মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় থিয়েটার থেরাপি ও উৎস

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কর্তৃক প্রদত্ত ২০০১ সালের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক পরিসংখানে উল্লেখ করা হয়েছিল উন্নত বিশ্বের শতকরা ৫০ ভাগ মানুষ মানসিক স্বাস্থ্য সেবা পেয়ে থাকে। সেখানে উন্নয়নশীল দেশে বসবাসকারী মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রাপ্তির হার যে হতাশা ব্যাঞ্জক হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই প্রতিবেদনে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে বেশকিছু সুপারিশ রাখা হয়েছিল। ২০০৮ সালে সেই সুপারিশসমুহের অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে গিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর প্রতিবেদক উল্লেখ করেছেন স্বাস্থ্যখাতে রাষ্ট্রীয়নীতিমালার দূর্বলতা, দক্ষ জনবলের অভাব (বিশেষত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে দক্ষ থিয়েটার থেরাপিষ্ট, কাউন্সিলর, মনোচিকিৎসক ও মনোবিশ্লেষক) এবং পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকা হচ্ছে অন্যতম কারন। এই ঔদাসীন্যতা ও গুরুত্বহীনতার জন্যই মূলত প্রদেয় সুপারিশসমূহ দেখেনি আলোর মুখ। অর্জিত হয়নি বিন্দুমাত্র অগ্রগতি। যার জন্য অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে প্রতিবেদন প্রকাশের পরও দাতাদের বোধদয় না হওয়া। দীর্ঘ সাত বছর পরও যদি দাতা সংস্থাদের সেই সীমাবদ্ধতা অতীক্রম না হয় তবে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা হবে বিপর্যস্থ। তাই মানসিক স্বাস্থ্যকে একটি জনগুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন ইস্যুতে পরিণত করতে প্রয়োজন সরকারী-বেসরকারী যথাযথ পদক্ষেপ। এই ক্ষেত্রে সাইকোথেরাপির অন্যতম ব্যবহারিক কর্মকৌশল থিয়েটার থেরাপির অনুশীলন রাখতে পারে সহায়ক ভূমিকা।

713 doshdik মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় থিয়েটার থেরাপি ও উৎস

নাট্য বিজ্ঞানের ছাত্র হিসাবে স্বেচ্ছাসেবী উন্নয়ন সংগঠন ইউনাইট থিয়েটার ফর সোশাল অ্যাক্শন্ (UTSA/উৎস)- এর তত্ত্বাবধানে ১৯৯৭ সাল থেকে সাইকোথেরাপির অন্যতম প্রয়োগশৈলী থিয়েটার থেরাপির অনুশীলন করলেও ২০০৩ সাল থেকে প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের পরিচালনায় উৎস (UTSA) প্রতিবছর জাতীয় থেরাপিউটিক থিয়েটার কর্মশালা আয়োজনের পাশাপাশি অষ্ট্রেলিয়া, কানাডা, আমেরিকা থেকে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন থিয়েটার থেরাপিষ্টগণদের আমন্ত্রণ জানিয়ে ইস্যুভিত্তিক (এইচআইভি/এইডস, দুর্যোগ, প্রতিবন্ধীতা, মানসিক চাপ, আতংকগ্রস্থতা, মাদকাসক্তি, পারিবারিক কলহ, মানসগঠন, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, সৃজনশীলতা, কর্মী ব্যবস্থপনা, সংগঠন উন্নয়ন প্রভৃতি) স্বতন্ত্র কর্মশালা আয়োজন করে নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত লক্ষ্য জনগোষ্ঠিভিত্তিক অনুশীলন প্রক্রিয়া চালু রেখেছে।

