**রহস্যঘেরা টাইটানিক, (পড়ে দেখুন)**

5
1497
**রহস্যঘেরা টাইটানিক, (পড়ে দেখুন)**

Ezaj Ahmed

আমি হাটিতেছি দূরগম পথে
খুজিতেছি ঠঁাই ,
আসিলাম ঘুরিতে ঘুরিতে
প্রযুকতি দুনিয়ায় ।
**রহস্যঘেরা টাইটানিক, (পড়ে দেখুন)**

**রহস্যঘেরা টাইটানিক, (পড়ে দেখুন)**

 

ইতিহাসের সবচেয়ে বিশাল এবং বিলাসবহুল জাহাজ হিসেবে টাইটানিকের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। ১৯১২ সালে জাহাজটি আশ্চর্যজনকভাবে ডুবে গেলেও আজ পর্যন্ত একে ঘিরে মানুষের আগ্রহ এতটুকু কমেনি।

টাইটানিক জাহাজের পূর্ণনাম RMS TITANIC (RMS-Royel Mail Ship)। এটি ছিল ব্রিটিশ শিপিং কোম্পানি হোয়াইট স্টার লাইনের মালিকানাধীন। এটি তৈরি করা হয় ইউনাইটেড কিংডম-এর বেলফাস্টের হারল্যান্ড ওলফ্ শিপইয়ার্ডে। জন পিয়ারপন্ট মরগান নামক একজন আমেরিকান ধনকুবের এবং ইন্টারন্যাশনাল মার্কেন্টাইল মেরিন কোং-এর অর্থায়নে ১৯০৯ সালের ৩১ মার্চ সর্বপ্রথম টাইটানিকের নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং তখনকার প্রায় ৭.৫ মিলিয়ন (বর্তমান প্রায় ১৬৫ মিলিয়ন) ডলার ব্যয়ে এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয় ৩১ মার্চ ১৯১২ সালে। এর দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৮৮২ ফুট দুই ইঞ্চি (প্রায় ২৬৯.১ মিটার) এবং প্রস্থ ছিল প্রায় ৯২ ফিট (২৮ মিটার)। এ জাহাজটির ওজন ছিল প্রায় ৪৬ হাজার ৩২৮ লং টন। পানি থেকে জাহাজটির ডেকের উচ্চতা ছিল ৫৯ ফুট (১৮ মিটার)।

এ জাহাজটি একই সঙ্গে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫৪৭ জন প্যাসেঞ্জার ও ক্রু বহন করতে পারত। ব্যয়বহুল এবং চাকচিক্যের দিক থেকে তখনকার সব জাহাজকেই ছাড়িয়ে গিয়েছিল। টাইটানিকের ফার্স্ট ক্লাস যাত্রীদের জন্য বিলাসবহুল ডাইনিংয়ের ব্যবস্থা ছিল। সেখানে একই সঙ্গে ৫৫০ জন খাবার খেতে পারত। এছাড়াও এর অভ্যন্তরে ছিল সুদৃশ্য সুইমিং পুল, জিমনেসিয়াম, স্কোয়াস খেলার কোট, ব্যয়বহুল তুর্কিস বাথ, ব্যয়বহুল ক্যাফে এবং ফার্স্ট ক্লাস ও সেকেন্ড ক্লাস উভয় যাত্রীদের জন্য আলাদা বিশাল লাইব্রেরি। তখনকার সব আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটেছিল এ জাহাজটিতে। এর বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাও ছিল খুবই উন্নত ধরনের। এ জাহাজের ফার্স্ট ক্লাসের জন্য তিনটি এবং সেকেন্ড ক্লাসের জন্য একটিসহ মোট চারটি লিফটের ব্যবস্থা ছিল।
জাহাজের ফার্স্ট ক্লাস যাত্রীদের জন্য সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্যাকেজটিতে আটলান্টিক একবার অতিক্রম করতেই ব্যয় করতে হতো তখনকার প্রায় ৪ হাজার ৩৫০ ডলার (যার বর্তমান মূল্য প্রায় ৯৫ হাজার ৮৬০ ডলার বা বর্তমান বাংলাদেশি টাকায় ৬৭ লাখ টাকারও বেশি)।
টাইটানিক প্রায় ৬৪টি লাইফবোট বহন করতে সক্ষম ছিল, যা প্রায় ৪০০০ লোক বহন করতে পারত। কিন্তু টাইটানিক আইনগতভাবে যত লাইফবোট নেওয়া দরকার তার চেয়ে বেশি ২০টি লাইফবোট নিয়ে যাত্রা করেছিল যা টাইটানিকের মোট যাত্রীর ৩৩% বা মাত্র ১ হাজার ১৭৮ জন যাত্রী বহন করতে পারত।

