এক জটিল বিষয় হলো আল্লাহ পাকের উৎপত্তি সংক্রান্ত মানুষের প্রশ্নাবলী। অনাদি কাল থেকেই মানুষের মনে ঘুরপাক খেয়েছে অবশ্যম্ভাবী এই প্রশ্ন, আল্লাহ কিভাবে সৃষ্টি হলেন। উনার শুরু কোথায়, শেষইবা কোথায়।

এব্যাপারে অবশ্য আল্লাহ পাকের বক্তব্য খুবই স্পষ্ট ও পরিষ্কার। নিজের জন্ম-মৃত্যু বিষয়ে আল্লাহ পাকের সরাসরি উত্তর, তিনি এমন যিনি জন্ম নেননি, তিনি জন্ম দেনও নি (১১২:৩)। তিনিই আদি,তিনিই আদি, তিনিই অন্ত, যখন কিছু ছিল না তখনও ছিলেন তিনি, যখন কিছু থাকবে না তখনও থাকবেন তিনিই (৫৭:৩~৬ দ্রষ্টব্য)। তিনি এমন যাকে ক্ষুধা

তিনি এমন যাকে ক্ষুধা-তৃষ্ণা, ঘুম-ক্লান্তি কিছুই কখনও স্পর্শ করে না (২:২৫৫ দ্রষ্টব্য)। মানুষের জন্যে বড়ই কঠিন এই সব বক্তব্য। সেজন্যেই মানুষের জন্যে বড়ই কঠিন এই সব বক্তব্য। সেজন্যেই বিশ্বব্যাপী এখনও শত শত কোটি মানুষ এমনও আছে যাদের কাছে জন্ম-মৃত্যু, খুঁত-পিপাসা ও ঘুম-ক্লান্তিহীন এমন সত্ত্বার প্রসঙ্গই তোলা যায় না, বিশ্বাস করানো তো বহুত বহুত দূর কা ওয়াস্ত। বিজ্ঞানের এই মহা উন্নতির যুগেও এমন জিজ্ঞাসার উদ্ভব হওয়ায় প্রশ্ন জাগে আগেকার আমলের মানুষজন কি তাহলে কিছু না যেনে, না বুঝেই বিশ্বাস করেছিল জন্ম-মৃত্যুহীন এক আল্লাহতে? এ বিষয়ে কি ছিল তাদের আসল অনুভূতি ও অভিব্যক্তি?

উল্লেখ্য যে সাধারণ পর্যবেক্ষণে পূর্ববর্তী প্রজন্মগুলোকে তাদের উত্তরসূরিদের থেকে জ্ঞানে ও গুণে বেশী যোগ্য হতে দেখা যায়। কঠোর সাধনার মাধ্যমে অর্জন করতে হতো বিধায় আগের আমলের মানুষের জ্ঞানের ও গুণের গভীরতা ছিল প্রশ্নাতীত এবং তাদের বিশ্বাসের শক্তিও ছিল তেমনই প্রবল। আগের আমলের তুলনায় সুযোগ্য ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রফেসার বা রাষ্ট্র নেতার সংখ্যা আমরা অব্যাহত ভাবে কমে যেতে দেখছি আমাদের জীবদ্দশাতেই। এখনকার পিসিএস, বিসিএস অফিসাররা নিজেরাও তাদেরকে বিগত আমলের অফিসারদের সমকক্ষ মনে করতে পারেন না। যদিও সুযোগে, সুবিধায় এবং তথ্য ভাণ্ডারের আধিক্যে একালের আমরা অনেক অগ্রগামী। অর্থাৎ জ্ঞানের গভীরতা আর তথ্য ভাণ্ডারের বাহুল্য এক জিনিস নয়। বিশাল তথ্য ভাণ্ডার আর বিজ্ঞানের গতি মানুষকে হয়তো স্মার্ট করতে পারে, ব্যস্ত করে তুলতে পারে নতুন নতুন কাজে কিন্তু তা কোন ভাবেই মানুষকে জ্ঞানী ও বিজ্ঞ হয়ে ওঠার গ্যারান্টি দেয় না। বিজ্ঞ হয়ে ওঠার জন্যে গভীর চিন্তার ক্ষমতা এবং সত্যের সন্ধানে একনিষ্ঠ অধ্যবসায় ও কঠোর সাধনা সব সময়ই ছিল বিকল্পহীন। এ যুগেও শর্তগুলো মূলত ঐ একই। আমাদের পূর্বসূরিদের কাছে প্রবল বিজ্ঞান না থাকলেও আল্লাহ পাক নিজ দয়ায় তাদেরকে দিয়েছিলেন প্রজ্ঞা, জ্ঞান ও গভীর অন্তর দৃষ্টি। বস্তুত সেই সুগভীর বিজ্ঞতার জোরেই তারা নৈকট্য লাভ করতে পেরেছিলেন আল্লাহ পাকের এবং যথাযথ ভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন আল্লাহ পাকের জন্ম-মৃত্যু, ক্ষুধা-ক্লান্তিহীন সুমহান সত্ত্বাকে। কিন্তু কথিত মহা উন্নতির এই যুগে বিজ্ঞানের ধাক্কায় প্রজ্ঞা তো ছেড়ে যাচ্ছে আমাদেরকে। তাই কি হবে আমাদের উপায়? কি ভাবে পাবো আমরা সুকঠিন ঐসব প্রশ্নের উত্তর?

