হুমায়ূন আহমেদের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও তথ্যের বিকৃতি ও অপবিজ্ঞান নিয়ে কিছু কথা

0
1087
হুমায়ূন আহমেদের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও তথ্যের বিকৃতি ও অপবিজ্ঞান নিয়ে কিছু কথা

প্রযুক্তির সফিউল

আমি সরিফুল, প্রযুক্তি আমার প্রান ও ভালবাসা, নতুন সকল প্রকার তথ্য ও প্রযুক্তি আমাকে খুব কাছে টানে। জানিনা তেমন কিছু তবে শেখার এবং জানার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
হুমায়ূন আহমেদের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও তথ্যের বিকৃতি ও অপবিজ্ঞান নিয়ে কিছু কথা

এই মুহূর্তে যদি কাউকে জিজ্ঞেস করা হয়ে থাকে, বাঙলা সাহিত্যের বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকের নাম কি ? নিঃসন্দেহে চোখ বন্ধ করে বলবে, “হুমায়ূন আহমেদ”। বাঙলা কথা সাহিত্যে তাঁর জনপ্রিয়তা চোখ ধাঁধানো , এবং যদি বলা হয়ে থাকে , সর্বকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক , তাহলেও হয়তো খুব একটা অত্যুক্তি হবে না। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পর বাঙলা সাহিত্যের তিনিই সবচেয়ে কাছাকাছি যেতে পেরেছেন পাঠকদের । তবে অবশ্যই তা “পাঠকপ্রিয়তার” বিচারে ।

তাঁর প্রথম বই প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালে । “নন্দিত নরকে” দিয়ে তাঁর যাত্রা শুরু , এবং একের পর এক লিখেই চলেছেন অনবরত ।
প্রথম লিখাতেই তিনি মন জয় করে নিয়েছিলেন বাঙলাদেশের অন্যতম প্রধান সাহিত্য-বোদ্ধা আহমেদ শরীফের । আহমেদ শরীফ তাঁর লেখার নান্দনিকতায় ছিলেন একজন গুণমুগ্ধ পাঠক । নন্দিত নরকে পড়ে তিনি লিখেছিলেন ,

বাঙলা সাহিত্য-ক্ষেত্রে এক সুনিপুণ শিল্পীর, এক দক্ষ রূপকারের, এক প্রজ্ঞাবান দ্রষ্টার জন্মলগ্ন যেন অনুভব করলাম ।

সত্যি , ব্যক্তিগতভাবে আমিও তাঁর প্রথম দিকের কিছু লেখার ভক্ত, যেখানে মধ্যবিত্ত জীবনের সুখ- দুঃখ- হাসি- কান্নাগুলো খুব সাবলীলভাবে ফুটে উঠেছে – যা সাহিত্য আলোচনার যোগ্য। তাঁর লিখা “গৌরীপুর জংশন”, “নন্দিত নরকে” লেখাগুলো সত্যি ভালো লাগার মতন ! সাহিত্যের হার্ড-কোর মাপকাঠিতে বিচার না করে যদি সাধারণ দৃষ্টি দিয়ে দেখি, তাহলে সেগুলো একান্তই ফেলে দেয়ার মতো না। আহমেদ সফার মতো সাহিত্যিকও তাঁর বই পড়ে ভেবেছিলেন নতুন এক প্রতিভার উন্মেষ ঘটবে, এবং প্রথম বই প্রকাশের ক্ষেত্রে আহমেদ সফার অবদান অনস্বীকার্য । কিন্তু রুঢ় হলেও এটা সত্য যে, পরবর্তীতে তাকেই পরোক্ষভাবে দায় নিতে হয় হুমায়ূন আজাদের বহুল প্রচলিত (এবং জনপ্রিয়) অপন্যাসিক শব্দটার, যা অনেকাংশেই সত্যি । আহমেদ সফা হয়তো ঠিকই বলেছিলেন

