একমাত্র আল্লাহর ভীতিই আমাদেরকে গুনাহ থেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে, পর্ব-২

0
198

আল্লাহর ভীতিই আমাদেরঅকে গুনাহ থেকে হেফাজত করতে পারে। এর আগের লেখা পড়ে আশা করি তা কিছুটা বোধগম্য হয়েছে। এখন কিছু সত্য উদাহরণ তুলে ধরার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।

দুধে পানি মিশানোর ঘটনাঃ

খলিফাতুল মুসলিমীন হযরত উমর ফারুক ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ) স্বীয় শাসন আমলে মানুষের অবস্থা জানার জন্য রাতের বেলা মদীনার অলি-গলিতে ঘুরে বেড়াতেন। যদি কারও ব্যাপারে জানতে পারতেন যে, অমুক ব্যক্তি অভাব-অনটনে নিমজ্জিত আছে, তখন তাকে সাহায্য করতেন। যদি জানতে পারতেন যে, অমুক ব্যক্তি কোন মুসীবতে আছেন, তখন তার মুসীবত দূর করার চেষ্টা করতেন। আর যদি কাউকে কোন অন্যায় কাজ করতে দেখতেন, তবে তা সংশোধন করার চেষ্টা করতেন। একদিন তিনি তাহাজ্জুদের সময় মদীনার একটি গলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। হঠাৎ এক ঘর থেকে দুজন মহিলার কথার আওয়াজ শুনতে পেলেন। আওয়াজ থেকে অনুভব করতে পারলেন যে, একজন বয়স্ক, আরেকজন যুবতী। আর যুবতী মেয়েটি সে বয়স্ক মহিলার মেয়ে। মা মেয়েকে লক্ষ্য করে বলছে যে, তুমি যে দুধ দোহন করে এনেছ, এতে কিছু পানি মিশিয়ে নাও। তাহলে দুধের পরিমাণ একটু বেড়ে যাবে। তারপর তা সকালে বিক্রি করে দিবে। উত্তরে সে মেয়ে বলল, আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর ফারুক ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ) এ আদেশ জারি করেছেন যে, কোন ব্যক্তি যেন দুধের সাথে পানি না মেশায়। তাই আমি পানি মেশাতে পারব না। তখন উত্তরে সে বৃদ্ধা মহিলা বলল, এখানে তো আর আমীরুল মুমিনীন বসে নেই। আর এখন অন্ধকার রাত, এখন পানি মিশালে কেউ তোমাকে দেখতে পারবে না। কেউ, বুঝতেও সক্ষম হবে না যে, তুমি দুধে পানি মিশিয়েছ। এর উত্তরে সে বলল, যদিও আমীরুল মুমিনীন দেখছেন না, আমীরুল মুমিনের আমীর আল্লাহ তাআলা তো নিশ্চয়ই দেখছেন। তাই আমি এ কাজ কিভাবে করি? হযরত উমর ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ) গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে সব কথা শুনছিলেন। যখন রাত গড়িয়ে সকাল হল, তখন তিনি সে মেয়েটির খোঁজ-খবর নিলেন। কে এ মেয়ে? যার হৃদয় খোদাভীতিতে ভরপুর। খোঁজ-খবর নেয়ার পর এই যুবতীর সাথে স্বীয় পুত্র প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু )-এর বিবাহের প্রস্তাব দিলেন। অবশেষে এ ভাগ্যবতী মেয়েটির বংশধর থেকেই হযরত উমর ইবনে আব্দুল আজিজ ( রহমতুল্লাহি আলাইহি ) জন্ম নিয়েছিলেন।

সারকথা এ মেয়েটির অন্তরে এ কথা এসেছিল যে, আমীরুল মুমিনীন দেখতে পাচ্ছেন না ঠিকই, কিন্তু আল্লাহ তাআলা তো নিশ্চয়ই দেখছেন। যখন অন্ধকার রাত, নির্জনতা, নিস্তবতা, দেখার মত কেউ ছিল না। কন্তু আল্লাহ তাআলা দেখছেন, এ কথা স্বরণ আসার নামই হচ্ছে তাকওয়া।

