২০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে ৪৪ হাজার টাকা দামের স্যামসাং গ্যালাক্সি-এস ৪

1
578

শোরুমগুলোতে স্যামসাং নোট-৩ মোবাইল ফোনসেট বিক্রি হচ্ছে ৫৩ হাজার টাকায়। নোট-২-এর দাম ৫১ হাজার টাকা। কিন্তু চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা খাসেরহাট থেকে শুরু করে রাজশাহী জেলা সদরের বিভিন্ন শোরুমে এগুলো পাওয়া যাচ্ছে যথাক্রমে ৩৫ ও সাড়ে ২২ হাজার টাকায়।

কিভাবে এত কম দামে বিক্রি করা সম্ভব? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেল, নামি ব্র্যান্ডের এসব ফোনসেট ভারত থেকে চোরাই পথে ঢুকছে ওই অঞ্চলে। চোরাচালানের এসব সেট বিক্রির জন্য আলাদা দোকানও গড়ে উঠেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাকের ডগায়। ডিলার ছাড়া অন্য শোরুমগুলোতে অন্তত ৪০ ভাগ ফোনসেটই চোরাই পথে আসা।

২০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে ৪৪ হাজার টাকা দামের স্যামসাং গ্যালাক্সি-এস ৪ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে ৪৪ হাজার টাকা দামের স্যামসাং গ্যালাক্সি-এস ৪

খোঁজ নিয়ে আরো জানা গেছে, চোরাই পথে আসা এসব সেটের বাইরের আবরণ বা কেসিং পরিবর্তন করে অথবা কিছু সংযোজন-বিয়োজন করে একেবারে নতুন আকার দেওয়া হচ্ছে। এসব ফোনসেটের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহও বেশি। কয়েক দিন ধরে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ক্রেতা সেজে সরেজমিন অনুসন্ধানে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

চোরাই পথে আসা মোবাইল ফোনসেটের রমরমা ব্যবসার কারণে সরকার একদিকে যেমন হারাচ্ছে শুল্ক, তেমনি বৈধ ডিলাররাও ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
শিবগঞ্জের খাসেরহাট ঘুরে দেখা গেছে, এই উপজেলার সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত বিনোদপুর ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর, কালু, ফটিক, কবির হোসেন ও ফনুসহ অন্তত ১০ ব্যক্তি ভারত থেকে পুরনো অথবা চুরি, ডাকাতি বা ছিনতাই হওয়া নতুন ফোনসেট চোরাই পথে আনছে। তারা নিজেরাই এগুলো খুচরা বিক্রি করে। কখনো শিবগঞ্জের পাইকারি তিন ব্যবসায়ী অথবা রাজশাহী থেকে যাওয়া ব্যবসায়ীদের কাছে পাইকারি দরে বিক্রি করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যবসায়ী নিশ্চিত করেছেন, শিবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে যেসব ফোনসেট আসে সেগুলো হয়তো কিছুদিনের পুরনো, নয়তো ছিনতাই, চুরি বা ডাকাতি করা। শিবগঞ্জে আসার পর তারা বিক্রি করে থাকে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা বেশি দামে। এতে করে যত দামি সেটই হোক না কেন নতুনের চেয়ে প্রায় অর্ধেক দামে বিক্রি করা যায়। এগুলোর চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে।
ওই ব্যবসায়ীরা আরো জানান, ৪৪ হাজার টাকা দামের স্যামসাং গ্যালাক্সি-এস ৪ বিক্রি হচ্ছে ২০ হাজার টাকায়, ৫৫ হাজার টাকা দামের নকিয়া লুমিয়া-১৫২০ বিক্রি হচ্ছে ২২ হাজার টাকা, ৪৪ হাজার টাকা দামের লুমিয়া-১০২০ বিক্রি হচ্ছে ২০ হাজার টাকায়, এইচটিসি-১ ডুয়েলের দাম মাত্র ২৫ হাজার টাকা।
শিবগঞ্জের এক চোরাকারবারি জানায়, সে গড়ে প্রতিদিন অন্তত ২০টি সেট ভারত থেকে আনে। সীমান্তের কাঁটাতারের কাছে গেলে ওপারের কারবারিরা পলিথিন প্যাকেট বা বস্তায় বেঁধে এপারে ফেলে দেয়। তারাও এপার থেকে টাকার বান্ডেল ওপারে ছুড়ে দেয়।
এসব ফোনসেট বিক্রি হচ্ছে শিবগঞ্জ উপজেলা বাজারের রাস্তার ধার ঘেঁষে গড়ে ওঠা তিনটি দোকানে। এর মধ্যে মা টেলিকম হলো সবচেয়ে বড় দোকান। অন্য দুটি দোকান হলো সোনালি টেলিকম ও খাজা বাবা টেলিকম।
ক্রেতা সেজে গত রবিবার দুপুর ১টার সময় মা টেলিকমে গিয়ে দেখা যায়, কমপক্ষে ১৫ জন ক্রেতা রয়েছে সেখানে। এ দোকানে বাংলাদেশি কভার, হেড ফোন, ব্যাটারিসহ কিছু আনুষঙ্গিক জিনিস রয়েছে। আর শ তিনেক ফোনসেটের মধ্যে সবগুলোই ভারতীয়। কোনোটি কিছুটা পুরনো, কোনোটি প্রায় নতুন। আবার কোনোটি একেবারে নতুন। শুধু প্যাকেট ছাড়া বিক্রি হচ্ছে মোবাইল ফোনসেটগুলো।
জানা গেছে, সম্প্রতি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) একটি দল মা টেলিকমসহ অন্য তিনটি দোকানে অভিযান চালিয়ে ভারতীয় ৯৫টি সেট জব্দ করেছিল। এর মধ্যে মা টেলিকমেই পাওয়া গিয়েছিল ৬৫টি।
সোনালি টেলিকমের মালিক সনি হোসেন বলেন, ‘ওপার থেকে সেট নিয়ে এসে আমাদের কাছে দিয়ে যায়। আমরা এখানে বসে ব্যবসা করি।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, এ অবৈধ ব্যবসার জন্য শিবগঞ্জ থানাসহ প্রশাসনের একাধিক দপ্তরে বখরা দিতে হয়। শিবগঞ্জ থানার আগের ওসিকে প্রতিদিন দিতে হতো পাঁচ হাজার টাকা। এখনো থানায় মাসিক হারে টাকা দিতে হয়।
জানতে চাইলে শিবগঞ্জ থানার ওসি আশিকুর রহমান বলেন, ‘থানা পুলিশ কোনো বখরা নেয় না। তবে এই ব্যবসাটি অবৈধ। এর আগে টাস্কফোর্স গঠন করে বেশ কিছু সেট জব্দ করা হলেও এ ব্যবসা থেমে নেই।’

1 মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