দয়াময় মহান আল্লাহ পাক শুধুমাত্র পূর্ববর্তীদেরই আল্লাহ ছিলেন না, তিনি একই ভাবে এই মডার্ন যুগেরও আল্লাহ, আমাদেরও আল্লাহ। তাই তিনি যে এ যুগের মানুষের প্রশ্নে নিরুত্তর থাকবেন, তা হবার নয় এবং তেমন ভাবার কোন কারণও নেই। তিনি বলেন, প্রত্যেকটি মানুষকে যে আয়ু দেয়া হয়েছে সেটাই তার জন্যে যথেষ্ট আল্লাহকে উপলব্ধি করা ও তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের জন্য (৩৫:৩৭ দ্রষ্টব্য)। অর্থাৎ প্রতিটি মানুষের জন্যেই তার নিজ নিজ যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা তথা লেভেল অনুযায়ী রয়েছে আল্লাহ পাককে বুঝতে পারা ও আল্লাহ পাক সংক্রান্ত তার প্রশ্নগুলোর উত্তর লাভের ব্যবস্থা। বিগত যুগে তিনি যেভাবে মানুষের প্রশ্নবাণের মুকাবিলা করেছেন বিভিন্ন সমসাময়িক উপমা-উদাহরণের মাধ্যমে একই ভাবে আমাদের জন্যেও রয়েছে আমাদের সময় ও কাল অনুযায়ী আল্লাহ পাক সংক্রান্ত প্রশ্নাবলীর উত্তর জেনে নেয়ার সুযোগ। শুধু প্রয়োজন একটু আগ্রহ, একটু একাগ্র প্রচেষ্টা।

বিজ্ঞান ছুটছে আল্লাহর দিকেঃ
সর্বময় আল্লাহ পাককে জানার ও বোঝার ক্ষেত্রে বর্তমানের বিজ্ঞান বিশেষত মহাকাশ বিজ্ঞান হলো যথার্থই এক শক্তিশালী মাধ্যম। মহাকাশ বিষয়ে মানুষের জানার পরিধি আজ বিস্তৃত হয়েছে সুদূরের অনন্ত নক্ষত্ররাজি পর্যন্ত। মহাশূন্যে স্থাপিত হাবল টেলিস্কোপ মানুষের দৃষ্টিকে নিয়ে গেছে আপন গ্যালাক্সি মিল্কিওয়ে পেরিয়ে সুগভীর মহাকাশের আরও গভীরে। দেখা মিলছে মহাজাগতিক ভাঙ্গা-গড়ার অবিশ্বাস্য সব দৃশ্যাবলীর। আমাদের উপলব্ধিতে ধরা পরছে ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব আরও স্পষ্ট ভাবে। জানা যাচ্ছে শক্তিমত্ত ব্ল্যাকহোলের রহস্য আরও নিখুঁত ভাবে। মানুষের পাঠানো নভোযান ভয়েজার এখন প্রায় পেরিয়ে গেছে মিল্কিওয়ের প্রান্ত সীমানা। এরপরও ধারণা করা হচ্ছে যে অনন্ত মহাশূন্যের মাত্র চার ভাগের বেশী দেখার সুযোগও সম্ভবত এখনও আমাদের হয়নি।

