বিজ্ঞানী “গ্যালিলিও গ্যালিলি” সম্পর্কে অজানা এবং দারুন সব তথ্য

0
1421

গ্যালিলিও গ্যালিলি একজন ইতালীয় পদার্থবিজ্ঞানী,জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ এবং দার্শনিক যিনি বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের সাথে বেশ নিগূঢ়ভাবে সম্পৃক্ত। তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদানের মধ্যে রয়েছে দূরবীক্ষণ যন্ত্রের উন্নতি সাধন যা জ্যোতির্বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে, বিভিন্ন ধরণের অনেক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ, নিউটনের গতির প্রথম এবং দ্বিতীয় সূত্র, এবং কোপারনিকাসের মতবাদের পক্ষে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ। বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংয়ের মতে আধুনিক যুগে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের এতো বিশাল অগ্রগতির পেছনে গ্যালিলিওর চেয়ে বেশি অবদান আর কেউ রাখতে পারেনি। তাকে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের জনক, আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের জনক এবং এমনকি আধুনিক বিজ্ঞানের জনক হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। এরিস্টটলীয় ধারণার অবসানে গ্যালিলিওর আবিষ্কারগুলোই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।

গ্যালিলিও ১৫৬৪ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি তারিখে ইতালির টুসকানিতে অবস্থিত পিসা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ভিনসেঞ্জো গ্যালিলি গণিতজ্ঞ এবং সংগীতশিল্পী ছিলেন। গ্যালিলিওর মা’য়ের নাম গিউলিয়া আমানাটি । গ্যালিলিও ছিলেন বাবা মা’র সাত সন্তানের মধ্যে সবার বড় আর সবচেয়ে মেধাবীও ।

বিজ্ঞানী বিজ্ঞানী "গ্যালিলিও গ্যালিলি" সম্পর্কে অজানা এবং দারুন সব তথ্য

বেশ অল্প বয়স থেকে গ্যালিলিওর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। প্রথম জীবনে তিনি চিকিৎসা শাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করতেন। একদিন ঘটনাক্রমে তিনি জ্যামিতি বিষয়ে একটি বক্তৃতা শুনেন। এই ঘটনাই তার জীবনের গতিপথ বদলে দেয় এবং পৃথিবীর ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয়। তিনি আগ্রহী হয়ে ওঠেন গণিতের প্রতি এবং চিকিৎসাশাস্ত্র ছেড়ে গ্যালিলি এবার অংক নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। কিন্তু আর্থিক অসচ্ছলতার দরুণ সেখানেই তার পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে হয়। এইসব সত্ত্বেও ১৫৮৯ সালে গ্যালিলিও পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার জন্য একটি পদ পান এবং সেখানে গণিত পড়ানো শুরু করেন। কেননা ইতোমধ্যেই তিনি ভৌতবিজ্ঞানের সূত্রগুলির ওপর কিছু অসাধারন তত্ত্ব ও চিন্তাভাবনা প্রকাশ করে ফেলেছেন। এর পরপরই তিনি পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান এবং সেখানকার অনুষদে জ্যামিতি, বলবিজ্ঞান এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ে ১৬১০ সালের পূর্ব পর্যন্ত অধ্যাপনা করেন। এই সময়ের মধ্যেই তিনি বিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে ভাবেন এবং বহু গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার করেন।

জীবনের প্রথম দিকেই গ্যালিলি নিশ্চিত হয়েছিলেন, দুই সহস্রাধিক বছরের পুরনো টলেমির নীতিটি একেবারেই ভ্রান্ত। টলেমির সূত্রটি হলো,”সূর্য পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরে””… কিন্ত সেই মধ্যযুগে টলেমির বিপরীত ধারণা পোষন করার অর্থ ধর্মদ্রোহিতা। সুতরাং গ্যালিলিও এ বিষয়ে জনসমক্ষে কোন উচ্চবাচ্য করলেন না।

