গল্প

15
397

“হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে”




মায়ার বড় খালা লন্ডনে থাকেন। খালার একমাত্র  সন্তান নাবিল লন্ডনের

কিংস্টন ইউনিভার্সিটিতে এল.এল.বি  করছে   ফাইনাল ইয়ার ।


প্রতিবছর জুনে মায়ার খালা-খালুজান, নাবিল ভাইয়া

বাংলাদেশে আসে।  তখনকার পুরো সময়টা মায়ার কাছে উৎসবের মতো লাগে ।

এটা ফেব্রুয়ারি মাস , এখন খালাদের আসার  কথা না কিন্তু  গতপরশুদিন বিকেলে

মায়া ছাদে বসে খুব মনোযোগ দিয়ে একটা বই পড়ছিল , লোকমান উল্কার  বেগে ছুটে

এসে বলল , ও আফা জলদি আহেন দেহেন কিডায় আয়ছে,  কথাটা সে একদমে  শেষ

করেই আবার দৌড়ে চলে গেলো । মায়া মনে মনে বলল, যার ইচ্ছা  সে আসুক আমার

কি ! বই টা প্রায় শেষের দিকে এখন দুনিয়া  উল্টে গেলেও তার কোন দিকে

তাকানোর উপায় নাই । মায়া আবার বই পড়া শুরু করতেই মনে মনে চিন্তা করলো ,

কে আসলো ? মায়ার সব রাগ গিয়ে পড়ল লোকমানের  উপর । ফাজিল ছেমড়া !

বললিই যখন ,  তখন কে এসেছে  তার নাম টা তো বলে যাবি ! মায়া তিক্ত – বিরক্ত

হয়ে বই বন্ধ করে নীচে চলে এলো।


রুমে ডুকতেই মায়া হতভম্ব ! মাকে জড়িয়ে ধরে নাবিল ভাইয়া বসে আছে । সে যা দেখছে তা

ঠিক দেখছে তো ?   নাকি স্বপ্ন ! নাবিল বলল,  আমার মায়ারাণী কেমন আছে ? মায়ার

ঘোর তখনও কাটেনি,  সে চোখ বড় বড় করে স্ট্যাচুর মতো দাড়িয়ে আছে । মায়ার

ঘোর কাটলো , নাবিল যখন তার মাথার চুল এলোমেলো করে দিয়ে বলল , তোদের

কাওকে  না বলেই চলে এলাম , ভাল করেছি নারে মায়া ?  মায়া  জোরে

জোরে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,  হুম  খুব ভালো করেছো , খালা – খালুজান কৈ ?

নাবিল বলল,  আম্মু – আব্বু আসেনি আমি একা এসেছি একটু  কাজ আছে

তাই ।  আমি যে আসছি এটা তোদেরকে ইচ্ছে করেই জানাইনি, কেমন সারপ্রাইজ

দিলাম বল ?  হিহি …।


মায়াদের বাড়ীতে ইতিমধ্যে উৎসব শুরু হয়ে গেছে । নাবিল ভাইয়ার প্রিয় খাবার – দাবার রান্না

করা হচ্ছে । মায়া আর নাবিল মিলে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছিল , লোকমান হুড়মুড় করে এসে নাবিলকে

বলল , ভাইজান কপি খাইবেন ? কপি বানায় আনমু ? আমি এখলাছ (A class ) এসপেসো কপি

বানান হিকছি । মায়া বলল , এই এসপেসো কপি কিরে ? বল এক্সপ্রেসো কফি । লোকমান দাঁত

বের করে হেসে বলল ওই অইল আর কি , ভাইজান আফনে আমার এসপেসো কপি খায়া কইবেন

কেমুন অইছে ,খালি  মুকে কইলে অইব না কাগজে লিহা  দিতে অইব ,টাহা – পয়সা জমাইতাছি

ইছছা আছে একখান চা – কপির দুকান দিমু আফনের লিহা আমি হেই দুকানে বান্দায়া টাঙ্গায়া রাখমু ।

মায়া বলল , এই তোকে না মা দোকানে যেতে বলল এখানে দাড়িয়ে ভ্যাজভ্যাজ করছিস ক্যান ? যা ।

আফা , যাইতাছিতো ইরুম করেন ক্যা , এদ্দিন বাদে নাবিল বাইয়ে আয়সে দুইডা কতা কয়া যাই !

ও আফা খালাম্মায় দুকানথে কি কি জানি আনবার কইছিল ?

মানে ! তোকে না আমি  কাগজে সব লিস্ট করে দিলাম ?