হুমায়ূন আহমেদকে মূল্যায়ন করতে জনপ্রিয়তার দিক থেকে দেখতে গেলে হুমায়ূন শরৎচন্দ্রের চাইতে বড়। মেরিটের দিক থেকে দেখতে গেলে হুমায়ূন নিমাই ভট্টাচার্য্যের সমান।

ক)
শুরুতেই এটা পরিষ্কার করে নেয়া উচিত যে, এই লিখাটা কোন সাহিত্য সমালোচনা না। হুমায়ূন আহমেদের লিখা কালজয়ী নাকি সস্তা জনপ্রিয়- সেসব কোন বোদ্ধা তর্কও আই লিখার উদ্দেশ্য না। হুমায়ূন সাহিত্যের সেন্টিমেন্টালিজম কতোখানি গ্রহণযোগ্য সেটাও উপজীব্য না। উপজীব্য হুমায়ূন সাহিত্যের বিভিন্ন গাঁজাখুরি অবৈজ্ঞানিক কথার বিশ্লেষণ ।
প্রথমেই হিমু ভ্যাগাবন্ড! প্রচলিত ভাষায় ছেলেমেয়েরা যাকে বলে ঢেউটিন মার্কা চরিত্র! হিমুকে দিয়ে লেখক ইচ্ছা করান আমার অ্যালার্জি নাই। একটা গল্প লিখার সময় আপনি নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে যা খুশী তাই লিখতে পারেন, আপনার কোন বাঁধা নেই।সেটার কোন শৈল্পিক আবেদন না থাকলেও কেউ বাঁধা দিবে না, বা জবাবদিহি করতে হবে না যে , “আপনি কেন লিখেছেন ? “ স্বয়ং শেক্সপিয়ার ভৌতিক ব্যাপার নিয়ে লিখেছেন । তাঁর হ্যাম-লেটে ভূতের চরিত্র সাহিত্যজগতে সবারই জানা । বাঙলা সাহিত্যের অলিখিত অবতার রবীন্দ্রনাথ ভূতের গল্প লিখেছেন । এমনকি অনেক কালজয়ী সাহিত্য আছে প্যারানরমাল ব্যাপার স্যাপার নিয়ে। উদাহরণস্বরূপ Doctor Faustus এর কথাই বলা যায় । ফিকশন সাহিত্যে এরকম কিছুর অবতারণা নিতান্তই অমূলক কিছুই না, তা খুবই প্রাসঙ্গিক রূপকের ক্ষেত্রে । কিন্তু যখন একজন লেখক তাঁর জীবনের ব্যাখ্যাতীত কাহিনীগুলো আজে বাজে গল্প বানিয়ে তার সাথে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও তথ্যের বিকৃতি ঘটিয়ে এবং অনেক সময় অপ-বিজ্ঞান যোগ করে দিয়ে পাঠকদের পরিচিত বিনোদনের খোরাক জোগান, তা নিঃসন্দেহে একটা বাজে ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় । এখানে সেসব ব্যাপারগুলোই আলোচনায় তুলে আনার চেষ্টা করবো।

