জটিল কিছু টিউন্স

পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসার নামে চলছে অমানুষিক নির্যাতন

“মাদকাশক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র” ;নামটা শুনলেই একটা শ্রদ্ধাবোধ আসে মন থেকে কারণ আমরা মনে করি ভূল পথে পরিচালিত হওয়া কিছু মানুষকে এখানে জীবনের সঠিক পথের সন্ধান দেওয়া হয় । কিন্তু বাস্তব সম্পুর্ণ ভিন্ন । চিকিৎসার নামে এখানে চলে শারীরিক + মানসিক নির্যাতন । যা শুনলে গায়ে কাটা দিয়ে ওঠবে যে কোন মানুষের ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছূক আমার একটি খুব কাছের ছোট ভাই সর্বপ্রথম চিকিৎসা করতে যায় “সূর্য মাদকাশক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রে” । তার নাম সুমন । ৩ মাস ৯ দিন চিকিৎসা করার পর সুমন বের হয় ওইখান থেকে । বের হবার পর আমি তাকে দেখে অবাক হয়ে যায় । আমি জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে তোর ? তুই এত শুকনা হইছিস কিভাবে । সুমনের চোখে মুখে তখন ছিল ভয়ের ছাপ ও অজানা আতঙ্ক । আমার সাথে কথা বলে নি । তখন তার সাথে দেখলাম সূর্য সেন্টারের দুইজন লোক । বুঝতে পারলাম ওই লোকগুলার জন্য ভয়ে সে কথা বলছেনা ।
পরে জানতে পারলাম সুমন পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছে । পড়ালেখাও শেষ । বর্তমানে পাবনায় আছে সে । কৌতুহলঃবশত অনেক চেষ্টা করে জানতে পারলাম ওখানে কি হয় ।
সর্বপ্রথম আপনি ওখানে ভর্তি হবার পরই আপনার মাথার চুল সহ শরীরে বর্ধিত হয় সব জায়গার চুল ফেলে দেওয়া হয় । তারপর আপনাকে দিগম্বর করে ঘন্টাখানেক সময় বাথরুমের ফ্লোরে বসিয়ে রাখবে । আর ঢোকার দিন রাত ১০ টার দিকে সব রোগীর সামনে আপনাকে বলতে হবে ‘আমি অমুক আমি একজন এডিক্ট’ । আপনি এডিক্ট হোন আর না হোন ।
এর পর সকাল ছয়টার সময় ঘন্টা বাজিয়ে ঘুম থেকে জাগানো হয় । শুরু হয় চিকিৎসার নামে অমানুষিক নির্যাতন । ঘুম থেকে উঠেই আপনাকে রুটি বানাতে হবে । দেড় কিলো আঠা দিয়ে ৪০/৪৫ জনের রুটি । যা শুনলে অবিশ্বাস্য মনে হয় । কিন্তু ওখানে তা হয় । সাথে এক মুঠো বুটের ডাল । নামে মাত্র পেয়াজ দেওয়া হয় । সকালের নাস্তা একজনে তিনটা রুটি সাথে বুটের ডালের পানি ।
এরপর একটা সেশন বসে, ওটার নাম মর্নিং মিটিং । ওখানে অকথ্য ভাষায় একজন আরেকজনকে গালাগালি করতে হয় । আগের দিন কেউ যদি কোন ভুল করে তাহলে ওটা গ্রুপ সিনিয়র অথবা অন্য কেউ ওই মর্নিং মিটিংএ উঠায় তারপর শুরু হয় গালাগালি । আপনি যদি ভুল করেন আর আপনার বিচার শুরু হয় তাহলে আপনাকে নীরবে গালিগুলো সহ্য করতে হবে । মর্নিং মিটিং চলে ১ ঘন্টা ১৫ মিনিটের মত । এরপর আবার আপনাকে কাজ করতে হবে । ঘর ঝাড়ু দেওয়া, ধোয়া, মোছা । বাথরুম পরিষ্কার করা । আর যে জিনিসটা সবচেয়ে খারাপ লাগে সেটা হচ্ছে স্টাফ’রা মানে চিকিৎসা কেন্দ্র যাদের তত্ত্বাবধানে থাকে তাদের বিছানা ঠিক করে দেও্য়া তদের জুতো জোড়া পরিষ্কার করে দেওয়া । শার্ট ইস্ত্রি করা । তাদের বাথরুম ক্লিন করা । এভাবে সারাদিনে চার পাঁচ বার সবকিছু ক্লিন করতে হয় ।
আর রান্নাবান্নাও আপনাকেই করতে হবে । দুপুরে ও রাতের বেলায় ডাল আর চড়ুই পাখির ডিমের সমান আলু ভর্তা দেওয়া হয় । ওখানের নিয়ম কানুনের একটু এদিক সেদিক হলেই ১০/১২ জন স্টাফ মিলে মারধর করে, তাও উলংগ করে সবার সামনে । সি আই এ, ইন্টারপোল, এফ বি আই ইনফরমেশনের জন্য যেভাবে ওয়াটার বোর্ডিং থেরাপী দেয় ঠিক সেভাবে ৪/৫ জন হাত পা বেধে নাকে মুখে পানি মারা শুরু করে ।
আর তারা যদি মনে করে আপনার ইগো সমস্যা আছে তাহলে আপনাকে খালি গায়ে সকাল বেলা রাস্তা ঝাড়ু দেওয়াবে । রাস্তার ডাস্টবিন পরিস্কার করাবে । কমোডে হাত ঢোকাবে, তার উপর হাত ধুতে দিবে না ।