১৬০৯ সালের বসন্তে তিনি পদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছিলেন। সেই সময় তিনি শুনে পান, হল্যান্ডে একটি নতুন যন্ত্র আবিষ্কৃত হয়েছে, যার নাম টেলিস্কোপ। যার সাহায্যে দূর আকাশের অনেক কিছুই দেখা যায়। গ্যালিলি টেলিস্কোপ যন্ত্রটিকে ঢেলে সাজালেন, আরও উন্নত করে তুললেন। এবার সেই যন্ত্র দিয়ে তিনি আকাশ পর্যবেক্ষণ শুরু করলেন, পৃথিবী থেকে প্রথমবারের মতো অনেক নতুন জিনিস তিনি দেখতে পেলেন যা এর আগে আর কারো চোখে ধরা পড়েনি! শনিগ্রহের বলয়গুলোও প্রথম সুস্পষ্টভাবে তার চোখেই ধরা পড়লো। সূর্যের চারপাশে কয়েকটি বিন্দুর আবর্তন দেখে তিনি নিশ্চিত হলেন কোপার্নিকাসের তত্ত্বই সঠিক। পৃথিবী আদৌ সৌরজগতের কেন্দ্র নয়, এ-কথা জানাবার সময় হয়ে গেছে। বহুবার তিনি রোমে গেলেন পোপের কাছ থেকে অনুমতি নিতে। শেষ পর্যন্ত ১৬২৪ সালে পোপের কাছ থেকে অনুমতিও পেলেন। ‘জগতের অবস্থা’ বিষয়ে গ্যালিলিও এখন কোপার্নিকাস ও টলেমি দু’জনের তত্ত্বই আলোচনা করতে পারবেন।

১৬৩২ সালে তার ‘ডায়ালগ “কনসার্নিং দ্য টু চিফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস’”প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে সমস্ত ইউরোপে এটি এক গুরুত্বপূর্ণ আধুনিক দর্শন ও বিজ্ঞানের গ্রন্থ বলে স্বীকৃত হলো। কিন্তু গ্যালিলিওকে এর চরম মূল্য দিতে হলো। রোমান ক্যাথলিক চার্চ তখনও প্রোটেস্টান্ট সংস্কারের আঘাত কাটিয়ে উঠতে পারেনি, ধর্মযাজকরা ঘোষনা করলেন , “লুথার এবং ক্যালভিনের সমষ্টিগত অপরাধের চেয়েও গ্যালিলির একার অপরাধ ধর্মের পক্ষে আরো বেশি ক্ষতিকারক ।” রোম শহরে একটি জাল দলিল পাওয়া গেল, এই দলিলে না কি বলা হয়েছে গ্যালিলিও যেন কোনভাবেই কোপার্নিকাসের তত্ত্ব আলোচনা না করেন।

গ্যালিলিওকে গ্রেফতার করে অভিযুক্ত করা হলো, তাকে দেখানো হলো শারীরিক অত্যাচারের ভয়। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো, ফ্লোরেন্সে তার নিজ বাড়িতে তাঁকে অন্তরিন অবস্থায় বাকি জীবন কাটাতে হবে। এত কিছু সত্ত্বেও তিনি দমলেন না, তিনি একের পর এক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে লাগলেন। এসব পরীক্ষায় তিনি যেসব সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন সেগুলি লিখে রাখলেন। শেষ করলেন তার বই “‘ডায়ালগ কনসার্নিং দ্য টু নিউ সায়েন্সে”।
এই বইয়ে গ্যালিলিও পদার্থবিজ্ঞান ও বলবিদ্যা নিয়ে তাঁর যাবতীয় চিন্তাধারা লিপিবদ্ধ করেছেন। ১৬৩৮ সালে প্রোটেস্টান্টরা হল্যান্ড থেকে এই বইটি প্রকাশ করেন।

এর চার বছর পর ৭৮ বছর বয়সে অন্ধ হয়ে অন্তরিন অবস্থাতেই গ্যালিলিওর মৃত্যু হয়। কিন্ত ততদিনে তিনি জেনে গেছেন, “এই বিশ্ব, এই জগৎ, এই পৃথিবী আর আগের অবস্থায় নেই। প্রাচীনযুগের গন্ডি পেরিয়ে এই পৃথিবী এগিয়ে গেছে আরো অনেক….অনেক দূর! ”

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here

19 + 6 =