এরকম বহু উদাহরণ দেয়া যাবে ,যেখানে তিনি জিন- ভূত – প্রেতের বিশ্বাসগুলো অত্যন্ত প্রাণান্তকর ভাবে ফুটিয়ে তুলছেন, যা আমাদের কিশোর সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক না করে বিশ্বাস করতে সহায়তা করছে, “যুক্তির বাইরেও কিছু আছে।“ নিঃসন্দেহে তাঁর বলার অধিকার আছে, কিন্তু যেখানে তাঁর মতো একজন জনপ্রিয় সাহিত্যিক এসব আধিভৌতিক “বাস্তব” গল্প শোনাচ্ছেন , সেটা চিন্তার কারণ । এবং আমাদের মেধাশুন্য কিশোর- কিশোরী থেকে তরুণ-যুবা সবাই তা হুমড়ি খেয়ে পড়ছে । ফলশ্রুতিতে তাদের বই পড়ার যোগ্যতা হারিয়ে গিয়েছে । বিশ্বসাহিত্যের নামই দামি বইগুলো তাদের কাছে নীরস ঠেকে । তাদের দরকার হয় খাঁটি হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্য ।আমি বলছিনা , জনপ্রিয় হলেই কোন কিছু সস্তা । শরৎচন্দ্র বাঙলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকদের একজন , তাই বলে কি তাঁর লেখার সাহিত্য-মূল্য নেই ? সেটা কিন্তু কোন প্রশ্নের দাবি রাখে না, কিন্তু হুমায়ূন সাহিত্য সেই দাবি অগ্রাহ্য করতে পারে না। তাঁর বেশ কিছু কারণ আছে ।
উদাহরণস্বরূপ এর নসিমন বিবি গল্পটা সম্পর্কে বলা যেতে পারে। গল্পের শুরুতেই তিনি বলেছেন, জীনের দেয়া সোনার পাতা সঙ্গীতশিল্পী এস আই টুটুল দেখেছে । এবং শেষে তিনি নিজেও দেখতে গিয়েছেন , কিন্তু দেখতে পারেন নি। সেই চিরচেনা সমাপ্তি । আমাদের ছোটবেলায় যাদের কাছের থেকে ভূতের গল্প শুনতাম, কোনটাই বক্তার নিজের অভিজ্ঞতালব্ধ থাকতো না, কারো দাদার , কারো চাচার , কারো ফুপার, তাঁর ফুপার ইত্যাদি ইত্যাদি করে বক্তার সাইকেল ঘুরতেই থাকতো।
নসিমন বিবি- যদি আই গল্পটার সাহিত্যিক মূল্য বিচার করতে যাই, তাহলে আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান দিয়েও বলতে পারি, এর কোন সাহিত্যিক আবেদন নেই , শুধুই গল্প শুনিয়ে যাওয়া । বরই এর পাতা কোন যুক্তিতে জীনের হাতের স্পর্শে সোনার পাতা হয়ে যায় , এবং তা দেখার জন্যে তিনি নসিমন বিবির কাছে ছুটেও যান; সেটা স্বয়ং তিনিই জানেন । ভালো কথা, গল্প শোনান , কিন্তু জিন ভূতের কাহিনী তাঁর মতো একজন বিজ্ঞানমনষ্ক লোকের বাস্তবের মোড়কে উপস্থাপন করাটা কতোটা যুক্তিসঙ্গত? এরকম বহু উদাহরণ দেয়া যাবে তাঁর গল্প থেকে, যেখানে তিনি তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন কাহিনীকে আধিভৌতিক রূপ দিয়েছেন । লিখাটা বেশী বড় করতে চাচ্ছি না, তাই একটাই উদাহরণ থাকল।

তাঁর সৃষ্ট মিসির আলীকে নিয়ে তিনি জুয়া খেলেন। মিসির আলীকে উপস্থাপন করা হয়েছে যুক্তিবাদী হিসেবে, “অনিশ” বইতে মিসির আলীর মুখে দ্ব্যার্থহীন কণ্ঠে আমরা শুনি “রুম ছাড়ব না, কারণ ছাড়লে কুসংস্কারকে প্রশ্রয় দেয়া হয়। আমি এই জীবনে কুসংস্কারকে প্রশ্রয় দেবার মত কোন কাজ করিনি। ভবিষ্যতেও করব না।” খুবই শক্ত কথা, বিজ্ঞানপ্রেমিদের আকর্ষণ করা গেল, যুক্তিবাদীদেরও করা গেল। কিন্তু তিনি যখন তাঁর বইয়ের নায়িকাকে তাঁর ছেলের সাথে টেলিপ্যাথি ক্ষমতার মাধ্যমে যোগাযোগ করিয়ে দেন , কিংবা টেলিপ্যাথি উপায়ে একজনের সাথে যোগাযোগ করান বিভিন্ন জনকে- সেখানে এই ডায়লগের গ্রহণযোগ্যতা কতোখানি বাকি থাকে আর? তা কি শুধু হাস্যরসেরই সৃষ্টি করে না? যুক্তি আর নিজের বিশ্বাসের খিচুড়ি কতোটা গ্রহণযোগ্য?

