ডোল্যান্সারের প্রতারণা সর্বস্বান্ত গ্রাহকরা জানেন না কী তাঁদের ভবিষ্যৎ

13
355

রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর পূর্ব রসুলপুর মহল্লার দুলাল শেখের স্ত্রী ইয়াসমীন আঁখি। গত বছরের নভেম্বরে প্রতিবেশী এক যুবকের প্ররোচনায় সাড়ে সাত হাজার টাকায় একটি আইডি কিনে ডোল্যান্সারের সদস্য হন। ক্লিকের মাধ্যমে প্রতি মাসে হাজার ডলার উপার্জনের কথা শুনে দেড় শতাধিক আইডি কেনেন সাড়ে তিন লাখ টাকায় এবং ইনভেস্টর সদস্য হন পাঁচ লাখ টাকায়। প্রথম দুই মাসে পান প্রায় এক লাখ টাকা। কিন্তু পরের সাত মাসে একটি টাকাও পাননি। ডোল্যান্সারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রোকন ইউ আহমেদ সস্ত্রীক পালিয়ে গেছেন- এই খবর পেয়ে আঁখি মিরপুরের দক্ষিণ পীরেরবাগের ১৩২/২ নম্বর বাড়ির সামনে এসে গত শনিবার বিকেল থেকে রাস্তায় বসে আছেন। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে আঁখি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘ভাই রে, ডোল্যান্সার আমার সংসারে আগুন জ্বালাইয়া দিছে। সংসার ভাঙার দশা হইছে। স্বামীর ব্যবসার কিছু টাকা আর স্বর্ণের গয়না বিক্রি কইরা এইখানে টাকা জমা দিছিলাম, এখন আমার সব গেল। ঘটনা শুনে স্বামী আমারে বাড়ি থাইকা বাইর কইরা দিছে।’