এ পর্যন্ত যতটুকুই জানা গেছে তার মধ্যেই দূরবর্তী এমন সব নক্ষত্রমণ্ডলীর সন্ধান মিলছে যেখানে আলোর গতিতে ছুটলেও পৌঁছাতে লাগবে আমাদের সময়ের হিসেবে কয়েক বিলিয়ন আলোক বর্ষ। ঐসব গ্রহ-নক্ষত্রের কতগুলোর আকার-আয়তন-উপকরণের বাহিরেও জানা গেছে সেগুলোর দিবস ও রজনীর দৈর্ঘ্য ও ব্যাপ্তি। এমন অনেক গ্রহ-উপগ্রহের দেখা মিলেছে যেখানকার একেকটা দিনের দৈর্ঘ্য পৃথিবীর বহু বছরের সমান। ধারণা করতে কষ্ট হয় না যে মহাশূন্যের আরও গভীরে অথবা প্রান্ত সীমানায় যদি কখনও পৌঁছানো যায় তাহলে হয়তো এমন গ্রহ-উপগ্রহের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে যেখানকার একেকটা দিন হয়তো হবে পৃথিবীর কয়েক শত বছর, এমনকি হয়তোবা আমাদের হাজার বছরের সমান। তেমন কিছুর দেখা এখন পর্যন্ত বাস্তবে না মিললেও মহাকাশে যে সেরকম এলাকা থাকতে পারে সে বিষয়ে কোনই সন্দেহ নেই।

মহাশূন্যের গভীরে আরো কত সহস্র বিলিয়ন আলোক বর্ষ পথ পাড়ি দিলে যে তেমন এলাকার অথবা এর কিনারার দেখা মিলবে তা এখনও আমাদের অজানা। কিন্তু মহাজ্ঞানী সুমহান আল্লাহ পাক মানুষের এই অনুসন্ধিৎসার একটা ইঙ্গিতপূর্ণ ধারণা দিতে ভুল করেননি পবিত্র আল-কোরআনে। আল্লাহ পাক বস্তুত মানুষের প্রতিটি প্রশ্নেরই যথাযথ উত্তর দিয়েছেন তাঁর পবিত্র কালামে। নিজের ভাষায় বর্ণনা করেছেন সৃষ্টির অনুপূর্ব এবং মানুষকে নিশ্চয়তা দিয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে এই কোরআন এমন যেখানে প্রতিটি বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে বর্ণিত হয়েছে এবং সেখানে বাদ দেয়া হয়নি কোন কিছুই (৬:৩৮; ৪১:৩; ৫৪:১৭, ২২, ৩২, ৪০ দ্রষ্টব্য)। এদিকে ইঙ্গিত করেই নবীজী সা: বিদায় হজ্জের ভাষণে তাঁর সাহাবিদেরকে আদেশ দিয়েছেন আল্লাহর কালাম ও তাঁর বাণীকে যেমন আছে ঠিক তেমনি ভাবে পরবর্তীদের কাছে পৌঁছে দিতে। কারণ হিসেবে বলেছেন, ‘তোমরা যা বুঝতে পারো নি পরবর্তীরা হয়তো তা বুঝতে পারবে’ (বোখারী শরীফ)। সাহাবিদের বুঝতে না পারা বাণীগুলো অবশ্যই ছিল সৃষ্টি সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক বর্ণনাসমূহ যেগুলো আজকে আমরা অনেকটাই অনুধাবন করতে সক্ষম বিজ্ঞানের অগ্রগতির কারণে।

তেমনই একটি অবিস্মরণীয় বাণীতে মহান আল্লাহ পাক বলেন, ‘ফেরেশতারা ও রুহ (জিবরাইল আ:) আরোহণ করে তাঁর দিকে এমন এক ঊর্ধ্বলোকে যেখানকার একেকটি দিন পৃথিবীর পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান’ (৭০:৪ দ্রষ্টব্য)। বলা অনাবশ্যক যে পৃথিবীর হাজার বছরের সমান একটা দিন হতে পারে তেমন এলাকাই যেখানে এখনও আমারা মহাশূন্যে খুঁজে পাই নি সেখানে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান একটি দিবসের এলাকা আদৌ মানুষ কখনও খুঁজে পাবে কিনা তা বলা কঠিন।