যুক্তি দিয়ে সাদামাটা ভাবে লিখলে মনে হয় বেস্ট সেলার হওয়া যায় না। কিছু মাল-মশলা তো চাই নাকি? এলো দেবী!! সুপারন্যাচারাল পাওয়ার আর প্যারানরমাল একটিভিটি দিয়ে তারই সৃষ্টি করা চরিত্র মিসির আলীকে সরাসরি “ওরাল-রেপ” করলেন। শুধু দেবী নয় আরও অনেক লেখাতেই আরও অনেক চরিত্র আমদানি করেছেন যেগুলো বিজ্ঞান এবং যুক্তির সাথে সংঘর্ষিক।
অনেকে দাবী করতে পারে, কেন সায়েন্স ফিকশন টাইপ হতে পারেনা? না পারেনা! কারণ সায়েন্স ফিকশনে সায়েন্সের বেসিক প্রিন্সিপালগুলো ভায়োলেট করে লেখা হয়না। সায়েন্স ফিকশনের সংজ্ঞা দেখুন,

a handy short definition of almost all science fiction might read: realistic speculation about possible future events, based solidly on adequate knowledge of the real world, past and present, and on a thorough understanding of the nature and significance of the scientific method [১]

আচ্ছা এরপরও অনেকে এভাবে ডিফেন্ড করতে পারে যে, সরাসরি মিসির আলী তো অবৈজ্ঞানিক কাজ করছেন না, তার আশেপাশের চরিত্রগুলো করছেন। তাহলে দু’টো কথা বলার আছে, এক, তাহলে লেখক মিসির আলীকে যুক্তিবাদী হিসেবে উপস্থাপন করে তার আশেপাশের চরিত্র দিয়ে মূল চরিত্রকেই হেয় করছেন। দুই, হ্যাঁ, স্বয়ং মিসির আলীকে দিয়েও আজগুবি সব ধানাইপানাই না করিয়ে ছাড়েন নি। মিসির আলীর নিজে যখন এক্সট্রাসেন্সরি পারসেপশনে বিশ্বাস করেন এবং তার ছাত্রীদের মাঝে কারো ইএসপি আছে কিনা মাপেন তখন কারো আর কিছু বলার থাকে? ইংরেজি নামগুলো শুনে, তারউপর মিসির আলীর মত যুক্তিবাদী চরিত্রের মুখনিঃসৃত বানী শুনে সাধারণ পাঠক ধরে নিবেন এগুলো অবশ্যই “বৈজ্ঞানিক” ব্যাপার-স্যাপার। কী সুন্দর পাঠক ঠকানো!! যেখানে এই ইএসপি, টেলিপ্যাথি ইত্যাদির বৈজ্ঞানিক মহলে কোনই স্বীকৃতি নেই! এটা অপ-বিজ্ঞান। [২] [৩] [৪] [৫] [৬]
বিজ্ঞান, অপ-বিজ্ঞান সব মিশিয়ে খিচুড়ি বানিয়ে তারউপর একটা যুক্তিবাদী কেন্দ্রীয় চরিত্র টেনে এনে পাঠকদের সামনে পরিবেশন করার মানে কী? এটা বিচার করার দায়িত্বটা মুক্তমনা পাঠকদের উপর ছেড়ে দিলাম।