২০০১ সাল থেকে উৎস (UTSA) একশনএইড বাংলাদেশের সহযোগীতায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গের সাইকোসোশাল কেয়ার এন্ড সাপোর্ট নিশ্চিত করতে “থিয়েটার থেরাপি সেন্টার অব দ্যা ডিজএ্যাবল্ড (টিটিসিডি)” প্রতিষ্ঠা করে বহুমূখী কর্মকান্ড পরিচালনা করে আসছে।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গের মনোদৈহিক ও মনোসামাজিক অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করার এক পর্যায়ে মনোদৈহিক চাপগ্রস্থ এবং মানসিক রোগ ও সমস্যাগ্রস্থ ব্যক্তিদের জন্য সাইকোসোশাল কেয়ার সাপোর্ট প্রদানে উৎস (UTSA) প্রতিষ্ঠা করে “বাংলাদেশ থেরাপিউটিক থিয়েটার ইনস্টিটিউট (বিটিটিআই)”। কিন্তু সুখের বিষয় এই যে, এ বছর ঘোষিত UNCRPD (United Nation Convention of Rights with Person with Disability)-তে মানসিক সমস্যাগ্রস্থ ব্যক্তিগণ ও মনরোগীদের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গের আওতায় আনায় আমরা তা এখন টিটিসিডি-এর মাধ্যমে সম্পাদন করতে পারব।
ইতিমধ্যে একশনএইড বাংলাদেশ-এর সহযোগিতায় বিটিটিআই সিডর-এ আক্রান্ত- বরগুনা, পটুয়াখালী ও বাগেরহাট উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তিদের সাইকোসোশাল কেয়ার সাপোর্ট প্রোগ্রামও সন্তোষজনক ভাবে সম্পাদন করছে। এছাড়াও উৎস (UTSA) গঠিত বিটিটিআই-এর প্রশিক্ষিত থিয়েটার থেরাপিষ্টদের নেতৃত্বে চট্টগ্রামস্ত কালুরঘাট এলাকায় গার্মেন্টস ফেক্টরী অগ্নিকান্ডে এবং বাকলিয়াস্ত বউবাজার এলাকায় ঘনবসতিপূর্ণ বস্তিতে সংগঠিত অগ্নিকান্ডে নিহতদের আত্মীয়-স্বজন, পরিবার পরিজন ও আহতদের আতংকগ্রস্থতা কমাতে আমরা সাইকোসোশাল কেয়ার কর্মসূচী সম্পন্ন করেছি।

সাইকোথেরাপির অন্যতম ও আধুনিক প্রয়োগ প্রক্রিয়া থেরাপিউটিক থিয়েটার-এর অন্যতম কর্মকৌশল- সাইকোড্রামা, সোসিওড্রামা, প্লেবেক থিয়েটার, ড্রামা থেরাপি, মিউজিক থেরাপি, আর্ট থেরাপি, ডান্স থেরাপি ও পয়েট্রি থেরাপি প্রদানে দক্ষ জনবল সৃষ্টির প্রত্যয়ে উৎস (UTSA) আওতাভুক্ত অন্যতম থিয়েটার ইউনিট টিটিসিডি এবং বিটিটিআই-এর উদ্যোগে ৬ বছরে ছয়টি জাতীয় থেরাপিউটিক থিয়েটার তথা প্রতিবিধানমূলক নাট্য কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছে। যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর ক্লিনিক্যাল সাইকোলজী বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়-এর নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়-এর বিভাগীয় শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ দেশব্যাপি কর্মরত ৩১টি উন্নয়ন সংস্থার সংশ্লিষ্ট কাজে কর্মরত উন্নয়নকর্মীগণ অংশগ্রহণ করেছে। আমাদের পাশাপাশি দেশব্যাপি তাঁরা তাদের স্ব-স্ব কর্মক্ষেত্রে অর্জিত সেই দক্ষতা প্রয়োগ করে মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

সাইকোথেরাপি প্রয়োগ প্রক্রিয়ার দক্ষতা উন্নয়ন পদক্ষেপ-এর অংশ হিসেবে আগামী জানুয়ারী ২০০৯ সালে উৎস (UTSA) আমেরিকান সোসাইটি ফর গ্রুপ সাইকোথেরাপি এন্ড সাইকোড্রামা (ASGPP)-এর বোর্ড মেম্বার ড. হার্ব প্রপার ও জেনি ক্রিষ্টাল-এর পরিচালনায় আয়োজন করতে যাচ্ছে পক্ষকালব্যাপি ৭ম জাতীয় প্রতিবিধানমূলক নাট্য কর্মশালা। যার প্রস্তুতি চলছে।