তবে মানুষের খোঁজ পাওয়ার অপেক্ষা না করে দয়াময় আল্লাহ পাক নিজেই দিয়েছেন সেই এলাকা বিষয়ে আরও কিছু তথ্য। সেগুলোর দেখা মেলে নবীজী সা:-এর মেরা’জ সংক্রান্ত আল-কোরআনের বিবরণীতে। মেরা’জের বর্ণনায় সুরা নজমে উল্লেখ করা হয়েছে সিদরাতুল মুনতাহার কথা। বলা হয়েছে যে সেই সিদরাতুল মুনতাহার কাছে আছে জান্নাতুল মাওয়া (৫৩:১৩~১৭)। মেরা’জ বিষয়ক সহি হাদিসগুলো থেকে জানা যায় যে এই সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত নবীজীর সফর সঙ্গী ছিলেন ফেরেশতাদের প্রধান হযরত জিবরাইল আঃ এবং ঐ পয়েন্ট থেকেই আল্লাহর আরশ পর্যন্ত নবীজীকে যেতে হয়েছিল একাকী। কারণ সিদরাতুল মুনতাহা পয়েন্টের ওপারে যাওয়ার অনুমতি ছিল না স্বয়ং প্রধান ফেরেশতারও।

বস্তুত এটাই মহাকাশের সেই প্রান্ত এলাকা বা শেষ সীমানা যেখানে শেষ হয়েছে জন্ম-মৃত্যু, ধ্বংস-সৃষ্টি ও সীমাবদ্ধ সময়ের এই জগত তথা আমাদের জ্ঞাত এই মহাবিশ্ব এবং সম্ভবত এই এলাকারই একেকটা দিন পৃথিবীর পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। আল্লাহর কাছ থেকে আদেশ-নির্দেশ বুঝে নিতে এবং নিজেদের কাজের রিপোর্ট দিতে জিবরাইল আ: ও অন্যান্য ফেরেশতারা সর্বোচ্চ এ পর্যন্তই যেতে পারেন, এর ওপারে নয়। কারণ এর পরপরই শুরু হয়েছে জন্ম-মৃত্যু, ধ্বংস-সৃষ্টি বিহীন এমন এক জগত যেখানে কারোই প্রবেশাধিকার নেই। এক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন মহামানব প্রিয় নবীজী হযরত মুহাম্মদ সা: যিনি সর্বময় আল্লাহ পাকের সীমাহীন ক্ষমতা ও কুদরতের নিদর্শন স্বরূপ মেরা’জের রাতে সক্ষম হয়েছিলেন এই দুই জগতের মধ্যে পরিভ্রমণে। সেটা ছিল মূলত এই নশ্বর জগতের বিস্তৃতি এবং অনন্ত অবিনশ্বর জগতের অস্তিত্বের চাক্ষুষ প্রমাণ যা আল্লাহ পাক মানুষের কাছে সুনির্দিষ্ট ভাবে উপস্থাপন করেছিলেন পবিত্র মেরা’জের রাতে। অসীম সেই জগত শুধুমাত্র মৃত্যুহীনই নয় বরং সেখানকার যাবতীয় পরিবেশ, পরিস্থিতি ও অনুভূতি তথা সমস্ত কিছুই আমাদের জ্ঞাত এই মহাজগত থেকে সম্পূর্ণই ভিন্ন। কিন্তু কি সেই ভিন্নতা? কতটুকুইবা ভিন্ন সেই জগত আমাদের পরিচিত এই জগত থেকে?

বলাই বাহুল্য যে সেই ভিন্নতার অন্যতম হলো সেখানে মৃত্যু নেই এবং মৃত্যুর মত জন্ম বলেও সেখানে কিছু নেই। সেখানে ক্ষুধা-ক্লান্তি, ঘুম-নিদ্রা কিছুই নেই। সেখানে অভাব নেই, অশান্তি বলেও কিছু নেই। পরিপূর্ণ সেই শান্তিধামে কাল বলে কিছু নেই, সময় বলেও কিছু নেই। সেখানে সীমা নেই, পরিসীমাও নেই। সেখানে কিছুই কখনও সৃষ্টি হয় না কিন্তু অন্য সব কিছুই সৃষ্টি হয় সেখান থেকে। যেহেতু সেখানকার কিছুই সৃষ্ট নয় বরং সদা সর্বদা একই ভাবে বিরাজমান তাই সেখানে শুরু বলে কিছু নেই, শেষও নেই। সেখানে আছে শুধুই একক অর্থাৎ একজন। কারণ সেখানে দুই বা দ্বিতীয় বলে কিছু নেই, থাকা সম্ভব নয়। সেখানে যিনি ছিলেন তিনি সেখানেই আছেন এবং সেখানেই থাকবেন। যেহেতু ধ্বংস বা মৃত্যু সেখানে অনুপস্থিত তাই সেখানকার একক সত্ত্বার নির্ধারিত সময়ব্যাপী সেখানে অবস্থানের প্রশ্নটাও অবান্তর। অবিনশ্বর সেই জগতের অধিপতি একমাত্র মহান আল্লাহ। তাই আল্লাহ পাকের জন্ম-মৃত্যু, শুরু-শেষ ও ক্লান্তি-নিদ্রার প্রসঙ্গগুলো একেবারেই অবাস্তব, অবান্তর এবং অসম্ভব।