খ)
উনার পিএইচডি ডিগ্রী আছে। উনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। উনার বিজ্ঞানের সাধারণ ব্যাপারগুলোতে আমাদের মত মানুষের চাইতে কম জ্ঞান আছে মানিনা। তবে অনেক সময় উনি এমন সব কথা লিখেন যা দেখে বেশ আহত হতে হয়। হাজার উদাহরণ দিয়ে মহাকাব্য লিখার ধৈর্য নেই, পাঠকদেরও সময় নেই তাই মাত্র কয়েকটা উদাহরণ দিচ্ছি।
যারা রিলেটিভিটি নিয়ে সাধারণ জ্ঞানটুকু রাখেন তারাই জানেন, বিগ-ব্যাং পরবর্তী ইনফ্ল্যাশন (স্ফীতি) অথবা অ্যালান গুথের ইনফ্ল্যাশন রিলেটিভিটি ভায়োলেট করেছে কিনা। উত্তর স্পষ্ট করে হবে, না। হ্যাঁ, প্রশ্ন জাগতেই পারে যে, কেন মশায় আমরা তো জানি ইনফ্ল্যাশনে একটা পয়সার সাইজ থেকে এক সেকেন্ডের অতিক্ষুদ্র ভগ্নাংশে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির দশগুণ সাইজে সম্প্রসারিত হয়েছে। বিশাল স্পিড! আলোর গতির চাইতে বহু গুন বেশি গতিতে কণাগুলো মুভ করেছে মনে হচ্ছে না? দুটি কণা যেখানে মিলিমিটার দূরত্বে ছিল তা এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে মিলিয়ন মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে চলে গেল যেখানে রিলেটিভিটি বলছে কোনকিছুই আলোর গতি তথা এক সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটারের বেশী গতিতে যেতে পারবে না। ব্যাপারটা আপাত দৃষ্টিতে দেখে রিলেটিভিটির বিপক্ষে মনে হলেও আসলে এটাও রিলেটিভিটির বিপক্ষে যায়না।

ব্যাখ্যা করছি, রিলেটিভিটি বলেছে স্পেসের সাপেক্ষে (অর্থাৎ স্পেস হচ্ছে রেফারেন্স ফ্রেম) কেউ আলোর গতিকে ছাড়িয়ে যেতে পারবে না…কিন্তু স্পেসের নিজস্ব গতি কীসের সাপেক্ষে? স্পেসের কোন রেফারেন্স ফ্রেম নেই তাই এর স্পেসের নিজস্ব স্ফীতি বা গতি রিলেটিভিটিতেই পড়েনা। আর ইনফ্ল্যাশন মানে হচ্ছে স্পেস-স্ফীতি ঘটেছে। ধরুন আপনি ক বিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছেন, আমি খ তে দাঁড়িয়ে আছি। আপনার আর আমার মধ্যে দূরত্ব ৫ মিটার। এখন আমি এক সেকেন্ডে এক মিটার হাঁটলে আমার আমার দ্রুতি হবে ১ মিটার/সেকেন্ড। আর প্রতি সেকেন্ডে আমি আপনার থেকে ১ মিটার করে দূরে সরে যাচ্ছি। কিন্তু ইনফ্ল্যাশনে হিসেবটা ভিন্ন। এখানে আপনি আমি ঠিক নড়ছিনা কিন্তু আমরা যে রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে ছিলাম সেটা একটা রাবারের রাস্তা এবং একটা হঠাৎ করে প্রসারিত হতে শুরু করলো ফলে হলোটা কী? আমি নড়লাম না, মানে আমার দ্রুতি শূন্য কিন্তু আপনার আমার মধ্যে দূরত্ব ঠিকই বাড়ছে। [৭][৮]
আর হুমায়ুন আহমেদ প্রত্রিকায় কী লিখলেন?

বিগ ব্যাং-এর পরপরই ফুটন্ত অগি্নগোলক কণার (?! ধরে নিচ্ছি উত্তপ্ত বস্তু বুঝাচ্ছেন) গতি ছিল আলোর গতির চেয়েও অনেক বেশি। তা কী করে সম্ভব? আমাদের আইনস্টাইন তো বলে গেছেন আলোর গতি ধ্রুবক। সেকেন্ডে এক লাখ ৮৬ হাজার মাইল থেকে বেশি কখনো হতে পারবে না। আইনস্টাইনের ‘থিওরি অব রিলেটিভিটি’ এবং ‘স্পেশাল থিওরি অব রিলেটিভিটি’র একটি আবশ্যকীয় শর্ত আলোর ধ্রুব গতি। সমস্যাটা কোথায়? আইনস্টাইন সমস্যাটা জানতেন” [৯]