আরেকটি শিক্ষণীয় ঘটনাঃ

একবার হযরত উমর ফারুক ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ) সফরে ছিলেন। সফরের যা সরঞ্জামাদি ছিল তা সবই ফুরিয়ে গেল। দেখলেন যে, জঙ্গলে ছাগলের পাল চরে বেড়াচ্ছে। আর আরববাসীদের মধ্যে এ নিয়ম ছিল যে, তারা মেহমানদারী হিসেবে মূল্য ব্যতীত দুধ পান করাত। তাই তিনি পালের রাখালের নিকট গিয়ে বললেন, আমি একজন মুসাফির। আমার সফরের সব সরঞ্জামাদি শেষ হয়ে গেছে। তুমি একটি বকরীর দুধ দোহন করে আমাকে দাও, আমি পান করব। রাখাল উত্তর দিল, আপনি একজন মুসাফির, আপনাকে দেওয়ার জন্য আমি সম্পূর্ণ প্রস্তুত। কিন্তু সমস্যা হল, এ সমস্ত বকরীর মালিক আমি নই। এগুলোর মালিক অন্য একজন। আমার শুধু এগুলো চালানোর দায়িত্ব। এগুলো মার নিকট আমানত স্বরূপ। তাই শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে আমি আপনাকে এগুলোর দুধ পান করানো বৈধ মনে করি না।

এরপর হযরত উমর ফারুক ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ) আরও কঠিনভাবে পরীক্ষা করতে গিয়ে বললেন, দেখ ভাই! আমি তোমাকে একটি লাভের কথা বলছি। যার ভিতরে তোমারও ফায়দা রয়েছে, আমারও ফায়দা রয়েছে। আর সেটি হচ্ছে যে, তুমি এ সমস্ত বকরীগুলো হতে একটি বকরী আমার কাছে বিক্রি করে দাও। তুমি টাকাগুলো পেয়ে গেলে, আর আমি বকরী পেয়ে গেলাম। পথে যেখানেই দরকার হবে, সেখানেই বকরীর দুধ পান করে নিব। বাকী রইল মালিকের কথা। তুমি মালিককে গিয়ে বলবে, হুজর একটি বকরীকে বাঘে খেয়ে ফেলেছে আর সে তোমার কথা বিশ্বাসও করবে। কারণ সাধারণত জঙ্গলে বাঘ বকরী খেয়েই থাকে। এভাবে আমরা উভয়েই লাভবান হয়ে যাব। রাখাল এ সব প্রস্তাব শুনে বলে উঠল, হে ভাই! যদি আমরা এসব করি তবে আল্লাহ কোথায় গেলেন? আমরা ইচ্ছা করলে একাজ এখানে করে ফেলতে পারি এবং মালিককেও সন্তোষজনক জবাব দিতে পারব। কিন্তু এ মালিকের আরও একজন মালিক আছে। তার কাছে গিয়ে কি জবাব দিব? তাই আমি এ কাজ করার জন্য প্রস্তুত নই।

হযরত উমর ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ) –এর পরীক্ষা নেয়া উদ্দেশ্য ছিল। তাই যখন তিনি রাখালের এ জবাব শুনলেন, তখন বলে উঠলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমার মত মানুষ এ পৃথিবীতে বাকী থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোন জালেম অন্যের উপর জুলুম করতে পারবে না। আর যতক্ষণ মানুষের অন্তরে আল্লাহর ভয়, আখিরাতের চিন্তা, আল্লাহর সন্মুখে দাঁড়িয়ে জবাবদিহীর কথা স্মরণ থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত অন্যায় ও জুলুম করতে পারবে না। আর বাস্তবে এটাকেই তাকওয়া বলে।

এরকম আরও বহু ঘটনা রয়েছে। যেগুলো আমাদের সবাইকে অনুসরণ করা উচিত। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আমল করার তৌফিক দান করুন।

একটি উত্তর ত্যাগ