টাইটানিকের ক্যাপ্টেন ছিলেন বিশ্বজুড়ে ‘নিরাপদ ক্যাপ্টেন’, ‘মিলিয়নিয়ার ক্যাপ্টেন’ ইত্যাদি বিভিন্ন নামে খ্যাত এবং ১৫ বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ইংল্যান্ডের রাজকীয় কমান্ডার এডওয়ার্ড জন স্মিথ। তার নেতৃত্বে টাইটানিক ১৯১২ সালের ১০ এপ্রিল ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটন থেকে নিউইয়র্কের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে।

১৪ এপ্রিল ১৯১২ তারিখ রাতে নিস্তব্ধ সমুদ্রের তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রিরও কাছাকাছি নেমে যায়। আকাশ পরিষ্কার থাকলেও চাঁদ দেখা যাচ্ছিল না। সামনে আইসবার্গ (বিশাল ভাসমান বরফখণ্ড) আছে এ সংকেত পেয়ে জাহাজের ক্যাপ্টেন জাহাজের গতি সামান্য দক্ষিণ দিকে ফিরিয়ে দেন। সেদিনই দুপুর এবং বিকেলের দিকে দুটি ভিন্ন ভিন্ন জাহাজ থেকে রেডিওর মাধ্যমে যোগাযোগ করে টাইটানিকের সামনে বড় একটি আইসবার্গ আছে বলে সতর্ক করে দেয় টাইটানিককে। কিন্তু টাইটানিকের রেডিও অপারেটরদের অবহেলার কারণে এই তথ্য টাইটানিকের মূল যোগাযোগ কেন্দ্রে পেঁৗছায়নি। সেদিনই রাত ১১:৪০-এর সময় টাইটানিকের পথ পর্যবেক্ষণকারীরা সরাসরি টাইটানিকের সামনে সেই আইসবার্গটি দেখতে পায় কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। টাইটানিকের ফার্স্ট অফিসার মুর্ডক আকস্মিকভাবে বামে মোড় নেওয়ার অর্ডার দেন এবং জাহাজটিকে সম্পূর্ণ উল্টাদিকে চালনা করতে বা বন্ধ করে দিতে বলেন। তবুও টাইটানিককে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। মোড় নিতেই ডানদিকের আইসবার্গের সঙ্গে প্রচণ্ড ঘষা খেয়ে চলতে থাকে টাইটানিক। ফলে টাইটানিকের প্রায় ৯০ মিটার অংশ জুড়ে চিড় দেখা দেয়।

জাহাজটি সর্বোচ্চ চারটি পানিপূর্ণ কম্পার্টমেন্ট নিয়ে ভেসে থাকতে পারত। কিন্তু ৫টি কম্পর্টমেন্ট পানিপূর্ণ হয়ে যাওয়ায় এর ওজনের কারণে জাহাজটি আস্তে আস্তে ডুবতে থাকে। ঘটনার আকস্মিকতায় ক্যাপ্টেন স্মিথ মূল নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে আসেন এবং জাহাজটি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেন। ১৫ তারিখ মধ্যরাতের দিকে টাইটানিকের লাইফবোটগুলো নামানো শুরু হয়। টাইটানিক বিভিন্ন দিকে জরুরি বিপদ সংকেত পাঠিয়েছিল। যেসব শিপ সাড়া দিয়েছিল তারমধ্যে অন্যতম হলো মাউন্ট ট্যাম্পল, ফ্রাঙ্কফুর্ট এবং টাইটানিকের সহোদর অলিম্পিক। টাইটানিকের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র হতে দূরবর্তী একটি জাহজের আলো দেখা যাচ্ছিল যার পরিচয় এখনো রহস্যে ঘেরা।