আবারো বিচারের ভার পাঠকের উপর ছেড়ে দিলাম।**

তিনি তার “কাঠপেন্সিল” বইয়ে লিখেছেন,

ধরা যাক আমি একজন অবজারভার। স্রোডিনজারের বিড়ালটা আমি দেখছি । আমার দেখার কারণে বিড়ালের ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছে । এখন অবস্থাটা হচ্ছে আমার অবস্থাটা কি ?আমার অবস্থা জানার জন্যে আরেকজনকে আমার দিকে তাকাতে হবে যাতে আমার wave function collapse করে। সেইজনকে বলা হয় wigner’s girlfriend । উইনারের বান্ধবী । এখন সেই বান্ধবীর wave function কলাপস করার জন্যে আরেকজন লাগবে। তাঁর পেছনে আরেকজন লাগবে । এরকম চলতেই থাকবে। আমরা শেষ পর্যন্ত কোথায় থামবো ? একজন cosmic observer এ এসে থামবো ।
পাঠক লক্ষ্য করেছেন কোয়ান্টাম থিওরি আমাদের আধ্যাত্মবাদের দিকে নিয়ে যাচ্ছে । বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের একজন মহান অবজারভারকে আঙুল দিয়ে দেখানোর চেষ্টা করছে । পুরো বিষয়টা পদার্থবিদদের জন্যে যথেষ্ট অস্বস্তিকর । তাঁরা এক জায়গায় এসে নীরব হয়ে যান। কারো ক্ষেত্রে উলটা ফল হয়। পদার্থবিদ্যা ছেড়ে ধর্মে- কর্মে মন দে। উজ্জ্বল উদাহরণ John Polkighorn. বিখ্যাত পদার্থবিদ ছিলেন । এখন চার্চের পাদ্রি ।
নিউটন এবং আইনস্টাইন এই দুইজনেই কিন্তু কঠিন আস্তিক মানুষ । আইনস্টাইন স্বর্গ-নরক নিয়ে মাথা ঘামাতেন না। তিনি বলতেন, আমি আমার গবেষণায় ঈশ্বরের মানসিকতা বুঝার চেষ্টা করি । এর বেশী কিছু না।

মূল কথায় যাওয়ার আগে গৌণ একটা ভুলের প্রতি দৃষ্টিআকর্ষন করছি। হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন “wigner’s girlfriend” কিন্তু আসলে এরকম কথা কোথাও নেই। আসলে এটা হবে “wigner’s friend”। এটা ইচ্ছাকৃত ভুল নাকি অজ্ঞতানিসৃত ভুল বিচার করছি না তবে অরিজিনাল টার্মের চাইতে উনার ব্যবহৃত শব্দজোড়ারই তার পাঠককুলের কাছে আবেদন কিঞ্চিত বেশিই বলে মনে হয় ;-) হুমায়ূন আহমেদের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও তথ্যের বিকৃতি ও অপবিজ্ঞান নিয়ে কিছু কথা

তারপরের ব্যাপারটি হচ্ছে John Polkighorne (হ্যাঁ, এটা Polkighorne হবে) কে নিয়ে। হুমায়ূন আহমেদ ব্যাপারটি এমনভাবে তুলে ধরেছেন যেন উনি একসময় নাস্তিক পদার্থবিদ ছিলেন, “উইনারের বান্ধবী” দেখে তওবা-তিল্লা করে পাদ্রী হয়ে গেছেন। না, উনি ছাত্রজীবন থেকেই ধার্মিক ছিলেন। কেমব্রিজে ছাত্র থাকাকালীন সময়ে তিনি ক্রিশ্চিয়ান ইউনিয়ানে যোগ দেন, বিয়েও করেন ক্রিশ্চিয়ান ইউনিয়ানেরই আরেক সদস্যাকে। পঁচিশ বছর ধরে পদার্থবিজ্ঞানে অবদান রাখার পর তার তিনি প্রিইস্ট হন। তবে আজীবনই তিনি আস্তিক ছিলেন। তিনি নিজেই লিখেছেন