হ দিছিলেন তো …লোকমান  মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল , তয় হিডা কুতায় যে

থুইলাম ? ধুরো ! এতো খুশীতে কি আর মাইনষের মাথার ঠিক থাহে !


মায়া নাবিলের তিন বছরের ছোট । মায়ার সাথে নাবিলের যেমন ভাব আবার তাদের মাঝে ঝগড়াটাও

হয় দেখার মত । যেমন গতকাল একদফা হয়ে গেছে । নাবিল গিটার বাজিয়ে খুব ভাল গান করে ।

মায়া গতকাল নাবিলকে বলল , ভাইয়া আমি একটা গান লিখেছি দেখতো কেমন হল ? নাবিল খুব

উৎসাহের  সাথে বলল,  কই দেখি ! নাবিল মায়ার লিখা গান পড়ে বলল , বাহ্ ! চমৎকার হয়েছে !

দুর্দান্ত!  ফাটাফাটি ! কিন্তু আমি কিছুই বুঝি  নাই , এইটুকু শুধু বুঝেছি যে,  তুই বিরাট প্রতিভা

তোর মত মেয়েরা  বাংলাদেশের…..।

মায়া যে কত বড় প্রতিভা  তা নিয়ে নাবিল একটা জ্বালাময়ী বত্তৃতা

দেবার পর বলল , আচ্ছা এখন যদি রবিঠাকুর তোর প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তোর কাছে  চলে এসে বলে,


” ওহে.. মোর পরাণ প্রিয়া

ছুটিয়া আসিলাম

তোমার প্রতিভা দেখিয়া ।

চল মোর সনে

সাহিত্য চর্চা করিব

দু’জনায় মিলিয়া

পরপারে বসিয়া ।”

তখন কি হবে ! এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন ! মনে হচ্ছে তোর অগ্নিদৃষ্টিতে আজকে আমাকে ভস্ম

করে ফেলবি ! মায়া হতাশ ভঙ্গিতে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল । নাবিল বকবক করেই যাচ্ছে , মায়া রেগে গিয়ে

একসময় বলল , ভাইয়া তুমি আমার সামনে থেকে যাওতো … যাও দুর হও …আমার চোখের সামনে

থেকে যাও ।

যদি না যাই কি করবি তুই ?

Oh God !

শুধু God কে ডাকছিস কেন ? ডাকতে হলে সবাই কে  একসাথে ডাকবি । শুধু God  কে সন্তুষ্ট রাখলে

হবে ! সবাইকে সন্তুষ্ট রাখতে হবে,  ডাকতে হলে সবাইকে একসাথে ডাকবি,  এভাবে বলবি…

Oh God ! ও আল্লাহ্‌ ! হে ভগবান !

ভাইয়া তুমি just shut up ok ?  এতক্ষণ অনেক অশান্তি করছ , এখন আমার চোখের

সামনে থেকে যাও ।

তুই এত রেগে যাচ্ছিস কেন ! আমি তোর চোখের সামনে থেকে এখনি বিদায় হবো তুই শুধু

আমার দিকে তাকিয়ে হাসি মুখে বল ,

” আমার দুই নয়ন  তোমারে আর  দেখিবার না চায় …

দু’দণ্ড  শান্তি দাও বলিয়া বিদায় ! ”


ভাইয়া তোমার সমস্যা  কি !

তুই ই বল তো কি সমস্যা ? তোরতো অনেক বুদ্ধি !

তোমার মাথায় সমস্যা বুজছ ? তোমার মাথা খারাপ ।

এইতো ধরতে পেরেছ মায়ারাণী । ওই যে কথায় আছে না ? রতনে রতন চেনে হাহা… ।




রাতে খওয়া-দাওয়া শেষ করে , বাসার সবাই মিলে কিছুক্ষণ আড্ডা দিল, নাবিল গিটার বাজিয়ে

গান গাইলো … আমার ও পরান ও যাহা চায়..

মায়ার বাবা বলল, বাবা তুমি কি এই গান টা জান ? আমার সকল দুখের প্রদীপ জ্বেলে …

না জানি নাতো খালুজান , এটা কি আপনার খুব প্রিয়  গান ? মায়া গলা খাঁকারি দিয়ে বলল ,

এটা আমার মা’র  খুব প্রিয় একটা গান তাই অবধারিত ভাবে আমার বাবার ও প্রিয় , তাই

না বাবা ? মায়া কথাটা এমন ভঙ্গিতে বলল , তার  বলার ভঙ্গি দেখে সবাই একসাথে হেসে উঠলো ।


মায়া ঘুমাতে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছিল , এমন সময় নাবিল এসে বলল , মায়া এত্তবড় একটা চাঁদ উঠেছে