রাত ০২:০৫-এর দিকে জাহাজের সম্পূর্ণ মাথাই পানির প্রায় কাছাকাছি চলে আসে। ০২:১০-এর দিকে প্রপেলারকে দৃশ্যমান করে দিয়ে জাহাজের পেছনের দিক উপরে উঠতে থাকে। ০২:১৭-এর দিকে জাহাজের সামনের দিকের ডেক পর্যন্ত পানি উঠে যায়। ওই মুহূর্তেই শেষ দুটি লাইফবোট টাইটানিক ছেড়ে যায় বলে এত বিস্তারিত জানা গেছে। জাহাজের পেছনের দিক ধীরে ধীরে আরো উপরের দিকে উঠতে থাকে। এসময় জাহাজের বিদ্যুতিক সিস্টেম বন্ধ হয়ে যায় এবং চারদিকে অন্ধকার হয়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পরেই ভারের কারণে টাইটানিকের পেছনের অংশ সামনের অংশ থেকে ভেঙে যায় এবং জাহাজের সম্মুখভাগ সম্পূর্ণরূপে পানির নিচে চলে যায়। বায়ুজনিত কারণে এ অংশটি কিছুক্ষণ ভেসে থাকার পর রাত ০২:২০-এর দিকে ধীরে ধীরে জাহাজের বাকি অংশটিও সমুদ্রের অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়। টাইটানিক ত্যাগ করা লাইফবোটগুলোর মধ্যে মাত্র দুটি লাইফবোট আবার উদ্ধার কাজে ফিরে এসেছিল। দুটি লাইফবোট ৮-৯ জন যাত্রীকে উদ্ধার করে। ভোর ০৪:১০-এর দিকে কার্পেথিয়া জাহাজটি এসে পৌঁছয় এবং বেঁচে থাকাদের উদ্ধার করা শুরু করে। সকাল ০৮:৩০ মিনিটে জাহাজটি নিউইয়র্কের দিকে রওনা দেয়। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে খুব অল্পসংখ্যক মানুষই জীবিত ফিরে আসতে পেরেছে। টাইটানিক দুর্ঘটনায় অসংখ্য পরিবার তাদের একমাত্র উপার্জনকারীকে হারিয়েছিল। কেবলমাত্র সাউদাম্পটনের প্রায় ১০০০ পরিবার সরাসরিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

১৯১২ সালে ডুবে যাওয়া এ জাহাজটি সাইড স্ক্যান সোনার পদ্ধতিতে ১৯৮৫ সালে পুনরায় আবিষ্কার করা হয়। এর আগে টাইটানিককে পুনরাবিষ্কারের সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে প্রায় ১২৪৬৭ ফুট বা ৩৮০০ মিটার নিচে নীরবে সমাহিত হয়ে আছে টাইটানিক, হয়ত থাকবেও চিরদিন। বিজ্ঞানীরা নানা গবেষণার জন্য এখনো এ বিষয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন। পানি আর বরফের প্রকোপে ডুবন্ত টাইটানিক আস্তে আস্তে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী ৫০ বছরের মধ্যেই টাইটানিক সাগরবক্ষে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন।

টাইটানিক সারা বিশ্বে এতটাই পরিচিতি পেয়েছিল যে, এর উপর ভিত্তি করে অসংখ্য প্রতিবেদন চিত্র এবং ছায়াছবি তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে জেমস ক্যামেরুনের ( JAMES CAMERON) ‘টাইটানিক’ ছবিটি রেকর্ড ২০০ মিলিয়নেরও অধিক টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়। সবাইকে অবাক করে দিয়ে সারা বিশ্বে টাইটানিক প্রায় ১ হাজার ৮৩৫ মিলিয়ন (১৮৩৫ মিলিয়ন) ডলার আয় করে এবং আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়ে ১১টি অস্কারসহ আরো অন্যান্য ৭৬টি পুরস্কার জিতে নেয়। টাইটানিক ডোবার ৮৫ বছর পরও এর প্রতি মানুষের আগ্রহ একটুও কমেনি ববং বহুগুণে বেড়েছে।

অনেকেরই ধারণা ছিল টাইটানিক জাহাজে কোনো অভিশাপ ছিল। এছাড়াও টাইটানিককে ঘিরে আরো অনেক গল্পের প্রচলন রয়েছে। যুগ যুগ ধরে অসংখ্য বিশেষজ্ঞ টাইটানিককে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন কিন্তু এরপরও টাইটানিক চিরকালই রহস্যের আড়ালে রয়ে গেছে।

5 মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