গোয়েন্দা নজরদারিতে অনলাইন সহ ১২৯টি এমএলএম কোম্পানি

1
628

গোয়েন্দা নজরদারিতে অনলাইন সহ ১২৯টি এমএলএম কোম্পানিমাল্টিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানির ১২৯টি প্রতিষ্ঠানের তালিকা এখন গোয়েন্দাদের হাতে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধিত ৬২টি কোম্পানি ছাড়া এগুলোর বেশিরভাগই নাম স্বর্বস্ব। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একটা অফিস ভাড়া নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে হাতিয়ে নিয়েছে মোটা অংকের টাকা। এ অবস্থায় এমএলএম প্রতারণার ফাঁদে পড়েছে প্রায় এক কোটি মানুষ। ইতিমধ্যে ৪৫টি কোম্পানির নিবন্ধন বাতিল করেছে সরকার। এছাড়া আরো ১২৯ এমএলএম কোম্পানির ব্যাপারে খোঁজ খবর নিতে গোয়েন্দাদের একটি টিম মাঠে নেমেছে। খবর গোয়েন্দা সূত্রের।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, রাজধানীর গুলশান, বনানী, মগবাজার, ইস্কাটন, পান্থপথ, বসুন্ধরা সিটি, নয়াপল্টন, পুরানা পল্টন, পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় এমএলএম এর নামে প্রতারণা ব্যবসা চলছে। যুবক, ইউনিপেটু এবং ডেসটিনির ব্যাপারে ব্যাপক প্রতারণার খবরে দেশব্যাপী তোলপাড় হলেও অসাধু ব্যবসায়ীরা তাদের এ প্রতারণার ব্যবসা ধরন পাল্টে চালাচ্ছে।

এদিকে ঈদের আগে শেষ কর্মদিবসে নিবন্ধন বাতিল করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দিয়েছে জয়েন্ট স্টক কোম্পানি। একই সঙ্গে এমএলএম ব্যবসায় নতুন কোনো লাইসেন্স না দেওয়ারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এমএলএম ব্যবসার নামে প্রতারণা ঠেকাতে জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনে এ বিষয়ে আলোচনারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি এসব এমএলএম কোম্পানির নিবন্ধন বাতিলের সুপারিশ করে। তবে এমএলএম কোম্পানিগুলোর লাইসেন্স বাতিলের পর গ্রাহকদের সঞ্চয়ের হাজার হাজার কোটি টাকা ফেরত পাওয়ার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দুদক সূত্র জানিয়েছে, ১০টি এমএলএম কোম্পানির ৬ হাজার কোটি টাকা আর্থিক অনিয়মের তদন্তে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। কর্মকর্তারা বলছেন, এই ১০ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইউনিপে টু ইউ, ইউনিগেট ওয়ে টু ইউ, ইউনিরুট ফাইন্যান্স ও মা পলিকম লিমিটেডের ছয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনিয়মের তথ্য ইতোমধ্যে দুদকের হাতে এসেছে। তবে ইজেন্ট ইন্টারন্যাশনাল, র‌্যাবন এক্স, ল অ্যট ভিশন এবং পিক এশিয়া অনলাইন বাংলাদেশ লিমিটেডের বিষয়ে শিঘ্রই অনুসন্ধান শুরু হবে। এসব কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ খতিয়ে দেখছে দুদকের উপপরিচালক তৌফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত একটি তদন্ত দল।

এ ব্যাপারে দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেছেন, ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পর দেশের অন্যান্য এমএলএম কোম্পানির ব্যাপারে কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নানা শ্রেণী পেশার মানুষ এসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেছে। এখানে প্রত্যক্ষভাবে সাধারণ মানুষের স্বার্থ যুক্ত। তাই বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে বলে দুদক চেয়ারম্যান জানান।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রয়োজনীয় আইন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অভাবে গত কয়েক বছরে দেশে বেশ কিছু এমএলএম কোম্পানি গজিয়ে ওঠে। বিভিন্ন ব্যবসার নামে উচ্চ হারে মুনাফার লোভ দেখিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করে। পরে অনেক ক্ষেত্রেই এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা লাপাত্তা হয়ে যাওয়ায় ব্যবসার নামে প্রতারণার বিষয়টি সবার নজরে আসে। ২০১০ সালের শেষ দিকে ইউনিপেটুইউর বিরুদ্ধে এভাবে প্রতারণার অভিযোগ ওঠে। বিনিয়োগকারীরা রাস্তায় নেমে সরকারের কাছে প্রতিকার চাইলে অর্থমন্ত্রীর নির্দেশে বাংলাদেশ ব্যাংক উদ্যোগী হয়। এরপর গত বছর জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক বিজ্ঞপ্তিতে জনগণকে সতর্ক করে বলা হয়, এমএলএম ব্যবসায় কিছু প্রতিষ্ঠান বিদেশে সোনার বাজার কিংবা মুদ্রা বাজারে বিনিয়োগের নামে মাসে ১০ শতাংশেরও বেশি মুনাফার আশ্বাস দিয়ে প্রতারণামূলকভাবে অর্থ সংগ্রহ করছে। ওই সময় দুর্নীতি দমন কমিশন কিছু এমএলএম প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম স্থগিত করে। সর্বশেষ অবৈধ ব্যাংকিংয়ের অভিযোগে ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের প্রেসিডেন্ট, চেয়ারম্যান, এমডিসহ শীর্ষ ২২ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা ও তাদের গ্রেপ্তার করে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়।

লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা ও প্রতারণা বন্ধে জেল জরিমানার বিধান রেখে ‘মাল্টিলেভেল মার্কেটিং নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১২’ নামে একটি আইনের খসড়াতেও সম্প্রতি অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

উল্লেখ্য, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত এমএলএম প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৬২টি। এর মধ্যে কেবল ডেসটিনি-২০০০ এর গ্রাহক সংখ্যাই প্রায় ৫০ লাখ। তবে দেশের প্রায় এক কোটি গ্রাহক এমএলএম প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়েছে বলে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ধারণা।

যেসব কোম্পানির খোঁজে মাঠে নেমেছে গোয়েন্দারা সেগুলো হচ্ছে- সিএসসি ২০০৪ বাংলাদেশ লিমিটেড, চলন বিল ট্রেড এন্ড কমার্স (প্রা.) লিমিটেড, বিডিআরইউএস ট্রেড (প্রা) লিমিটেড, অলিমা কর্পোরেশন লিমিটেড, রিজয়সিং এসএ লিমিটেড, ভিশন (প্রা.) লিমিটেড, স্পইডারস নেট ওয়ার্ল্ড ট্রেডার্স লিমিটেড, কপোতাক্ষ মার্কেটিং কোম্পানি লিমিটেড, সাঙ্গুইন বিডি (প্রা) লিমিটেড, ট্রাভেল হলিডে এক্সপ্রেস লিমিটেড, ফাস্ট পে বাংলাদেশ লিমিটেড, আইলিংকস মর্কেটিং লিমিটেড, ট্রাস্টওয়ে কর্পোরেশন লিমিটেড, আইডিয়া মার্কেটিং কর্পোরেশন লিমিটেডসহ ১২৯টি কোম্পানির তালিকা গোয়েন্দাদের হাতে রয়েছে। নিবন্ধন বাতিল হওয়া কোম্পানিগুলো হচ্ছে- ডেসটিনি ছাড়াও নিবন্ধন বাতিল হওয়া ৪৪টি এমএলএম কোম্পানি হচ্ছে ভিশন (প্রা.) লিমিটেড, ইন্টারন্যাশনাল টং চেং প্রোডাক্টস, ওশান মার্কেটিং কোম্পানি লিমিটেড, সোয়াবস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, হারবা লাইফ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, ফর লাইফ কনসোর্টিয়াম লিমিটেড, ব্র্যাভো আইটি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, ভিলেজ ওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্ক, স্কেচ লিমিটেড, রয়েল ড্রিম, এসএসএন গে¬াবাল লিমিটেড, বীজ-এইম করপোরেশন লিমিটেড, মাস্ক মার্কেটিং প্রাইভেট লিমিটেড, গ্যার্নো ওয়ার্ল্ড ওয়াইড লিমিটেড, এসভিশন ড্রিম মার্কেটিং কোম্পানি লিমিটেড, বন্ধন অ্যাসোসিয়েট প্রাইভেট লিমিটেড, মাল্টিভিশন ২০১০, টোন অ্যান্ড টিউন, গ¬ান্স গেইন, ইভা টেলিকমিউনিকেশন লিমিটেড, জি ই-কম লিমিটেড, নাফ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, ফেইথ মার্কেটিং সিস্টেম লিমিটেড, গার্ডন নেটওয়ার্ক লিমিটেড, গ¬াসিয়ার (বিডি) লিমিটেড, গেনোডারমা মেইন স্টকিষ্ট বাংলাদেশ, ভিয়ানশী বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেড, লয়েড ভিশন প্রাইভেট লিমিটেড, সুখ সারী বাংলাদেশ লিমিটেড, গ্রীন অ্যাকটিভ বিজনেস, ড্রিমওয়ে টিম প্রাইভেট লিমিটেড, লিবার্টি (বিডি) নেটওয়ার্ক মার্কেটিং প্রাইভেট লিমিটেড, রয়েল ভিশন প্রাইভেট লিমিটেড, রয়েল ড্রিম, ফর ইভার লিভিং প্রোডাক্টস বাংলাদেশ লিমিটেড, ওয়ান মিলিয়ন প্রাইভেট লিমিটেড, মেগা পলিস লিমিটেড, জিওনেট লিমিটেড, গোল্ডেন ফিদা লিমিটেড, ন্যাচারাল হার্বস লিমিটেড ও দি এইম সিলিউশন প্রাইভেট লিমিটেড।

লিখেছেন:
রাজ লিংকন চঞ্চল,
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট,
বিডি টুয়েন্টিফোর লাইভ ডট কম:

 [লেখাটি পূর্বে এখানে প্রকাশিত]

1 মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