ডোল্যান্সারের প্রতারণা সর্বস্বান্ত গ্রাহকরা জানেন না কী তাঁদের ভবিষ্যৎ

প্রতারণার শিকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র সুমন ঘোষ বলেন, ‘আমার ঢাকায় থাকার জায়গা হারিয়েছি, গ্রামেও যেতে পারছি না। গ্রামের বাড়িতে আত্মীয়স্বজনদের দুই শতাধিক আইডি কিনে দিয়েছি। আমার কথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পাঁচ শর বেশি আইডি কিনেছেন। কোথাও এখন মুখ দেখানোর জায়গা পাচ্ছি না।’
শুধু ইয়াসমীন আঁখি বা সুমন ঘোষ নন, ডোল্যান্সারের প্রতারণার শিকার হয়েছেন তিন লাখ ৫১ হাজারের বেশি সদস্য। গ্রাহকরা জানান, সদস্য ফি, মাসিক পেমেন্ট এবং লিজ ইনভেস্ট মিলিয়ে প্রায় হাজার কোটি টাকা নিয়ে পালিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রোকন ইউ আহমেদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। সারা দেশের প্রতিটি জেলায় ডোল্যান্সারের ফাঁদে পড়ে প্রতারণার শিকার হওয়া সদস্যদের ৯০ শতাংশই বিভিন্ন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাঁদের চোখে এখন ঘুম নেই। ডোল্যান্সারের প্রতারিত সদস্যদের কয়েকজন জানান, কম্পিউটার আর ইন্টারনেট কানেকশন থাকলে চলবে, ক্লিক করলেই ঘরে বসে হাজার ডলার উপার্জন করা সম্ভব। এভাবে নানা প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীদের ফাঁদে ফেলে সদস্য করে ডোল্যান্সার। প্রতিটি আইডি কিনতে কিংবা সদস্য হতে জমা দিতে হয় সাড়ে সাত হাজার টাকা। বেশি উপার্জনের জন্য একজন সদস্য একাধিক আইডি কিনেছিলেন। এমনকি পোস্ট-১, পোস্ট-২, ইনভেস্টর সদস্য যাঁরা, তাঁরা দুই লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা দিয়েও সদস্য হয়েছেন।
গতকাল রবিবার সরেজমিনে গিয়ে প্রতারণার শিকার হওয়া সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মাসের প্রথম দিক থেকে প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার রোকনকে কোথাও খুঁজে পাননি সদস্যরা। কলাবাগানের অফিসেও তাঁকে দেখা যায়নি। এমনকি জিগাতলার প্রধান কার্যালয়ে তিনি অফিস করেননি। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন রোকন ও তাঁর স্ত্রী সদস্যদের কাছ থেকে সংগৃহীত টাকা নিয়ে সিঙ্গাপুরে পালিয়ে গেছেন। খবর পেয়ে ডোল্যান্সারের পাঁচ হাজারের বেশি সদস্য দুদিন ধরে অবস্থান নিয়েছেন রোকনের শ্বশুরবাড়ি মিরপুরের দক্ষিণ পীরেরবাগের ১৩২/২ বাড়ির চারপাশে।
প্রতারিত গ্রাহকরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করছেন। রোদ-বৃষ্টি থেকে বাঁচতে একটি স্থান ত্রিপল দিয়ে আচ্ছাদিত করা হয়েছে। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ওই বাড়ির সামনে মিরপুর থানা থেকে ১০ সদস্যের একটি পুলিশের দল মোতায়েন করা হয়েছে। গ্রাহকরা অভিযোগ করেন, রোকন সাড়ে তিন লাখ সদস্যদের কাছ থেকে হাজার কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছেন। তাঁর শ্বশুর-শাশুড়িরও গত শুক্রবার দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু খবর পেয়ে ওই বাড়ির সামনে অবস্থান নিয়েছেন তাঁরা। কিন্তু স্থানীয় সন্ত্রাসীরা ওই পরিবারের লোকজনকে নিরাপদে বাড়ি থেকে পালানোর সুযোগ করে দেওয়ার চেষ্টা চালায়। ক্ষুব্ধ গ্রাহকদের তীক্ষ্ণ নজরদারি ও সার্বক্ষণিক অবস্থানের কারণে তাঁরা বাড়ি থেকে বেরোতে পারেননি।
মিরপুর থানার ওসি কাজী ওয়াজেদ আলী জানান, গত শুক্রবার প্রতারিত শত শত গ্রাহক রোকনের শ্বশুড়ের ভাড়া বাসার সামনের সড়কে অবস্থান নেন। কয়েক হাজার প্রতারিত সদস্য সেখানে অবস্থান নেওয়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। একদল চলে গেলে অন্যদল যাওয়া-আসা করছে। মিরপুর থানায় এ বিষয়ে এখনো কেউ মামলা করতে আসেনি। তবে এই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ধানমণ্ডি থানায় দুটি মামলা হয়েছে। এদিকে উত্তেজিত শত শত গ্রাহক গতকাল সকালে ডোল্যান্সারের কলাবাগানের কার্যালয়ে গিয়ে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। প্রায় তিন ঘণ্টা তাঁরা সেখানে অবস্থান করেন। বিকেলে প্রতারিত সদস্যরা সংসদ ভবনের সামনের (মানিক মিয়া এভিনিউ) সড়ক কিছু সময়ের জন্য অবরোধ করে রাখেন। পুলিশের সঙ্গে আলোচনার পর অবরোধ তুলে নিয়ে তাঁরা আবার পীরেরবাগ ফিরে যান।
উত্তরা ৬ নম্বর সেক্টরের মো. শাওন ডোল্যান্সারের স্টার সদস্য। চাকরি করতেন টঙ্গীর গাজিপুরা বেলা টেক্সটাইলের ডায়িং এক্সিকিউটিভ হিসেবে। চাকরি ছেড়ে দিয়ে বেশি উপার্জনের আশায় গত জানুয়ারি মাসে সাড়ে আট লাখ টাকায় ডোল্যান্সারের ইনভেস্টর সদস্য হন। তাঁর আইডি আছে ২৪টি। কিন্তু প্রথম মাসে টাকা পেলেও আজ পর্যন্ত আর কোনো টাকা পাননি তিনি। শাওন বলেন, ‘ডোল্যান্সার আমাকে রাস্তার ফকির বানিয়েছে। এখন আমার মরা ছাড়া কোনো গতি নাই। প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা নিলে আমাদের টাকা উদ্ধার করা যাবে কিন্তু প্রশাসনের কোনো ভূমিকা দেখছি না।’
প্রতারিত আবু সাঈদ মাহিন ডোল্যান্সারের স্টার সদস্য। তিনি বলেন, ‘ক্লিক করে ডলার উপার্জনের জন্য এক লাখ পাঁচ হাজার টাকায় ১৬টি আইডি কিনেছিলাম। আমার কথামতো বাবা ও বড় বোনও ছয় লাখ ১৫ হাজার টাকা খরচ করে আইডি কেনেন এবং লিজ ইনভেস্টর সদস্য হন। এখন আমাদের পুরো পরিবার টাকা হারিয়ে পাগলের মতো। বাবার পেনশনের পুরো টাকাটাই শেষ হয়ে গেছে।’ সিদ্ধেশ্বরী কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র কামাল হোসেন বলেন, ‘অনেক পীড়াপীড়ি করে বাবা-মায়ের কাছ থেকে তিন লাখ ২৫ হাজার টাকা এনে ডোল্যান্সারে দিই। প্রতিষ্ঠানের এমডি পালিয়ে যাওয়ার কথা শুনে বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এখন কী করব বুঝতে পারছি না।’
প্রতারিত সদস্য আশিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা যাঁরা এখানে রাতে অবস্থান করছি, তাঁদের ডোল্যান্সারের মালিকের পক্ষ হয়ে স্থানীয় সন্ত্রাসীরা বিভিন্নভাবে হুমকি দিচ্ছে। দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঘোরাফেরা করছে। এখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য শাসিয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে পুলিশের কঠোর ভূমিকা রাখা উচিত।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জের আহসান হাবিব বলেন, ‘তিন লাখ ২৫ হাজার টাকায় ইনভেস্টর সদস্য হয়ে এখন ফকির হওয়ার অবস্থা। দুদিন ধরে মুখে কোনো খাবার যাচ্ছে না। টাকা না পাওয়া পর্যন্ত এখান থেকে যাব না।’ রাকিব মো. ইয়াসিন নামের আরেক সদস্য বলেন, ‘বাংলালায়নের চাকরি ছেড়ে ডলারের লোভে এখানে সদস্য হয়েছিলাম। এখন চাকরিও গেল, টাকাও গেল।

13 মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