The most fundamental reason for thinking about such an unconventional move was simply that Christianity has always been central to my life. [১০]

যা হুমায়ূন আহমেদের বর্ননার ধরণের সাথে মোটেও মিলে না।

যাইহোক এখানে বিবেচ্য বিষয় ইহা নয়। উনি যে বিষয়টির মাধ্যমে আধ্যাত্মিকতা টেনে এনেছেন তার যৌক্তিকতা কতটুকু দেখা যাক। প্রথমে বলি এই ওয়েভ ফাংশন কলাপ্সের বিষয়টা বেশ কিছু কোয়ান্টাম ইন্টারপ্রেটেশন থেকে এসেছে, এর মধ্যে কোপেনহেগেন ইন্টারপ্রেটেশন খুব বিখ্যাত।
ক) কোপেনহেগেন ইন্টারপ্রেটেশনে ওয়েভ ফাংশন কলাপ্সের কথা বলা আছে ঠিকই কিন্তু ঠিক কী বা কে “অবজার্ভার” হিসেবে বিবেচিত হবে তা সঠিকভাবে নির্ধারণ করা নেই। সুতরাং তিনি শুধুমাত্র “কানসাস অবজারভার” ইন্টারপ্রেটেশনটি বেছে নিয়েছেন।

খ) নীলস বোরসহ অনেকেই ওয়েভ ফাংশন কলাপ্সকে শুধু প্রতীকী উপস্থাপনা বলে আখ্যায়িত করেছেন।

Bohr never talked about the collapse of the wave packet. Nor did it make sense for him to do so because this would mean that one must understand the wave function as referring to something physically real. Bohr spoke of the mathematical formalism of quantum mechanics, including the state vector or the wave function, as a symbolic representation. Bohr associated the use of a pictorial representation with what can be visualized in space and time. Quantum systems are not vizualizable because their states cannot be tracked down in space and time as classical systems’. [১০]

গ) স্রোডিংগারের থট এক্সপেরিমেন্টে ওয়েভ ফাংশন কলাপ্সে কানসাস অবজারভারের ভূমিকার প্রয়োজনই নেই এমনটা পরীক্ষণের মাধ্যমে প্রমাণ করা হয়েছে। দেখানো হয়েছে বাক্সে রাখা গিগার কাউন্টারই যথেষ্ট ওয়েভ ফাংশন কলাপ্স করাতে সেখানে হুমায়ূন আহমেদ বা তার বান্ধবীর দরকার পড়বে না। [১১]

ঘ) কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আরেকটু বহুল পরিচিত নাম হচ্ছে ম্যানি-ওয়ার্ল্ড ইন্টারপ্রেটেশন বা মাল্টিভার্স ইন্টারপ্রেটেশন। এই ইন্টারপ্রেটেশনে ওয়েভ ফাংশন আদৌও কলাপ্স হয়না বলা হয়েছে। এই ইন্টারপ্রেটেশনের পক্ষে অনেক বিখ্যাত পদার্থবিদকেই দেখা যায়, তাদের মধ্যে আছেন স্টিফেন হকিং, ভাইনবার্গ প্রমুখ। [১২]

ঙ) আরও আছে অবজেক্টিভ কলাপ্স থিউরি, এখানে বলা হচ্ছে, কানসাস অবজারভার নয় বরং বিড়াল নিজেই নিজেকে পর্যবেক্ষণ করছে বা প্রকৃতি নিজেই নিজেকে পর্যবেক্ষণ করছে। এর অর্থ হল বিড়াল একটা নিশ্বাস নিলো, অতিক্ষুদ্র হলেও তার ভর বাড়ল সুতরাং ওয়েভ ফাংশন কলাপ্স। নিঃশ্বাস ছাড়ল? ওয়েভ ফাংশন কলাপ্স। তাপমাত্রা পরিবর্তন হল? কলাপ্স! অর্থাৎ কারো বান্ধবীর বাক্স খুলে বিড়াল দেখার আগেই ওয়েভ ফাংশন কলাপ্স হয়ে বসে আছে। [১৩] [১৪]