ওখানে আপনি তিন মাস থাকবেন আপনাকে টুথব্রাশ দেওয়া হবেনা । সাবান দেওয়া হবে না । আপনার পরিবার থেকে কেউ যদি আপনার কাপড় চোপড় দিয়ে যায় তাহলে তারা নিজেরা সেগুলো ব্যবহার করবে, আপনাকে দিবে না । আপনার পরিবার থেকে যদি খাবার দেওয়া হয় । সেগুলো আপনাকে দেওয়া হবে না, তারা নিজেরাই খাবে ।
সবচেয়ে খারাপ জিনিসটা হচ্ছে অনেক কমবয়সী ছেলেকে রাতের বেলা ডেকে নিয়ে রিহাবের মালিকরা শরীর ম্যাসেজ করাবে, এটাকে তারা বলে সুস্থতার ভিত্তি । আমার জানা মতে হবিগঞ্জ সূর্য রিহাবিলিটেশন সেন্টারে বাইরের শহরের কম বয়সী ছেলেদেরকে রাতের বেলা ম্যসেজের কথা বলে নিয়ে গিয়ে শারীরিক প্রয়োজন মেটায় সেন্টারের মালিকরা । তাদের মধ্যে গৌতম নামের একজন আছেন, উনি সিলেট শহরের একটি ছেলেকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করেন, ছেলেটা শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করে । হবিগঞ্জ সূর্য রিহাবিলিটেশন সেন্টারে রাতের বেলা লাখ লাখ টাকার জুয়া খেলা হয় । দেহব্যবসা হয় রাতের অন্ধকারে ছাদের একটি রুমে । হবিগঞ্জের রিহাব সেন্টারে দুইজন ডাক্তারের সাইনবোর্ড আছে শুধু রোগীদের মা বাবাকে দেখানোর জন্য । কিন্তু বছরেও একবার আসেনা এইসব ডাক্তার ।
(আমি যা কিছু বলছি সব কিছুর প্রমাণ আছে আমার কাছে, যাদের সাথে এইসব অনিয়ম হয়েছে তারাই নিজের মুখে বলবে যদি প্রমাণের দরকার হয় )
এই রকম ভূড়ি ভূড়ি উদাহরণ আছে । অনেক ছেলেরা ভিতরের ব্যপারগুলা মেনে নিতে পারেনা, যে জন্য বের হয়ে আরও বেশি নেশা করে । পরিবারকে বললে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পরিবার বিশ্বাস করে না । ফলে আমরা বার বার একি জায়গায় চিকিৎসা করতে যাই আমাদের পরিবারের ইচ্ছায় । আর আমাদের পরিবার যদি একবার চায় তাহলে তারা আপনাকে জোর করে যে কোন সময় যে কোনখান থেকে ধরে নিয়ে যাবে ।
অভিবাবক সেজে যে কোন কেউ আপনাকে ওই সব চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে ফেলে রাখবে বছরের পর বছর যা আপনার প্রিয়জন কখনো জানবেনা । অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে হবিগঞ্জ সূর্য রিহাব সেন্টারে সম্পত্তি নিয়ে ঝামেলার জন্য অনেক ছেলেকে ভিতরে আটকিয়ে রেখে চলে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন । আর তখন অনেকেই ভয়ে বিভিন্ন কাগজ পত্রে সাইন করে ।
আমি বুঝিনা, এইসব ক্ষেত্রে কোথায় থাকে মানবাধিকার কর্মীরা কোথায় থাকেন সুশীল সমাজের লোকজন ? এসব জিনিস আমাদের চোখের সামনেই হচ্ছে কিন্তু আমরা জানি না । কিংবা জেনেও না জানার ভান করি । শুনেও না শুনার ভান করি ।
আমি এক ইউরোপীয়ানের ( লিসা ) মুখে শুনেছিলাম যে বাংলাদেশের আরেকটা নাম হচ্ছে “মগের মুল্লুক” । ওই ইউরোপীয়ান বাংলা উচ্চারণ ঠিকমত করতে পারে না। কিন্তু এই দেশ যে মগের মুল্লুক ওটা সে ঠিকই বুঝেছিল কিংবা কেউ বুঝিয়েছিল । আমি অবশ্য পরে লিসাকে অনেক তর্ক করে বুঝিয়ে দিছিলাম এটা আসলে গোটা কয়েকজন করাপ্টেড মানুষের জন্য ।
এসব ব্যাপারে আমরা কতটুকু সচেতন ? আমাদের অভিবাবকরা কতটুকু সচেতন ? আর সরকারের সচেতনতার ত কোন প্রশ্নই আসে না ।

লেখাটি পূর্বে প্রকাশিত হয়েছিল এখানে যা লিখেছেন আমাদের সম্মানিত মার্কেটিং অফিসার এবং টিজে আশরাফ জনি।

About The Author

আসসালামু আলাইকুম। স্বাগতম আপনাকে। কেমন আছেন আপনি? আশা করি ভাল আছেন। আমি তথ্য প্রযুক্তিকে ভালবাসি। আমার সাথে যোগাযোগ করতে চাইলে ফেসবুকের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারেন। আমার লিঙ্ক : https://www.facebook.com/banda.ikhtiar

Related posts

6 Comments

টিউন সম্পর্কে মতামত দিন।