আমরা ঐ জগতের কথা ভাবতে পারি না। এমনকি জন্ম-মৃত্যুহীন অথবা শুরু ও শেষ বিহীন কোন কিছুর অস্তিত্বও আমাদের ভাবনায় আসে না। কারণ আমাদের এই দৃশ্যমান জগতে আমরা সবাই এখানে কাল ও সময়, সীমা ও পরিসীমা, সৃষ্টি ও ধ্বংস এবং শুরু ও শেষ হওয়ার সুনির্দিষ্ট এক চক্রের মধ্যে আবদ্ধ। এই চক্রের ভিতরে কেউই একক ভাবে কিছু করতে সক্ষম নয় তাই এখানে সবকিছুই দুই বা ততোধিকের মিশ্রণ ও সমষ্টি। এই চক্রের বাহিরে আমাদের চিন্তা-চেতনা কাজ করে না কোন ভাবেই। এটা একান্তই আমাদের সার্বিক ও সর্বব্যাপী সীমাবদ্ধতার পরিণতি। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে এই সীমাবদ্ধতার বিপরীতে বা ঊর্ধ্বে কিছু নেই বা থাকতে পারে না। বরং এপিঠ-ওপিঠের সাধারণ তত্ত্ব অনুযায়ীই সীমাবদ্ধ ও নশ্বর এই জগতের উল্টো পিঠে অসীম ও অবিনশ্বর জগতের উপস্থিতিটাই স্বাভাবিক। আর জগতটা যেহেতু অসীম ও অবিনশ্বর তাই ঐ জগতের অধিপতিও অবশ্যই হবেন সমস্ত সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে তথা অসীম, অবিনশ্বর ও শাশ্বত। বস্তুত সেই তিনিই হলেন আল্লাহ সুবহানাল্লাহ তা’য়ালা। তাই জন্ম-মৃত্যু বিহীন ও সীমা-পরিসীমাহীন আল্লাহ পাকের পবিত্র একক সত্ত্বা ও অস্তিত্ব বিষয়ে সন্দেহের কিছু নেই এবং সন্দেহের অবকাশ নেই সর্বশক্তিমান আল্লাহ পাক সম্বন্ধে আল-কোরআনের বিবরণীগুলোতেও। আল্লাহ পাক সংক্রান্ত পরম এই সত্যটা বিজ্ঞানের এই যুগে উপলব্ধি ও বিশ্বাস করতে পারা খুবই সহজ।

সামনে দুরূহ পথ ভয়াবহ সময়ঃ
নশ্বর ও অবিনশ্বর মহাজগতের প্রান্ত সীমায় অবস্থিত সিদরাতুল মুনতাহার কাছে আরও আছে জান্নাতুল মাওয়া (৫৩:১৩~১৭ দ্রষ্টব্য)। উল্লেখ্য যে এই জান্নাত ও জাহান্নামই হলো মানবকুলের চূড়ান্ত গন্তব্য। অর্থাৎ যে অবিনশ্বর মহাজাগতিক কেন্দ্র থেকে উৎপত্তি হয়েছে এই সৃষ্টি সেই কেন্দ্রের পদতলেই ফিরতে হবে আমাদের সবাইকে। আল্লাহর দরবারে ফিরে যাবার এই কথাটাই আল্লাহ পাকের প্রতিটি নবী মানব সমাজে প্রচার করে গেছেন আবহমান কাল ধরে। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে এই বাণী। বলা হয়েছে যে, এই মহাবিশ্বের সবকিছুকেই ফিরতে হবে মহান স্রষ্টার কাছে (১০:৪ দ্রষ্টব্য)। অনাদি কাল থেকে আল্লাহ পাকের প্রিয় বান্দাদের প্রচারিত এই বাণী মাত্র অতি সম্প্রতি অমোঘ সত্য হিসেবে ধরা পরতে শুরু করেছে মানুষের জ্ঞানে ও গবেষণায়। বিজ্ঞান এখন নিশ্চিত ভাবেই বলছে মহাজগতের অব্যাহত সম্প্রসারণের পর অনিবার্য সংকোচনের কথা এবং সংকুচিত হতে হতে উৎস মূলে ফিরে যাবার কথা। অতীব গুরুত্বপূর্ণ জটিল এই বিষয়টা মহান আল্লাহ পাক খুবই সুন্দর করে স্বল্পতম অনবদ্য ভাষায় বলেছেন পবিত্র কোরআনে। আল্লাহ পাক বলেন, তারা কি দেখ না যে আল্লাহ পাক কিভাবে ভূমিকে ক্রমান্বয়ে সংকুচিত করে চলেছেন চতুর্দিক থেকে (১৩:৪১ দ্রষ্টব্য)।

