ফেসবুক ভার্চুয়াল তারুণ্য জাগছে

1
330

দুনিয়ার ৫০ কোটিরও বেশি মানুষ সামাজিক যোগাযোগ সাইট ফেসবুক ব্যবহার করেন, যার মধ্যে ২০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশের নাগরিক। ফেসবুকের সাহায্য নিয়ে এই ২০ লাখ মানুষ নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করেন। ফেসবুকে স্ট্যাটাস, ছবি, ভিডিও, নোট ও প্রয়োজনীয় লিঙ্ক শেয়ার করেন। একসময় তাদের এই যোগাযোগ জুড়ে ছিল ব্যক্তিগত অনুভূতি ও ভাবনার সমাহার। কিন্তু দেশ ও দশের ভাবনা খুব একটা প্রাধান্য পেত না তাদের এই ভার্চুয়াল কর্মকাণ্ডের কোনো অংশেই। কিন্তু খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে ২০ লাখ ফেসবুক ব্যবহারকারীসহ ৬০ লাখ বাংলাদেশী নেটিজেন। এই ৬০ লাখ নেটিজেনের প্রধান অংশ যে তরুণ বাংলাদেশী, যারা খুব বেশি সাড়া দিচ্ছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা ইস্যুতে, তারা ভার্চুয়াল জগতে সংবেদনশীলতার জানান দিচ্ছে। ইন্টারনেট ব্যবহার করে তারা নানা সামাজিক ইস্যুতে জনমত গড়ে তুলছে। এমনকি তারা রাস্তায়ও নেমে আসছে। তাদের তত্পরতাকে আগে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়া না হলেও তিউনিসিয়া, মিসর, লিবিয়া, বাহরাইনসহ মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ঘটনার পর বাংলাদেশী ভার্চুয়াল তারুণ্যের গতিবিধির প্রতি নজর রাখতে শুরু করেছে সরকারের নানা মহল। সরকারবিরোধীরাও আগ্রহী হয়েছেন তাদের প্রতি। বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য, জাতীয় নেতাদেরও দেখা যাচ্ছে তাদের সঙ্গে ভাববিনিময় করতে। ভার্চুয়াল জগতে বাংলাদেশী তরুণদের সক্রিয় হয়ে ওঠার খবর জানাচ্ছেন খোমেনী ইহসান গত ৪ মার্চ মিরপুরের শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে ক্রিকেট দ্বৈরথ চলছিল বাংলাদেশ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যে। অপ্রত্যাশিতভাবে ফেভারিট বাংলাদেশ এই দ্বৈরথে হেরে যায়। খেলা দেখতে সমবেত বাংলাদেশী ক্রিকেট ফ্যানরা এ ঘটনায় বেশ ক্ষুব্ধ হয়। খেলা শেষে তাদের মধ্যে একদল বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়দের বহনকারী বাসে ঢিল ছুড়ে মারে। বাংলাদেশী ক্রিকেটারদের বাস টার্গেট থাকলেও ঢিল পড়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের ক্রিকেটারদের বাসে। ঢিলের আঘাতে বাসটির জানালার কাচ ভেঙে যায়। বাংলাদেশী সমর্থকরা ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের ওপর মোটেও ক্ষুব্ধ না হলেও ঢিল তো লেগেছে তাদের বাসের গায়েই। এমন দুর্ঘটনায় হতবাক হয়ে পড়ে পুরো বাংলাদেশ। লজ্জায় মুখ ঢাকা ছাড়া কোনো উপায়ই যেন ছিল না। অথচ বাংলাদেশী ক্রিকেটপ্রেমীদের সৌজন্য ও ভদ্রতা ভূয়সী প্রশংসা পাচ্ছিল মাইক আথারটনের মতো ক্রিকেট লেখিয়েদের লেখনীতে। সমর্থকদের চরিত্র বিচার করে বাংলাদেশ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এমন মন্তব্যও করছিলেন। কিন্তু শুক্রবারের ঘটনায় সবই জলবত্ তরলং হয়ে গেল। ঢিল ছোড়ার ঘটনা বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের গোহারার বেদনাকেও ছাপিয়ে যায়। পুরো জাতি অমোচনীয় কলঙ্কের বেদনায় নীল হয়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের ভার্চুয়াল তারুণ্য অভাবনীয় এক ঘটনা ঘটিয়ে যেন সব কলঙ্ককে ঢেকে ফেলল! শুক্রবার রাতেই বাংলাদেশী এক ফেসবুক ব্যবহারকারী foisal masum ‘Lets say sorry to our guest’ শিরোনামের একটি ইভেন্ট ইনভাইটেশন পাঠাতে থাকেন পরিচিত সব ফেসবুক বন্ধুকে। তারা সবাইকে শনিবার সকাল ৬টায় হোটেল শেরাটনের সামনে আসতে বলেন। কথামত অর্ধশতাধিক তরুণ-তরুণী হাজির হন শেরাটন হোটেলের সামনে। তাদের হাতে ছিল ফুল, কারও হাতে প্ল্যাকার্ড। নিরাপত্তাজনিত কারণে তারা সরাসরি ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের কাছে ফুল তুলে দিতে পারেননি। কিন্তু আইসিসির কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ওয়েস্ট ইন্ডিজের খেলোয়াড়দের ফুল পৌঁছে দেয়া হয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের খেলোয়াড়রা দূর থেকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা গ্রহণ করেন। নিজস্ব সেলফোন পাঠিয়ে সরি বলতে আসা সমর্থকদের ছবি তুলে নিয়ে যান। তাদের একদল বিমানবন্দরে গিয়েও একইভাবে ‘সরি’ বলে আসেন। তাদের এই সরি বলা বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষই হয়তো টের পাননি। কিন্তু সরি বলার দৃশ্য ফেসবুকের মাধ্যমে পৌঁছে গেছে দুনিয়ার প্রায় সব দেশের মানুষের কাছে। যারাই এই সরি বলার ঘটনার কথা জেনেছেন, বাংলাদেশের ব্যাপারে আবারও উচ্চ ধারণা পোষণ করতে বাধ্য হচ্ছেন। সীমান্ত হত্যার কার্যকর প্রতিবাদের সূচনা ‘আর কত কাঁদবে বাঙালি? আজ অশ্রু সব শুষে নিয়েছে ভিনদেশী সীমান্ত প্রহরী। ফেলানী—কোনো মানুষ নয়, একটি জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ড, একটি বিপ্লব, একটি সতর্ক আহ্বানের নাম, একটি সতর্কবানী, একটি চিত্কার : পানি, পানি। কোন পানি? এ তো ঠিক ফারাক্কার আর্তনাদ, এ তো নব্য টিপাইমুখের আর্তনাদ। প্রিয় বোন! তোমার রক্তের শপথ!! সাম্রাজ্যবাদীদের জবাব দিতে আমরা সজাগ ।’ বাংলাদেশের কিশোরী ফেলানীকে গত ৭ ফেব্রুয়ারি কুড়িগ্রাম সীমান্তে হত্যা করার পরে সবার আগে যারা জেগে ওঠে, তারা ফেসবুক ব্যবহারকারী তরুণ। ্তুঋবষধহর : Resistence Starts From Here (ফেলানী : প্রতিরোধের শুরু এখানেই)’ শিরোনামের এই ফেসবুক পেজটি খুলে প্রতিবাদের সূচনা করা হয়। ফেসবুকে তত্পর বাংলাদেশীদের গ্রুপ ÔGeneration 71’ এই পেজটি খোলে। পেজটির প্রোফাইলে ব্যবহার করা ছবিটিই গোটা বাংলাদেশে পোস্টার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই পেজটির ‘ফেলানী ঝুলছে না, ঝুলছে বাংলাদেশ’ স্লোগানটিও সীমান্তে বাংলাদেশী নাগরিকদের ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বিএসএফের অব্যাহত হত্যাকাণ্ডবিরোধী স্লোগানে পরিণত হয়েছে। এই পেজের সঙ্গে সম্পৃক্ত তরুণদের উদ্যোগে এরই মধ্যে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করা হয়েছে। গত ২১ জানুয়ারি ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে এসে যোগ দেয় ফেসবুক ব্যবহারকারীরা ছাড়াও বাংলা ভাষার কমিউনিটি ব্লগ somewhereinblog.net, sonarbangladesh.com/blog I amarbornomala.com -এর ব্লগাররা। ফেলানী হত্যার ঘটনায় তরুণদের বিক্ষুব্ধ মনোভাব এরই মধ্যে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশে বসবাসকারী প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। ফেসবুক ব্যবহারকারী তরুণরা সীমান্ত হত্যার বিরুদ্ধে অনেক জোরালো আন্দোলন সংঘটিত করার চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক এ দুটি ইস্যু ছাড়াও ভার্চুয়াল জগতে বাংলাদেশের তরুণরা ফেসবুক ব্যবহার করে রাস্তায় নেমে এলেও তারা কাজ করছে নানা ইস্যুতে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের দ্বিদলীয় রাজনীতির বদলে নতুন ধারার রাজনীতি গড়ে তোলার জন্য ‘গণশক্তি— people’s powerÕ নামে একটি গ্রুপ। এই গ্রুপ তরুণদের সংগঠিত করে একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে চায়। ‘জাতীয় সম্পদ রক্ষা নেটওয়ার্ক’ নামের এই নেটওয়ার্কটি জাতীয় সম্পদের ওপর বাংলাদেশের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য কাজ করছে। সাম্রাজ্যবাদী ও দেশি-বিদেশি লুটেরা গোষ্ঠীর চক্রান্তের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন ও সংঘবদ্ধ করতে ভূমিকা রাখার জন্য মানুষ ও সম্পদ রক্ষার আন্দোলনে শক্তি জোগাচ্ছে। বাংলাদেশের লেখকদের রয়্যালিটি নিশ্চিত করার জন্য কাজ করছে ‘লেখক রয়্যালিটি ফোরাম’ গ্রুপ। দেশের প্রায় সব তরুণ লেখকই যুক্ত আছেন এই গ্রুপে। ফেসবুক ব্যবহারকারী Kanak Barman, Nasrin Jarin, Sheikh Taslima Moon I Taimur Faruk Tusher এডমিন হিসেবে পরিচালনা করছেন ‘ইভটিজিংবিরোধী ফেসবুক ফোরাম’। এই ফোরাম ইভটিজিং প্রতিরোধে তরুণদের জোরালো ভূমিকা রাখতে উদ্বুদ্ধ করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী Sohaila Ridwan I Aparna Howlader এবং বুয়েটের শিক্ষার্থী Tanzirul Azim তাদের গ্রুপ Stand Against ACID Attack. এসিড ছোড়ার বিরুদ্ধে তারা প্রচারণা চালাচ্ছেন। ফেসবুকে এ ধরনের নানা গ্রুপ ও পেজের মাধ্যমে তরুণরা নানা ইস্যুতে সংগঠিত হওয়ার পাশাপাশি দেশের শিক্ষাঙ্গনে সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, দুর্নীতি, ক্রসফায়ারে মানুষ হত্যা, গুপ্তহত্যা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, যুদ্ধাপরাধের বিচার ও আদিবাসীদের অধিকার রক্ষাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন দেশের তরুণ ব্লগাররা। তারা কমিউনিটি ব্লগগুলোতে পোস্ট লিখে সচেতন করছেন ভার্চুয়াল তারুণ্যকে। এরপর কী? আজ থেকে কয়েক বছর আগেও কেউ বিশ্বাসই করত না ইন্টারনেটের মাধ্যমে তরুণরা বাংলাদেশে সক্রিয়তার নতুন ভুবন গড়তে পারবে; কম্পিউটারের মাউস ও কি-বোর্ড ব্যবহার করে তারা কিছু করতে পারবে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে সামাজিক যোগাযোগ সাইট ও ব্লগগুলোর কারণে যেভাবে সরকারবিরোধী আন্দোলন দানা বাঁধছে, তাতে অনেকেরই ধারণা বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সবচেয়ে জোরালো প্রতিরোধের ঘোষণাও আসবে এখান থেকে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো, খাবার পানি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, যানজট ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপারে ভার্চুয়াল জগতের তরুণরা সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলবে।

1 মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