দেখবি চল , মায়া বলল , তুমি যাও আমি এখন ঘুমাতে যাবো ।

ঘুমানোর অনেক সময় পাবি চলতো …

নাবিল,  মায়ার  হাত ধরে ছাদে টেনে নিয়ে গেল । ছাদে যাবার পর মায়া আকাশের এদিক – ওদিক

একটু তাকিয়ে, নাবিলের দিকে ঘুরে দুই হাত কোমরে রেখে কপাল কুঁচকে বলল , ভাইয়া কোথায়

তোমার এত্তবড় চাঁদ ! আমি তো কোনো চাঁদ দেখছি না ! নাবিল দুহাতে মায়ার মুখ তুলে ধরে  বলল ,

এই যে আমার আকাশের চাঁদ ! মায়া লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো ।

মাঝে মাঝেই নাবিল ভাইয়া কিভাবে

যেন কথা বলে!  তখন,  তার চেনা নাবিল ভাইয়াকে তার কাছে অন্যরকম লাগে ।

নাবিল বলল,  মায়া ,  আজ

ফেব্রুয়ারির তেরো তারিখ , এখন সময় হল রাত ১১.৫৫ মিনিট , আমি ঠিক ১২ টার পর তোকে একটা প্রশ্ন

করবো , আমার চোখের দিকে তাকিয়ে উত্তরটা দিবি, উত্তরটা  দিবি হ্যাঁ অথবা না দিয়ে । মায়া কিছু বলল না

তার অসম্ভব লজ্জা লাগছে ।


মায়া নাবিল মুখোমুখি চুপচাপ বসে আছে ।

মায়া ?

হুম বল

আমার চোখের দিকে তাকা

মায়া মুখ তুলে তাকাল

চোখের দিকে তাকিয়ে থাকবি চোখ সরাবি না

মায়া নাবিলের চোখের দিকে তাকাল

নাবিল বলল, Will U Marry Me ?

মায়া , মাথা ঝাঁকিয়ে  বলল , হুম

নাবিল হেসে উঠলো , মায়ার মনে হল , এত সুন্দর হাসি সে তার জীবনে দেখেনি । মায়ার চোখ ভিজে উঠল ।

সে মনে মনে বলল , আমি সুখী ,  পৃথিবীর সবচে সুখী মানুষ আমি ।


আমার মায়ারাণীর এত সুন্দর চোখ দু’টোতে  পানি কেন ?

মায়া চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল,

দুক্ষে বুজলা দুক্ষে,   তুমি সারাজিবন অনেক যন্ত্রণা  করবে,   আমার জানটা ভাজা ভাজা করে ফেলবে সেই দুক্ষে ।

নাবিল গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল , হুম কথাটা তুই খারাপ বলিস নাই , ভাজা বলতে ভাজা ! একেবারে ঝাল ফ্রাই করে ফেলব !

দুজনেই একসাথে হেসে উঠল ।


মায়া , আমি তোকে পেয়েছি ,  আমার জিবনে আর কিছু চাই নারে ।

” আমার মায়ারাণীর কপালে দিলাম একটা চুমু এঁকে…

আমার হৃদয়ে আলো হয়ে যেন সে সবসময় থাকে ।”



প্রকৃতির একটা  নিষ্ঠুর দিক আছে , এই নিষ্ঠুরতা প্রকৃতি মানুষের ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি প্রয়োগ করে ।

প্রকৃতির নিয়মই হল,  পরিপূর্ণতা দান করে তা আবার কেঁড়ে নেয়া । প্রকৃতি তার  নিজস্ব নিয়মে  চলে ।

মায়া- নাবিলের ক্ষেত্রেও হয়ত এই নিয়মের ব্যতিক্রম  ঘটবে না ।


15 মন্তব্য

  1. মানি না, , মাত্র একটা গল্প কেন?? :O আরও গল্প চাই।
    খুবই ভাল হয়েছে, ,

    ending টার সম্বন্ধে ভাবগাম্ভীর্য পূর্ণ কথা ;) — প্রকৃতির এই নিয়ম টা আছে দেখেই বোধহয় ‘পরিপূর্ণতা’ টা অনেক বেশি ভাল লাগে।।

    newaYz,,,keep..iT..uP :)


    • ending টার সম্বন্ধে ভাবগাম্ভীর্য পূর্ণ কথা ;) — প্রকৃতির এই নিয়ম টা আছে দেখেই বোধহয় ‘পরিপূর্ণতা’ টা অনেক বেশি ভাল লাগে।। ”
      ওরে….. সাবাশ ! হ্যাঁ try করব, N তুই’ ও keep..iT..uP :)

একটি উত্তর ত্যাগ