আপন স্রষ্টার কাছে প্রত্যাবর্তনের অবধারিত সেই ধারা প্রবাহে সর্বতোভাবে লাভবান হবে জান্নাতিরা। জান্নাতিদের জন্যে যত ধরণের উপহার-উপঢৌকনের কথা বলা হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে লোভনীয় ও আকর্ষণীয় উপহার হলো মহান আল্লাহ পাকের দিদার লাভ (১৮:১১০; ৭৫:২২~২৩ এবং সহি বোখারী ও মুসলিম শরীফের সংশ্লিষ্ট হাদিস দ্রষ্টব্য)। জান্নাতিরা আল্লাহ পাককে দেখবেন তাঁর আসল রূপে। তাই জান্নাতের অবস্থান আল্লাহ পাকের জান্নাতিরা আল্লাহ পাককে দেখবেন তাঁর আসল রূপে। তাই জান্নাতের অবস্থান আল্লাহ পাকের অবিনশ্বর মহাজগত তথা আরশে আযিমের নিকটবর্তী হওয়াটাই যুক্তি সংগত ও স্বাভাবিক। বস্তুত সেই সত্যটাই পুণঃ নিশ্চিত করা হয়েছে জান্নাতুল মাওয়ার অবস্থান সুনির্দিষ্ট ভাবে সিদরাতুল মুনতাহার কাছাকাছি উল্লেখ করার মাধ্যমে। তবে এত লোভনীয় জান্নাতে পৌঁছানো মানুষের জন্যে সহজসাধ্য হবে না। কোরআন-হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী জান্নাতমুখী অভিযাত্রায় প্রতিটি মানুষকেই দেখতে হবে জাহান্নাম তথা পার হতে হবে পুলসিরাত যার নিচে থাকবে প্রজ্বলিত দোজখের লকলকে অগ্নিশিখা (১৯:৭১ এবং বোখারী শরীফের সংশ্লিষ্ট হাদিস দ্রষ্টব্য)। অর্থাৎ জাহান্নামের অবস্থান স্থল হলো জান্নাতের এলাকা থেকে নীচে তথা নশ্বর ও অবিনশ্বর মহাজগতের প্রান্ত সীমা বা সিদরাতুল মুনতাহা থেকেও অনেক নীচে যেখান থেকে অন্তহীন শান্তিধাম বা অবিনশ্বর জগতের কিছুই অনুভব করা সম্ভব হবে না।

অতএব দেখা যাচ্ছে যে শেষ বিচার সমাপ্তির পর মানুষে জন্যে অপেক্ষা করছে এক ভয়াবহ ও দুর্গম পথের অভিযাত্রা। এ পথের দূরত্ব কতটুকু হতে পারে তারও একটা ধারণা দেয়া হয়েছে পবিত্র আল কোরআনে। আল্লাহ পাক বলেন, শেষ বিচারের ময়দানের এক একটা দিন হবে পৃথিবীর হাজার বছরের সমান (২২:৪৭; ৩২:৫ দ্রষ্টব্য)। অর্থাৎ বিচারের ময়দান হবে আল্লাহ পাকের অবিনশ্বর এলাকা থেকে,অর্থাৎ বিচারের ময়দান হবে আল্লাহ পাকের অবিনশ্বর এলাকা থেকে, এমনকি পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান একদিনের যে সসীম ও অসীমের সীমান্ত এলাকা তা থেকেও অনেক অনেক দূরে, অন্যত্র। সেখানে আল্লাহ পাক অবতরণ করবেন শেষ বিচারের একক বিচারক হিসেবে। সেদিন তিনি ছাড়া সিদ্ধান্ত নেয়া বা দেয়ার কেউ থাকবে না। বস্তুত তাঁর কোন কর্তৃত্ব বা সিদ্ধান্তে কেউ কখনই অংশ নেয় না, নিতে পারে না (১:৩; ১৮:২৬ দ্রষ্টব্য)। অনুপুঙ্খ হিসাব-নিকাশ করবেন পৃথিবীর আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত সৃষ্ট প্রতিটি আদম সন্তানের। বিচার-আচার শেষে হাজার বছর সমান দিবসের হাশরের মাঠ থেকে মানব সকলকে যাত্রা শুরু করে যেতে হবে ঐ পঞ্চাশ হাজার বছর সমান একদিনের এলাকা অভিমুখে। এলাকা দুটোর মধ্যে সময়ের সুবিশাল পার্থক্য থেকেই বোঝা যায় যে দুর্গম ঐ পথের দূরত্ব হবে বহু সহস্র কোটি আলোক বর্ষ কিম্বা তারও বেশী। ঐ দূরত্ব অতিক্রম করেই প্রতিটি মানুষকে পৌঁছাতে হবে তার জন্যে নির্ধারিত গন্তব্য হয় বেহেশত নতুবা দোজখে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে যেন জান্নাতিদের জন্যে পথের দূরত্বটা হবে জাহান্নামীদের চেয়েও বেশী। কারণ জাহান্নাম পার হয়েই তাদেরকে যেতে হবে জান্নাতের দিকে। জাহান্নাম থেকে জান্নাত অভিমুখী ঐ পথটুকু যে কতটা দীর্ঘ হবে তা জানেন শুধুই আলেমুল গায়েব তথা মহান আল্লাহ পাক। কিন্তু ঐ দূরত্ব পাড়ি দেয়াটা যে গণিতের যোগ-বিয়োগের মত সরল কিছু হবে না সেটা বলা হয়েছে খুবই পরিষ্কার করে।