আসলে আর্গুমেন্টে এসব কিছু এড়িয়ে না গেলে কারো বান্ধবীও আসতো না, কসমিক অবজারভারের ত্যানা টেনে এনে আধ্যাত্মিকতাকে প্রমাণও করা যেত না। তবে ভুলেও ভাববেন না উনি যে পয়েন্ট অব ভিউ থেকে সেদিক থেকেও আধ্যাত্মিকতাকে প্রতিষ্ঠা করা যায়।
সবশেষে আসি ফ্যালাসির ব্যাপারে, উনি যা লিখেছেন সেখানে আধাআধি, গোঁজামিল মিল দিয়ে বিজ্ঞানের তথ্য কিছু যাইহোক দিলেন দিলেন শেষে গিয়ে টেনে আনলেন ফ্যালাসি। ক, খ কে দেখছে। গ, খ কে দেখছে…এই ভাবে বিস্তৃত করতে থাকলে এটা-তো এড ইনফিনিটাম ফ্যালাসিতে পড়ে তাই উনি ফ্যালাসিতে পা না দেয়ার লক্ষ্যে আরেকটু কথা জুড়ে দিলেন, কসমিক অবজারভার অর্থাৎ প্রান্তসীমা নির্ধারণ করে দিলেন। আমার মনে হয় মুক্তমনা পাঠকেরা এতক্ষণে আমার মন বুঝে ফেলেছেন, হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন এখন আমি ছোট্ট করে প্রশ্ন বসিয়ে দিব, তো লেখক মহাশয় অই যে কসমিক অবজারভারকে কে অবজার্ভ করছেন? :-D হুমায়ূন আহমেদের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও তথ্যের বিকৃতি ও অপবিজ্ঞান নিয়ে কিছু কথা

এই পর্বটা হুমায়ূন আহমেদেরই লেখা দিয়ে শেষ করে দিচ্ছি, উনার একটা বইতে লিখেছেন,

“স্থূল দেহের ভেতরেই লুকিয়ে আছে মানুষের সূক্ষ্ম দেহ। সূক্ষ্ম দেহকে বলে বাইপ্লাজমিক বডি। স্থূলদৃষ্টিতে সেই দেহ দেখা যায়না। স্থূল দেহের বিনাশ হলেই সূক্ষ্ম দেহ বা বাইপ্লাজমিক বডি স্থূল দেহ থেকে আলাদা হয়ে যায়। সূক্ষ্ম দেহ শক্তির মত। শক্তির যেমন বিনাশ নাই-তেমনি সূক্ষ্ম দেহের বিনাশ নাই। সূক্ষ্ম দেহের তরঙ্গধর্ম আছে। তরঙ্গ”-দৈর্ঘ্য স্থূল দেহের কামনা-বাসনার সাথে সম্পর্কিত। যার কামনা-বাসনা বেশি তার তরঙ্গ-দৈর্ঘ্য তত বেশি। “
মিসির আলী বই বন্ধ করে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন। স্মিথ নামের এই লোক কিছু বৈজ্ঞানিক শব্দের ব্যবহার করে তার গ্রন্থটি ভারিক্কি করার চেষ্টা করেছেন। নিজের বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছেন পাঠকের কাছে। গ্রন্থের শুভ ভূমিকার কথাই সবাই বলে—গ্রন্থের যে কী প্রচণ্ড “ঋণাত্মক ভূমিকা” আছে, সে-সম্পর্কে কেউ কিছু বলে না। একজন ক্ষতিকর মানুষ সমাজের যতটা ক্ষতি করতে পারে, তার একশগুণ বেশি ক্ষতি করতে পারে সেই মানুষটির লেখা একটি বই।

একটি উত্তর ত্যাগ