উল্লেখ্য চলতি বছর একশন এইড বাংলাদেশ-এর আমন্ত্রণে ঢাকাস্ত নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত সাইকোসোশাল কেয়ার সাপোর্ট এন্ড ডিজাস্টার বিষয়ক সেমিনার-এ আমাদেরে একটি উপস্থাপনা ছিল। যেখানে এএবি-এর সম্মানিত বর্তমান কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবিরসহ ডিজএ্যাবলিটি থিম কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। সেই সাথে স্মরণীয় যে, ২০০৬ সালে আয়োজিত ৪র্থ জাতীয় প্রতিবিধানমূলক নাট্যকর্মশালায় একটি দিবসে এএবি-আওতাভুক্ত ডিজাষ্টার থিম-এর সাথে “সাইকোড্রামা ফর আর্থকোয়েক ডিজাষ্টার সারভাইভারস” শিরোনামে একটি কর্মশালা সম্পন্ন হয়েছিল এবং চলতি ২০০৮ সালে এএবি-এর সহযোগিতায় পরিচালিত নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠান এডোলেসেন্ট’স ডেভোলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (এডিএফ) বাংলাদেশ-এর সদস্য সংগঠন সমূহের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে বিটিটিআই “কিশোর-কিশোরীদের মনোসামাজিক পরিচর্যায় প্লেবেক থিয়েটারের ব্যবহার” শীর্ষক ৩ দিন ব্যাপি কর্মশালা আয়োজন করেছিল।

চট্টগ্রাম শহরের বহদ্দারহাট থেকে আগ্রাবাদ বারেক বিল্ডিং মোড় পর্যন্ত- ১৫ কিলোমিটার রাস্তার দুইপাশে ভবঘুরে-ঘুরেবেড়ানো সিজোফ্রেনিয়া রোগীদের দিনব্যাপি এক পর্যবেক্ষণ-এ বর্ণনাতীত করুণ চিত্র আমরা অবলোকন করেছি, যা দুঃখজনক। অথচ মানসিক সমস্যার সম্মুখীন এই জনগোষ্ঠিকে থেরাপিউটিক থিয়েটার কার্যক্রমের আওতায় এনে পুনর্বাসন করা আমাদের মানবিক দায়িত্ব। কারণ এই সহযোগিতা পাওয়া তাদের মানবাধিকার।

দীর্ঘ একযুগেরও বেশী সময়কাল যাবত উৎস (UTSA)-এর আওতাভুক্ত সহযোগি প্রতিষ্ঠান বিটিটিআই ও টিটিসিটি-এর ব্যবস্থাপনায় মানসিক স্বাস্থ্য সংরক্ষণে পরিচালিত কর্মকান্ডের বিবরণী বয়ান করে পাঠকের আর বিরক্তি উৎপাদন করতে চাইনা। চাই পরবর্তী সময়ে আমাদের প্রশিক্ষণ আয়োজন ও কর্মসূচীসমূহে আপনার পূর্ণ সমর্থন।

প্রতিবছর ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে থিয়েটার থেরাপি সেশন আয়োজনের পাশাপাশি সেমিনার ও দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয়ের আলোকে নানা কর্মসূচী পালন অব্যাহত রয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় আগামী ১০ অক্টোবর’০৮ দিবসের নির্ধারিত প্রতিপাদ্য “Making Mental Health a Global Priority: Scaling Up Services through Citizen Advocacy and action” কেন্দ্রিক কর্মসূচী পালনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

লেখক: নির্বাহি পরিচালক, উৎস (UTSA)

পিসির সমস্যা হাজারো, সমাধান একটি টিউনারপেজ হেল্প লাইন
৯,০০০ অনলাইন গেমস নিয়ে মেতে উঠুন টিউনারপেজ গেমস জোন

About The Author

Related posts

2 Comments

Leave a Reply