বলা হয়েছে যে যারা হবে পুণ্যাত্মা তারা আমলনামা পাবে ডান হাতে এবং তাদের সাথে থাকবে আলো। বেহেস্তের পথে তারা সেই দুরূহ অন্ধকার প্রান্তর পাড়ি দেবে অনায়াসে, চোখের পলকে। অন্যদিকে বাম হাতে আমলনামা পাওয়া ব্যক্তিরা পথ হারাবে অন্ধকারে। হাতরে বেড়াবে রাস্তা। আলো হাতের পুণ্যাত্মাদেরকে অনুনয় করবে তাদের জন্য একটু অপেক্ষা করতে, তাদেরকে একটু আলো দিয়ে সাহায্য করতে। কিন্তু দুর্গম সেই পথে অপেক্ষা করার মত অবস্থা থাকবে না কারো। দাঁড়ানো সম্ভব হবে না কারো পক্ষেই। সবাই থাকবে কম্পিত, মহা আতংকিত। ব্যস্ত থাকবে সবাই শুধুই নিজেকে নিয়ে (৫৭:১২~১৩; ৭০:৮~১৪; ৮০:৩৩~৩৭ এবং বোখারী ও মুসলিম শরীফের সংশ্লিষ্ট হাদিসগুলো দ্রষ্টব্য)। ঐ পথহারাদেরকে এবং অতি পাপী যারা ঐ পথহারাদেরকে এবং অতি পাপী যারা পথ চলতে হবে একেবারেই অক্ষম তাদেরকে টেনে, হিচঁড়ে এবং পিটিয়ে বাধ্য করা হবে ঐ পথ পাড়ি দিতে (সহি বোখারীর শেষ বিচার সংক্রান্ত হাদিস দ্রষ্টব্য)। এদের জন্যে ভয়ংকর সেই পথের ভোগান্তি হবে অবর্ণনীয়। তাদের পথ চলা শেষ হবে না সহজে।

এদের জন্যে ভয়ংকর সেই পথের ভোগান্তি হবে অবর্ণনীয়। তাদের পথ চলা শেষ হবে না সহজে। আবার অন্তহীন কালও লাগবে না। বরং ফেরেশতারা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ঐ পাপীদেরকে পৌঁছে দেবে তাদের স্ব স্ব গন্তব্যে।

