দায়সারা প্রযুক্তির কারণে অপচয় ৫ হাজার কোটি টাকা!

0
263

দারিদ্র্য দূরীকরণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের লক্ষে সরকারের নেয়া কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) ছয়টি প্রকল্পে দায়সারা প্রযুক্তি নির্বাচনের কারণে অন্ততপক্ষে ৫ হাজার কোটি টাকা অপচয় হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার উপরে ব্যয়ের হিসেব দেখানো হলেও মাত্র দেড় হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি খরচ করেই এই প্রকল্পগুলো সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। পরিকল্পনায় ত্রুটির কারণেই এমন ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে বলে অভিমত তাদের।

829d548178da2534a804d35c203f9998 দায়সারা প্রযুক্তির কারণে অপচয় ৫ হাজার কোটি টাকা!

ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার (আইএসপি) এর সাবেক সহ-সভাপতি সুমন আহমেদ সাবির বলেন, রোডম্যাপ ছাড়া স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা না করে এ ধরনের পরিকল্পনায় গেলে বড় অঙ্কের অপচয় ঘটবে। তা ছাড়া কে ব্যবহার করবে, কি প্রয়োজনে করবে, তা চিহ্নিত না করে এবং ব্যবহারকারীদের প্রয়োজন বিবেচনা না করে অবকাঠামো নির্মাণ করা হলে বাণিজ্যিকভাবেও তা লাভজনকও হবে না। বিটিসিএল এ বিষয়ে অভিজ্ঞ নয় বলেও দাবি করেন সুমন আহমেদ সাবির।

বিশেষজ্ঞদের দাবি, ছয় প্রকল্পের মধ্যে শুধুমাত্র অপটিক্যাল ফাইবার কেবল স্থাপনেই অপচয় হবে এক হাজার কোটি টাকার উপরে। আর ডাটা নেটওয়ার্ক অবকাঠামো বিনির্মাণে টেলিফোন সেবার জন্য প্রচলিত এসডিএইচ যন্ত্রপাতির অযৌক্তিক ব্যবহারের কারণে আরও অপচয় হবে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। ফলে বিটিসিএলের নেয়া এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে আড়াই হাজার কোটি টাকা সরাসরি অপচয় হবে।

অথচ চাহিদা বৃদ্ধির সাথে সঙ্গতি (Build as you grow) রেখে ডাটা অবকাঠামো নির্মাণে প্রকল্প প্রণয়ন করা হলে প্রারম্ভিক বিনিয়োগ দেড় হাজার কোটি টাকাই যথেষ্ট।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ইউনিয়ন, উপজেলা ও দেশব্যাপী নেটওয়ার্ক অবকাঠামো নির্মাণের লক্ষে ছয়টি প্রকল্প হাতে নেয় বিটিসিএল। প্রকল্প ছয়টি হচ্ছে- টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প, ১ হাজার ইউনিয়ন প্রকল্প, ওএফসি-২৯০ উপজেলা প্রকল্প, ১ হাজার ইউনিয়ন দুর্গম প্রকল্প, ৪-জি এলটিই প্রকল্প, নেক্সট জেনারেশন নেটওয়ার্ক (এনজিএন) প্রকল্প।

এসব প্রকল্পের আওতায় মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৫শ’১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ১শ’৯৮ কোটি টাকা এবং প্রকল্প ঋণ সহায়তা প্রায় ৩ হাজার ৩শ‘ ১৮ কোটি টাকা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ ফাইবার অপটিক কেবল স্থাপনে প্রতি কিলোমিটার প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচ হবে। অথচ পল্লী বিদ্যুতের অবকাঠামো ব্যবহার করে ওভারহেড ফাইবার অপটিক কেবল স্থাপন করা হলে প্রতি কিলোমিটার মাত্র ৩৫ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে মানসম্মত প্রচলিত এরিয়াল ফাইবার অপটিক কেবল ফিগার-৮, এডিএসএস, এফআরপি ইত্যাদি ব্যবহার করেই তা করা যাবে। এছাড়া দেশে এরিয়াল ফাইবার অপটিক কেবল রক্ষণাবেক্ষণেও অভিজ্ঞ জনবলের অভাব নেই। অপরদিকে গ্রামাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ ফাইবার অপটিক কেবল কতটা নিরাপদ থাকবে তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। যদি কোনো কারণে সমস্যা দেখা দেয় তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে মাটি খুঁড়ে মেরামতের ব্যবস্থাও ব্যয়বহুল এবং সময় সাপেক্ষ।

সবচেয়ে বড় কথা, অপেক্ষাকৃত বেশি ঝুঁকি ও জরুরি বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাই যেখানে ভূগর্ভস্থ করা হয় না, সেখানে বিদেশি ঋণের টাকা দিয়ে কম নিরাপত্তা ঝুঁকির কেবল স্থাপনে অধিক ব্যয় করা হচ্ছে। বিষয়টি ভেবে দেখার মতো বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বিটিসিএলের এসব প্রকল্পের আওতায় এসডিএস ট্রান্সমিশন যন্ত্রপাতি কেনার জন্য বড় অঙ্কের ব্যয় ধরা হয়েছে। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন ডাটা নেটওয়ার্কিং। কারণ এসব যন্ত্রপাতিতে কম্পিউটিংয়ের ব্যবস্থা নেই।

বর্তমানে ডাটা নেটওয়ার্কিংয়ের জন্য সহজলভ্য প্লাটফরমগুলোতে স্বল্প দূরত্বের ক্ষেত্রে (১০ থেকে ৮০ কিলোমিটার) ফাইবার পোর্ট রয়েছে, যা উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের জন্য যথেষ্ট।

কার্যত টেলিফোন সেবার জন্য এসটিএম-১, এসটিএম-১৬, এসটিএম-৬৪ যন্ত্রপাতিগুলোর প্রয়োজন পড়ে না। আর এ ধরণের এক্সেস নেটওয়ার্কের জন্য এসডিএইচ যন্ত্রপাতির মূল্য ডাটা যন্ত্রপাতির মূল্য অপেক্ষা অনেক বেশি। আবার, ডাটা নেটওয়ার্কের জন্য পিএসটিএন ব্যবহার করা হলে পিএসটিএন থেকে ডাটা এবং ডাটা থেকে পিএসটিএন কনভার্সন হবে ব্যয়সাধ্য ও অহেতুক।

এ সব বিষয়ে সুমন আহমেদ সাবির আহমেদ বলেন, দেশের ৩ শতাংশ মানুষকে টার্গেট করে অবকাঠামো নির্মাণ করা ঠিক হবে না। সব মানুষকে এর আওতায় আনতে হবে। যারা ডাটা ব্যবহার করবেন তারা কি কারণে এবং কি প্রয়োজনে ব্যবহার করবেন তা চিহ্নিত করতে হবে। সামগ্রিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে এ ধরণের বৃহৎ কাজ করতে হবে। আর তা করতে হলে প্রয়োজন রোডম্যাপ প্রণয়ন।

তিনি বলেন, ডাটা অবকাঠামো নির্মাণ সরকার বাণিজ্যিকভাবে করতে চায় কি না, তা নির্ভর করবে সরকারের পলিসির উপর। এ জন্য স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে হবে। ব্যবহারের প্রয়োজন না বুঝে গ্রামাঞ্চলে ডাটা অবকাঠামো ভূগর্ভস্থ কেবল স্থাপন হবে বাণিজ্যিকভাবে অপচয়।

– See more at: http://www.deshebideshe.com/news/details/31141#sthash.KcOPfhCI.dpuf

একটি উত্তর ত্যাগ