এসব বিবরণী থেকে প্রতীয়মান হয় যে বেহেস্ত-দোজখের অবস্থান বস্তুত সিদরাতুল মুনতাহার এপারে তথা নশ্বর এই মহাজগতের প্রান্তে। যদি তাই হয় তাহলে প্রশ্ন থেকে যায় যে মৃত্যুময় এই এলাকায় কিভাবে সম্ভব জান্নাত ও জাহান্নামবাসীদের মৃত্যুহীন অনন্ত জীবন? এই প্রশ্নেরও যথাযথ উত্তর মহান আল্লাহ পাক দিয়েছেন প্রিয় নবীজী সা-এর জবানীতে। বলা হয়েছে যে মানবকুলের বিচার-আচারের নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়ার পর বেহেস্ত-দোজখের মাঝ বরাবর মৃত্যুকে উপস্থিত করা হবে একটা মেষ শাবক বেশে এবং সেখানে সেই মেষ শাবকটাকে জবাই করে মৃত্যুর সমাপ্তি ঘোষণা করা হবে চিরতরে। জবাই ও ঘোষণার সেই দৃশ্য দেখবে বেহেস্ত ও দোজখবাসী সবাই। এতে বেহেস্তবাসীরা হয়ে উঠবে আরও উৎফুল্ল অন্যদিকে হতাশায় মুহ্যমান হয়ে পরবে জাহান্নামীরা (সহি বোখারী দ্রষ্টব্য)।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে পবিত্র কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত নশ্বর এই জগতের বাহিরে অবস্থিত অবিনশ্বর মহাজাগতিক এলাকার অস্তিত্ব অবশ্যই এক মহা সত্য এবং সেটা আমাদের এ পর্যায়ের বৈজ্ঞানিক সব অর্জনের ভিত্তিতেই আজ পরিষ্কার ভাবে প্রমাণ করা সম্ভব। আরও ধারণা করা সম্ভব যে সেই অসীম জগতের সকল প্রকারের সীমাবদ্ধতা মুক্ত হওয়া সংক্রান্ত বিবরণীগুলোও অসত্য নয় মোটেই। তাই কেয়ামত ও তৎপরবর্তি বিচার-আচার এবং বিচারের শেষে হাজার বছরের একদিন সমান বিচারের ময়দান থেকে পঞ্চাশ হাজার বছরের এক দিবস সমান বেহেশত-দোজখমুখী দুর্গম পথ পাড়ি দেয়ার যে কষ্টসাধ্য দুরূহ সময় মানুষের জন্যে অপেক্ষা করছে তাও এখন আর অবিশ্বাস করার কোনই অবকাশ নেই।

এই তথ্যগুলোর কোন একটার মধ্যে যদি সামান্যতম অসঙ্গতিও থাকতো তাহলে এগুলোর ব্যাখ্যা কখনই এতটা যৌক্তিক ও সুসমন্বিত ভাবে করা সম্ভব হতো না এবং এতটা নিখুঁত বৈজ্ঞানিক সমন্বয়ও বজায়ে রাখা যেত না এসব বর্ণনার মধ্যে। বস্তুত পরম এই সত্যগুলোর বিষয়ে সুস্পষ্ট জ্ঞান ও পর্যাপ্ত উপলব্ধি বোধ ছাড়া এই পৃথিবী ত্যাগ করা যে মানুষের জন্যে হবে বড়ই ভয়াবহ, নিদারুণ অনুতাপের এবং অকল্পনীয় ক্ষতির তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এটা আসলে মানব জনমের সবচাইতে কঠিনতম বাস্তবতা, জটিলতম চ্যালেঞ্জ। বিষয়টা লক্ষ-কোটি বার বোঝালেও মানুষ যে তা বুঝতে চাইবে না তা খুব ভালো ভাবেই জানেন সর্বজ্ঞ আল্লাহ। কিন্তু আল্লাহ পাক অতি দয়াময়। মানুষের প্রতি তিনি অতীব স্নেহশীল। তাই তিনি নিজে থেকেই মানুষকে বিস্তারিত খুলে বলেছেন শেষ পরিণতি এবং সোজাসুজি ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন, ‘মুসলমান না হয়ে মারা যেও না’ (২:১৩২)। এজন্যেই প্রতিটি মানুষের মধ্যে শিক্ষা জীবনের শুরু থেকেই পরম এই জ্ঞানের যথাযথ চর্চা ও অনুশীলন নিশ্চিত করা অতি আবশ্যক। শিক্ষার এই ভিত্তিটা ঠিক মত গড়তে পারলে আশা করা যায় যে তা হয়তো মানুষকে জীবনের নিত্য উত্থান-পতনের মধ্যেও কোন না কোন ভাবে হলেও রক্ষা করতে সক্ষম হবে চূড়ান্ত গন্তব্য চ্যুত হওয়ার হাত থেকে।

**কোরআন ও হাদিস ভিত্তিক বক্তব্যগুলো যাচাই করতে অনুগ্রহ করে সূত্রগুলোর সহি অনুবাদ ও ব্যাখ্যা দেখুন।

একটি উত্তর ত্যাগ